এদেশীয় ভার্চুয়াল ধর্ষকদের মুখোশ খুলে দিলেন ক্রোয়েশীয় প্রেসিডেন্ট

মঙ্গলবার, জুলাই ১৭, ২০১৮ ৫:৪৩ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টকে যারা চোখ দিয়ে ধর্ষণ করে ছেড়ে দিলেন তাদেরকে আমি ‘ধর্ষক’ই বলবো। এই ধর্ষকামী চিন্তাটা এসেছে এই রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে। কেননা, এই রাষ্ট্র ধর্ষকামী চিন্তাকে পোষণ করে।

ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রেমে হাবুডুবু, তাকে কাছে পেলে জড়িয়ে ধরার মানসিকতা, তাকে চুমো দেওয়ার মানসিকতা যারা প্রকাশ করেছেন তাদেরকে নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। কেননা, তার ব্যক্তিত্ব, তার আচার-আচরণ দেখে আপনাদের এরকম মনোভাবের প্রকাশ ঘটতেই পারে। কিন্তু যখন এই প্রেসিডেন্টের বিকিকিনি পোশাক নিয়ে কথা বলছেন, তার স্তন নিয়ে লালা ঝরাচ্ছেন, তার নিতম্ব নিয়ে ভেবে শরীরের ঘাম ঝড়াচ্ছেন, তার ঠোঁটকে নিয়ে স্বপ্নদোষ হচ্ছে -তখন সেটা ধর্ষক চরিত্রের প্রকাশ।

এই চরিত্রের কারণে আপনি ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টকে ভেবে রাস্তায় যেকোনো নারীকে ধরে ‘খেয়ে ছেড়ে দেওয়ার’ মানসিকতা প্রকাশ করতে পারেন। এই চিন্তাটাকে বিরোধিতা করার জন্যই বলছি, আপনারা সৌন্দর্য আর খেয়ে ছেড়ে দেওয়ার পার্থক্যটা বুঝতে শিখুন। 

আমি ব্যক্তিগতভাবে মার্সেলোকে ভালোবাসি, প্রেম করার মনোভাবও প্রকাশ করেছি, একই সাথে ম্যাক্রোকে আমার ভালো লেগেছে। তার স্মার্টনেস, তার বাহ্যিক অবয়ব আমার ভালো লেগেছে। কিন্তু তাকে খেয়ে দেখার রুচি কিন্তু জাগে নি, তাকে একবেলা বিছানায় নেওয়ার ইচ্ছেও জাগে নি, তাকে ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছেও জাগে নি- কিন্তু তাকে ভালো লাগে! কিন্তু, আপনাদের ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টকে নিয়ে বিছানায় যাওয়ার মনোভাব প্রকাশ করেছেন, তার স্তন নিয়ে কত হাস্যরস আপনাদের, তার নিতম্বকে চেটে দেওয়ার ইচ্ছেও আপনাদের -কারণ আপনারা এই ধর্ষকামী সমাজের ভোগতান্ত্রিক, পুরুষতান্ত্রিক পুরুষ। আপনাদের এমন ইচ্ছে জাগাটা অস্বাভাবিক নয়! তবুও, আমরা এর তীব্র বিরোধিতা করবো, লিখবো। কেননা, আমরা এই ভোগতান্ত্রিক, পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার তীব্র বিরোধিতা করি।

আমরা চাই আপনারাও এই ধর্ষকামী রাষ্ট্রের এই চরিত্রগুলো উন্মোচন করুন। যদি সে দায়িত্ব না নিতে পারেন তবে আপাতত চুপ থেকে যারা এই ধর্ষকামী সমাজের বিরুদ্ধে লড়ছে তাদেরকে সহায়তা করুন।
সোশ্যাল মিডিয়া আজকাল মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল টিম সেমিফাইনালে যাওয়ার আগে থেকেই ঠিক এ ধরনের নোংরা মানসিকতার মানুষজনের দেখা পেয়েছি। তাদেরকে কমেন্ট করে প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন মনে করি নি, কারণ এই মনস্তত্ত্ব পোষণকারীদেরকে ভার্চুয়ালী প্রতিবাদ করা মানে তাদের কাছে ‘ধর্ষিত’ হওয়া।

আমি রীতিমতো অবাক হয়েছি, একজন নামীদামী কবি লিখেছেন, ‘ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টের স্তনে ঠোঁট ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে, তার নিতম্বকে চেটে অর্গাইজম বের করতে ইচ্ছে করে...’ তার এই পোস্টে লাইক এবং কমেন্ট দেখে রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিলাম! এও কী সম্ভব! যারা লাইক, কমেন্ট করেছেন তাদের প্রায় সবাই তার কথার সাথে সহমত প্রকাশ করেছে, হাহা রিঅ্যাক্টে ভরিয়ে দিয়েছে। আমরা কি এই চিন্তা পোষণকারীকে ‘ধর্ষক’ বলতে পারি না? এই চিন্তা পোষণকারীই কোনো না কোনোভাবে ‘ধর্ষণ’ করে এটা বিশ্বাস করতে পারি না! অবশ্যই পারি! 

সৌন্দর্যের গুণকীর্তন কেউ গাইতেই পারে। যতদিন পর্যন্ত এই সমাজব্যবস্থা পরিবর্তন না হচ্ছে ততদিন এই বর্ণপ্রথা থাকবে, সৌন্দর্যের গুণকীর্তন থাকবে। এই গুণকীর্তনটা ব্যক্তিত্ব নিয়ে না, নেতৃত্বগুণ নিয়ে না, দেশপ্রেমিক মনোভাব নিয়েও না -জাস্ট বাহ্যিক অবয়বের গুণকীর্তন! এটা নিয়ে বৃহৎ পরিসরে বৃহৎ আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু, যারা নারীর শরীরের স্তন, ঠোঁট, নিতম্ব (মুর্দ্দাকথা যা দেখতে পারে আর কী!) নিয়ে বিশাল সেক্সুয়াল গবেষণা শুরু করে দিয়েছেন তাদের উদ্দেশ্যে দু’চার কথা বলি, আপনারা ‘ধর্ষণ’ সরাসরি না করেও এক-একজন ধর্ষক। আপনারা সুযোগ পেলেই ‘ধর্ষণ’ করবেন, আপনারা বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে এ ধরনের রমরমা গল্প বানিয়ে বলে বীর্য বের করার সুখও পান। আপনারা নারীর পোশাক দেখে আপনাদের পুরুষাঙ্গ দণ্ডায়মান করে ফেলেন। যে পুরুষাঙ্গের পাওয়ার ফলান গিয়ে কোনো দুর্বলচিত্তের নারীর উপর। 

আমার মেসেজটা ওই সমস্ত দুর্বলচিত্তের নারীদের মধ্যেই ফেলতে চাই। তাদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট করে বলতে চাই- এই সমস্ত ‘ধর্ষক’ পুরুষদের ভালোবাসায় আপ্লুত হবেন না, এ সমস্ত পুরুষরা আপনাদের মতো দুর্বলচিত্তের নারীর সাথে মিলিত হওয়ার সময়েও ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টকে ভাবে, ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট মনে করেই হয়তো আপনাকে ‘খেয়ে ছেড়ে দিচ্ছে’। এই খেয়ে ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতা সম্পন্ন পুরুষকে আপনাদের বুঝতে হবে। আপনাদেরকে এ-ও বুঝতে হবে এই রাষ্ট্রটাই ‘ধর্ষকামী’ রাষ্ট্র, ভোগবাদী, পুরুষতান্ত্রিক, ব্যক্তি পুঁজিতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রটাকে আঘাত করেই এই ধরনের নোংরা চিন্তার মানসিকতাকে ঘৃণা করতে হবে। এদেরকে ‘তুই ধর্ষক’ বলে শ্লোগান তুলে নিজের ব্যক্তিত্ব, আত্মসম্মানবোধকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে একই সাথে পুরো সমাজকে পরিবর্তন করার দায়িত্ব নিতে হবে। 

সুতরাং, এ সমস্ত বিষয়কে ছোট ছোট বিষয় বলে, হাস্যরস বলে, মজা বলে ছেড়ে দেওয়ার কিছু নেই। আপনার/আপনাদের আশেপাশে এ সমস্ত চিন্তা পোষণকারী অসংখ্য পুরুষ রয়েছে যাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে -এই চিন্তা ‘ধর্ষকামী’ চিন্তা। এই চিন্তাকে ঘৃণা করি। আপনার/আপনাদের প্রিয় পুরুষটিও হয়তো কোনো না কোনো ভাবে এই চিন্তাকে ধারণ করে থাকে, কারণ এই নষ্ট সমাজেই তার বাস। তাই ‘নারীমুক্তি’র মূলমন্ত্র দৃঢ়ভাবেই গ্রহণ করতে হবে। এ সমস্ত কোনো বিষয়কেই আমি ছেড়ে দিতে রাজি নই, এদেরকে গভীরভাবে রাজনৈতিকভাবে পর্যবেক্ষণ করাকে দায়িত্ব মনে করি, এই চিন্তা পোষণকারী যেকোনো ব্যক্তিকেই চিন্তার আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর জন্য চেষ্টা করি/করবো। 

সাম্য-ভালোবাসার পৃথিবী গড়ে তুলতে হলে আন্দোলন-লড়াইটা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সাথে পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যাবাদ, ভোগবাদ, পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে। যে বা যারা মনে করে ‘পুরুষতন্ত্র’ বলতে কিছু নেই তাদেরকেও চিনে রাখার দায়িত্ব নিতে হবে। কেননা, এরা একেকটা চরম পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার পুরুষ-নারী, পুরুষ যে-ই হোক না কেনো। এই পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা ধারণ করতে পারে। সেজন্য, খুব সচেতনভাবে, দৃঢ়ভাবে এই সমস্ত সকল বিষয়ের বিরুদ্ধে লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে। সত্যিকার অর্থে বিপ্লবী সংগঠনে সংগঠিত হতে হবে। এখনই সময় লড়ার, স্বপ্ন দেখার, স্বপ্ন দেখাবার।


  • ৪০৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

লাবণী মণ্ডল

নারীবাদী লেখিকা।

ফেসবুকে আমরা