ধর্ষণের শাস্তি ও নৈতিক বিতর্ক

সোমবার, জুলাই ৮, ২০১৯ ৮:৩৭ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


নৈতিকতা আকাশ থেকে পড়া কোনো ওহী না যে এটার সিংগুলার অব্জেক্টিভ ফর্ম থাকবে। কেউ একজন ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাইতে পারেন কেউ না চাইতে পারেন৷ দুইপক্ষেরই লজিক থাকতে পারে৷

জুনকো ফুরুটার (যারা জানেন না তারা প্লীজ murder of junko furuta লিখে গুগল করেন) ক্রনিক যৌন ও শারীরিক নির্যাতন এর কথা শুনলে মনে হয় এই অপরাধীদের মৃত্যুদন্ডের চাইতেও কোনো কঠিন শাস্তি থাকলে সেটা দেওয়া উচিৎ। এই চাওয়ার মধ্যে অমানকবিকতা কই। শুধু জুনকো ফুরুটা না শিশু কাজের লোককে বেধড়ক মারধোর এবং মধ্যযুগীয় ক্রনিক শারীরিক নির্যাতন করা গৃহকত্রীর অত্যাচার যদি এমন পর্যায়ে যায় যেটা প্রচন্ডরকমভাবে ড্যামেজিং তাইলে সেই অপরাধেরও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাওয়া যেতে পারে। একটা সমাজকে যতোটা সভ্য হতে হয় মৃত্যুদন্ড শাস্তি রদ করার জন্য বাংলাদেশ সভ্য হয়নি ততোটা। আমাদের পাশে নিউরোটিক সাইকোপ্যাথ পার্ভাট বসে থাকলেও আমরা তার বিরুদ্ধে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি না, মানসিক রোগে ভুগে কেউ ড্রাগ এবিউজ করলে এবং আত্মহত্যা পথযাত্রী হলেও আমরা তাকে কোনো হেল্প করি না। যেই দেশ মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আসার আগেই অপরাধীদের রিহ্যাবিলিটেশন করাটা কতটা যুক্তিযুক্ত?

আবার অপরাধীরাও মানুষ এবং সিস্টেমের শিকার এই ব্যাকস্টোরিকে কন্সিডার করে অপরাধীর সাজা মওকুফ করার এবং তাকে ভালো মানুষ বানানোর চেষ্টা করার পেছনেও যুক্তি থাকতে পারে এবং ধর্ষনের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলে ধর্ষণের শিকারদের খুনের হার বাড়তে পারে কারণ অপরাধী প্রমান মুছে দিতে চাইবে এই যুক্তিও আসতে পারে। দুটো মোরাল অবস্থানের পক্ষেই যথেষ্ট যুক্তি আছে। যারা ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড চায় এরা বাল আর আমি চাই না মানে আমি মোরালি সুপিরিয়র এই কোন মাপের নির্বুদ্ধিতা? আপনার যদি মনে হয় আপনার নৈতিক অবস্থান বেশী যৌক্তিক আপনি সেটার পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন আপনার অবস্থানের সুফল এবং আপনার অপনেন্ট এর অবস্থানের কুফল নিয়ে আলোচনা করেন আপনি যদি এতই বুদ্ধির ঢেকি হন তো। অন্যদের মত আপনার সাথে না মিললেই তাদেরকে ইনফিরিওর ভাবার মত ছাগল হইয়েন না।

কেউ একজন লিখেছে তার ছেলেবেলায় যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েও তিনি ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড চান না। এটা না চাওয়ার অনেক বড়ো কারণ হলো শিশুদের যৌন নির্যাতন করা মানুষটা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে নিজের বাপ ভাই চাচা মামা জাতীয় নিকট আত্মীয় হয়। নিকট আত্মীয়ের জন্য মৃত্যুদন্ড চাওয়াটা অনেক মানুষের জন্যই মুশকিল হয়ে পড়ে। আর তাছাড়া সকল ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড আর ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড আলাদা জিনিস। যারা ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চান তার খারাপ মানুষ, নির্বোধ মানুষ? আমার একটা কন্যা সন্তান আছে যাকে এক মাস ঘরে আটকায়ে ক্রনিক ধর্ষন করছে চার পাঁচটা ছেলে আমি তাদের যে বটি দিয়ে কোপায়া ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করে দিবো না এই ব্যাপারে নিশ্চিত না। আমার মতে এখনো রিহ্যাবিলিটেশন যে কোনো অপরাধীর জন্য বেস্ট ট্রীটমেন্ট। কিন্তু যে রিহ্যাবিলিটেশন চায় না সে অপরাধীদের একটা ক্যান্সার সেলের মত ট্রীট করে যেটা সরিয়ে ফেললে সমাজ ভালো ফাংশান করবে বলে মনে করে সে কি পয়েন্টলেস?

কে বলছে অপরাধীরা সাজার ভয় পায় না? পৃথিবীতে বহু সাইকোপ্যাথরা মার্ডারার না শুধু মাত্র সাজার ভয়ে। ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কেইস রিপোর্ট করে না দেখে দেশে এত ধর্ষণ হয়। সমানে ধর্ষকদের শাস্তি দেওয়ার গল্প গুলো খবরের কাগজে ছাপা হইতো ধর্ষকেরা চিমশায়ে যাইতো। সংবাদ মাধ্যমগুলো জনগণের এটেনশান পাওয়ার জন্য ধর্ষণের গল্প, ধর্ষিতর চিৎকার রসায়ে রসায়ে লিখে এইজন্য ধর্ষকের কী শাস্তি হলোর থেকে এদের মূল ফোকাস থাকে কেম্নে মেয়েটা ধর্ষিত হলো। এরা যদি খানিকটা মোরাল ডিউটি পালন করতো, ধর্ষকদের শাস্তির উপরে বেশী ফোকাস করতো বহু মানুষ সোজা হয়ে যেতো।

আর সিস্টেম থেকে মানুষকে আলাদা করার ব্যাপারটা খুবই মানবিক কিন্তু সিস্টেম জিনিসটা কোনো ডেমনিক কার্স না, এটা মানুষের দ্বারা তৈরি কাঠামো যেটা পরে মানুষকেই নিয়ন্ত্রণ করে। সিস্টেমের দোষ বলে সবকিছুতে পার পেয়ে যাওয়াটা কেমন জানি লাগে। পুরুষতন্ত্র থেকে পুরুষদের আলাদা করার কারণ যখন পুরুষতন্ত্র সিস্টেম হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং স্থায়ীত্ব পেয়েছে তখন অনেক নারীই সেটাতে সাবমিট করছে এবং অনেক পুরুষই সেটার বিরুদ্ধে গেছে। কিন্তু পুরুষদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া এই সিস্টেম প্রতিষ্ঠায় ও টিকিয়ে রাখায় পুরুষদের কোনো ভূমিকা নাই এবং এই তন্ত্রের  সাথে পুরুষ পুরা সম্পর্কহীন এটা যে বলবে সে হয়তো খুবই সাদামাঠা মানুষ নয়তো সুবিধাবাদী মিথ্যুক। আবারও বলছি সিস্টেম কোনো ডেমোনিক কার্স না। আর যেহেতু এখানে পুরুষদের স্বার্থরক্ষার ব্যাপার আছে সেখানে পুরুষদের এক্টিভ কন্ট্রিবিউশানও আছে৷

মানুষ কেনো পুরুষতন্ত্র থেকে পুরুষদের আলাদা করে। পুরুষতন্ত্র জিনিসটা তাতে ডেমোনাইজ করা সহজ হয়। এবং পুরুষসহ পুরুষতন্ত্র ডেমোনাইজ করলে পুরুষরা রিভল্ট করবে পৃথিবীর বেশীরভাগ ক্ষমতা এবং সম্পদ এখন পুরুষদের হাতে কুক্ষিগত যার মাথায় একটু ঘিলু আছে সে বুঝবে পুরুষদের বাদ দিয়ে এই সমতা আনা সম্ভবই না, আলাদা করে ভীনগ্রহ থেকে কোনো এলিয়েন এসে মেয়েদের হাতে এক্সট্রা কোনো রিসোর্স বা পাওয়ার দিবে না। পুরুষদের কোঅপারেশনের জন্যই মূলত  পুরুষকে না, পুরুষতন্ত্রকে মূল হোতা ভাবা হয়, এভাবে করলে সিস্টেমের পরিবর্তন সিস্টেমের মধ্যে থেকেই করা সম্ভব হয়। কিন্তু পুরুষতন্ত্রের সাথে পুরুষের কোনো কো-রিলেশন নাই এবং এই তন্ত্রকে হেইট করার সাথে সাথে কারোর মধ্যে অর্গানিক্যালি পুরুষদের প্রতি ঘেন্না তৈরি হয় তাকে অর্থহীন ভাবার কারণ নাই। আয়মান সাদিক এর মতো খুবই জেন্টেল ছেলে একজন সেক্স অফেন্ডারকে  নিয়ে কাজ করেছে। সিস্টেমটা এমনভাবে তৈরি যে ছেলেরা নারীদের সাথে যা খুশি তাই করলেও তথাকথিত ভালোছেলেরাও নিশ্চুপ হয়ে থাকে এবং ওই সেক্স অফেন্ডারের যদি কোনো উপযোগিতা থাকে তাহলে তার ওই আচরণকে উপেক্ষা করে তার উপযোগিতাকে কাজে লাগে।

পুরুষেরা কি জানেনা তার পাশের কোন ছেলেরা অফেন্সিভ যৌনতা করে বেড়ায়, তারা কখনো এটা নিয়ে কিছু বলে? এটা কি খালি তন্ত্রেরই দায়? কক্ষনো না। ব্রোপ্যাথি (ম্যান ম্যান এম্প্যাথি, আমার বানানো টার্ম) ইজ আ রিয়েল থিং। আয়মান সাদিকদের জন্য পুরুষদের প্রতি ঘেন্না আসে না?  লাখ লাখ সেক্স অফেন্ডারের জন্য আসে না? ঢাকার রাস্তায় রাত দুইটায় কোনো মেয়ে বের হলে যারা হামলা করবে তারা কারা? কর্মক্ষেত্রে বা শিক্ষাজীবন নারী সহকর্মী বা সহপাঠীকে প্রতিনিয়ত হেয় করার কাজটা পুরুষেরাই করে তাদের আচরণের জন্য যদি কেউ আকাশের দিকে তাকায়ে ম্যান ইন দ্য স্কাই দ্বারা নাজিলকৃত পুরুষদের সাথে সম্পূর্ণভাবে সম্বন্ধহীন পুরুষতন্ত্রকে দোষারোপ না করে ব্যক্তিপুরুষে দোষ খুঁজে তাকে আমি গবেট ভাবছি না। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে পুরুষদের এমন আচরণের জন্য ব্যক্তিপুরুষের চেয়ে সিস্টেমকে দায়ী করি। এবং এটাও সত্য পুরুষতন্ত্রকে অমান্য করার কাজটা আমার পরিচিত অনেক পুরুষকেই করতে দেখেছি। এদের সংখ্যাটা বাড়ুক এটাও আমি চাই এইজন্য পুরুষ দেখলেই ঘেন্না করার কাজটা করি না, করবোও না কোনোদিন।

আমার এই লেখার মূল বিষয় হলো মোরাল রিলেটিভিজম। বিভিন্ন মোরাল দৃষ্টিভঙ্গি থাকা এবং প্রতিটা দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে কিছু পয়েন্ট থাকা। মুই কি হনুরে, আমি বাদে সব বলদ এই রকমের আলোচনা দেখতে দেখতে টায়ার্ড। আমি পার্সোনালি মনে করি না এভ্রিথিং গোজ বা সবই ঠিকাছে। ভালো মন্দ এর ধারণা সমাজের শৃংখলা তৈরীর জন্য আর্টিফিশিয়াল কন্সট্রাক্ট এর মানে এই না বিশৃঙখল নীতি বিবর্জিত সমাজ তৈরী হবে। আমার ব্যক্তিগত মতে কিছু মোরাল অন্য মোরালের থেকে বেটার সমাজকে ভালোমতো ফাংশনের জন্য। কিছু মানুষকে দেখছি এরা ধার্মিকদের প্রতি এম্প্যাথিক, ধার্মিকদের দৃষ্টিভঙ্গিটাকে বোঝার চেষ্টা করছে কিন্তু আবার সেক্যুলাররা কেনো ধর্মবিদ্বেষী হয় সেটাকে বোঝার ব্যাপারে অনাগ্রহী।  ধর্ষক কেনো ধর্ষণ করছে সেটা বোঝার চেষ্টা করছে কিন্তু ধর্ষনের শিকার ভিক্টিম কেনো মৃত্যুদন্ড চাইছে সেটা বোঝার ব্যাপারে অনাগ্রহী। এমন সিলেক্টিভ এম্প্যাথি হয় চিন্তার সংকীর্ণতা নয়তো সুবিধাবাদ থেকে।

আমি ঘেন্নার চক্র ভাঙ্গার পক্ষপাতি। কারণ ঘেন্না চক্রে ঘুরতে থাকলে সমাজ এগোয় না। একাত্তরের চেতনা নিয়ে আরও একশ বছর বাংলাদেশে রাজনীতি চলবে। সামনে এগিয়ে নতুন একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনকরে প্রগতিশীল সমাজ তৈরী করে সমৃদ্ধি না এনে বাংলাদেশ মুভিং ব্যাকওয়ার্ড। কোন উন্নত রাষ্ট্র এভাবেই ইতিহাস নিয়ে পড়ে থাকে না। ইতিহাস বাদ দেই, কোনো মানুষ যদি তাকে জ্যামেজ করা প্রাক্তন প্রেমিককে নিয়ে তাকে রিভেঞ্জ নেওয়া নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকে তার লাইফও এগোও না।

বড় বড় ক্রিমিনালদের মৃত্যুদন্ড রদ করে উন্নত রাষ্ট্র তৈরি হয় নাকি রাষ্ট্র উন্নত হওয়ার পরে ক্রিমিনালদের রিহ্যাবিলিটেশন করা সম্ভব হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে বাংলাদেশের মতো অশিক্ষিতে ভরপুর এবং জনবহুল দেশে মৃত্যুদণ্ড রদ করার প্রক্রিয়াটা এখনই হয়তো সম্ভব না৷ কিন্তু কোনো একদিন বাংলাদেশের ক্রিমিনালদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে না  এই লক্ষ্য সামনে রেখে দেশকে  আগানো একটা ভালো লক্ষ্য।

এখনই ট্রায়ালের যে অবস্থা ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হতে হতে ধর্ষকের ন্যাচারাল ডেথ হয়ে যায় আর মেয়েরা রেপুটেশন খুয়ানোর ভয়ে ধর্ষকের বিরুদ্ধে কোনো লিগাল কমপ্লেইনই করে না। এম্নিতেই ধর্ষকেরা খুব দুধেভাতেই থাকে এ দেশে। আর কত সুবিধা লাগবে?

ধর্ষক দেখলে বলতে হবে - "আসেন ভাই আপনে ধর্ষক কিন্তু আপনে তো পুরুষতন্ত্রের শিকার এইজন্য বইসা চা নাস্তা খান, চায়ে চিনি কম হইলে আওয়াজ দিয়েন, আর্টিফিশিয়াল সুইটেনারও আছে লাগলে বইলেন। আমি গতকাল কাজের মেয়েকে বেধরক পিটাইছি,  দুইটা দাঁত পড়েছে একটা নখ ভাংছে। এইটা তো আমার দোষ না পুঁজিবাদের দোষ। সমাজে শ্রেণী বৈষম্য যতোদিন থাকবে ততোদিন আমি কাজের লোক পিটাবো আর আপনে ধর্ষণ কইরা যাবেন এন্ড ডোন্ট ওরি আমাদের মৃত্যুদণ্ড হবে না মানবতাবাদীরা এই সিস্টেম চেঞ্জের জন্য কাজ করতেছে সিস্টেম পাল্টাইলে এটা আমাদের দোষ, তার আগ পর্যন্ত উই ক্যান ব্লেইম দ্য সিস্টেম চিয়ার্স।"


  • ১০২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তিয়ান পুতুই

লেখক এবং এক্টিভিস্ট।

ফেসবুকে আমরা