তাসফিয়া কামাল

তাসফিয়া কামাল এর জন্ম ঢাকায়, বড় হয়েছেন ঢাকায়। পড়াশুনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েয় 'পদার্থবিজ্ঞান' বিভাগে। বর্তমানে জার্মানিতে মাস্টার্স করছেন 'অপটিকাল সায়েন্সে'। একই সাথে গবেষনার কাজে যুক্ত।

ফ্রি-সেক্সের দেশ ইউরোপ নাকি বাংলাদেশ?

বাংলাদেশীদের অশিক্ষিত কাঠমোল্লাদের কাছে ইউরোপের পরিচয় হলো 'ফ্রি সেক্সের দেশ ইউরোপ'। এখানে বাপ মা ভাই বোন ছেলে মেয়ে সবাই খালি সারাদিন সেক্স করে। বিশ্বাস না হলে যেকোনো ইউরোপ সংক্রান্ত ওয়াজ শুনে দেখুন।

এই নাস্তিক ফ্রি সেক্সের দেশে আসার আমার প্রায় দুই বছর উপরে হয়ে গেলো। একদম জার্মানিতে পা দেওয়ার সাথে সাথেই আমাকে যেটার সম্মুখীন হতে হয়েছে সেটা হলো এক অচেনা, অজানা জাপানিজ বেটা আমাকে ল্যাগেজ আর ব্যাগ নিয়ে হিমসিম খেতে দেখে নিজেই এগিয়ে এসে আমার ল্যাগেজ ট্যাক্সি পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। তার এক সপ্তাহ পরেই আমি বাসা বদল করি এবং আবারো দুই হাতে দুই বড়ো বড়ো ল্যাগেজ আর ব্যাকপ্যাক তো আছেই। নতুন বাসা কাছেই এবং কোন বাস বা ট্রেন নিতে হবে সেটা জানি না দেখে আমি হেঁটেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। শীতের সেই অন্ধকার রাস্তায় আবারো এক অচেনা, অজানা বেটা ছেলে আমাকে এসে জিজ্ঞাসা করলো সাহায্য লাগবে কিনা, আমি ডিসেন্সি দেখাতে গিয়ে বলি 'It's ok, I think I can handle myself' সে তখন উল্টা আমাকে বললো 'I can still help you' তো এর পর হাঁটতে গিয়ে বুঝলাম বাসা যতোটুকু ভেবেছিলাম তার থেকেও অনেক দূর। সেই অপরিচিত মানুষটা পুরোটা রাস্তায় আমার সাথে গল্প করলো এবং ল্যাগেজ নিতে হেল্প করলো। ও হ্যাঁ, সে বাসায় পৌছানোর পর একবারের জন্যও খারাপ কিছু আশা করেনি এমনকি আমার ফোন নাম্বার পর্যন্ত চায়নি। একটা মেয়ে বাংলাদেশে বসে কখনো রাত বিরাতে এইভাবে একটা অপরিচিত ছেলের সাহায্য নেওয়ার কথা চিন্তা করতে পারে?

এই গত দুই বছরে একবারের জন্যও আমি কোনো বাজে কথা, টিজিং বা সেক্সুয়াল হ্যারেজমেন্টের শিকার হইনি। কমেন্ট করা তো অনেক দূরের কথা, ট্রেনে বা বাসে যখন অনেক ভীড় থাকে তখনো কোনো ছেলে বাজে ভাবে একবার তাকানোর চেষ্টাও করেনি, ধাক্কা দেওয়া তো অনেক দূরের কথা। আর বাংলাদেশের মতন 'নন-ফ্রি সেক্সের দেশে' এমন একদিন যায়নি যেদিন বাইরে বের হয়ে আমি নূন্যতম কোনো কমেন্টের শিকার হইনি বা বাজে দৃষ্টির শিকার হয়নি। আর পোষাক নিয়ে জাজমেন্টের কথা নাইবা বলি। এখানে কোনো মেয়ে নগ্ন হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ তাকে নিয়ে বাজে কোনো মন্তব্য করবে না, শুধুমাত্র অবাক হবে হয়তো।

আমি স্টুডেন্ট ডর্মে থাকি, সেই কারণে প্রত্যেক ইউকেন্ডে এখানে পার্টি হয় রাত দুইটা তিনটা কখনো ভোর পর্যন্ত। আমি আজ পর্যন্ত শুনিনি এখানে কোনো মেয়ে ড্রাঙ্ক অবস্থায় মলেস্টেড হয়েছে। ড্রাঙ্ক হওয়ার পর দুনিয়ার কেউই সোবার থাকে না, কিন্তু এদের প্রাতিষ্ঠানিক এবং পারিবারিক শিক্ষা এতোটাই ভালো যে এরা ড্রাঙ্ক হওয়ার পর তো কোনো মেয়েকে বাজে কথা বলা বা গায়ে হাত দেওয়ার কথা ভুলেও চিন্তা করতে পারে না। এখানে সামারে বিকিনি পরে সান বেথিং করা বা পুকুরে লাফ ঝাপ করা খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য, কখনো এর জন্য কেউ মলেস্টেড হয়েছে শুনলাম না। তাই বলে কি জার্মানি বা সমগ্র ইউরোপে মলেস্টেশন বা রেপ হয়ই না। অবশ্যই হয়, কিন্তু এরা আমদের মতন ভিক্টিম ব্লেইমিং করে না। এখানে যখন কোনো মেয়ে রেপ হয় তখন মেয়ের ফ্যামিলি, ফ্রেন্ডস সবাই তাকে সম্পূর্ন মোরাল সাপোর্ট দেয়। তার মানসিক অবস্থার উন্নতির জন্য যা কিছু করার প্রয়োজন তাতে সাহায্য করে। আর 'নন-ফ্রি সেক্সের দেশ' বাংলাদেশে মেয়ে রেপ হলে সবার আগে নিজের বাপ মা ই মেয়েকে ব্লেম করে আর বলে চুপ করে থাকতে।

গত বছর সামারে আমি জার্মানির একটা ন্যুড বিচে যাই। বাংলাদেশীদের ভাষ্যমতে তো সেখানে রেপের ছড়াছড়ি হয়ে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু অবাক করার ব্যাপার ছিলো, কেউ কারো দিকে তাকায় পর্যন্ত না। হ্যাঁ ওখানেও কিছু ছেলে ছিলো যারা লুলোপ দৃষ্টিতে নগ্ন মেয়েদের দিকে তাকিয়ে ছিলো, অনুমান করেন তো তারা কোন দেশে বা কোন অঞ্চলের হতে পারে! আপনি যদি সাউথ এশিয়া অনমান করে থাকেন তবে আপনি সম্পুর্ন সঠিক।

তো ইউরোপের মতন নাস্তিক, অপসংস্কৃতি আর 'ফ্রি-সেক্সের' দেশের মানুষরা বাংলাদেশের মতন ৯০% মুসলিম, সংস্কৃতবান আর 'নন-ফ্রি সেক্সের' দেশের মানুষের মতন ভন্ড, পার্ভাট আর বউ পিটানি ওয়ালা না। এটাই হয়তো এদের ক্ষোভের জায়গাটা। মোরালি এত আপগ্রেডেড জাতি দেখে এরা ভিতরে ভিতরে লো ফিল করে। একটা মেয়েকে সামনে বিকিনি পরা অবস্থায় দেখে কিভাবে রেপ না করে থাকা যায় সেটা এদের মাথায় ঢুকে না। একটা মেয়ের নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজের নেওয়ার অধিকার আছে, তাতে আবার পরিবার সমাজ সাপোর্টও দেয় সেটা এদের বুঝে আসে না। তার উপর ছেলেরা এখানে মেয়েদের ভোগের বস্তু ভাবে না, একটা মেয়ের নিজের সেক্স পার্টনার চুজ করার স্বধীনতা আছে, একাধিক মানুষের সাথে সেক্স করার পরও কোনো ছেলে মনে করে না যে ওই মেয়েকে রেপ করা তার নৈতিক দ্বায়িত্ব। এইসব চিন্তা করে এদের মাথার রক্ত গরম হয়ে যায় আর এই জন্যই ইউরোপ এদের কাছে এতো খারাপ।

এই অশিক্ষিত কাঠমোল্লাদের লজিক অনুযায়ী এইদিক থেকে দেখলে ইউরোপ না বরং বাংলাদেশকে 'ফ্রি সেক্সের দেশ' বলা উচিত। ইউরোপে দুই বছর থেকেও ফ্রি সেক্সের দেখা পাইলাম না কিন্তু বাংলাদেশে থাকতে ফ্রি ধাক্কা, ফ্রি টেপা, ফ্রি কমেন্ট, ফ্রি চাহনি সবই ছিলো। ভাগ্যভালো যে ফ্রি রেপ পাই নাই। অবশ্য আপনারা চাইলে বাংলাদেশকে 'ফ্রি রেপের দেশ' ও বলতে পারেন, একান্ত আপনাদের ব্যক্তিগত মতামত।

আর আপনার যদি ধারণা হয়ে থাকে যে মানুষের উপর এই সব ওয়াজ মাহফিলের তেমন কোনো প্রভাব নাই, তাহলে বলবো আপনি একবার হলেও বাংলাদেশের গ্রামগুলো থেকে ঘুরে আসুন, সেখানে মানুষ এখনো বিশ্বাস করে যে সাইদীকে চাঁদে দেখা গিয়েছিলো।

3282 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।