ধর্ষণ প্রতিরোধে সতীত্বের ধারনার বিলোপ

মঙ্গলবার, জুলাই ৯, ২০১৯ ৮:০৬ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


যতোদিন সতীত্বের ধারনা মানুষ মাথায় নিয়ে ঘুরবে ততোদিন যৌন সহিংসতা সমাজে অটুট থাকবে। বেদম পিটুনি আর পাশবিক যৌনতা নির্যাতনে সত্বীতের ধারনার বাইরে আর কোনো পার্থক্য নাই। ধর্ষণের জন্য কারুর জীবন শেষ হয় না, কেউ নষ্ট হয় না, কোনো কলংকের ব্যাপার নাই, মানুষ কেবল তার যৌনাঙ্গ না এই শিক্ষা যতোদিন না পর্যন্ত এই সমাজের মানুষ শিখতেছে ততোদিন "ইজ্জত গেলরে"র ভয়ে ঠিকমত প্রতিবাদ করবে না তারা এবং ধর্ষণের ট্রমা কাটিয়েও উঠতে পারবে না।

বাপ মা তার সন্তানের ধর্ষকদের, সেটা হোক বাসার টিউটর, মামা, চাচা, দুলাভাই এদেরকে দুধকলা দিয়েও পুষবে যতোদিন সতীত্বের ধারনার বিলোপ না ঘটবে। ছোটবেলায় আমাকে এক আংকেল এসে পুরা থুতু মাখায়া চুমু দিতো, আমার পেট উল্টায়ে বমি আসতো আম্মুকে বলতাম উনি যেনো আমার কাছে না আসেন। আম্মু আব্বু কোনোদিন উনার বালটাও ছিড়েন নাই। কেবল অধিক পরিমাণে চিৎকার চেঁচামেচি হুলুস্থুল করার পর ওনার বাসায় আসা বন্ধ করছেন। আমার বাপ মা ওনার গালে লাত্থি বসায়া দুই তিনটা দাঁত ফেলান নাই। খুব সম্ভবতঃ আব্বু আম্মু ভাবছে দুই গালে কইষা লাত্থি মারলে এই কথা ছড়াবে এবং এই কথা ছড়াইলে আমারই ক্ষতি হবে, এছাড়াও মধ্যবিত্তের যে প্রধান সমস্যা- টিকে থাকার স্বার্থে বহু মানুষের উপর সরাসরি অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হওয়া- সেটাও এখানে কাজ করছে। অবশ্য আরেকটু বড় হওয়ার পরে আমি নিজেই আক্ষরিকভাবে লাত্থি মারা শিখে গেছি। অনেক ফেমিনিস্টদেরও দেখি ধর্ষণকে নিয়ে এমনভাবে কথা বলতে যেনো ধর্ষণ হইলে ধর্ষিত জীবন পুরাটাই গেলোরে। আমি "ধর্ষিতা" না বলে "ধর্ষিত" বলছি কেন না আমি মনে করি পুরুষেরাও ধর্ষণের শিকার হয়। নারীরা সেটা করতে সক্ষম কিনা জানি না তবে পুরুষেরা যে পুরুষদের ধর্ষণ করতে সক্ষম এবং প্রচুর ছেলে শিশুকে নারী পুরুষ উভয়েই ধর্ষণ করে সেটাও আমি জানি। আমার পরিচিত এমন ছেলে বন্ধু আছে যে শিশুকালে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েও বড় কালে দিব্যি ঠিক আছে, কিন্তু একজনও মেয়ে নাই যে যৌন সহিংসতাকে প্রাণনাশিনী ড্যামেজ হিসেবে গণ্য করে নাই।

বাংলাদেশের অতি শিক্ষিত জনগোষ্ঠী আসলেই ধর্ষিত মেয়েদেরকে ভালো চোখে দেখে না, বাপ-মা দের এজন্য ধর্ষকদের প্রোটেকশনের জন্যও আহামরি দোষও দেই না, কোনো বাবা মাই সন্তানের জীবনটা কঠিন করতে চায় না আর তার থেকেও সন্তানের উপরে চলা ছোট্ট একটু খামচাখামচির জন্য সোশ্যাল এইড বঞ্চিত হয়েও জীবন কাটাতে চাইবে না অনেকেই (ট্রাস্ট মি সন্তান বাপ-মা'দের জন্য আহামরি কোনো ভালোবাসার জিনিস না, শিল্প সাহিত্য মিডিয়া বাপ মার ভালোবাসাটাকে অতিরঞ্জিত করে)। এরা এদের বুদ্ধি অনুযায়ী সন্তানদের ভালো চিন্তা করেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে পৃথিবীর সবচে বড় বড় ট্র‍্যাজেডি গুলার সৃষ্টি "ভালোর জন্য"। হিটলারও মানুষের ভালোই চেয়েছিলেন। মানুষ যদি মানুষের একটু কম ভালো চাইতো তাহলে পৃথিবীটা একটু বসবাসযোগ্য হতো।

সমাজে মধ্যযুগীয় ধর্মের আধুনিকায়ন কিংবা বিলোপ এই দুইটার একটা না হলে জনগণের দিক থেকে এই সহিংসতার বিলোপ হবে না৷ ধর্ষণ প্রতিরোধে সরকারের এবং গণমাধ্যমের অনেক কিছু করণীয় আছে, তার সাথে প্রয়োজন জনগণের প্রচন্ড সচেতনতা। ধর্ষণ হলে সেই অপরাধের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করা, ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করা (সেটা এক বছরেও জেল হলেও ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করা প্রচন্ডরকম জরুরী) আর ধর্ষিতকে প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে ট্রমা থেকে বের করে নিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।

এই সকল ব্যবস্থাপনা তখনই সম্ভব যখন যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার পরেও ভিক্টিমের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা সম্পূর্ণভাবে আনেফেক্টেড থাকবে। সমাজের সামগ্রিক নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় যতোদিন ধর্ম actively কাজ করবে সতীত্বের ধারনার বিলোপ কোনোদিনই হবে না। এবং সতীত্বের ধারনা থাকার মানে হলো নিকটাত্মীয়দের দিয়ে ধর্ষণ হলে, খবর বাইরে না ছড়ানোর চেষ্টা করা এবং অনাত্মীয়দের দিয়ে ধর্ষণ হলে প্রোভোকেটিভ পোশাক পরা নারীদের চরিত্র হনন করা এবং প্রতিটা ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা।


  • ১২৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তিয়ান পুতুই

লেখক এবং এক্টিভিস্ট।

ফেসবুকে আমরা