ইজ্জত নারীর যোনীতে? নাকি আমাদের মস্তিষ্কে?

মঙ্গলবার, নভেম্বর ৫, ২০১৯ ৩:৩১ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


একটি জরায়ু নিয়ে জন্মের সাথে সাথেই নারীর শরীরের সাথে লেপ্টে দেয়া হয় "সম্ভ্রম", "সম্মান", "ইজ্জত" এ জাতীয় শব্দাবলী। তার কানের কাছে বারবার উচ্চারিত হয়- "তোমার ইজ্জতই সব, সেটা গিয়েছে তো মরেছ"। একটি জাতিকে শেখানো হয়- তোমাদের পুরো জাতির ইজ্জত এ জাতির নারীগণের যোনিতেই সংরক্ষিত।

তাই পুরুষরা সেই নারীদেরকে গৃহবন্দী রেখে সেই ইজ্জত সংরক্ষণের চেষ্টা চালায়। কেবল পুরুষরাই নয় সামাজীকিকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সকল নারীকেই একটা বয়সের পর কাপড়চোপড় দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়, এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাখা হয় গৃহবন্দী। নারী ঘরের বাইরে পা ফেললে, নিজের ইচ্ছেমত পোশাক পছন্দ করলে কিংবা মাঠে-ঘাটে কাজ করলে পরিবারের ইজ্জত চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাকে হর-হামেশা শুনতে হয়, এ বাড়ির মেয়েরা এভাবে চলাফেরা করে না, এ বাড়ির মেয়েরা এ ধরনের কাপড় পরে না কিংবা এ বংশের মেয়েরা কোনোদিন বাইরে গিয়ে কাজ করেনি করবেও না।

অন্যদিকে, একটা জাতির ইজ্জত হননের প্রধান তরিকা হয়ে ওঠে সে জাতির নারীদের "ইজ্জতহরণ"। ভারতে বিজেপি নেতৃত্বরা সময় সুযোগ পেলেই অথবা না পেলেও ঘোষণা দিয়ে মুসলমান নারীদের ইজ্জতহরণ করতে বলেন সাগরেদদের, উচ্চবর্ণীয় হিন্দুগণ কথায় কথায় দলিতদের ইজ্জতহরণ করতে পারেন জনসম্মুখে বা অন্তরালে, পশ্চিম পাকিস্তানিরা ২ লক্ষ বাংলাদেশি নারীদের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ইজ্জতহরণ করতে পারে বাংলাদেশিদের চরম শিক্ষা দিতে। যে কোনো যুদ্ধে প্রধান টার্গেট হয়ে পড়ে নারী। একদিকে নারীদের ধর্ষনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ইজ্জত ধুলোয় লুটিয়ে দেয়া যায়, অপরদিকে প্রতিপক্ষের নারীর গর্ভে নিজেদের বীর্য রোপণ করা যায়। যেহেতু এখনো পর্যন্ত আমাদের সমাজগুলোতে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এটাই যে- 'এই সন্তানের বাবা কে?'

শুধু জাতিগত বিদ্বেষেই নয়, ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক বিদ্বেষেও প্রতিশোধ নেয়া হয় নারীর ইজ্জতহরণের মাধ্যমে। কোনো মেয়ে প্রেমের প্রস্তাবে রাজি হচ্ছে না! ওর তো জেদ অনেক বেশি! তুলে নিয়ে যাও, ধর্ষণ করো। দেখবে ফনা তোলা নাগিন বশ মেনে গেছে। বাবা বা ভাইয়ের সাথে কোন্দল? বাড়ির মেয়েটাকে ধর্ষন করে বংশের মুখে কালিমা লেপে দাও। ঐ যে আগেই বলেছি বংশমর্যাদা বংশের নারীদের যোনীতে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধর্ষনগুলোও যদি লক্ষ্য করি সেখানেও আমরা দেখতে পাবো পূর্নিমা থেকে পারুল, টার্গেট কিন্তু নারীর ইজ্জত। আমার দলকে ভোট দেয়নি? ওকে শিক্ষা দিয়ে দাও ইজ্জতহরণ করে। যেহেতু একজন মানুষকে পুরো সমাজের সামনে ছোটো করার সবথেকে বড় অস্ত্র এই ইজ্জত বা নারীশরীর।

অথচ, তথাকথিত ইজ্জত নারীর শরীরে থাকে না, যোনিতে থাকে না ইজ্জতের কোনো লেশমাত্র।

তাই সকলে জরায়ু বা যোনীর সাথে লেপ্টে থাকা ইজ্জতেরই প্রতিবাদ করুন আগে। সকল মানুষই বলতে শিখুন এবং শেখান সবাইকে- কেউ নারীকে ধর্ষণ করলে তার শারীরিক এবং মানসিক ক্ষতি হয় ঠিকই কিন্তু এর সাথে ইজ্জত বা সম্মানের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং যে জোর করছে, সম্মান বা ইজ্জতটা তারই যায়।


  • ১২৮১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তানিয়াহ্ মাহমুদা তিন্নি

জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লি থেকে স্নাতকোত্তর শেষে একটি এনজিওতে কর্মরত আছেন।

ফেসবুকে আমরা