নারীর বয়ঃসন্ধি ও মেনোপজ

সোমবার, জুলাই ১৬, ২০১৮ ৯:০৮ PM | বিভাগ : ওলো সই


আমার সহকর্মী বান্ধবী মারিয়ার মেনোপজ চলছে কয়েক বছর ধরে। এখানে যখন হাড়কাঁপানো শীত তখন আমাদের কাজের জায়গায় সবগুলি জানালা ও খুলে রাখে। তারপরেও বলে, গরম লাগছে রে তামান্না, গরমে সেদ্ধ-শুকনা হয়ে গেলাম। আমি ঠাণ্ডায় ঠকঠকিয়ে কাঁপি। কিন্তু জানালা বন্ধ করতে বলি না ওকে। কারণ মেনোপজ ফেস করছে এমন কয়েকজনের কাছ থেকে আমি জেনেছি, এসময়ে হট-ফ্লাশ হয়। হট-ফ্লাশ হওয়ার সময় অসম্ভব গরম লাগে, দম-বন্ধ লাগে। এছাড়াও রয়েছে আরো নানান সমস্যা, বিশ্রী অনুভূতি। এসময়ে হরমোনাল ইমব্যালেন্সিং হয় বলে মেজাজও খুব খিটখিটে হওয়া স্বাভাবিক। আর শরীরে অশান্তি ও দম-বন্ধ ভাব হলে মেজাজ কার খারাপ হবে না, বলুন?

আমার বান্ধবী ইনগ্রীডের স্তন ক্যান্সার হবার পর স্তন অপরসারণের সাথে সাথে ওর জরায়ুও অপসারণ করে ফেলেছে ডাক্তার ওর সম্মতিক্রমেই; ওর শরীরে ক্যান্সারের জিন আছে বলে এবং জরায়ুতে ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলে। ওর মেনোপজ চলছে তাই আজ প্রায় তিন বছর ধরে। ওর খুব গরম লাগে সারাক্ষণ, এমন কি শীতকালেও। ওর রুমে চব্বিশঘণ্টাই এসি চলে এবং তার সাথে দুই দুইটা ফ্যান। আমি বলি, এমন ঠাণ্ডার মাঝেতো আমি ফ্রোজেন হয়ে মারা পড়বো।

ইনগ্রীডকে আমি জিজ্ঞেস করি, হট-ফ্লাশের সময় তোমার কেমন লাগে? ও বলে, মনে হয়, অত্যন্ত গরম পানিতে আমি নাক পর্যন্ত ডুবে আছি। আমার চারপাশে কোনো অক্সিজেন নেই, আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না, আমার হাত-পা অবশ হয়ে আছে, মাথা ঝিমঝিম করছে।

এ-সময় খুব রাগ হয় কি তোমার? ও বলে, অস্থির লাগে, অসহ্য লাগে সবকিছু। শরীরে এমন অশান্তি হলে অসহ্য অস্থির তো লাগবেই।

অনেক নারীর আবার এসময়ে শুধু শারীরিক সমস্যা নয়, মানসিক সমস্যাও দেখা দেয়। আমাদের শরীর আর মন সম্পর্কযুক্ত তো। ওরা ভাবে, হায়! আমার নারীত্ব বুঝি শেষ হয়ে গেলো! যদিও ওই বয়েসে প্রায় কেউই আর বাচ্চা নিতে চায় না, তবুও ওরা ভাবে, হায়! আমার সন্তান ধারণের ক্ষমতা বুঝি ফুরিয়ে গেলো! স্বামী বা যৌনসঙ্গীর কাছে আমার সকল আবেদন বুঝি শেষ হয়ে গেলো! বিশেষ করে আমাদের সমাজের নারীরা মেনোপজের সময় এমন ভাবতে বাধ্য হয় সামাজিক কারণে। যে নারী সেক্স-টয়, ঘরের কাজের মেশিন ও বাচ্চা উৎপাদনের মেশিন ছাড়া আর কিছুই নয়, সে অন্যরকম ভাবতে পারারও কথা না।

এ-সময়টা বিভিন্নজনের বিভিন্ন মেয়াদের ও ভিন্ন ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। সময়টার মেয়াদ ১ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত হতে পারে। কারো একবছর, কারো চারবছর, কারো দশবছর। কষ্ট ও অনুভূতির মাত্রাটাও বিভিন্ন।

এ-সময়টাতে নারীদের সহযোগিতা প্রয়োজন; মানসিক ও শারীরিক। পুরুষদের বলছি, আপনার সঙ্গী যদি এ-সময়ের মধ্য দিয়ে যায়, তার সমব্যথী হোন। তাকে মানসিক সাপোর্ট দিন। হাত ধরে তার কাছে বসুন। তার কষ্টের সময় তার মাথায় পিঠে হাতে একটু সহমর্মিতার হাত বুলিয়ে দিন। তাকে তার কষ্টকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন।

আর নারীদের বলছি, এ-সময়ে যদি আপনার পুরুষসঙ্গী আপনার সমদরদী না হয়, আপনাকে আপনার কষ্টকে অবজ্ঞা করে, মন খারাপ করবেন না সেজন্য। এই আবর্জনার বিচিতে পেনাল্টি কিক মেরে আপনার জীবন থেকে বের করে দিন। এই আবর্জনার টুকরোর আপনার দরকার নেই আপনার জীবনের সীমানায়।

১০-১২ বছর বয়েসে সাধারণত মেয়েদের পিরিয়ড শুরু হয়। এটা বয়ঃসন্ধিকাল। এসময় হরমোনের পরিবর্তন হয় মেয়েদের শরীরে। মন ও শরীরের জগতে ঘটে বিশাল পরিবর্তন। শারীরিক অনুভূতি অনুভব করতে শুরু করে মেয়েরা। খুবই গুরুত্বপূর্ণ, খুবই সংবেদনশীল এ-সময়টা। পিতামাতাদের বলছি, এ-সময়ে আপনার কন্যার পাশে থাকুন। বাবারা বাবা বলে দূরে সরে থাকবেন না। নিজের কন্যার রক্তমাখা প্যান্টিটি আপনার নিজের হাতে ধুয়ে দিন যত্ন করে। তাকে শিখিয়ে দিন, কীভাবে টেক কেয়ার করতে হয়। কীভাবে প্যান্টি ধুতে হয়। কীভাবে প্যাড ব্যবহার করতে হয়। তাকে দোকানে নিয়ে যান, প্যাড প্যাণ্টি ব্রা ইত্যাদি যা যা লাগে কিনে দিন। ট্যাবু ভাঙুন। পুরুষ বলেই সংকোচ বা লজ্জার কিছু নেই। আপনার ছোট্ট কন্যাটি নারী হতে চলেছে। তার শরীর ও মনের জগতে অদ্ভুত অপরিচিত সব পরিবর্তন ঘটে চলছে। এক অজানা নূতন ভুবনে প্রবেশ করছে সে। এ-ভুবনটি তার জন্য ওয়েলকামিং করে তুলুন। তার সাথে সহজ হোন, ফ্রী হোন তার শরীর ও মনের ব্যাপারে। শরীরের পরিবর্তন ও শরীর নিয়ে ওকে কখনো কটু কথা বলবেন না, খোঁটা দেবেন না।

এ-সময়ে বড় আবেগপ্রবণ বড় অভিমানী হয় মেয়েরা হরমোনের কারণে। তার আবেগ-অনুভূতিগুলির কথা মন দিয়ে শুনুন, আলোচনা করুন তার সাথে। তার অনুভূতি ও মতামতের গুরুত্ব দিন। তার সাথে গল্প করুন, খেলুন, সময় কাটান আনন্দে রাখুন তাকে। তার শরীর নিয়ে, শরীর ও মনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নিয়ে তাকে লজ্জিত হতে সংকুচিত হতে শেখাবেন না। শরীর বা শারীরিক প্রক্রিয়ায় লজ্জা বা সংকোচের কিছু নেই। এগুলি স্বাভাবিক জিনিস জীবনের, আমাদের জীবনের বাস্তব অংশ।

১০-১২ বছর থেকে পিরিয়ড শুরু হয় এবং তা চলতে থাকে প্রায় ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত। বয়ঃসন্ধিকাল এবং মেনোপজ দুটোই নারীর জীবনে বিশেষ সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ সময়। আপনজনেরা কাছে থাকুন এসময়ে। এর মধ্যেখানে রয়েছে গর্ভধারণ সন্তান-প্রসব বাচ্চার দুধ নিজের শরীরে উৎপাদন করে তা বাচ্চাকে খাওয়ানো ইত্যাদি। প্রতিটা সময়ই অদ্ভুত। প্রতিটা সময়েই দরকার আপনজনদের ভালোবাসা সাপোর্ট। এ-সময় ও সময়ের মানুষদের বুঝুন, উপলব্ধি করুন, সাপোর্ট করুন।


  • ৩৫০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তামান্না ঝুমু

ব্লগার ও লেখক

ফেসবুকে আমরা