আসুন আমরা আরেকটু সভ্য হই

মঙ্গলবার, নভেম্বর ৫, ২০১৯ ১:২২ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


অস্ট্রেলিয়ায় আসার পর ভাবছিলাম যৌনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ইত্যাদি টপিকে লিখা বন্ধ করে দিবো। যেহেতু অস্ট্রেলিয়ায় আসার পর ভয়ংকর একটা স্ট্রাগলের জীবন আর নিরন্তর আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগাকে ট্রেড করছি ব্যক্তিস্বাধীনতার সাথে এবং সেটা পেয়ে গেছি হেতু এই বিষয়ে লিখে সময় নষ্ট করবো না। কেননা আমার হিসাবে সময় একপ্রকার কারেন্সী এবং ব্যক্তিস্বাধীনতাকেন্দ্রিক অপিনিয়নভিত্তিক চর্বিতচর্বন লিখে সময় নষ্ট করার থেকে একটা নতুন কিছু শেখা গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে প্রচুর মানুষ প্রতিনিয়ত লিখে। আমি না হয় নাই-ই বললাম।

এই দেশে আসার পর সব'চে ভালো লাগে রাস্তা ঘাটে শপে মলে রাফতিকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাইতে। এই সামান্য জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়া, আর মাঝে মাঝে শর্টস পরে ঘোরাটা এনজয় করতে হাড়ভাংগা খাটুনি আর স্ট্রেস যখন নিচ্ছি তখন দেখছি দেশে ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য মানুষ নিরন্তর যুদ্ধ করে যাচ্ছে। বিষয়টা দেখে খারাপ লাগে। এই সামান্য বিষয়গুলো- পৃথিবীর নানা দেশের মানুষেরা যেটা একি টাইমলাইনে বসে এম্নিতেই ভোগ করে, সেটা পাওয়ার আশায় বাংলাদেশের মানুষেরা বিদ্রোহ করছে প্রতিমুহুর্ত। এবং নারীবাদটা মূলতঃ লাইফস্টাইল রেবেল কেন্দ্রিক হচ্ছে। এটাকে খাটো করে দেখছি না মোটেই, সামান্য নিঃশ্বাস নিতেও যখন ট্যাক্স দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে সেটার বিরুদ্ধে তখন কথা বলা, আলোচনার ঝড় তোলা, প্রোটেস্ট করাটাই কাম্য।


একটা জাতি থেকে প্রোডাক্টিভ মানুষ পাওয়ার মূল শর্ত হইলো মানুষকে ফ্রী টাইম বের করে দেওয়া। শুধু তাই না সকল দার্শনিক চিন্তার উৎস এই ফ্রী টাইম। অভিজিৎ ব্যানার্জি একা নোবেল পান নাই উনার স্ত্রী এস্টার ডুফলোও পেয়েছেন। এবং মেয়েদের জন্য এই ফ্রী টাইমটা বের করার বিষয়টা কেনো যেনো মানুষ মাথায় আনতেই চান না। মানুষ ভাবছে- নারীরা কেবল পুরুষদের জন্য ফ্রী টাইম সৃষ্টির জন্য তৈরী হইছেন, তাদেরও যে ফ্রী টাইম পাওয়ার প্রয়োজন আছে এই ভাবনাটা কাউকে করতে দেখলাম না। ফ্রীটাইমের জন্য একজন সাপোর্টিভ পার্টনার ডিমান্ড করাটাকে দেখলাম মানুষজন হীনচোখে দেখছে অথচ অস্ট্রেলিয়ায় জেসন মোমোয়ার মত হাই টি তাগড়া পুরুষেরা নির্দ্বিধায় তাদের স্ত্রীকে সহযোগিতা করছে। আমি নিশ্চিত অভিজিৎ ব্যানার্জি তার স্ত্রীকে দিয়ে সমস্ত হাউজহোল্ড কাজ করান নাই, উনি তাঁর স্ত্রীকে সাধ্যমতো সাহায্য করেছেন। এবং আমার লিস্টের অনেকের ভাষ্যমতে যে সকল স্বামীরা স্ত্রীকে সাহায্য করে তারা পুরুষ না, তাঁরা অনুগত শিশু। এইজন্য অভিজিৎ ব্যানার্জির আর পিয়েরে কুরীর স্ত্রী নোবেল পায় আর আপনেরা পান স্কুলের সামনে পাটি পাইত্যা গুটিবাজি করা কতগুলো স্ত্রী যারা নিজের অলস মস্তিষ্ককে কোনো প্রোডাক্টিভ কাজে খাটাইতে পারেন না বিধায় সেটাকে পরচর্চায় নিয়োজিত করেন।

একটা জাতি যখন নিশ্বাস নেওয়া, হাত পা নাড়ানো, রিলেশন করা ইত্যাদির বিষয়গুলো নিয়েও তুমুল তর্কের ঝড় তোলে সে জাতির ফ্রী টাইমটাকে ব্যয় করে ফালতু বাতে, যে কারণে বাংলাদেশ থেকে ভালো বিজ্ঞানী, গবেষক ইত্যাদি তৈরী হয় না আর মেধাবী মেয়েরা মেধা বিসর্জন দিয়ে হাঁড়িপাতিল মাজে।

এখন আসি দুইটা স্ক্যান্ডালে। একটা স্ক্যান্ডাল হচ্ছে হাই স্কুল মিউজিক্যালের স্টার ভেনেসা হাজেনস এর ন্যুড ছবি লিক। ঘটনা ঘটেছে ২০০৭ সালে। ভেনেসা পাব্লিকলি লজ্জা প্রকাশ করেন- যে তিনি এই ছবিগুলা তোলার জন্য লজ্জিত। ২০১৭ সালে ১০ বছর পর জেনিফার লরেন্সের ন্যুড ছবি লিক হওয়ার পর জেনিফার লরেন্স লজ্জিত হওয়া তো দূরের কথা তিনটা উল্টো যারা এই ছবি লিক করেছে তাদের ক্রিমিনাল দাবী করে বলেছেন - " It is not a scandal, it is a sex crime, it is a sexual violation, it's disgusting,the law needs to be changed and we need to change." মানুষের সমর্থনও এতে তিনি পেয়েছেন। মানুষের মানসিকতা দশ বছরে কী চমৎকার ভাবে বদলেছে।



তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রসরের সাথে সাথে এবং তথ্যের abundance (প্রাচুর্যতা) এর সাথে সাথে সমাজের নিয়ম কানুন পরিবর্তিত হচ্ছে ত্বড়িৎগতিতে। ২০১৯ সালে বসে দুইজন সিংগেল মানুষের অন্তরঙ্গ (আমি অন্তরঙ্গতার কিছু পাই নাই যদিও, তবে যারা চুমু আর সঙ্গমকে গুলায়ে ফেলে তাদের দৃষ্টিতে এইটাই ইস্রাফিলের শিংগায় ফুঁ দেওয়ার মতো ঘটনা) ছবি প্রকাশে সমালোচনার হিড়িক ওঠাটা প্রচন্ডরকম বর্বর, মধ্যযুগীয় আর প্রতিক্রিয়াশীল। যেখানে বিদ্যাসাগর ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ সংস্কারের পক্ষে কাজ করেছিলেন সেখানে ২০১৯ সালে অন্তর্জালের যুগে ডিভোর্সী মেয়ের বয়ফ্রেন্ড থাকতে পারে এইটাকে সহজভাবে মানুষ নেবে- এতটুকু সামাজিক বিবর্তন আমরা আশা করতে পারি। কে ছবি তুললো বা কে ভিডিও করলো তাদের অন্তরঙ্গ মুহুর্ত এটা কারুর মাথাব্যাথার বিষয় হওয়া উচিৎ না। এটা ভিক্টিম ব্লেইমিং। কারুর ইচ্ছা হইতেই পারে তাদের বিশেষ মুহুর্তের স্মৃতিকে সংরক্ষণ করা, পরে সেটা দেখে তারা কাঁদুক বা চাইলে মাস্টারবেট করুক সেটা তারা নির্ধারণ করবে। অন্যের প্রাইভেট ছবি লিক করার মত একটা বাজে ক্রাইমকে - " ছবি তুলছে কেনো" বলে হালালীকরণ করা কোনো সভ্য মানুষের কাজ না।

এই ভিক্টিম ব্লেমিংটা কেনো হয়? আজও সমাজ মেয়েদের ম্যাডোনা আর হোরের বাইরে ইন্ডিভিজুয়াল ভাবতে শেখেনাই মানুষ। সারাক্ষণ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত, বাসার কাজের মেয়ের আর পতিতালয়ে যাতায়াতকারী মানুষেরাও টেরিটোরিয়াল এগ্রেশনের কারণে মেয়েদেরকে গণিমতের মাল তথা নিজের সম্পত্তি ভাবা থেকে নিজেকে নিবৃত্ত করতে অক্ষম এবং এই হিপোক্রেটের দলেরা নিজেরা তো সেলিব্যাসি পালন করবে না মোটেই কিন্তু নারীরা না করলে তাদের গাল দিতে, সোশ্যালি হ্যারাস করার ক্ষেত্রে একবারও আয়নায় নিজের চেহারাটাও দেখবে না । ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার ভুখন্ডটা তাদের টেরিটোরি এবং এই টেরিটোরিতে অবস্থিত তাবৎ মেয়েরা এদের সম্পত্তি। টেরিটোরির সবকিছুকে পোজেজ করার এই টেন্ডেন্সি পশুদের মাঝে এবং পশু থেকে অবিবর্তিত মানুষের মাঝে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এই টেরোটোরিয়াল এগ্রেশনজনিত পশুশ্রেণীর ভাবনার কারণে পরিমনীর ছবির নিয়ে তাদের অধিকারবোধ আর মিথিলার লিকড ফোটোতে "মিথিলা কতো বড়ো দুশ্চরিত্রা" এই ফালতু আলোচনায় ভরে যায়। এরা ধর্ষকের পক্ষে কথা বলে অথচ পারস্পরিক সম্মতিতে যৌনতায় এদের যতসব চুলকানী। নারীদের এজেন্সী পুরুষদের কাছে বরাবরই চক্ষুশূল, একি সাথে নারীর প্রিয় পুরুষেরাও তাদের চক্ষুশূল। নারীর প্রিয় পুরুষদের ক্ষমতা তাদের ঈর্ষাপরায়ণ করে, আর নারীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া তাদের ভোগ্যবস্তু থেকে মানুষের পর্যায়ে উত্তীর্ণ করে- এটাও তো একটা বিশাল সমস্যা।

অথচ এই ঘটনার দুই বছর আগে ২০১৭ সালে এই পৃথিবীতেই একজন অভিনেত্রী তার ন্যুড ছবি লিক করাকে ক্রিমিনাল অফেন্স ঘোষনা দিছেন। কারুর ব্যক্তিগত ছবি লিককারী একজন অপরাধী। জুলিয়ান এসেঞ্জের রাজনৈতিক তথ্য লিক আর এই লিক গুলায়ে ফেলবেন না, জুলিয়ান এসেঞ্জ হোক আর মার্ক জাকারবার্গ হোক এরা - মানুষ কে কার সাথে কি করে - এর মত মামুলি বিষয়ে মাথা ঘামায় নাই কোনোদিন, এদের হাতে সেইসকল তথ্য থাকার পরেও।

এখন কথা হইলো যৌনতার সামাজিক দায়বদ্ধতা। বাংগালীর সামাজিক দায়বদ্ধতার ফিচফিচানি খুব বেশী এরা নাক গলানী পাব্লিক। কে কী খাইলো, কি পড়লো, কার সাথে মিশলো সকল বিষয়েই এরা সিসি ক্যামেরা রেডি রাখে আর হাবল টেলিস্কোপ নিয়ে বইসা থাকে। কে কী খাইলো -হালাল না হারাম, কে কী পড়লো- শাড়ি না বিকিনি, কে কার সাথে শুইলো -হোমোসেক্সুয়াল না প্যানসেক্সুয়াল -কোনো সভ্য মানুষ এইসব বিষয়ে নাক গলায় না। কারণ এইসব দেশের মানুষ জানে যে একজন তৃপ্ত মানুষ মাত্রই প্রোডাক্টিভ মানুষ হওয়ার পোটেনশিয়াল রাখে, মানুষের মৌলিক অধিকার, বিনোদন এগুলাতে যতোবেশি অবদমন চলে মানুষ ততবেশী ভায়োলেন্ট হইতে থাকে, ততো কম কর্মতৎপর হয়। খাবারে অবদমন আছে সভ্য দেশেও যদি সেটা ক্ষতিকর মাদক হয়, যৌনতায়ও আইনী বাঁধা আছে যদি সেটা ইন্সেস্ট হয়, অফিশিয়াল ড্রেসকোড মান্য না করার শাস্তিও আছে - এরকম সামান্য কিছু ক্ষতিকর সেক্টর বাদ দিয়ে বাকী সকল নাগরিক স্বাধীনতা ভোগের ক্ষেত্রে সামাজিক দায়বদ্ধতা যতো কমানো যায়, মানুষ যতো স্বাধীন হয় ততো বেশী সে তার পোটেনশিয়ালগুলোকে এক্সপ্লোর করতে সক্ষম হয়।

আর মেয়েদের একজন ইন্ডিভিজুয়াল হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ কবে দেখতে শিখবে জানি না,এই জায়গাটায় মারাত্মক হতাশ আমি। এইটা একটা ফান্ডামেন্টাল কার্টেসী -যে কোনো মানুষকে তার বর্ণ,গ্রোত্র, লিংগ, ধর্মবিশ্বাস নির্বিশেষে একজন ইন্ডিভিজুয়াল হিসেবে সম্মান দেওয়া। এই ২০১৯ সালেও যেটা আমরা শিখতে পারি নাই, আফসোস!


  • ৪২৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তিয়ান পুতুই

লেখক এবং এক্টিভিস্ট।

ফেসবুকে আমরা