নারীর উপর মাতৃত্বের বোঝা আর কতো?

শুক্রবার, নভেম্বর ৮, ২০১৯ ৩:৪৪ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র একজন আপু কথা প্রসঙ্গে একদিন বললেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্য নারীরাই 'পারফেক্ট'। শিশুদের মন নারীরাই ভালো বুঝতে পারে, মাতৃত্বের সহজাত গুণের কারণে নারীরাই সবথেকে বেশি যত্নশীল।  অন্য একদিনের আড্ডায় তিনিই আবার বললেন, নারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে ভালো নয়। আমি কারণ জিজ্ঞেস করায় উত্তরে তিনি যা বললেন সেটি ভাবনার উদ্রেক ঘটায়। নারী শিক্ষকদের  ক্লাসে বসে হয়তো করতে হয় বাসায় রেখে আসা শিশুটির জন্য দুশ্চিন্তা অথবা ক্লাস শেষেই দৌড়াতে হয় বাচ্চাকে স্কুল থেকে নিতে। এর পাশাপাশি বাড়ির সবার জন্য  রান্নাবান্না, বৃদ্ধ শশুর-শাশুড়ীর দেখভাল করতে হবে..., টুকটাক আরো অনেক কিছু। যার ফলে গবেষণাসহ ঘাটতি থেকে যায় ক্লাসের প্রস্তুতিতে।

আমি ভাবতে বসলাম। এতোদিন ধরে নারীদেরকে যে পেশাগুলোর জন্য উপযুক্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে সেই পেশাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো শিক্ষকতা। এই পেশার মাহাত্ম্যকে এভাবে জটিল করে তুললেন আপু। বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষকদের ভালো শিক্ষক না হয়ে উঠতে পারার পেছনে যে কারণগুলো চিহ্নিত করলেন সেই একই কারণগুলো কি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়? তারমানে মাতৃত্বের দোহাই দিয়ে শিশুদের আমরা যাদের হাতে তুলে দিচ্ছি তাদের অর্ধেকেরও বেশি সারাদিন পাঠদানের পাশাপাশি এটা চিন্তা করতে থাকেন বাসায় আমার শিশুটি ঠিকমতো খেলো কিনা, বৃদ্ধ শশুড়-শাশুড়ি ঔষধ খেলো কিনা ইত্যাদি। আবার ৬ থেকে ৮ ঘন্টা পাঠদান শেষে বাড়ি ফিরেই বাড়ির রান্নাবান্না, সন্তানের পড়াশোনা, কাপড়-চোপড় ধোয়া সব কাজ শেষ করে ঘুমানোর ফুরসত পান হয়তো রাত ১২ বা ১টায়। ভোরে উঠে আবার যাবতীয় কাজকর্ম সেরে পড়াতে যেতে হয়। এতো কাজের চাপ যার মাথায়, আমরা কিভাবে আশা করি যে তিনি ছোট শিশুদের ভালো পড়াবেন?  আমার তো সব সময়ই মনে হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান আনন্দপূর্ণ করে তুলতে শিক্ষকদের হতে হবে সবথেকে বেশি সৃজনশীল, প্রাণবন্ত, উদ্যোমী। কয়েকদিন আগেই একটি খবরে পড়লাম ইউরোপের কোনো একটি দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে তাদের আঁকা ছবি দিয়ে নিজের পোশাক তৈরি করেছেন। অথচ বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর কথা ভাবুন তো একবার দু'একটি ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে।

এর মানে আসলে কী দাঁড়াচ্ছে?  যতোদিন পর্যন্ত পুনরুৎপাদনমূলক কাজগুলো অর্থাৎ গৃহস্থলির কাজকর্ম- সন্তান লালন-পালন, রান্না, কাপড় কাঁচা ইত্যাদিকে শুধু নারীর কাজ হিসেবে রাখা হবে, ঘরের কাজগুলোর সুষম বণ্টন করা যাবে না, ততোদিন পর্যন্ত মাতৃত্বের দোহাই দিন আর সেবিকা হিসেবে উপস্থাপন যাই করুন না কেনো নারীদের কাছে বাইরের কাজ অর্থাৎ আয়মূলক কাজ বোঝা হিসেবেই পরিগনিত হবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, গৃহস্থালির কাজ যেগুলোর অর্থনৈতিকভাবে কোনো স্বীকৃতি নেই তার ৭৬.২% নারীরা করেন। আর অর্থনৈতিকভাবে স্বীকৃতি নেই বলেই কেউ যখন আমাদের জিজ্ঞেস করেন আপনার মা কী করেন? খুব সহজেই আমরা উত্তর দিই তিনি কিছুই করেন না। আর তিনি যখন আয়মূলক কোনো কাজের সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছেন তখন গৃহস্থলির কাজগুলো একেবারেই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। কোনো নারী হয়তো একই সাথে শিক্ষকতা এবং গৃহস্থালির কাজ করছেন, কিন্তু পেশা কী জিজ্ঞেস করলে তিনি কেবল শিক্ষকতার কথা বলবেন।

তারমানে নারী চাইলে বাইরের কাজও করতে পারেন এই অপশন তাকে আমরা দিচ্ছি। কিন্তু তিনি চাইলেই গৃহস্থালির কাজ নাও করতে পারেন এই অপশনটা তাকে আমরা দিচ্ছি না। যার ফলে এখনও অনেক নারীই গৃহিণী হয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অথবা অনেকেই ঘরের বাইরের কাজে যোগদান করেও অনেক সময় সন্তান লালন-পালন বা গৃহস্থালির কাজের চাপে আয়মূলক কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কখনো নারীকে আয়মূলক কাজ থেকে ছাটাইও করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন নারী শ্রমিক যখন গর্ভবতী হন তখন অনেক শিল্পকারখানা থেকেই তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়। অথবা কোনো নারীর সন্তান অসুস্থ হলে দেখা যায় ছুটি নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে তিনিই তার সেবাযত্ন করছেন। অথচ পুরুষ সদস্য দিব্যি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই যে মাতৃত্বের দোহাই দিয়ে একদিকে নারীকে গৃহকাজে বাধ্য করা হচ্ছে, অপরদিকে একই মাতৃত্বের দোহাই দিয়ে তাকে শিক্ষকতা কিংবা সেবিকার কাজ গ্রহন করার পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে। আপনারা জেনে থাকবেন প্রাথমিক শিক্ষা-কার্যক্রম এ অর্ধেকেরও বেশি নারী শিক্ষকদের সুযোগ দেয়া হয়। অর্থাৎ একজন নারীকে সামাজিকীকরণের মধ্য দিয়ে এটাই সেখানো হচ্ছে তোমার জন্য শিক্ষকতাই পারফেক্ট অথচ সুযোগ পেলে সে হয়তো পাইলট হতে পারতো।

কিন্তু সত্যিই কি শিশু লালন-পালন এবং সেবাযত্নে পুরুষরা একদম আনাড়ি? যার কারণে বলাই হয় যে, পুরুষদের থেকে নারীরা ভালো শিক্ষক। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার যে চারজন পছন্দের শিক্ষক ছিলেন তাদের তিনজনই পুরুষ আমজাদ স্যার, মুজাহিদ স্যার  এবং তুহিন স্যার। এ তিনজনের কারো মধ্যেই সেবাযত্নের ঘাটতি তো ছিলোই না বরং আমার এবং আমি জানি আমার অনেক সহপাঠীদের পছন্দের হয়ে উঠেছিলেন তারা আরও বিশেষ কিছু কারণে। আমজাদ স্যার খুব সহজেই মিশে যেতে পারতেন শিশুদের সাথে, তিনি ক্লাসে ঢুকলেই সেটি হয়ে যেতো বিনোদনকেন্দ্র, তার পাঠদান এতটাই আকর্ষণীয় ছিল যে শাস্তিগুলোও আমাদের আনন্দ দিত। মুজাহিদ স্যার অঙ্ক করাতেন খুব সহজ নিয়মে কিলোমিটার-সেন্টিমিটার আমরা ছড়ার মাধ্যমে শিখেছি, লব-হর এখনো আমার মনে আছে কারণ তিনি বলেছিলেন- " লবাবের ব্যাটা সব সময় উপরেই থাকে" এরকম আরো কতো কী! তুহিন স্যার ছিলেন তরুণ, উদ্যোমী এবং প্রাণবন্ত। আমি বিশ্বাস করি শিশুশিক্ষা কার্যক্রমে "নারীসুলভ" আচরণ ব্যতিরেকে আরও কিছু বিশেষ গুনাবলি এবং প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, যার সন্নিবেশ ঘটিয়ে নারী পুরুষ যে কেউ ভালো শিক্ষক হয়ে উঠতে পারেন।

নারীর পাশাপাশি  পুরুষদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।  এই সমাজে একটি পুরুষকে ভাবার অবকাশই দেয়া হচ্ছে না সে চাইলেই গৃহিণী (দুঃখিত গৃহিনীর কোনো পুরুষবাচক শব্দ আমার জানা নেই) হতে পারে। বরং নারীসুলভ আচরণ পুরুষদের জন্য সম্মানহানিকর হয়ে ওঠে। একজন পুরুষ চাইলেও কেঁদে উঠতে পারেন না জনসম্মুখে। তাকে অপমান করতে চাইলেও বলা হয়- "চুড়ি পরে ঘরে বসে থাকো"।

অন্যদিকে নারীদের উপর মাতৃত্বের গুণ আরোপ করে তাদের কাজের বোঝা আরও বাড়িয়ে তুলি আমরা। অথচ মা এবং মাতৃত্ব শব্দদুটোর মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা নারীর থাকলেও সন্তান লালন-পালন কিংবা মাতৃছায়া প্রদানে পুরুষের কোনো বাঁধা নেই। শুধু সন্তান গর্ভে ধারণ করতে পারেননি এই সৌভাগ্যে পুরুষদের আমরা দায়মুক্তি দিচ্ছি। বাইরের কাজ করলেই তার মাফ। অথচ নারী সন্তান গর্ভে ধারণের দুর্ভাগ্যে আয়মূলক কাজ করলেও সন্তানের বোঝা একা তার ঘাড়ে। যদিও সন্তান জন্মের দায় দুজনেরই। চাইলেই যাবতীয় কাজ নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেয়া যায়। কিন্তু তা না করে কাজ ফাঁকি দিতেই হোক আর এড়িয়ে যেতেই হোক সেগুলোকে নারীদের কাজ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে যখনই নারীরা ঘর ছেড়ে বাহির হতে চাইলো অর্থ উপার্জনের আশায় (যেহেতু ঘরের কাজ কাজ হিসেবে স্বীকৃতই নয়) তখনি নারীসুলভ কাজগুলো ঘাড়ে চেপে বসল। তারা না হতে পারছে ঘারকা না ঘাটকা।

পৃথিবীকে মা, মাতৃভূমি, ধরণীর মতো বিশেষণগুলো আরোপ করে যেমন তার সন্তানেরা তার যাবতীয় সম্পদ শুষে নিচ্ছে। প্রতিনিয়ত খুঁড়ে-খাবলে ধর্ষন করছে তাকে। তেমনি নারীর উপর মাতৃত্ব আরোপ করে তার শ্রম শোষন করে চলেছে অবিরাম।

পরিশেষে, জেন্ডারভিত্তিক শ্রমবিভাজন না করে  প্রতিটি কাজকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিবারের সকল সদস্যদের মধ্যে বয়স এবং শারিরীক শক্তি অনুযায়ী বন্টন করতে পারলে হয়তো এ থেকে উত্তরণ ঘটতে পারত। কিন্তু দীর্ঘদিনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্টেরিওটাইপ থেকে বের হয়ে আসা এতটাও সহজ নয়। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়- নারীর উপর মাতৃত্বের বোঝা আর কতো?


  • ৩০২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তানিয়াহ্ মাহমুদা তিন্নি

জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লি থেকে স্নাতকোত্তর শেষে একটি এনজিওতে কর্মরত আছেন।

ফেসবুকে আমরা