বায়োস্কোপঃ পদ্মাবত

সোমবার, ফেব্রুয়ারী ২৬, ২০১৮ ৫:১৬ PM | বিভাগ : পাঁচমিশালী


বানশালি’র ফিকশন সিনেমা “পদ্মাবত” নিয়ে অনেক আলোচনা চলছে নানা আঙ্গিকে নানা স্তরে। নানা মানুষ নানা মত দিচ্ছেন। নারীবাদী’রা প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, সাধারণ মানুষ যারা সিনেমা আর বাস্তবতার তফাৎ বোঝে না তারা পদ্মাবতীর উদাহরণ দিয়ে দিয়ে মেয়েদের জীবন আরও দুর্বিসহ করে তুলবে। তাদের কথায় যুক্তি আছে বইকি, এমনিতেই যেকোনো দুর্ঘটনার জন্যে উপমহাদেশে মেয়েদের চাল, চলন, পোশাকআশাককে দায়ী করা হয়, পরিবার থেকেই বলা হয়, মুখপুড়ি, তুই মরিস না কেনো? আর এখন তো হাতের কাছে রয়ে গেলো জ্বলন্ত প্রমাণ। “পদ্মাবতী” মরলো তুই মরিস না কেনো? এই বাক্যবান কত মেয়েকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় কে জানে। দু’হাজার আঠারো সালে সিনেমার এই এন্ডিং মেনে নেয়া যায় না। বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষজন ও বানশালি’র অবিচারে ব্যাপক ভাবে আহত হয়েছে। পুরো পৃথিবী দু’ হাজার আঠারোতে থাকলেও বাংলাদেশ এখনও পাঁচশো সত্তর খ্রীষ্টাব্দেই আটকে আছে, আরব বেদুইনদের মরুভূমিতে। এলাস। খিলজীকে মন্দ বলা বানশালি’র মোটেই উচিত হয় নি। রতন সিং এর কীর্তি কিছুই চোখে দেখে নাই শালা, সাম্প্রদায়িক কোথাকার। রতন সিং এর মতো অত্যাচারী রাজা আর হয়? তিনি কয়দিন রানীদের সাথে থাকতেন? তার রাজবাড়ি ভর্তি ছিলো রক্ষিতা দিয়ে। এসেছে খিলজী নিয়ে মুভি বানাতে। 

আচ্ছা, খিলজী আর রতন সিং এর তুলনা কোথা থেকে আসে! রতন সিং ভারতের সন্তান আর খিলজি তুর্কি থেকে আসা বহিরাগত যার উদ্দেশ্যই ছিলো ভারতবর্ষ লুটেপুটে খাওয়া। গতানুগতিক বক্তব্য, “মুঘল সম্রাট’রা ভারতবর্ষকে হিন্দু রাজাদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করেছিলেন, সেই সময়ে ভারতে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়।“  আচ্ছা!– সেই প্রভূত উন্নতি গুলো কি কি? বাসস্থান, জীবিকা, স্বাস্থ্য, খাদ্য কোন দিক থেকে সাধারণ জনগন উন্নতির মুখ দেখেছিলো? হ্যাঁ, বড় বড় ইমারত বা স্থাপনা তৈরি হয়েছিলো কিন্তু সে তো তাদের নিজেদের প্রয়োজন ছিলো। ভারত তো মুঘলদের দেশও ছিলো না, তারা এটাকে শক্তি বলে হস্তগত করে নিজেদের বিলাসের প্রয়োজনে, কি যুক্তিতেই বা তারা ভারতবর্ষের উন্নতি নিয়ে মাথা ঘামাবেন? বরং মুঘলদের পুরো সময়টা কেটেছে নিজেদের মধ্যে বিশ্বাস – অবিশ্বাস, মসনদের ষড়যন্ত্র, দ্বন্দ্ব আর কাটাকাটি মারামারি’র মধ্যে দিয়ে, কে কার চেয়ে বেশি ভোগ করবে এই ছিলো তাদের লড়াই। মানছি আমি, হিন্দু রাজা’রা খুব খারাপ ছিলেন, তাতে কিন্তু বাইরে থেকে এসে কারো ভারতবর্ষ অধিকার করে নেয়া জায়েজ হয়ে যায়?    

যে যুক্তিতে আলাউদ্দিন খিলজী কিংবা মুঘলদের ভারতবর্ষ দখল জায়েজ হয় সেই একই যুক্তিতে এমেরিকার ইরাক কিংবা আফগানিস্তান দখলও জায়েজ হয়। তখন আবার “এমেরিকা নিপাত যাক” শ্লোগানে রাজপথ মুখরিত। মুঘলদের থেকে শাসন ব্যবস্থা বা শাসকদের দিক থেকে ইংরেজরা অনেক উন্নত ছিলো। তাহলে কোন যুক্তিতে বৃটিশ তাড়ানো হলো? স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়! উপমহাদেশে কোনো ন্যায়, যুক্তি, বিচারের ব্যাপার নেই, একটি শব্দ “ধর্ম” দ্বারা সব বুদ্ধিবৃত্তি পরিচালিত হয়। আবার ট্রাম্প আর সৌদি যখন এক সাথে নাচ গান করে তখন কবি নীরব। এদের সব কিছুতে আলাদা বিচার। একটি রাষ্ট্র গঠনের জন্যে চারটি মৌলিক উপাদান লাগে, জাতীয়তা, ভাষা, নির্দিষ্ট ভূখন্ড এবং ধর্ম। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ধর্ম এমন কিছু আবশ্যিক উপাদানও নয়, সেটা পৃথিবীর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। না, এমেরিকা-ইউরোপ দেখার দরকার নেই, ভারতই তার উজ্জল দৃষ্টান্ত। ধর্ম যদি মূল ভূমিকা রাখতো তাহলে ভারতের আজ খান খান হয়ে যাওয়ার কথা ছিলো। 

মুঘল সম্রাট’রা খুবই শিক্ষানুরাগী ছিলেন, নিজেরা ছবি আঁকতে ভালবাসতেন, কবিতা লিখতেন, সঙ্গীতের চর্চা করতেন এবং করাতেন। এমনকি কেউ কেউ গোপনে শাহজাদীদের পড়াশোনার ব্যবস্থাও করিয়েছিলেন। বহু মাদ্রাসা, মক্তব প্রতিষ্ঠিত করেছেন, স্কুল – কলেজ এর সংস্কার করিয়ে বিভিন্ন বৃত্তির ব্যবস্থাও করেছিলেন কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় নি। যেমন হয়নি হাসাপাতাল প্রতিষ্ঠা। তবে প্রচুর রাস্তা ঘাট বানিয়েছিলেন, মসজিদ বানিয়েছিলেন তারা। সেই ঐতিহ্য বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা আজও ধরে রেখেছে। নির্বাচনী এলাকায় রাস্তা আর মসজিদ বানাতে কখনও ভুল হয় না তাদের। কিন্তু কিছু টাউট বাটপার ছাড়া আর কারও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না, সাধারণ জনগন যেই তিমিরে ছিলেন সেই তিমিরেই থেকে যান ঠিক মুঘল শাসন ব্যবস্থা’র মতো। 

(বেশির ভাগ বাংলাদেশীদের মতে) হিন্দু নাপাক অত্যাচারী রাজাদের হাত থেকে মহান মুসলিম বীর আলাউদ্দিন খিলজী ভারতকে উদ্ধার কিংবা রক্ষা করেছিলেন, আসুন আমরা এই বীরের জীবনীটি দেখি এক নজরেঃ

আলাউদ্দিন খিলজী নিজের আপন চাচা যিনি তার শ্বশুরও বটে তাকে খুন করে দিল্লীর গদি দখল করেন। তিনি নিজে বেশুমার মদ খেলেও মদ্যপান নিষিদ্ধ করেন সে সময়। জুয়াখেলা, পতিতা গমন সব নিষেধ করেন, পতিতাদের বলেন বিয়ে করতে নইলে তাদের পাথর ছুড়ে হত্যা করা হবে মর্মে ঘোষনা দেন। তার দু’জন স্ত্রী ছিলো। ঐতিহাসিকদের মতে তিনি পেডোফাইল এবং বাইসেক্সুয়ালও ছিলেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে তার হেরেমে সত্তর হাজার মানুষ ছিলো, যার মধ্যে ত্রিশ হাজার স্ত্রী লোক ও বাকি পুরুষ আর বাচ্চা। তিনি এক সময় নিজেকে প্রফেট হিসেবে ঘোষনা দেন এবং মোল্লাদের বাধ্য করেন ইসলাম ধর্মকে ম্যানিপুলেট করে তাকে স্বীকৃতি দান করার জন্যে। ইসলামী সংস্কৃতি মেনে, তার খাস আদমি মালিক কাফুর সিংহাসনের আশায় তার শিরায় বিষাক্ত ইনজেকশান দেন এবং বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু ঘটে এবং মালিক কাফুর খিলজী’র দুই পুত্রকে অন্ধ করে। তাকে মেহরুলি’র কুতুব কমপ্লেক্স এ কবর দেয়া হয় খুব চুপচাপ ভাবে। 

খিলজি শুধু চিতোরই লুটপাট করেন নি, রানথাম্ভোরে দুর্গ, মালোয়া থেকে মান্ডু হয়ে চান্দেরী আর ধার পর্যন্ত দখল করেছিলেন। বেশীর ভাগ যুদ্ধেই প্রথম বারে হেরেছিলেন। তেরশ আট সালে ওয়ারানগাল যুদ্ধে জয় লাভ করেন এবং কোহিনূর হীরা লুট করেন। বালগানা রাজ্যে জয় করে, রাজা রায় করনের কন্যা দেভালা দেবীকে বন্দী করে দিল্লী নিয়ে এসে তার বড় পুত্র খিজির খানের সাথে তার বিয়ে দেন। মংগলদের আক্রমণ থেকে চারবার এই তুর্কি বংশোদ্ভুত রাজা ভারতবর্ষকে রক্ষা করেন। বর্গা চাষীদের পঞ্চাশ ভাগ কর তিনি জমি’র মালিকদের ওপর অর্পণ করেন। তারপরও বর্গা চাষীদের হাতে তেমন কিছু বাঁচতো না কারণ আলাউদ্দিনকে খুবই উচ্চহারে কর হারে পরিশোধ করতে হতো। সমাজে আভিজাত্য যাতে বৃদ্ধি না পায়, সেজন্যে তিনি বিয়ের ব্যাপারে কিছু নিয়ম তৈরি করে দিয়েছিলেন। অভিজাত সমাজে বিয়ের সম্বন্ধ করতে তার অনুমতি লাগতো। তিনি দিল্লীতে সৈন্য আর সাধারণদের জন্যে সুলভ মূল্যে খাবার, কাপড়, ওষুধ, ঘোড়া ইত্যাদি কেনার দোকানের ব্যবস্থা করেছিলেন। দ্বিতীয় আলেক্সান্ডার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজের পরিচয় সম্বলিত বিভিন্ন ধাতব, তামা, রুপা’র মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। 

মহারাষ্ট্রের টেক্সট বই থেকে মুঘলদের ইতিহাস বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে। পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য বলে খ্যাত “তাজমহল”কে উত্তর প্রদেশ তাদের ট্যুরিজম বুকলেট থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছে। যদিও তাজমহল বাদ দেয়া আমার দৃষ্টিতে একটু বাড়াবাড়ি। পূর্ব পুরুষরা তাদের মাতৃভূমি রক্ষা করতে পারে নি সেই রাগ এখন ঢেলে আর কি হবে? তার থেকে বরং ট্যুরিস্টদের এই দেখিয়ে দেখিয়ে টু পাইস যা আসছিলো তা দিয়ে দেশে’র যদি কোনো কাজ হয়। নিজেদের বুকলেট থেকে বাদ দিলে কি হবে, বিশ্বজোড়া সবাই তো ভারত মানেই তাজমহল আর মুঘল স্থাপত্য ভাবে আর জানে।

অন্তর্জালে অনেক আলোচনা খুঁজে পেলাম, ভারতে আলোচনা হয় “মুঘল শাসন না ইংরেজ শাসন ভালো ছিলো এই নিয়ে”। কিন্তু বাংলাদেশ? ইয়েস বাংলাদেশ আটকে আছে বাংলাদেশে। আমাদের টেক্সট বই গুলো থেকে হিন্দুদের লেখা বাদ দেয়ার পায়তারা করা হবে কিন্তু যুক্তিশীল চিন্তা ভাবনা নিয়ে লেখা কিছুই পড়ানো হবে না। নির্মোহ ইতিহাস কবে আসবে বাংলাদেশের টেক্সটবুকে কে জানে।

স্মৃতি থেকে লিখছি, ভুল হতেও পারে, আমাদের প্রাইমারি টেক্সট বইয়ে শিরোনাম ছিলো, “বখতিয়ার খিলজী’র ভারত বিজয়”, আদতে সেটা হতো “বখতিয়ার খিলজী’র ভারত দখল”। ট্রেনিং দিয়ে গবেটের পর গবেট জেনারেশান তৈরি হবে। বখতিয়ার খিলজী কিংবা বাবরকে ইতিহাসের পাতায় আঁকা হবে মহান বীর হিসেবে। বেকুবগুলো বীরদর্পে ফেবু ভেঙে লড়াই করবে, রতন সিং আর সব হিন্দু বাজে রাজাদের কাছ থেকে তাদের মাতৃভূমি কেড়ে নিয়ে খিলজী আর মুঘল’রা ভারতে সু’দিন নিয়ে এসেছিলো তুর্কি বংশোভূত এই বহিরাগতদের ভালোবাসার বন্যায় ভারতবর্ষের দু’কূল প্লাবিত হয়ে গিয়েছিলো। আর হ্যাঁ করবে নাই বা কেনো, সেই প্লাবনের কিছু ছিটেফোঁটা তো দিল্লী থেকে বাংলাদেশ অব্ধি এসে পৌঁছেছিলো বটে।


  • ৮৮৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তানবীরা তালুকদার

জন্ম ২৯শে আষাঢ়, ঢাকা। আপাতত নেদারল্যান্ডস প্রবাসিনী। কিন্তু দেশের সাথে নাড়ির যোগাযোগ কাটেনি। পেশায় একাউনটেন্ট। বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের নানান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে আছেন। অবসর সময়ে আবৃত্তি, নাচ ও নাটকের পাশাপাশি লেখালেখি করার চেষ্টা করেন। তাঁর লেখায় নিছক গল্প নেই; রয়েছে সত্যের ওপর দাঁড়ানো এবং জীবন দিয়ে উপলব্ধি করা অনুভূতির কথা। লিখছেন ছোটবেলা থেকেই। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ “পাহাড় আর নদীর গল্প” (২০১৩) এবং উপন্যাস “একদিন অহনার অভিবাসন” (২০১৪)। ২০১১ সালে ডয়েচে ভেল আয়োজিত “ববস” সেরা ব্লগ নির্বাচন প্রতিযোগিতায় তাঁর নিজস্ব ব্লগ http://ratjagapakhi.blogspot.nl/ মনোনয়ন পেয়েছিল। “ইয়েপ আর ইয়ান্নেকে” ডাচ ভাষা থেকে বাংলায় তাঁর প্রথম অনূদিত বই।

ফেসবুকে আমরা