নারীর শরীরে অতিরিক্ত পোশাক না চাপিয়ে তোমাদের মস্তিষ্ক উন্মুক্ত করো

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ২, ২০২০ ৫:৫৪ AM | বিভাগ : আলোচিত


জানুয়ারি ২০১৯ থেকে অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত ৯ টি জাতীয় সংবাদপত্র, আইন ও সালিশ কেন্দ্র ও মানুষের জন্য ফাউণ্ডেশনের তথ্যমতে, দশ মাসে ১২৫৩ জন নারী বাংলাদেশে ধর্ষণ এর শিকার হয়েছেন। এই ক’মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৬৭ জন শিশু। শুধু মেয়ে শিশুই নয় ছেলে শিশুরাও হয়েছে যৌন সহিংসতার শিকার। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক একটি খবর জানাচ্ছে অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। আইন শৃঙ্খলায় নিয়োজিত কর্মী, পরিবহন শ্রমিক, স্কুল কিংবা মাদ্রাসা শিক্ষক কে নেই এই তালিকায়? অর্থাৎ সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরেই বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়েছে এই ব্যধি।

সমাজের অনেককেই বলতে শোনা যায় আগের থেকে যৌন সহিংসতার পরিমাণ বেড়েছে অনেক। কারণ হিসেবে অনেকেই দায়ী করেন নারীর খোলামেলা পোশাক পরিধানকে। অর্থাৎ তারা বলতে চান নারী নিজেই তার প্রতি ঘটে যাওয়া সহিংসতাগুলোর জন্য দায়ী। কিন্তু খোলামেলা পোশাক বলতে আসলে কী বোঝায় সে ব্যাপারে তারা নিজেরাই স্পষ্ট ধারণা রাখেন না বলেই আমি মনে করি।

একটি দেশের মানুষের পোশাক কী হবে সেটি নির্ভর করে সে দেশের ভৌগলিক অবস্থান, আবহাওয়া-জলবায়ু, কাঁচামালের সহজলভ্যতা ইত্যাদির উপর। বাংলাদেশের মানুষের পোশাক পরার অভ্যাসের দিকে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাবো, পূর্বে নারীরা শরীরের নিচের অংশে এক খণ্ড সুতি কাপড় পরতেন লুঙ্গির মত পেঁচিয়ে, উপরের অংশে জড়াতেন আরেকখণ্ড। এমনকি ব্লাউজের প্রচলনও হাল আমলের। মূলত ব্রিটিশ শাসনকালে গজিয়ে ওঠা শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির নারীরা নিম্নবর্গের নারীদের থেকে নিজেদের পৃথকভাবে উপস্থাপন করতে ব্লাউজ এর সাথে কুঁচি দেয়া শাড়ি পরার প্রচলন করেন। পরবর্তীতে এটিই আদর্শ রূপ ধারন করে সর্বস্তরের গ্রহণযোগ্যতা পায়। একে অনেকটা ‘আপার ক্লাস মবিলাইজেশন’ হিসেবেই আমরা দেখতে পারি। একটু বয়স্ক নারীদের জিজ্ঞেস করলেই বুঝতে পারবেন বাংলাদেশে ৩০-৪০ বছর আগেও নারীরা শাড়ির সাথে ব্লাউজ পরতেন বিশেষ কোনো উৎসব-পার্বণে। এখনও গ্রামাঞ্চলে অনেক নারী ব্লাউজ ছাড়াই শাড়ি পরেন। নাতিশীতোষ্ণ বাংলাদেশে এটুকু কাপড়ই ছিলো প্রয়োজনীয়।

অথচ বর্তমান বাংলাদেশে রাস্তাঘাটে তাকালেই আপনি দেখতে পাবেন নারীদের বেশ বড় একটা অংশ বোরখা অথবা বোরখাজাতীয় বিশাল আলখাল্লায় নিজেদের ঢেকে রেখেছেন। অথচ এই জাতীয় পোশাক বাংলাদেশে প্রয়োজন নেই। মরুভুমির তপ্ত বালু থেকে বাঁচার তাগিদেই এই পোশাকগুলো আরবের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়। আবার পাশ্চাত্য পোশাকের ব্যাপারে বলবো, বাংলাদেশে একেবারে শহুরে উচ্চবিত্তিয় মানুষের একটা অংশকেই কেবল এ ধরনের পোশাক পরতে দেখা যায়, সবাইকে নয়। খোলামেলা পোশাক বলতে যদি শরীরের বেশ কিছু অংশ উন্মুক্ত রাখাকে বোঝানো হয় তাহলে সেই হিসেবে তো বর্তমান বাংলাদেশের থেকে ৩০ বা ৪০ বছর আগে বেশি খোলামেলা পোশাক পরিধান করতো নারীরা। এক্ষেত্রে যৌন সহিংসতা কিংবা ধর্ষণের কারণ হিসেবে যারা পোশাককে দায়ী করেন তাদের নিজেদের যুক্তিই ধোপে টেকে না। যখন নয় মাসের শিশুকে ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে, হিজাব বা বোরখা পরেও তনু কিংবা নুসরাতকে যৌন সহিংসতার শিকার হতে হচ্ছে তখন তারা দোষ চাপাবেন কাকে?

তাই এলোমেলো অযৌক্তিক কারণ দর্শানো পরিহার করে ধর্ষণের আসল কারণের দিকে দৃষ্টি রাখি। পুরুষতন্ত্র স্বাভাবিকভাবেই চায় নারীকে অধস্তন করে রাখতে। নারীকে মানুষ হিসেবে গন্য না করে একটি “সেক্স অবজেক্ট” হিসেবে দেখতেই পছন্দ করে। এই মানসিকতায় একটি পুরুষ হাত, বাহু, চুল এমনকি সম্পূর্ণ বুক খোলা রাখলেও আপনি এগুলোকে একজন মানুষের শরীরের আলাদা আলাদা অংশ বলে মনে করবেন। অথচ নারীর বুকে এক প্রস্থ কাপড় থাকলেও চলবে না, একপ্রস্থ কাপড়ের উপর আরেক প্রস্থ কাপড় নিয়ে উচ্চতাটা ঢেকে রাখতে হবে, নিতম্বের উচ্চতাও ঢেকে রাখতে হবে যেহেতু সেগুলো শরীরের অংশ নয় বরং যৌন সুড়সুড়ি দায়ক বলে গন্য করা হয়। অথচ পুরুষের নিতম্বটি একইরকম উচ্চতার হলেও আমাদের কাছে তা শরীরের অংশ মাত্র।

ধর্মীয় বিধিনিষেধ মেনে পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করার ক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাই নারীদের ব্যাপারেই বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। একজন নারী তার শারীরিক সৌন্দর্য প্রকাশ করতে পারবেন না পুরুষরা আকৃষ্ট হবে বলে। অথচ পুরুষ ঢিলেঢালা পোশাক না পরে যখন আঁটসাঁট জিন্স ইন করে পরে তখন নারীও আকৃষ্ট হতে পারেন- এটা কেউ পুরুষদের উদ্দেশ্যে বলেন না। এখানে একটা প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক নারীরা কি পুরুষদের বা তাদের শরীরের প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষা বোধ করেন না? নিশ্চয়ই করেন। নারী-পুরুষ যে কেউ যে কারো প্রতি আকৃষ্ট হতেই পারেন। কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণ জরুরি। কারও প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষা অনুভব করা মানে এই নয় জোর করে কারো সাথে যৌন সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।

ঠিক এখানেই নারীদের কাছ থেকে আপনাদের শিক্ষা নেয়ার আছে অনেক কিছু। নারী আপনার শরীরকে ‘সেক্স অবজেক্ট’ নয় একটি শরীর হিসেবেই দেখতে শিখেছে। আপনার উঁচু নিতম্ব, সুঠাম দেহ এমনকি খোলা বুক দেখলেই আপনার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে না, চোখ দিয়ে আপনার শরীরটা গিলে ফেলে না। এমনকি চিৎকার করে বলে না তোমার শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ঢেকে রাখো। নারী আত্মনিয়ন্ত্রণ করে। আর পুরুষ নিজের ধর্ষকামী মনোভাবকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে নারীর পোশাকের উপর দোষ চাপায় নিরন্তর।


  • ৫১৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তানিয়াহ্ মাহমুদা তিন্নি

জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লি থেকে স্নাতকোত্তর শেষে একটি এনজিওতে কর্মরত আছেন।

ফেসবুকে আমরা