জাকিয়া সুলতানা মুক্তা

সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

নারীর সম-অধিকার: প্রসঙ্গ সম্পত্তিতে অধিকার ও উপার্জনের বন্টনবিধি

নারীর হাজার বছরের যে বঞ্চনার ইতিহাস এবং পুরুষতন্ত্রের রাজনৈতিক চালে আজো নারীর যে ঊণমানুষ জীবন-যাপন, তার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের নারীর অবস্থান কোন পর্যায়ে আছে তা নিয়ে বিস্তর আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এই মুহুর্তে সারা বিশ্বব্যাপী নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে, বাংলাদেশও এর থেকে দূরে নয়।

যদি দুই শতক পূর্বের দিকে ফিরে তাকানো যায়, তবে দেখা যাবে যে আধুনিক সভ্যতার নারীরা তাদের পুরুষতন্ত্রের অধীন বঞ্চনাময় জীবনের বিরুদ্ধে সরব উচ্চারণে, সর্বপ্রথম এগিয়ে এসেছিলেন ১৮৫৭ সালে। সেদিনের আমেরিকার সেই সুতা কারখানার শ্রমিক নারীরা কেবল তাদের মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমেছিলেন তা কিন্তু নয়; তারা একইসাথে বঞ্চিত-নিপীড়িতদের প্রতিনিধি হয়েও সেদিনের সেই আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন। সেই দাবীর আন্দোলিত ঢেউ বিভিন্ন পরিক্রমা পার করে, ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে স্বীকৃত হয় ১৯৭৫ সালে। সেদিনের সেই নারী আন্দোলন পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন স্তরে নারীবাদী চর্চার সূচনা করে। এই চর্চার অংশ হিসেবে সমাজ-সভ্যতায় নারীর উপেক্ষিত মানবিক অবস্থান সম্পর্কে যেমন সচেতন গবেষণা চলছে, একই সাথে নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মানবিক বিশ্ব গড়ার প্রত্যয়ও সেখানে রয়েছে।

সুতার কারখানার সেই নারী শ্রমিকেরা, যারা আধুনিক সভ্যতায় নারীর বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন; তারা সেদিন উপার্জনক্ষম নারী ছিলেন বটে, কিন্তু তারা পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রিক কাঠামোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অবস্থানে ছিলেন না। এখানে উল্লেখ্য যে সমসাময়িক বিশ্বে তখন প্রভাবশালী ক্ষমতাদন্ডের অধিকারী নারীর শাসনও চলছিলো, এই বঞ্চিত নারীদের পাশাপাশি; যেমন ব্রিটেনের রাণী ভিক্টোরিয়া (২৪শে মে, ১৮১৯ – ২২শে জানুয়ারি, ১৯০১)। কিন্তু আপামর নারীদের সংখ্যার কাছে উক্ত উপার্জনক্ষম নারীরা নিতান্তই স্বল্পসংখ্যক ছিলেন এবং ক্ষমতার চর্চায় অধিষ্ঠিত নারীরা তখন বটেই, এখনও খুব বেশি পরিমাণে উদাহরণ হিসেবে নেই। তাই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত ইতিহাসে নারীর সার্বিক ক্ষমতায়নের পর্যালোচনা করলে, নারীর চোখে সভ্যতার অগ্রগতি কিন্তু খুব বেশি হয়নি। কারণ, উপরের দু'টো উদাহরণেই এটা স্পষ্ট যে নারীর উপার্জন বা ক্ষমতারোহণ নারীকে পারিবারিক-সামাজিক-বৈশ্বিক মুক্তি এনে দিতে পারেনি, পারে না নিজের সংস্কার থেকেও নিজেকে স্বাধীনতা দিতে। কারণটা পরিষ্কার সেদিনের নারী আন্দোলনের সূচনাকারী নারী শ্রমিকেরা উপার্জনক্ষম হলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন না। আর মহারাণী ভিক্টোরিয়াও ক্ষমতার চূড়া বসেও বঞ্চিত নারীর প্রতিনিধিত্বকারী ছিলেন না, ছিলেন পুরুষতন্ত্রের ঘেরাটোপে বন্দিনী এক পুরুষতন্ত্রের ধ্বজাধারী শাসক। তাইতো নারীবাদী আন্দোলনের শুরুর দিকে উচ্চারিত নারীর সমানাধিকারের প্রশ্ন আজো সার্বিক চর্চায় সমাজের কাছে ধোঁয়াশাপূর্ণ ও প্রশ্নবিদ্ধ। আজো নারীর উপার্জনক্ষম হওয়ার প্রশ্নে ও শিক্ষা অর্জনের প্রশ্নে পুরুষতন্ত্রের ভাবনাতাড়িত ব্যাখ্যার আলোকে নারীর অধিকারের সমাধান খোঁজা হয়। বলা হয় দেশের তথা বিশ্বের, নারী-পুরুষের সংখ্যাগত বিচারে কেবল পুরুষ; সমাজ-সংসারের ঘানি টানলে আদতে আধুনিক বিশ্ব পিছিয়ে পড়বে। সভ্যতার চাকা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাই নারীকে সভ্যতার ঘানি ঠেলার দায়িত্ব পুরুষের পাশাপাশি কাঁধে তুলে নিতে হবে। এই পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যাটি প্রণোদনা হিসেবে নারীমুক্তির আন্দোলনে অত্যন্ত জনপ্রিয় বটে, তবে খেয়াল করলে এমন প্রণোদনার পেছনে পুরুষতান্ত্রিক প্রয়োজনটাও চোখে পড়বে। জনসংখ্যার বিপুল চাপ ও বিশ্বায়নের যুগে তাবৎ সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাষ্ট্রিক-বৈশ্বিক চাপের ফলে, আজকের বিশ্বে কেবল পুরুষের উপার্জনে জগৎ-সংসার চালানো মুশকিল। যেহেতু নারীর গৃহকর্মের কোনো অর্থনৈতিক স্বীকৃতি নেই, নারী কোনো স্তরেই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে না। আর পুরুষতান্ত্রিক সম্মানের সংজ্ঞায়নে নারীর কোনো স্তরেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল্যায়ন পাওয়া এক বিরল ব্যাপার। পারিবারিক-সামাজিক-রাষ্ট্রিক কোনো পর্যায়েই নারীর গৃহকর্মের, নারীর মতামতের, নারীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নে; সম্মানজনক গ্রহণযোগ্যতা কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই বলা যায় নারী গৃহকর্মে বন্দিনী অবস্থাতেই থাকুক, কী পরিবর্তিত বিশ্বের প্রয়োজনমাফিক উপার্জন করতে ঘরের বাইরের কাজেই নামুক কিংবা কোনো না কোনো কানাগলি দিয়ে ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণই করুক; তারা আজও পুরুষতন্ত্রের হাতের পুতুল বৈ আর কিছুই নয়।

সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে নারীকে কখনো কখনো পুরুষতন্ত্রের প্রয়োজনেই গৃহে অন্তরীণ হতে হয়েছে, আবার পুরুষতন্ত্রের প্রয়োজনেই ঘরের বাইরে বের হয়ে উপার্জনক্ষম হওয়ার দৌড়ে নামতে হয়েছে। নারী অর্থনৈতিকভাবে উপার্জনক্ষম হওয়ার স্বীকৃতি পেয়েছে, নারী উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, কালেভদ্রে নারী ক্ষমতার মসনদেও বসার ভাগ্য পেয়েছে; কেবল পায়নি সমদৃষ্টিতে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের প্রশ্নে-সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার প্রশ্নে-নিজের মতন বাঁচার প্রশ্নে মানবিক মূল্যায়ন। তাই নারীকে কেবল শিক্ষিত হলেই চলবে না, উপার্জনক্ষম হলেই বর্তমান বাস্তবতায় চলবে না; সভ্যতার ঘানি পুরুষের পাশাপাশি তাদেরও যেহেতু ঠেলতে হয়, তাই কিছু প্রশ্নের মীমাংসা নিয়ে তাদের ভাববার সময় এখন এসেছে। আর তা হলো,

() উপার্জনক্ষম নারীর উপার্জন কীভাবে বন্টিত হবে? কারা হবে সেই উপার্জনের ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী? কারা কারা হবেন তার চলতি উপার্জনের পাওনাদার?

() উত্তরাধিকারিণী হিসেবে বাবার সম্পত্তিতে পুরুষের সাথে নারীর সমানাধিকার এবং বিবাহসূত্রে স্বামীর সম্পত্তিতে, নারীর অধিকারের বিষয়টিতে; নারী কি আজো জন্ম ও বিবাহসূত্রে প্রাপ্ত উক্ত সম্পত্তির ভাগ সম্মানীয় অনুদান হিসেবে মুফতেই পাওয়ার স্বীকৃতিতে খুশি থাকবে? নাকি নারী সেসব প্রাপ্তির বিপরীতে পারিবারিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক কিছ দায়িত্ব বুঝে নিতে চায়, দায়িত্ব সচেতন হতে চায়? নারী কি চায় সেই দায়িত্ব সচেতনতার প্রেক্ষিতে পুরুষের পাশাপাশি সমান সমান স্বীকৃতি?

() নারীর অর্জিত সম্পদে বাবার বাড়ি-শ্বশুড়বাড়ি-স্বামী-সন্তানের প্রাপ্য কীভাবে নারী বন্টন করতে চায়? এই বন্টনব্যবস্থাতে কেনো পুরুষের দায়িত্বের বিধি ব্যবস্থাই স্বীকৃত থাকবে, নারীর ক্ষেত্রে কেনো থাকবে না? নারীকেও তার অর্জিত উপার্জনের ভাগ, পুরুষের মতন একইভাবে তার চারপাশের বিভিন্ন আত্মীয়তার বা রক্তের সূত্রে সম্পর্কিতদের অংশ কীভাবে বন্টিত হবে তার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। এতে নারী আগ্রহী কিনা?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা এখন সময়ের দাবী। কারণ এখন নারীরা শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, উপার্জন করার সুযোগও পাচ্ছে। তাহলে কেনো সে নিজের মতন বাঁচার স্বাধীনতা পাবে না? নিজের মতন নারী তখনই বাঁচতে পারবে, যখন উক্ত ডিসকোর্সগুলোর যথাযথ উত্তর পারিবারিক-সামাজিক-রাষ্ট্রয়-বৈশ্বিক স্বীকৃতি নারী আদায় করে নিতে পারবে। নারী দিবসে নারীকে কিছু দায়িত্ব বুঝে নিতে হবে এবং মুফতে পাওয়া কিছু পুরুষতান্ত্রিক অনুদান ও তথাকথিত সম্মানের যে ধারণা তার থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

নারীর উপার্জনে নারীর নিজের, বাবার বাড়ি, শ্বশুড়বাড়ির মধ্যে সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিপদে-আপদে মানসিক-শারীরিক-আর্থিক সমর্থনে পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও জীবনে চলার পথে নিজের, বাবার বাড়ির, শ্বশুড়বাড়ির প্রশ্নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সাথে সমান সমান দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসার দক্ষতা এবং উদারতা রাখতে হবে। পরনির্ভরশীল থাকা, পরমুখাপেক্ষী হওয়া ও পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যার আলোকে নিজের বা বাবার বাড়ি অথবা শ্বশুড়বাড়ির প্রশ্নে একচোখা কোনো নীতি অবলম্বন জারি রাখা বা রাখতে বাধ্য হলে চলবে না। কিন্তু কেবল নারীকেই তার উপার্জনের প্রশ্নে এই দায়িত্ব সচেতন হলে হবে না, পাশাপাশি সমাজকেও নারীর উপার্জনের এই বন্টন ব্যবস্থাকে মেনে নেয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। নারীর উপার্জনকে, নারী নিজেই যেনো সংসারের বাড়তি উপার্জন না মনে করে এবং পরিবারের (হোক বাবার বাড়ি বা স্বামী-শ্বশুড়বাড়ি!), কোনো পক্ষই যেনো নারীর আর্থিক অবদান বা ভূমিকাকে বাড়তি বলে মনে না করে। পুরুষ যেমন ঐতিহাসিকভাবে পরিবারের দায়িত্ব নেয় এবং সেই প্রেক্ষিতে সম্পত্তির যৌক্তিক উত্তরাধিকারী হয়, দয়া-দাক্ষিণ্যাকারে জন্ম বা বিবাহসূত্রে প্রাপ্ত ওয়ারিশ হিসেবে নারীর মতন নয়; তেমনি নারীকেও পুরুষের পাশাপাশি সেই যৌক্তিক অবস্থানে অধিষ্ঠিত হতে হবে। এটা সম্ভব তখনই, যখন নারীর উপার্জনের বিধিব্যবস্থায় যৌক্তিক বন্টনের মানসিকতা নারী অর্জন করবে এবং নারীর এই উদ্যমের মানসিকতার সার্বিক স্বীকৃতি মিলবে। এর চর্চাতেই নারী যৌক্তিকভাবে দাবি করতে পারবে পিতা বা স্বামীর সম্পত্তিতে নিজের যৌক্তিক অধিকার। পাশাপাশি পুরুষের প্রাপ্যও বুঝিয়ে দিতে হবে। বাবা বা স্বামীর অধিকারের প্রশ্নে মেয়ে বা স্ত্রীরূপে তার উপার্জন ও ওয়ারিশের সুষ্ঠু অংশীদারিত্ব পুরুষকেও দিতে হবে।

এই প্রশ্নগুলোর সমাধান করতে হলে সম্পত্তি আইনে পরিবর্তন আনতে হবে। বাবার বা স্বামীর বা মায়ের কিংবা স্ত্রীর সম্পত্তিতে নারী-পুরুষ উভয়েরই ভাগাভাগি সমভাবে বন্টিত হওয়া জরুরী। জরুরী ঘরে-বাইরে নারী-পুরুষের পারিবারিক-সামাজিক দায়িত্বের সমান অংশগ্রহণের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা। নারী-পুরুষের উভয়ের অর্জিত উপার্জন ও প্রাপ্ত কিংবা অর্জিত সম্পত্তিতে পারস্পরিক অধিকারের প্রশ্নে সমানাধিকার থাকলে, নারী-পুরুষের বাস্তবিক সমানাধিকার নিশ্চিত হতে পারে বলে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাই নারী দিবসে নারী-পুরুষ তথা সমাজকে এই প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবার আহ্বান জানাই।

660 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।