সৌম্যজিৎ দত্ত

লেখক, ব্লগার, আইএসআই তে লেকচারার এবং গবেষণারত ছাত্র।

তসলিমা নাসরিন অশ্লীল, তসলিমা নাসরিনের লেখা অশ্লীল?

গত এক দিনে ৪৫০ কি.মি. জার্নি করেছি। বাসে, ট্রেনে নিজের মতো থাকি। আশেপাশে কিছুর দিকেই কখনো মন যায় না। মানববাদী লেখক তসলিমা নাসরিনের লেখা “নারীর কোনও দেশ নেই” বইটি সাথে করে নিয়ে গেছিলাম এবার। বইটি আগেও পড়েছি। একটি একটি করে প্রায় সব কলামই পড়া। তাও আবারও পড়ি। পড়া জিনিসই নতুন করে পড়ি। উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলি মনে রেখে দিই, এবং সেগুলি আবারও পড়ি। নতুন কিছু গল্প পাওয়ার আশায়, নতুন কিছু চিন্তা করার আশায়, যাতে আমিও এর থেকে কিছু নতুন করে ভাবতে পারি, লিখতে পারি, তাই সেগুলি আবারও পড়তে থাকি। এই সময়ের মধ্যে যে কলামগুলি আবারও পড়লাম, “এক পুরুষ থেকে আরেক পুরুষ – নারীর সমস্যার এ কি কোনও সমাধান?”, “আর কতকাল নারী কোলে কাঁখে রেখে অমানুষ করবে পুরুষজাতকে?”, “পুরুষ কি আদৌ নারীর প্রেম পাবার যোগ্য?”, “ভারতবর্ষে বেঁচে থাকবে শুধু পুরুষরাই।” হাই ভোল্টেজ সব লেখা। তসলিমা নাসরিনের লেখা মানে ভাষা যেমনই হোক, ভীষণ শিক্ষণীয়। যেমন বলা যায়, লেখক আঁতে ঘা দিয়ে মানুষকে সত্যের সাথে পরিচয় করান।

অনেকেই বলে থাকেন, তসলিমা নাসরিন অশ্লীল, অশ্লীল লেখেন।

জ্বি না। তসলিমা নাসরিনের লেখা অশ্লীল নয়। উনি অশ্লীল লেখেন না। কোনটা শ্লীল,  কোনটা অশ্লীল এ মূলত ব্যক্তিসাপেক্ষ। যেমন ধরুন আপনি পুরুষতান্ত্রিক। ঘোর পুরুষতান্ত্রিক। তসলিমা নাসরিন তো পুরুষতন্ত্রকে ফালা ফালা করে কেটে, রক্তাক্ত করে লেখেন। উনি লেখেন, “পুরুষ যতো ভালোই হোক বা ভালো সেজে থাকুক, বা উনিও হয়তো কখনো কখনো প্রেমে পড়ে প্রথম প্রথম কোনো কোনো পুরুষকে উন্নত চিন্তার ভাবেন, অর্থাৎ সেই পুরুষ পুরুষতান্ত্রিক নয়, সেই পুরুষ নারী স্বাধীনতায় এক’শ শতাংশ বিশ্বাস করেন, আদতে দেখেন সেই পুরুষ কিছু সময় পরই স্বমহিমায় ফেরেন, নারীর মাথায় উঠে নাচেন বা নারীর প্রতি কর্তৃত্ব শুরু করেন।” তাহলে সে পুরুষ উন্নত চিন্তার হয় কিভাবে? সে পুরুষ তো পুরুষতান্ত্রিকই। বরং মানুষের মুখোশের আড়ালে সে পুরুষতন্ত্রকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। তসলিমা নাসরিন যখন বুঝতে পারেন সেই পুরুষতান্ত্রিক প্রেমিকটিকে, তখন মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেন। অতএব এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চিন্তাভাবনা অনুযায়ী তসলিমা নাসরিন হয়ে ওঠেন অশ্লীল। তসলিমা নাসরিনের লেখা হয়ে ওঠে অশ্লীল।

তসলিমা নাসরিন লেখেন সুঠাম, মেদহীন পুরুষ শরীর তাঁর ভীষণ প্রিয়। শুধুমাত্র প্রকাশ্যে তিনি এটি লিখছেন বলেই তাকে অশ্লীল বলা হচ্ছে? সুঠাম, মেদহীন পুরুষ শরীর তো প্রায় সব নারীরই প্রিয়। হ্যাঁ সবাই এটা প্রকাশ্যে আনতে পারেন না, কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর চোখে, মুখে, কণ্ঠে, শরীরে লজ্জার পট্টি পরিয়ে রাখে। তাই তারা বলতে পারে না। তসলিমা নাসরিন এসব লজ্জার পট্টির ধার ধারে না। তাই তিনি অশ্লীল। অথচ পুরুষ কিন্তু মুখের ওপরে নারীকে নারী শরীর নিয়ে নানান খারাপ মন্তব্য করে নিজের পুরুষ পরিচয়কে গর্বিত করে। যেন এসব না করলেই সে কাপুরুষ। প্রকাশ্যেই করে। তখন কিন্তু এটাকে অশ্লীল বলা হয় না। পুরুষ যেখানে কর্তা, সেখানে পুরুষ কিভাবে অশ্লীল হয়?

তসলিমা নাসরিন লেখেন, পুরুষতান্ত্রিক প্রথাকে উচ্ছেদ করতে হলে সবার প্রথমে বিবাহপ্রথাকে উচ্ছেদ করতে হবে। কারণ বিবাহ প্রথাই নারীকে নারী, পরনির্ভর করে তোলে, পুরুষকে নারীর মালিক, শাসক করে তোলে। এখন এত বছর ধরে চলে আসা এই বিবাহপ্রথাকে যদি এক নারী উচ্ছেদ করতে বলে, তখন সে ওই মালিক পুরুষের চোখে তো অশ্লীল হবেই। বিবাহ প্রথা উচ্ছেদ হলে নারীর তো আর পিছুটান থাকে না, দুর্বলতা থাকে না। তাহলে পুরুষ কিভাবে শাসক হয়ে বাঁচবে? অতএব তসলিমা নাসরিন অশ্লীল।

তসলিমা নাসরিন বলেন, ভারতবর্ষে নারী ক্রমশ কমে আসছে, কারণ স্ত্রী-ভ্রূণ হত্যা, স্ত্রী লিঙ্গ অপ্রত্যাশিত, এমনকি এমন রীতিও চালু ছিলো যেখানে নারী শিশুকে মাটির কলসির মধ্যে বন্দী করে একটুকরো গুঁড় একটি সুতোয় বেঁধে কলসির ভিতরে ঢুকিয়ে, সেই কলসিকে মাটি চাপা দেওয়া হতো। মাটি চাপা দিয়ে বলা হতো, “যেখানে আছিস, সেখানেই থাক। গুঁড় খা। আর ফিরিস না। তোর ভাইকে পাঠিয়ে দে।” ঠিক এমনই একটি এলাকায় রাজা জনক মাটির নিচে কলসির ভিতরে সীতাকে খুঁজে পায়। অথচ যেখানে ভারতবর্ষে কোনো এক আশ্চর্য ম্যাজিকে ভূমিকন্যা হিসেবে সীতার জন্ম বলে মানা হয়, সেখানে এমন সত্যি কথা তসলিমা নাসরিন কেনো লিখবে?

তসলিমা নাসরিন লেখেন, “অতি মাননীয় পুরুষেরাও, যারা সামাজিক উচ্চতায় বিরাজ করছেন, তারাও হয় ঘরে এসে নারীকে অত্যাচার করেন বা নারীকে দিয়ে দাসকর্ম করান বা নারীকে ব্যবহার করেন, বা সেই নারীকে প্রতারিত করে ঘরের বাইরে একাধিক সম্পর্ক গড়েন।” এখন যে সব মাননীয় ব্যক্তিদের আমরা পূজা করি, তসলিমা নাসরিনের এতো সাহস হয় কি করে যে এতো বড় সত্যিটা লেখেন?

তসলিমা নাসরিন অশ্লীল। তসলিমা নাসরিনের লেখা অশ্লীল।

আমার চোখে তসলিমা নাসরিন ঈশ্বর। কারণ প্রতিমুহূর্তে তসলিমা নাসরিন নামক এই আশ্চর্য মানুষটি আমার জ্ঞান চোখে একটু একটু করে উজ্বল আলো এঁকে দেয়। শুধু তসলিমা নাসরিনকে একটিই কথা বলবো, “মেয়েমা কোনো কোনো পুরুষ বা কেউ একজন হলেও, পুরুষতন্ত্রকে ছিন্ন করে মানুষ হতে চায়। ভীষণ মানুষ হতে চায়। তোমার মতো মানুষ হতে চায়।”

3403 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।