তানিয়াহ্ মাহমুদা তিন্নি

প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগ, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়।

নারী দিবসের পরিবর্তে মানুষ দিবস পালনের দাবী একটি পুঁজিবাদী পুরুষতান্ত্রিক ষড়যন্ত্র

১৮৯৪ সালে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক নারীদের ম্যাগাজিন দ্য গ্লাইশিয়েট (ইকুয়ালিটি)-এ আলোচনা করছিলেন বুর্জোয়া নারীবাদ এবং প্রলেতারিয়েত অর্থাৎ সমাজের নিম্নশ্রেণিতে বসবাসরত নারীদের আন্দোলন এক জিনিস নয়, মূলগত জায়গা থেকেই তারা আলাদা। তাঁর মতে, বুর্জোয়া নারীবাদীরা তাদের নিজেদের শ্রেণির পুরুষদের বিরুদ্ধে একধরনের লিঙ্গভিত্তিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সমাজ সংস্কার করতে চায়। অপরদিকে প্রলেতারিয়েত নারীরা একইসাথে লিঙ্গভিত্তিক সংগ্রাম এবং শ্রেণি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদের অবসান চায়। অর্থাৎ নারী এবং নারীশ্রমিক হিসেবে তারা যে শোষণ বঞ্চনার শিকার তারা হচ্ছেন এ দুটো থেকেই মুক্তি চান। ১৯০০ সালের পার্টি কংগ্রেসের প্রাক্বালে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি দ্বিবার্ষিক সম্মেলনের আয়োজন করে যেখানে গুরুত্ব সহকারে প্রলেতারিয়েত নারীদের সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। মূলত জার্মান সোশ্যালিস্ট কর্মজীবী নারীদের এ ধরনের কর্মসূচিই পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক নারী আন্দোলনকে পথ দেখায়।

১৯০৭ সালে ক্লারার নেতৃত্বে নিউইয়র্কে সর্বপ্রথম নারী সম্মেলন হয়। এরপর ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে প্রতি বছর ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন ক্লারা। সিদ্ধান্ত হয়, ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে।

১৯১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক এবং অস্ট্রেলিয়ার নারী শ্রমিকরা ৮ মার্চকে নারী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সময়ে ফ্রান্স, হল্যান্ড, বোহেমীয়া এবং রাশিয়ার কিছু অংশ এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৯১৪ সালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নারী দিবস উদযাপিত হয়, পাশাপাশি একটি ছবি বিখ্যাত হয়ে পড়ে যেখানে দেখা যায়, একটি নারী কালো পোশাকে লাল পতাকা ওড়াচ্ছে। জার্মানিতে এই সিম্বল সম্বলিত পোস্টার পুলিশ নিষিদ্ধ করে। চতুর্থ নারী দিবস উদযাপনই মূলত ইম্পিরিয়ালিস্ট বিশ্বযুদ্ধের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ তৈরি করতে ভূমিকা রাখে। এর তিন বছর পর ১৯১৭ সালে রাশিয়ার নারী শ্রমিকরা নারী দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানকে ধর্মঘটে পরিণত করে যা পরবর্তীতে রাশিয়ান বিপ্লবে অন্যতম ভূমিকা রাখে।

৮ মার্চ নারী দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখতে পাবেন এটি শুধু নারীর প্রতি সাধারণ শ্রদ্ধা সম্মান প্রদর্শনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নারীর সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই এটি। যেখানে শ্রমিক শ্রেণির নারী মার্কসবাদীদের ভাষায় প্রলেতারিয়েত নারীর মুক্তি তরান্বিত করার মধ্য দিয়ে প্রলেতারিয়েত শ্রেণির মুক্তির স্বপ্ন দেখা হয়েছে। এখন বাংলাদেশে বা এ রকম অনেক দেশে প্রলেতারিয়েত শ্রেণি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করবে কিনা সে প্রশ্ন তোলা থাক। কিন্তু নারী মুক্তির প্রশ্নে আপনি যদি শ্রেনি প্রশ্নটি মাথায় না রেখে বেগুনি শাড়িতে র‍্যালি করাকে নারী দিবস উদযাপন বোঝেন তাহলে রুবানা হকদের বক্তব্য শুনে হতাশ হবেন, এটাই স্বাভাবিক।

রুবানা হকরা কোন শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করছেন সেটিতে দৃষ্টি দেওয়া সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। বিজিএমই এর সভাপতি হয়ে তিনি যদি নারী দিবস পালন করতে চান তাহলে তো শুধু নারী হওয়ার কারণে নারী শ্রমিকদের বেতন বৈষম্য, অনিরাপদ কর্মক্ষেত্র, যৌন হয়রানি, জেন্ডার সেগ্রেগেটেড কর্মক্ষেত্র নিয়ে কথা উঠবে, কথা উঠবে রানা প্লাজা, তাজরিন ফ্যাশন্স নিয়েও। এগুলো এড়ানোর সবথেকে উত্তম পন্থা হল মানুষ দিবস পালন করা নারী দিবস না।

কোনো প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে একজন নারী বসে আছে তারমানেই যে সংগঠনটি নারী প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে সেটা ভাবা আর যাই হোক বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। মনে রাখতে হবে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোতে বেশিরভাগ নারীই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ধারন করে।

পরিশেষে প্রতিনিয়ত নারীবাদীদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় বেশিরভাগ সময় সেটির উত্তর দিচ্ছি নাইজেরিয়ান নারীবাদী চিমামান্দা এনগোজি অ্যাদিচের সাহায্য নিয়ে। আশা করি যারা রুবানা হকের মতো করে চিন্তা করেন তারা উত্তর পেয়ে যাবেন। সম্প্রতি চিমামান্দার কয়েকটি প্রবন্ধের অনুবাদ করেছেন বীথি সপ্তর্ষি।

অনেকেই প্রশ্ন করেন, আপনারা এতো নারী নিয়ে ব্যস্ত কেনো? মানুষের মুক্তি চাইলে তো মানুষ নিয়ে কথা বলতেন। এই রকমই চিমামান্দা কে কেউ কেউ প্রশ্ন করতেন শব্দটি নারীবাদী কেনো? কেনো বলেন না আপনারা মানবাধিকারের প্রতি বিশ্বাসী বা এ রকম কিছু?

চিমামান্দা- “কারন এটি অসততা হবে। সাধারণভাবে নারীবাদ অবশ্যই মানবাধিকারের অংশ। কিন্তু মানবাধিকার শব্দের দ্যোতনাটি অস্পষ্ট এবং এটি জেন্ডার বিষয়ক যে নির্দিষ্ট সমস্যা আছে তা অস্বীকার করে। এটা আসলে অস্বীকারের পথ তৈরি করে যে নারীদের বহু শতাব্দি ধরে বাদ দেওয়া হয়নি। এটি আসলে অস্বীকারের পথ তৈরি করবে যে জেন্ডার সমস্যার মূল লক্ষ্য নারীরা নয়। সমস্যাটা আসলে মানুষ হওয়ার বিষয়ে নয়। বিশেষত একজন নারী মানুষ হওয়ার বিষয়ে। বহু শতাব্দী ধরে বিশ্ব মানবসভ্যতাকে দুটি দলে ভাগ করে রেখেছে এবং তারপর একটি দলকে বঞ্চিত করে দমন পীড়ন করা হচ্ছে। এটাই কেবল যৌক্তিক হবে যদি সমস্যাটিকে স্বীকার করাই সমাধান হিসেবে ধরে নিতে পারি আমরা।“

920 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।