আমার প্রেয়সী কি টিপ পড়বে না?

সোমবার, অক্টোবর ১৬, ২০১৭ ১২:৪২ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


'টিপ-পরা আমাদের সংস্কৃতির অংশ না' -বলে অশ্রু বিসর্জন করতে দেখি এক শ্রেণীর লোকজনকে। শুধু টিপ না, এদের কথা অনুযায়ী আমাদের অনেক কিছুই 'সংস্কৃতির অংশ' না অথবা 'হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি'। সেই তালিকায় শহীদ মিনারে ফুল দেয়া, মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে শুরু করে আরো অনেক কিছুই আছে। এই লোকগুলো এসব বাদ দিয়ে যেগুলোকে 'আমাদের সংস্কৃতি' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সেগুলো আসলে 'আরাবিয়ান সংস্কৃতি', যাকে তারা 'ইসলামী সংস্কৃতি'র সাথে গুলিয়ে ফেলে।

যেমন পোশাকের ব্যাপারটাই ধরা যাক। আরবিয় মরুভূমি অঞ্চলে ধুলি-ঝড় এবং বিরূপ আবহাওয়া থেকে বাঁচার জন্য সেখানকার মানুষ লম্বা জোব্বা/বোরখা ধরণের পোশাক পরে, মাথায় স্কার্ফ/হিজাব ব্যবহার করে। আবার আমাদের এদিকে আর্দ্র আবাহাওয়ার উপযোগী খোলামেলা পোশাক-যেমন ধূতি, লুঙ্গি, শাড়ির প্রচলন আছে। অর্থাৎ কোনে একটা অঞ্চলের পোশাক কী হবে সেটা নির্ধারিত হয় সেই অঞ্চলের আবহাওয়া দ্বারা। এখন আরব দেশের লোকজন বা ধর্মপ্রচারকগণ জোব্বা-হিজাব পরিধান করতো বলে সেটা ইসলামী পোশাক এবং আমাদেরকেও সেটাই গ্রহণ করতে হবে- এটা কোনো যৌক্তিক সিদ্ধান্ত না। মাঝে মধ্যে চিন্তা করি আর হাফ ছেড়ে বাঁচি, এই ভেবে যে- ভাগ্যিস মুহম্মদ সাহেব তাও মরু অঞ্চলে এসেছিলেন, তিনি যদি মেরু অঞ্চলে আসতেন, তাহলে সারা বছর ইসলামী পোশাক হিসেবে আমাদের উলের জ্যাকেট পরে থাকতে হত!

পোশাকের কথা বললাম উদাহরণ হিসেবে। এরকম আরো উদাহরণ দেয়া যায়। সত্যি কথা বলতে, যেকোনো অঞ্চলের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে সেই অঞ্চলের ভৌগলিক অবস্থান, আবহাওয়া, জলবায়ু- এগুলোকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ আমি আরবিয় সংস্কৃতি, ভারতীয় সংস্কৃতি- এভাবে বলতে পারি, কিন্তু ইসলামী সংস্কৃতি বললে সেটা সার্বজনীন কোনো ব্যাপার হবে না। 'ইসলামী বিধান' বলা যেতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতি না। বিধান মানা অথবা না মানা- পুরোপুরি ঐচ্ছিক। কিন্তু সংস্কৃতিকে চাইলেই অস্বীকার বা বাতিল করে দেয়া যায় না। সেটা করতে গেলে আত্মপরিচয়-সংকট সৃষ্টি হয়, যেটা হয়ে আসছে এ অঞ্চলের অধিকাংশ মুসলমানদের, যারা কিনা আমাদের অনেক কিছুই 'হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি' বলে বাতিল করে দিতে চায়।

বহু শতাব্দী ধরে আমরা, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ ভারতীয় উপমহাদেশের অংশ ছিলো, ছিলো অখণ্ড বাংলা হিসেবে। রাজনৈতিক কারণে সেই বাংলা এখন আর অখণ্ড নেই। কিন্তু বহু বছরের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে এখানে, সেটাকে কি খণ্ডিত করা যায়? বাঙালির নিজস্ব যে সংস্কৃতি আছে, (যদিও বাঙালির শক্তিশালী এবং সুগঠিত কোনো সাংস্কৃতিক কাঠামো নেই, যেমন আছে অন্যান্য অনেক জাতির) সেটাকে কি আমরা বাতিল করে দেব নব্য বাংলাদেশে? আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, ইরানসহ আরো অনেক মুসলিম দেশ নিজেদের স্ব-স্ব সংস্কৃতি চর্চা করেই তাদের ধর্ম পালন করছে। আমাদের এখানে তাহলে বাঙালি সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিতে হবে কেনো?

তবে হ্যাঁ, অবস্থানগত কারণেই বাঙালি সংস্কৃতি প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় সংস্কৃতিরই অংশ এবং তার কিছু কিছু অংশ ইসলামের বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এই সংকটের বেশ সুন্দর এবং সহজ একটা সমাধান আছে। আপনি বাঙালি সংস্কৃতির থেকে ইসলামী বিধানকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান, ভালো কথা। আপনি পালন করুন ইসলামী বিধান। কিন্তু আপনি কখনই, কোনো অবস্থাতেই এই দাবী করতে পারেন না যে, 'এটা আমাদের সংস্কৃতি না, এটা বন্ধ করে দিতে হবে। 'সেটা টিপ পরা হোক, শাড়ি পরা হোক বা মঙ্গল শোভাযাত্রা হোক।

এই সুযোগে আরেকটা কথা বলে যাই। বাঙালি সংস্কৃতি বলে যেটা প্রচলিত, সেটাও আসলে খুব সমৃদ্ধ কিছু নয়, সংগঠিত তো নয়ই। বরং বাংলাদেশে আদিবাসী গোষ্ঠী গুলোর মধ্যে চমৎকার সাংস্কৃতিক কাঠামো আছে। লক্ষ্য করে দেখুন বাঙালির কোনো নিজস্ব নাচ নেই। আদিবাসীদের আছে, অন্যান্য ভারতীয় জাতি গুলোর আছে, এমনকি কট্টরপন্থী আফগান-তাদেরও নিজস্ব নাচ আছে। কিন্তু বাঙালির কোনো নিজস্ব নাচ নেই! বাঙ্গালির সংস্কৃতি খুব একটা শক্তিশালী হয়ে গড়ে ওঠেনি এখনো। তবে সংস্কৃতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়, সংগঠিত হয়। আমাদেরটাও হবে। তবে সেটা আমাদের মাটির সাথে মিল রেখে স্বাভাবিক ভাবে হবে না মরুভূমির সাথে মিল রেখে অস্বাভাবিক ভাবে হবে- সেটাই আমাদের ভাবতে হবে।

আকাশি রঙের শাড়ি, কপালে ছোট একটা নীল টিপ, খোপায় রজনীগন্ধা- বিষণ্ণ বিকেলে আমি এভাবেই তো কল্পনায় এরকম কল্পিত নারীর ছবি আঁকি। এরকম স্বর্গীয় একটা ব্যাপারকে 'আমাদের সংস্কৃতি' না বলে যারা বাতিল করতে চায় তাদের ঘটে কি আল্লাতালা এতটুকুও রোমান্স দেন নি? এদের মাথা আছে কী? মগজ না কচু পোড়া?

 


  • ১৫২৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

রাফী শামস

অনলাইন এক্টিভিস্ট

ফেসবুকে আমরা