তরিকুলের ভাঙা হাড় দেখে আপনাদের লজ্জা লাগে না?

বুধবার, জুলাই ১১, ২০১৮ ৩:২১ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


“ডান পায়ের ভাঙা দুই হাড়, মাথায় আটটি সেলাই ও সারা শরীরে মারের ক্ষত নিয়ে যন্ত্রণায় দিন যাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তরিকুল ইসলামের। কোটা সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভের সময় গত সোমবার তরিকুলকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটের সামনে রাস্তায় ঘিরে ধরে পেটায় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন মিলে যখন লাঠি নিয়ে তরিকুলকে পেটাচ্ছিলো তখন আব্দুল্লাহ আল মামুন লোহার হাতুড়ি দিয়ে তার পিঠে ও পায়ে আঘাত করে। কাঠের উপর যেভাবে পেরেক পোঁতা হয়, সেভাবে তরিকুলের শরীরে আঘাত করছিলো হাতুড়ি দিয়ে”।-দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (জুলাই ৫, ২০১৮)

অথচ আমি খুব আশাবাদী ছিলাম যে, এই আন্দোলনকারী ছেলে-মেয়েদের উপরে অত্যাচার চালানো হবে না। সরকার হয়তো একটা মিডল গ্রাউন্ডে আসবে। বোকা ছেলেটার পায়ের হাড় ভেঙ্গে দিলো ওরা! অবশ্য আমরা কি আর মানুষ? হাতুড়ি দিয়ে আমাদের ছেলেদের পা ভেঙ্গে দেয়ার, আমাদের মেয়েদের শহীদ মিনারে লাঞ্ছিত করার লাইসেন্স তো অবশ্যই সরকারের প্রিয়তম এই দলীয় বাহিনীটির আছে। তাই নয় কি? কেননা আমরা ব্রাত্য জনগণ। আমরা তীব্র গরমে সিদ্ধ হতে হতে এবং ভিড়ে পিষ্ট হতে হতে বাসে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। আমরা গণরুমে থাকি। নেতাদের মারধর জোটে কপালে। হলের ডাইনিং-এর কুৎসিত খাবার খেয়ে বেঁচে থাকি। আমরা নাক-মুখ ওড়না দিয়ে চেপে কলা ভবনের ময়লা উপচানো বাথরুমে যাই। সামান্য কিছু টাকার টিউশনির জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ঢাকার এ মাথা থেকে ও মাথা দৌড়িয়ে বেড়াই। সস্তায় দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য লাইন দিয়ে ডাকসুর ক্যান্টিনে অপেক্ষা করি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। আমাদের পিতা-মাতারা মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত এবং হতদরিদ্র। তারা পেশায় দিনমজুর, কৃষক, ছাপোষা চাকুরিজীবী, গৃহিণী আর যতো হাবিজাবি। আমাদের গায়ে বুলেট ছুঁড়তে তাই আপনাদের দুইবার চিন্তা করতে হয় না।

আমাদের প্রেমিক-প্রেমিকারা প্রেম করে শুকনা বাদাম চিবিয়ে। আমাদের বেলা বোসরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে লাইব্রেরিতে বইয়ের পাতা উলটে যায় সরকার ও জনগণের সেবক হবে বলে। আমাদের বেলা বোসদের প্রেমিকেরা সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে পড়তে পড়তে স্বপ্ন দেখে, বিসিএস অফিসার হলেই বেলা বোসের পরিবার কন্যাকে আর লাভজনক ‘এরেঞ্জড’ বিয়ের জন্য চাপ দেবে না।

করপোরেট কোম্পানি চোখ টিপে জানিয়ে দেয়, আমরা ক্ষ্যাত। ইংরেজি পারি না। বাংলা মাধ্যম থেকে উঠে এসেছি আমরা। পড়েছি গ্রামের ভাঙ্গাচোরা স্কুলে, মফস্বলের স্কুলে, জেলা স্কুলে কিংবা ঢাকার কোনো ক্ষ্যাত স্কুলে। চাঁদনি চকের গজ কাপড়ের সালোয়ার-কামিজ গায়ে দিয়ে, ফুটপাতের শার্ট গায়ে দিয়ে আমরা দিন দিন আরো ক্ষ্যাত হতে থাকি। তারপরেও এই শুয়োরের বাচ্চাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এই আমরাই জিআরই-তে ভালো স্কোর করি। টোফেল দেই। আইএলটিএস দেই। বিদেশে আসি স্কলারশিপ নিয়ে। অমানুষিক পরিশ্রম করে পি এইচ ডি করি। গবেষণা করি। ফটর ফটর করে ইংরেজি বলি। বিদেশী পত্রিকাতে আমাদের নাম ছাপা হয়।

আমরা সরকারি চাকরির সব স্তর পার হয়ে দেখি, আমাদের এইসব সংগ্রামে আমাদের পা আসলে দৌড় শুরু করার আগেই আপনারা কষে বেঁধে ফেলেছেন। কোটার নাম দিয়ে দলীয় নিয়োগটাই সরকারি চাকরিতে প্রথা। আমরা কোটা নিয়ে আন্দোলন করলে আপনারা আমাদের ‘ম্যাধাবী’ বলে মুখ ভেংচি দেন। আমাদের ‘রাজাকার’ বলে গালি দেন। আমরা আপনাদের মিনমিন করে বলি, কোটা কিছু কমিয়ে দিতে। তখন আমাদের জানিয়ে দেন, স্বাধীনতার অনেক দেনা জমে আছে। আমাদের এখন ঋণ শোধের সময়! আমরা ঋণ শুধতে গিয়ে কেউ বেকার থাকি। এক সময় সিলিং ফ্যানে ঝুলে মরে যাই। মরার পরেও আপনারা আমাদের নিয়ে হাসেন। বলেন, আমাদের সরকারের চাকর হওয়ার এতো লোভ! অথচ আপনারা ভুলে যান, রাষ্ট্রযন্ত্র চালাতে গেলে-সুশাসন আনতে গেলে মেধাবী সরকারি চাকরের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের কেউ কেউ অতিমানবীয় মুখস্থ বিদ্যার জোরে আর কপালের কুদরতে খাল-বিল-নদী-নালা-প্রণালীর নাম জপতে জপতে সরকারি চাকরির গুড়ের ভাগ পায়। আপনাদের সেবায় নিবেদিত হয়।

আমরা কেউ কেউ বেসরকারি চাকরি খুঁজতে গিয়ে দেখি, বংশ পরিচয় ছাড়া সেখানেও ভাত নেই। আমাদের মামা নেই। চাচা নেই। টাকা নেই। নেতার চামচা হওয়ার মতো মাজার জোর নেই। সরকারি গুন্ডা হওয়ার মতো তেজ নেই। কিন্তু আমাদের আছে দীর্ঘ জীবন সংগ্রামের ইতিহাস। আমাদের পা হাতুড়ি দিয়ে ভেঙ্গে আন্দোলন আপনারা থামাতে পারবেন কি? এই আন্দোলনের নেতৃত্ব যদি আসলেই শিবিরের হাতে গিয়ে থাকে, তার দায় কি সরকারের নয়? কোনো মিডল গ্রাউন্ডে না এসে ছাত্রলীগকে মাঠে নামিয়ে সরকার আসলে কী ধরনের সাফল্য অর্জন করছে, আমার বোধগম্য নয়।

আমি জানি, অন্যান্য আন্দোলনের মতো এই আন্দোলনও রাজনীতির বাঘ-ভাল্লুকেরা খেয়ে নিবে। সিসিফাসের মতো করে এই বোকা ছেলে-মেয়েগুলো আন্দোলন ঠেলে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যাবে। আর আপনারা লাথি মেরে আমাদেরকে আমাদের আসল জায়গা দেখিয়ে দিবেন। তারপরেও আমাদের আন্দোলন আপনারা থামাতে পারবেন না। শোষিতের চিৎকারে আপনার কানের পরদা ফেটে যাবে। তরিকুলের ভাঙা হাড় দেখে আপনাদের লজ্জা লাগে না? বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘামে ভেজা, রক্তে ভেজা ছেলে-মেয়েদের মুখের দিকে তাকান একবার! সত্যি করে বলেন তো, এই দুই পয়সার ছেলে-মেয়েদের মুষ্টিবদ্ধ চোয়াল দেখে কি আজকে আপনার কলিজা কাঁপছে না? কাঁপবেই তো! শোষকের কলিজা না?


  • ২১৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফারজানা শারমীন সুরভি

জন্মস্থান ঢাকা, বাংলাদেশ। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্দান ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি করছেন। পেশায় একই বিভাগের গ্র্যাজুয়েট টিচিং এসিস্টেন্ট। লেখক হওয়ার স্বপ্ন নেই, কিন্তু লেখালেখির নেশায় একটা জীবন কাটিয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখেন।

ফেসবুকে আমরা