সাইলেন্সি, ট্রমা এবং আমার প্রতিবাদ

শুক্রবার, জুলাই ৫, ২০১৯ ৪:৪১ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


অনেকদিন ধরেই অনলাইনে, অফলাইনে অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করছে তুমি মাসুদ স্যার এর ইস্যুতে কোন প্রতিবাদ কেনো করছো না, লিখছো না। নিজেরে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে বেশিরভাগ স্থূল মানুষের মতো আমারো ভালো লাগে। কিন্তু এর মধ্যে একজনও আমার সমসাময়িক সময়ের না। কেনো জানেন? কারন তাঁরা কিছুটা হলেও জানে কেনো আমি চুপ? আজকে ও আমি সব লিখতে পারবো না। লিখার মতো সাহস নেই, আমার বাবা-মা আমার জন্যে অনেক সয়েছেন, সইছেন আর প্যারা দিতে চাই না। কারন তাঁরা সবাই একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।

মাসুদ মাহমুদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। স্যার এর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো আমি পড়েছি, এর প্রত্যেকটা অভিযোগ সত্য হলেও যা হয়েছে স্যার এর সাথে তা হতে পারে না। তবে স্যার এর সকল শিক্ষার্থী স্যার এর সারকাস্টিক কথাবার্তার সাথে পরিচিত যেগুলো কখনো কখনো ব্যক্তি আক্রমণ মনে হয়। যেমন একবার আমাদের ক্লাসে একটি ছেল কলম আনেনি, সে লেকচার নোট নিচ্ছিলো না, স্যার জিগ্যেস করায় কলম নেই বলার পর স্যার বলেছিলো, ও মাই পুয়র বয় হোয়াট ইউ উইল ডু ইন ইউর লাইফ উইথ আউট অ্যা প্যান। আর একবার এক মেয়ে দেরী করে আসায় স্যার থাকে বলেছিলো সারারাত কি নিয়ে ব্যস্ত ছিলে? এগুলো সাহিত্যের ভাষায় বলে innuendo।

স্যার ক্লাসে এমন কোনো শিক্ষক নেই যাকে নিয়ে স্ট্যায়ার করতেন না। তফন স্যার, বিল্লাহ স্যারকে বলতেন ভেজিটেবল। উনাকে জুনিয়র শিক্ষকরাও বেশ ভয় পেতেন উনার মুখের ভাষার জন্যেই। উনি উনার বৌকে নিয়ে একবার ইলিয়াড পড়ানোর সময় ক্লাসে বলেছিলেন, শি বিকামস নাও কিউ কামবার। চিটাগং শহরে ছেলেমেয়েরা প্রেম করতে কবরস্থানে যায় বলে উনি দুঃখ করে বলতেন উনি একটি উদ্যান খুলবেন যেখানে প্রেমিক যুগলরা যাবে কিন্তু যুবতী মেয়ের স্বামীর প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে সেখানে। এসবই তিনি মজা করেই বলতেন।

আমার এমন অনেক সহপাঠী ছিলো যাঁরা নিটশের "গড ইস ডেড" থিওরী পড়ার আগে তওবা পড়তো, তাঁদের বা আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলিম মানসে বড়ো হওয়া মফস্বলের ছেলে মেয়েদের এসব স্যাটায়র হজম হবে না, তাই স্বাভাবিক। ৯০% ছেলে মেয়ে রামজী আর সেন পড়েই পরীক্ষায় পাশ করতো, মূল বই আর তাঁর সুপ্রাচীণ ভাষা পড়ার জন্যে আমরা হয়তো এখনও তৈরি না, আমি নিজেই আজো "প্যারাডাইস লস্ট" পড়িনি।

আমার অগ্রজ রাসেল ভাই বলেছেন বিজনেস ইংলিশ, ইএলটি, ইংলিশ ফর কমিউনিকেশন এর মতো সাবজেক্ট খুলতে। আমি উনার সাথে একমত, চাকরী বাজার এবং ছেলেমেয়ের উদ্দেশ্য এতে সফল হবে। কস্ট করে তাঁদের স্যঁর্ত, নীটশে বা ইডিপাস রেক্স পড়তে হবে না। একদিন থিওরি ক্লাসে স্যার বলেছিলেন ফেমিনিজিম পড়তে আসা মেয়েদের বোরকায় দেখলে উনার হতাশ লাগে, আমারো লাগে কিন্তু এটা বোধহয় ক্লাসে বলা যায় না।

এবার আসি আমার সাথে স্যার এর ইস্যুতে। স্যার ভয়ংকর নিঃসঙ্গ মানুষ, বিবাহিত জীবনে চরম অসুখী, অ্যারেন্জড ম্যারেজ। চিটাগাং এর খুবি প্রভাবশালী পরিবার এর মেয়ে উনার সঙ্গী, উনি নিজেও চারুকলার শিক্ষক, মার্জিত এবং সুন্দরী। স্যার এর প্রতি আমার প্রচন্ড ভালো লাগা ছিলো শুরু থেকেই কারন উনি অসাধারণ পড়াতেন, উনি ক্লাসে ম্যাজিক তৈরি করতে পারতেন, তাঁর চরম শত্রুও এটা স্বাীকার করবেন। উনি পিএইচডি করেছেন এমিলি ডিকেনসন এর কবিতা নিয়ে।

আজ থেকে ১২/১৩ বছর আগে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় আমি একটা অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করেছিলাম, সেই অনুষ্ঠানের পর আমি স্যারদের সাথে নেচেও ছিলাম। স্যার আমার টিউটোরিয়াল স্যার ছিলেন। স্যার এর প্রতি আমার মুগ্ধতা ছিলো অসীম, স্যার এর মনোযোগ, স্যার এর সঙ্গ আমি দারুণ উপভোগ করতাম। নিজেকে কিছু একটা মনে হতো, স্যারের বাসায় আমার আসা যাওয়া ছিলো। স্যার এর সাথে আমার কিছু একাডেমিক কাজও করা হয়েছিলো, যাঁর বিনিময়ে স্যার আমাকে টাকাও দিয়েছিলেন। আমি এইচএসসি-এর পর থেকে টিউশনি করতাম, বাসায় থাকতাম, খেতাম, কিন্তু নিজের টাকায় চলতাম। স্যার যে পরিমান সময় নিতেন আমার থেকে তাতে আমার দু'দুটো টিউশনি ছাড়তে হয়।

স্যার এর বাসায় আমি একা না, আমার কাছের সহপাঠীরাও যেতো, স্যার আমাদের দান্তে, কাহলিল জীবরান পড়ে শোনাতেন। সেই মুহূর্তগুলো আজো আমার জীবনের অসাধারণ মুহুর্ত, স্যার এর সাথেই আমার প্রথম পিজন-এ যাওয়া, চিটাগং এর বিখ্যাত সিনেমার ডিভিডির দোকান, স্যারি আমাকে প্রথম আল-পাচিনো কে চেনান, অড্রে হেপবার্ন কে চেনান, বাইসাইকেল থিপ চেনান।

এতদূর অব্দি সব ঠিকঠাক, সমস্যাটা শুরু হলো যখনি উনি আমাকে ললিতা পড়তে দিলেন এবং বইটির শিল্প ও ভাষা অসাধারন, এরপর এমলি ডিকেনসন সারাজীবন বিয়ে না করা এবং বাবার চেয়ে বেশি বয়সি লোকের প্রেমে পড়াকে গ্লোরিফাই করা হলো। আমি বিস্তারিত কিছু লিখবো না, সেটা ও হয়তো উনার প্রতি আমার অভিযোগ ছাপিয়ে ভালোবাসাটা আজো বেশি বলে। পুরো একটা বছর টম এন্ড জেরি টাইফ খেলার পর, আমি উনার খালি বাসায় বারংবার যেতে অস্বীকৃতি জানানোয় আমার টিউটোরিয়াল মার্কস ছিলো ১০ সে বছর, বাকী প্রত্যেকটা ইয়ারে যা ছিলো ২০ এর উপরে। মার্কস নিয়ে আমার এখন আজ ১২/১৩ বছর বিন্দুমাএ ক্ষোভ নেই, ৫ বছরের মাস্টার্স শেষ করতে ৯ বছর শেষ করা আমার বিভাগের ঐ সার্টিফিকেট গুলো বেঁচে আমার ভাত জুটে না। কিন্ত ঐ বয়সে আমার অপরিপক্কতা হয়তো স্যারের অনেক আচরণকে উৎসাহিত করেছিলো, কিন্তু আমি স্পষ্ট বলেছিলাম আমার মুগ্ধতা উনার ব্যক্তিত্ব আর নলেজের প্রতি, উনার সঙ্গের প্রতি কখনোই সেটা শারীরিক ছিলো না। উনি এবং উনার স্ত্রী কেউ সেটা বুঝেনি, উনার কণ্যার চেয়ে মাত্র দুবছরের বড় ছিলাম, পুত্রের চেয়ে ও ছোট, উনার বৌ আমাকে ফোন করে পিকনিকে যেতে মানা করতো, কেপ্ট, রক্ষিতা বলে গালাগাল করতো। আর স্যার আমার পরের অ্যাকাডেমিক ইয়ারগুলো নরক বানিয়ে দিয়েছিলেন। স্যার এর কুনজরে না পড়ার জন্যে বা ভয়ে আমি জানি না আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুরা শুধুমাত্র একজন ছাড়া আমার থেকে দূরে চলে গিয়েছিলো। আমাকে স্যার আকারে ইংগিতে জামাতের চর ডাকতেন।

আমার বাবা মা ও ঐ ক্যাম্পাসেই চাকরী করেন, উনার মতো সিনিয়র প্রফেসর বৌ এর সাথে ঝগড়া করে আমার বাসায় এসে বসে থাকতেন সকাল থেকে সন্ধ্যা অব্দি। বাবা-মা সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে আপ্যায়ন করলেও আমাকে ঠিকই মুখোমুখি হতে হয়েছে অস্বস্তিকর প্রশ্নের। ঐ মানসিক ট্রমা আমি এখনো বয়ে বেড়াই। স্যার একটা মাত্র আর্লি টুয়েন্টির মেয়ের উপর প্রতিশোধ নিতে ছাড়েনি।

আমাদের দেশের পুরুষদের ইগোকে কোন পাণ্ডিত্য উতরে যেতে পারে না। যা যা হয়েছিলো তাঁর বিশদ ব্যাখার দরকার পড়ে না, নেই ও, এটা তার ১০ ভাগও না। আমি আজো বিশ্বাস করি স্যার আমাকে ভালোই বাসতো কিন্তু, আমি এমিলি ডিকেনসন এর মতো না, তাই বলে এক নিমিষে স্যার হেথক্লিপ হয়ে যাবে এবং টানা ৩/৪ বছর উনার ক্লাসে সমানে আমাকে ইংগিত করে ইনউনডু ব্যবহার করে গেছেন। আর উনার বৌ একজন পরিনত মানুষ হয়ে ফোন করে আমাকে গালাগালতো করতোই, সেই সাথে স্যার এর আগে কত স্টুডেন্টসকে কী কী ভাবে ব্যবহার করে টিস্যু এর মতো ফেলে দিয়েছেন তাঁর ব্যাখা দিতেন। আমি চেষ্টা করেছি নিরপেক্ষ ভাবে বলার এবং আমার ঐ ট্রমাকে পাশে রেখেই আমি উনার উপর শারীরিক আক্রমণের প্রতিবাদে সামিল হলাম।

আমি মিটু-এর সময়ও লিখেছিলাম, আজ আবারো। সুতরাং সময় নিয়ে জ্ঞান দিবেন না প্লিজ। আপনারা আমাদের কথা কখনোই শুনেননি, তাই বলে সত্য মিথ্যা হয় না। আর আমার মতো মেয়েকে এটেনশন সিকার, সুযোগ সন্ধানী আখ্যা দেওয়া সোজা কারন আমি তথাকথিত বোরকা পরা ভালো মেয়ে না। আমি এতে বোরকাকে ছোট করি নাই, কিন্তু বোরকা থাকলে একটা বাড়তি সিম্প্যাথি পাওয়া যায়। আমি অভিযোগকারী মেয়েদের ভিডিও দেখেছি, সেই অভিযোগগুলো কিন্তু অশ্লীল ব্যক্তি আক্রমণ এর পর্যায়েই পড়ে। আমরা ছাত্রজীবনে একাডেমিক জীবনের কথা ভেবে সহজে পিঠ দেয়ালে না ঠেকলে কিছু বলি না। আবারর প্রমাণ হলো আমার মার্কসশীট, একজন ছাত্রী সব বর্ষে ২৫ এ নম্বর পেলো ২১, ২০, ১৯, শুধু স্যার এর কাছে ১০ এটাতো হতে পারে না। আর যদিও মিউচুয়ালি বিছনার প্রস্তাব মেনে নিতাম তবে আমার মার্কস এতো কম হতো না। এর চেয়ে বেশি কোনো প্রমাণ নেই আমার কাছে।

স্যার অসম্ভব ভালো পড়ান, উনার ব্যক্তিত্ব অসাধারণ, তাই বলে উনার যৌন ইচ্ছে প্রকাশ আর সেটায় সফল না হয়ে আমাকে একাডেমিক ভাবে ক্ষতি গ্রস্ত করা বা আমাকে মানসিক অত্যাচার করা কোনোটাই মিথ্যে হয়ে যায় না।


  • ২২৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শায়লা হক তানজু

প্রবাসী লেখক, এক্টিভিস্ট।

ফেসবুকে আমরা