শেকল ভাঙার গল্প

মঙ্গলবার, অক্টোবর ১০, ২০১৭ ৮:৩৭ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


কিছুদিন আগে এক দুর্ভাগা নারীর জন্য ইন্টারপ্রিটিং করছিলাম যার কলহ-জর্জরিত সতেরো বছরের বিবাহিত জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে সন্তানদের হস্তক্ষেপে। স্বামী তাকে প্রায়ই চড় চাপড়টা মারলেও তিনি মুখ বুজে সহ্য করেছেন, কখনোই একে খুব একটা খারাপ কিছু বলে ভাবেন নি। স্বামী তো তাকে রোজগার করে খাওয়ায়। তার মতো অশিক্ষিত স্ত্রীকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে, হাসপাতালে, শপিং এ যায়। বিনিময়ে মাঝে মধ্যে গায়ে হাত তুলতেই পারে, এ আর এমন কী? কিন্তু কেনো তিনি এতো বছরে একবর্ণ ইংরেজিও শিখতে পারেন নি, একা চলাফেরা করতে পারেন না, এই বিষয়টা এই নারী কখনো ভেবেই দেখেন নি।

একদিন মারধোর একটু বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেলে ছেলেমেয়েরা পুলিশ ডাকে, তখন দীর্ঘদিনের পারিবারিক নির্যাতনের কথা বেরিয়ে পড়লে পুলিশ এবং সোশাল সার্ভিসের হস্তক্ষেপে স্বামীকে ঘরছাড়া হতে হয়। পৌরুষে আঘাত লাগার কারণে তিনিও নিজেকে শোধরানোর চেষ্টা না করে স্ত্রীকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন।

স্ত্রীর জন্য কিন্তু এই মুক্তি মোটেই আনন্দের নয়, বরং ঝঞ্ঝাটের। নিজের জীবন কীভাবে নিজে একা বাঁচবেন সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই তার। তিনি বাচ্চাদের জন্মতারিখ জানেন না, নিজের বাসার ঠিকানাটা কোনোমতে ভুল উচ্চারণে বলতে পারলেও ডাক্তারের নাম ঠিকানা বলতে পারেন না। হাসপাতাল বা পোস্ট অফিস কোথায় জানেন না, একা দোকানে পর্যন্ত যেতে পারেন না। বাসে কীভাবে উঠতে হয়, কত নাম্বার বাস কোনদিকে যায়, বাসের টিকিট কীভাবে কাটতে হয়- সবই তার কাছে দুর্বোধ্য।

শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে কিন্তু ঘটনা সত্যি এবং এই গল্প শুধু একজনের নয়, বরং অসংখ্য অভিবাসী নির্যাতিত নারীর যারা নিজেও নির্যাতনের প্রকৃতিটা ঠিক বোঝেন না।

ফ্যামিলি ওয়ার্কার বললো, ‘তোমার বড় মেয়ের জন্মতারিখ বলো’।
তিনি উত্তর দিলেন, ‘ইতা তো কইতাম পারি না। তাইর বাপে জানইন। পাসপোর্ট তান কাছে’। 
‘তাহলে ধরেই নিচ্ছি অন্য বাচ্চাদের জন্মতারিখও জানো না?’ 
‘না,’ মহিলার বিব্রত কন্ঠস্বরে অপরাধবোধ ঝরে পড়ে। 
‘বাচ্চাদের ডেন্টিস্ট এপয়েন্টমেন্ট করা হয়েছে?’ 
‘ইতা তারার বাপে জানইন। তাইন করইন হকল সময়। আমি ইতা বুঝি না’। 
‘তোমার ডাক্তারের চেম্বার কোথায়?’
‘জানি না’ 
‘কখনো যাওনি ডাক্তারের কাছে?’ 
‘তাইর বাপর লগে গেছি। একলা কোনোদিন কোনোবায় গেছি না’।

দেখা গেল এই সাক্ষাতের উদ্দেশ্যটাই সম্পূর্ণরূপে বিফল। মহিলা কোনো তথ্যই দিতে পারলেন না যার উপর ভিত্তি করে তাকে সাহায্য করা যায়। প্রতিটা প্রশ্নের উত্তরে তার একই কথা, কোনোদিন একা ঘরের বাইরে পা ফেলেন নি, কিছুই জানেন না, বোঝেন না। বাচ্চারা স্কুলে গিয়ে ইংরেজি বলতে এবং পড়তে শিখেছে। তা্রা যখন ঘরে থাকে তখন তেমন সমস্যা হয় না। তারা চিঠিপত্র পড়ে বুঝিয়ে বলে, টেলিফোন এলে তাকে সব বুঝিয়ে দেয়। সমস্যা হয় তাদের স্কুলের সময়ের মধ্যে কোনো এপয়েন্টমেন্ট পড়ে গেলে। তখন ইন্টারপ্রিটার থাকবে জানলেও তিনি নিজে একা সেখানে যেতে পারেন না, কোনোমতে চলে গেলেও কোনো তথ্য দিতে পারেন না।

ফ্যামিলি ওয়ার্কার জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার জন্য আমি কি কিছু করতে পারি, যাতে তোমার জীবন কিছুটা সহজ হতে পারে?’ 
‘আমারে একজন মানুষ দেউক্কা যে আমার চিঠি পড়ব, আমারে নানান জাগাত লইয়া যাইব’। 
‘আমরা তো কাউকে প্রাইভেট সেক্রেটারি দেই না। চিঠি আমাদের অফিসে নিয়ে এলে আমরা পড়ে দেব’। 
‘আমি কোনবায় একলা যাওয়া চিনি না। আমারে একজন মানুষ দেউক্কা যে আমারে সকলতা হিকাইব (শেখাবে)।' 
তার কথা শুনে ফ্যামিলি ওয়ার্কার হেসে ফেললো। 
‘তোমার কেনো মনে হলো এভাবে তোমাকে একজন মানুষ দেয়া যেতে পারে?’

উত্তরে মহিলা বললেন, উনার স্বামীই উনাকে বলেছেন একা একা চলাফেরা করা শেখবার প্রয়োজন নেই। কোনোদিন বিপদে পড়লে সরকার তাকে একজন মানুষ দেবে, যে তার সব কাজ করে দেবে। বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই সহজ সরল মহিলা স্বামীর এই কথা বিশ্বাস করে বসে আছেন- তাকে কিছু শিখতে হবে না, তিনি পৃথিবীর স্বর্গে বাস করেন যেখানে কখনো কোনো অসুবিধাই তার হবে না। স্বামী তো আছেনই, আর স্বামী না থাকলে সরকারই সব করে দেবে।

এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন এসব আশ্বাস ছিলো তাকে ঘরে বন্দী করে রাখার বাহানা মাত্র। আজ যখন স্বামী তাকে ত্যাগ করে গেছেন তার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেছে। বাচ্চারা ইংরেজি জানলেও তারা অনেক ছোট, তারা অফিস আদালতের সব বিষয় বোঝে না। তিনি আজ পর্যন্ত নিজের নামে সরকারী ভাতার জন্যও আবেদন করতে পারেন নি। যে ঘরে থাকেন তার দখল, বাচ্চাদের শিশুভাতা সবই এখনো স্বামীর নামেই রয়ে গেছে। তার নিজের একটা ব্যাংক একাউন্ট পর্যন্ত নেই যেখানে সরকার তার ভাতা পাঠাবে। তার নামে যে একটা ব্যাংক একাউন্ট খোলা সম্ভব এটাই তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না।

মহিলার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়ছে, ফ্যামিলি ওয়ার্কার একটা টিস্যু এগিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে তার চার বছরের ছেলেটা তাকে অবিরাম কিল ঘুষি মেরে চলেছে। তিনি কিছুই বলছেন না। ফ্যামিলি ওয়ার্কার বললো, ‘তোমাকে সবকিছুর আগে বুঝতে হবে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার তুমি একা নও। এই যে তোমার ছেলেটা তোমাকে এভাবে মারছে, সে এসব কোত্থেকে শিখল?’ 
‘বাচ্চাইন্তে তো ইতা করে। ছোট মানুষ। কুনতা বুঝে না’। 
‘এধরনের আচরণকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়া বন্ধ করতে হবে তোমাকে। মারধোর করা কখনোই স্বাভাবিক নয়, তা বড়রা করুক অথবা ছোটরা’।

উত্তরে চোখের পানি মুছে নিয়ে অপ্রতিভ ভাবে হাসেন মহিলা। ছেলেকে কাছে টেনে বলেন, 
‘ইতা পারে না। তারা তোমারে নটি (naughty) কইরা’। 
‘তোমার স্বামী আবার ফিরে আসতে চাইলে কী করবে?’ 
‘কিতা আর করমু? বাচ্চাইনতর বাপ তাইন, আইলে তো খুশি অইমু’। 
‘না। এতো সহজে আবার তাকে মেনে নেয়া ঠিক হবে না তোমার। এতে তোমার বাচ্চাদেরই ক্ষতি হবে। তুমি একটা কোর্স করো, বুঝার চেষ্টা করো কিসে তোমার এবং তোমার বাচ্চাদের মঙ্গল হবে’।

এক ঘন্টার এপয়েন্টমেন্ট আড়াই ঘন্টায় গড়ালো। শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো, বড় মেয়ের স্কুলের পর মহিলা তাকে নিয়ে আবার ফ্যামিলি ওয়ার্কারের কাছে আসবেন। মেয়েকে তারা গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো গুগল ম্যাপে দেখিয়ে দেবে, সে মাকে নিয়ে শনি/রবিবারে ঐ জায়গাগুলোতে যাবে, কীভাবে বাসে উঠতে হয় তাকে শেখাবে। জরুরি চিঠিপত্র ফ্যামিলি ওয়ার্কারের কাছে নিয়ে এলে তিনি পড়ে দেবেন এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে তাকে সাহায্য করবেন।

এর একমাস পরে এই মহিলার জন্য কাজ করতে গেলাম একটা পুলিশ স্টেশনের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে। মাত্র একমাসে মহিলার আমূল পরিবর্তন। 
‘পুলিশ স্টেশনের রাস্তা চিনলেন কেমন করে?’
‘এখন আমি বহুততা চিনি। একলা একলা হকলবায় যাই’।

তার কথা শুনে আনন্দে আমার চোখ ভিজে গেল। স্বামীর সাথে সতেরো বছর থেকে যা শেখেন নি, স্বামীহীন জীবনে মাত্র একমাসেই তিনি তা শিখে গেছেন। তার চোখে মুখে জ্বলজ্বল করছে আত্মবিশ্বাস। বললেন -ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স এয়োয়ারনেস কোর্স শুরু করেছেন, ধীরে ধীরে ইংরেজিও শিখবেন। তিনি চান না তার স্বামী আবার ফিরে আসুক। একাই ভাল আছেন, একাই থাকতে চান।

আমার অসংখ্য অভিজ্ঞতার একটা মাত্র শেয়ার করলাম। আসলে আমরা নিজের বুদ্ধি এবং পরিস্থিতি দিয়ে অন্যকে যাচাই করি কিন্তু সবার বুদ্ধি, ক্ষমতা, জীবন আর পরিস্থিতি এক নয়। এজন্য ভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সির মানুষের গল্পগুলো আমাদের ঠিক মাথায় ঢোকে না। এক/দুই যুগ বিলেতে থেকে কেনো একজন মানুষ ইংরেজি পারে না ভেবে আমরা অবাক হয়ে যাই। দু’চার দশক সময় কিছুই নয়, শেকলে পা বাঁধা মানুষ এক জীবনেও হাঁটতে শিখতে পারে না। এতে অবাক হবার কিছু নেই।

 


  • ২১১০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

জেসমিন চৌধুরী

প্রবাসী, সমাজকর্মী

ফেসবুকে আমরা