আমাদের পুলিশকাকু

বুধবার, জুন ৬, ২০১৮ ৫:৩২ PM | বিভাগ : ওলো সই


পুলিশকাকু আমাদের গ্রাম-সম্পর্কের কাকা। গ্রামে আমাদের প্রতিবেশী। আমরা গ্রামের ভাতিজা-ভাতিজিরা সবাই ওঁকে পুলিশকাকু বলে ডাকি। বড়রা সবাই ডাকে পুলিশ। নাম কিন্তু তাঁর পুলিশ নয়, তিনি কোনোদিন পুলিসের চাকরিও করেন নি। তাঁর পিতৃমাতৃ-প্রদত্ত নাম হচ্ছে, আলম। কেনো তাঁকে সবাই পুলিশ ডাকে, জানি না আমরা। আমরা তাঁকে দেখলেই পুলিশকাকু পুলিশকাকু বলে ডেকে উঠি। তিনিও আমাদের ডাকে হাসিমুখে সাড়া দেন, কী গো, মা! কী গো, বাপ! কী গো, আমার ছেলেমেয়েরা!

অন্যান্য দরিদ্র মানুষদের দেখি, তাঁরা জীবিকার জন্য মানুষের কামলা খাটেন, রিকশা চালান, ঠেলাগাড়ি চালান। কিন্তু পুলিশকাকু এসব কাজ করেন না। করতে পারেন না। তাঁর শরীরে সে-শক্তি নেই। আজন্ম রোগা পটকা হাড়জিরজিরে তিনি। কথা বলতে বলতে প্রচণ্ডভাবে কাশেন। শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে তাঁর চিরজনমের অনাহারের স্পস্ট চিহ্ন। কাজ করতে না পারলে তিনি জীবিকা নির্বাহ করেন কিভাবে? মানুষের ফাই-ফরমাশ খাটেন তিনি। কারোর গাছ থেকে নারকেল, সুপারি, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, কলা ইত্যাদি ফল পেড়ে বাজারে নিয়ে বিক্রি করে পয়সাটা মালিকের হাতে এনে গুনে দেন। কারোর খেতের বেগুন, টমেটো বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন। ধানের কল থেকে কারোর ধান চুড়িয়ে আনেন। কারোর হলুদ মরিচ ধনে জিরে গম গুঁড়ো করিয়ে আনেন। কারোর বাজার করে দেন। এসব কাজে যে খুশিমনে যা দেয় তাই দিয়ে খেয়ে না খেয়ে কাকু ও তাঁর পরিবারের অন্যান্যদের দিন যায়।

কাকুর চারটি ছেলেমেয়ে। বড়ছেলে জসিম বয়েসে আমার কয়েক বছরের বড় হবে। ছোটবেলাতেই মৃগী রোগে মারা যায় ও। তারপরে রাহেনা, তারপরে শাহাব উদ্দীন, এক্কেবারে ছোট ঝর্ণা। আমাদের সমাজে অনেক নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষেরা কন্যাসন্তানদের ঘৃণা করে। আমাদের পুলিশকাকু হতদরিদ্রের চেয়েও দরিদ্র। কিন্তু তাঁর কন্যাদের প্রতি তাঁর নির্ভেজাল অপার ভালোবাসা। ছেলেদেরও আদর করেন। কিন্তু মেয়েদের প্রতি তাঁর আদর যেন একটু বেশি। শুধু নিজের মেয়েদের কেনো, আমরা যে তাঁর পাড়াতো-ভাতিজি, সেই আমাদের প্রতিও তো তাঁর ভালোবাসার শেষ নেই। তিনি বলেন, মেয়েদের বেশি আদর করতে হয়। কারণ মেয়েরা পরের বাড়ি চলে যায়। পরের বাড়িতে মেয়েরা কেমন পরিবেশে, কার হাতে পড়ে তার কি কোনো ঠিক আছে?  কাকুর ছোটমেয়ে ঝর্ণা তখন অনেক ছোট। ৪-৫ বছরের হবে। সারাদিন কাকু ঝর্ণাকে কোলে কোলে রাখেন। আমরা বলি, কাকু, ঝর্ণাকে কোল থেকে একটু নামাও না! কাকু অমলিন হেসে বলেন, মা গো, চোখের পলক না ফেলতেই মেয়েটা বড় হয়ে যাবে, পরের বাড়ি চলে যাবে। তখন আর কোলে নিতে, আদর করতে কাছে পাবো?

কোনো-কোনোদিন কোনো ফাই-ফরমাস খাটার বিনিময়ে কেউ ভাত খাইয়ে দেয় কাকুকে। ভাত সাধলেই স্নিগ্ধ হেসে সম্মতি জানিয়ে খেতে বসে যান। পেটে যে তাঁর জনমের খিদে! না সাধলেও হাসিমুখে বিদায় নেন। ভাত খেয়ে রাজ্যের প্রশংসা করেন রাঁধুনী আর পরিবেশকের। কী অমৃত যে খাওয়ালে, মা গো! অনেকে অনেক সময় কাজ করিয়ে তাঁকে কোনো পারিশ্রমিক দেয় না। কাকু কখনো মুখ ফুটে চান না নিজের প্রাপ্য। কেউ দিলে নেন,  না দিলে চুপ করে খালিহাতে বাড়ি চলে যান। আমাদের দেখলেই হেসে জিজ্ঞেস করেন, কেমন আছো গো, মা? কাল যে দেখি নি! অসুখ করে নি তো? আমরা বলি, কই, কাকু, আমরা তো ভালই আছি। আর কালই তো তোমার সাথে আমাদের দেখা হলো, কথা হলো! কাকু বলেন হেসে, আহারে মেয়েরা! তোমাদের না দেখলে খালি-খালি লাগে। দেখলেও মনে হয়, দেখি নি। কাকুর চোখগুলি কোঠরাগত, মুখ তাঁর জনম জনমের অপুষ্টি আর অনাহারের ভাস্কর্য। কিন্তু সেই মুখের হাসিটি কী মায়াময়, কী অপূর্ব ভালোবাসায় পরিপূর্ণ!

কাকুর সাথে অনেক রসিকতা করি আমরা। তার মধ্যে একটা রসিকতা প্রতিদিনই করি। আমাদের মজা লাগে, কাকুও দেখি, খুব মজা পায় এ-বিশেষ রকমের রসিকতায়। কাকুকে আমরা প্রতিদিনই জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা পুলিশকাকু, আজকে বাড়িতে ভাত খেয়েছো কী দিয়ে? কাকু হাসতে হাসতে উত্তর দেন, ও মা, আজ ভাত খেলাম খাসির রেজালা, মুরগীর রোস্ট, বড় বড় কইমাছ ভাজা, বড় রুইমাছ ভাজা, কাবাব, আর পাবদামাছের ঝোল দিয়ে। আর ভাতের পরে ছিলো দুধ, দই, কলা, ইত্যাদি। তোমাদের কাকি কী মজা করে যে রান্না করলো, আর কী মজা করে যে আমরা সবাই খেলাম!  আমরা এতসব মজার মজার খাবারের নাম ও তাদের মজার বর্ণনা কাকুর মুখে শুনে ভীষণ মজা পাই। আমরা বলি, কাকু, আরো বলো। কাকু এবার আরো অনেকগুলি ভালো ভালো খাবারের নাম জুড়ে দেন তালিকায়। আমরা খুশিতে হেসে কুটিকুটি হই। কাকুও সমানতালে হেসে কুটিকুটি হন আমাদের সাথে। আমাদের এ-রসিকতা যে কত নিষ্ঠুর, তা আমরা তখন বুঝতাম না।

কাকুর মুখে কোনোদিন ‘না’ শুনি নি আমরা। কেউ তাঁকে ফরমাস দিয়েছে কোনও কাজে আর কাকু তা করেন নি, এমন হতেই পারে না। নিজের শরীরে না কুলালেও সে-দুঃসাধ্য কাজ কাকু করে দেবেন নিজে কষ্ট করে। কিন্তু ‘না’ বলে কারোর মনে কষ্ট দেবেন না।

কাকুর চিরজনমের কাশিটা একবার খুব বেড়ে গেলো। সাথে আরো হাজারটা অসুখ। কাকুকে আর দেখি না আমরা। এখন আর আসতে পারেন না আমাদের এদিকে। খাটতে পারেন না কারুর ফাই-ফরমাস। কাকু শয্যা নিয়েছেন তাঁর ভাঙা কুঁড়েঘরে। অনাহারে পুরো পরিবার। তখন বর্ষাকাল। কাকুর ঘরের চালে যে হাজার হাজার ফুটো আকাশের নক্ষত্রের মতো ফুটে আছে! সেসব ফুটো দিয়ে বৃষ্টির পানি অঝোরে পড়ছে তাঁর ঘরে, পড়ছে তাঁর শয্যায়। এর-ওর কাছে খবর পাচ্ছি, কাকুর শরীরের অবস্থা ভালো নয়। তখন আমার বিয়ে হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আমেরিকায় থাকে। আমি সাময়িকভাবে বাপের বাড়িতে পেয়িং আশ্রিত হিসেবে আছি। এরা আমার জন্য মাসে মাসে বাপের বাড়িতে থাকা-খাওয়ার খচর পাঠায়। আমি মনে মনে ভাবি, একদিন কাকুকে দেখতে যাবো। কাকির হাতে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে আসবো কাকুর ঔষধ-পথ্যের জন্য। এমন ভাবতে ভাবতে একদিন শুনি, সে-টাকার কাকুর আর দরকার নেই, তিনি চলে গেছেন বিনা চিকিৎসায়, অনাহারে, বৃষ্টির বানে ভেসে ভেসে।

আমি আমেরিকা থেকে দেশে গেলাম একবার বেড়াতে। একদিন আমার কাকির কাছে গিয়ে বসে বসে গল্প করছি। দেখি, পুলিশকাকুর বৌ এসেছেন কাকিকে ঘরের কাজে টুকটাক সাহায্য করতে। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলছেন, কতদিন পরে এলে গো, মা! দেখলাম, পুলিশকাকুর ছোট্ট মেয়ে ঝর্ণা নেই তার মায়ের সঙ্গে। তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করি, কাকি তোমার ঝর্ণা কই? কাকির চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরতে শুরু করে নীরবে। কী ব্যাপার, কাকি, তুমি কাঁদছো কেনো? ঝর্ণার অসুখ নাকি? ঝর্ণার মা চুপচাপ কাঁদতে থাকেন। আমার কাকি বলেন, ঝর্ণা তো চলে গেছে রে, ঝুমু! চলে গেছে মানে? গতবছর হঠাৎ মেয়েটার সারা শরীর ফুলে ঢোল হয়ে গেলো। বড় ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ তো ওদের নেই। তেমন কোনো চিকিৎসা আর করানো গেলো না রে। মেয়েটা চলে গেলো পৃথিবী ছেড়ে!

হায় নিষ্ঠুর পৃথিবী! হায় নিষ্ঠুর দারিদ্র! পুলিশকাকু চলে গেলেন অনাহার আর চিকিৎসার অভাবে, তাঁর আদরের ছোট্ট  ঝর্ণাও তাই! কাকুর সেই স্নেহমাখা অম্লান হাসি এখনো চোখে ভাসে। এখনো কানে আর মনে শুনতে পাই সেই স্নেহের বাক্য, কেমন আছো গো, মা? এমন স্নেহের হাসি আমার পিতামাতা কোনোদিন হাসে নি আমার দিকে চেয়ে, এমন স্নেহের বাক্য তারা কোনোদিন বলে নি আমার উদ্দেশ্যে।


  • ৪২৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তামান্না ঝুমু

ব্লগার ও লেখক

ফেসবুকে আমরা