কিছু বন্ধু থাকলে জীবন ধন্য হয়

শুক্রবার, জুলাই ১৩, ২০১৮ ৪:৪১ AM | বিভাগ : ওলো সই


বাচ্চাদের একটা গ্রীষ্মকালীন স্লীপএ্যাওয়ে ক্যাম্পে কাজ পেয়ে গেছিলাম এবার। কথা ছিলো, দুইমাস কাজ করবো ওখানে। ইনগ্রীডের সাথে ওখানেই পরিচয়। সেও আমার মতো কাজ নিয়ে এসেছে ক্যাম্পে। আমার কাজটা ছিলো অনেক কষ্টের। দৈনিক ১২ ঘণ্টা কাজ, সপ্তাহে ৭২ঘণ্টা, একদিন ছুটি। কাজের সময় মনে হতো, আমি মারা যাচ্ছি কাজের চাপে। নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশ নেই। কাজ শেষে আপাদমস্তক প্রচণ্ড ব্যথা। অপরদিকে ইনগ্রীডের কাজ দৈনিক মাত্র এক/দুই ঘণ্টা। বড় আরামের কাজ। ও সারাদিন বই পড়ে, এদিক-ওদিক অলস ঘুরে বেড়ায়, খিকখিক করে হাসে। কিন্তু ওর সাথেও আমার মতো একই ডিল। এ কেমন অন্যায়, অগণতন্ত্র! ওকে দেখলে আমার গা জ্বালা করে। কত আরামে আছে মহিলা, আর আমি কাজ করতে করতে মরার ফুরসত পাই না!

ও প্রায়ই আমাদের কাজের জায়গায় আসে। আমাদেরকে হেল্প অফার করে, হেল্প করে এক/দেড়ঘণ্টা। খুব সহজ কাজ আমরা ওকে দিই যাতে কষ্ট না হয় ওর। আমার তবুও জ্বালা জ্বালা লাগে ওকে দেখলে। কারণ ওর কোনো কাজ নাই করার। সারাদিন অখণ্ড অবসরে থেকে থেকে বিরক্ত হয়ে অন্যকে হেল্প অফার করে ঢং দেখায়। একদিন কাজের শেষে আমাকে বাইরে ঘুরতে নিয়ে যেতে চায় ও। আমিও রাজি হয়ে যাই। আমরা ঘুরতে যাই। ইনগ্রীড ড্রাইভ করে ওর গাড়ি। আমি বসি ওর পাশে। আমরা অনেকক্ষণ ঘুরে ঘুরে নতুন অঞ্চলটা দেখি। রেস্টুরেন্টে বসে আইসক্রীম খাই। নিজেদের গল্প করি। আমার অনেক ভালো লেগে যায় এ-রমণীকে, যাকে আমি কয়েকঘণ্টা আগেও বিরক্তির চোখে দেখতাম।

ওর স্তন ক্যান্সার হয়েছিলো তিন বছর আগে। সে-কঠিন সময়ের গল্প বলে আমাকে ওর....

ওর শরীরে ক্যান্সারের জিন আছে যা ও ওর মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলো। ওর মা ক্যান্সার সারভাইবার, তাও আবার দুই-দুইবারের। তাই সবসময় সতর্ক ছিলো, নিয়মিত চেকআপের মধ্যে ছিলো। প্রাথমিক অবস্থাতেই ধরা পড়ে ক্যান্সার। দুটি স্তনই অপসারণ করতে করতে হয় সার্জারি করে। তারপর শুরু হয় কেমো। আটমাস চলে। কেমোতে ভয়াবহ রকমের অসুস্থ হয়ে পড়ে ও। ওর চারটি বাচ্চা। নিজেকেই দেখাশোনা করার সাধ্য নেই তখন ওর। বাচ্চা দেখবে কীভাবে? সেসময় ওর বর অনেক যত্ন করে ওর এবং বাচ্চাদের। এমনিতেই নাকি ও যত্নশীল বর ও বাবা। ওর বাবা-মা ও একমাত্র বোন এসে থাকে ওর সাথে পুরো সময়টা। সীমাহীন যত্ন করে। ওর প্রতিবেশীরা প্রতিবেলায় ওদের জন্য খাবার রান্না করে নিয়ে আসে। কোনো কোনো দিন বেশ কয়েকজনেও একসাথে খাবার নিয়ে আসে। ওরা বলে, এত খাবার খাবো কী করে, তোমরা কিছু কিছু ফেরত নিয়ে যাও। এবং আর কয়েকদিন খাবার আনতে হবে না, অতিরিক্ত খাবার হয়ে গেছে ঘরে। কিন্তু ওরা শোনে না। নিত্যই ফ্রেশ রান্না করে আনবেই আনবে ওরা।

অনেক সুন্দর চুল ছিলো ওর, আগের ছবিতে দেখলাম। কেমোতে চুল সব ঝরে গেছে। আবার গজিয়েছে অবশ্য। এখনো ছোট ছোট।

ওর চুল ঝরে যাবার সময়ে ওর কয়েকজন কাছের বান্ধবী নিজেদের চুল শেইভ করে ওর মানসিক অবস্থা সাপোর্ট করতে চেয়েছিলো। ইনগ্রীড ওদের তা করতে কঠিনভাবে মানা করেছে। ও বলে, চুলহীন অবস্থাটা বরং আমি উপভোগ করেছি। মাথাটায় বাতাস লেগেছে অবাধে, মাথাটা হালকা হালকা লেগেছে। সিলিকনের নকল স্তন ইমপ্লেন্ট করা হয়েছে ওর। ও বলে, আমার বেশ ভাল লাগে এ-নকল স্তন। কারণ ব্রা পরতে হয় না, ব্রা পরা ছিলো এক চরম দিকদারি আমার জন্য। আমি ওর কথা শুনি, আর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি ওর দিকে। 'চোখে কী পড়লো' বলে অন্যদিকে ফিরে আস্তে করে চোখের জল মুছে নিই।

ক্যাম্পে আমার কাজটা ছিলো কিচেনে। দু’ইশ মানুষের তিনবেলা রান্না ও পরিবেশনের কাজ। আমরা ৮/৯ জন ছিলাম। তবুও বিষম কষ্টের কাজ। সকাল ৮টা ১৫মিনিটে ব্রেকফাস্ট, দুপুর সাড়ে ১২টায় লাঞ্চ, বিকেল সাড়ে ৫টায় ডিনার পরিবেশন করতে হয়, এক সেকেন্ডও দেরি করা যাবে না। প্রতিবেলায় ডিসার্ট। ৮-১০ রকমের সালাদ বানাতে হয় প্রতিবেলা, অনেক পদের খাবার রান্না করতে হয়। তার উপর রয়েছে, ভেজিটেরিয়ান, ভিগান, গ্লুটেন-ফ্রী ইত্যাদি। পেঁয়াজ রসুন আদা সব্জি শাক ইত্যাদি কাটাছেলা করতে হয় হাজারে হাজারে রকেটের গতিতে। বেসমেন্টের বিশাল ওয়াক ইন ফ্রিজে শত শতবার গিয়ে মণে মণে খাদ্যবস্তু একবার তুলে আনতে হয়, আরেকবার রেখে আসতে হয়। কিছু কিছু হাঁড়িপাতিলের সাইজ পুকুরের মতো, ওজন মণ খানিক। এগুলো আলগাতে হয় শতবার, ধুতে হয় আরো বেশিবার। চারদিকে নানান রকমের চুলো জ্বলে, রান্না হতে থাকে হরেক রকমের। কিন্তু কিচেনে কোনো এসি নেই, শুধু একটা ফ্যান। ইনগ্রীডই সর্বপ্রথম আমাদের কষ্ট দেখে আমাদের জন্য সমবেদনা অনুভব করে। ক্যাম্প-মালিককে বলে, কিচেনে আরো লোক দরকার, এসি দরকার, আমাদের কাজের দুইটা শিফট দরকার, আমাদের কাজের আওয়ার আরো কমানো দরকার। আমাদের কষ্ট দেখে সহ্য করতে না পেরে ও-ই সবার আগে এগিয়ে আসে আমাদের হেল্প করতে। বলে, আমার কোনো কাজই নেই, আর তোমরা এ-দোজগে মারা যাচ্ছ। কিন্তু মালিক John-এর কোনো বিকার নেই। বরং সে ঘেউঘেউ করে ওঠে। পরে আমিও বলেছিলাম এ-কথাগুলি মালিককে। সে আমার ওপর খুব রুষ্ট হয়। একটা বাচ্চার জন্য সে দুই সপ্তাহে সাড়ে তিন হাজার ডলার চার্জ করে। এরকম দুইশ বাচ্চা আছে ক্যাম্পে। কিন্তু এ্যামপ্লয়ীদের তেমন পে করে না। কিচেন এ্যামপ্লয়ীদের মধ্যে একমাত্র শেফ আন্দিয়া হচ্ছে তার আল্লা, আর বাকিদের মানুষ হিসেবেও গণ্য করে না। আন্দ্রিয়াও জনের মতো ঘেউঘেউ স্বভাবের।

আমি ইনগ্রীডকে চিনতে পারি সেদিন। এমন নিঃস্বার্থ পরদরদী মানুষ ক'জন আছে পৃথিবীতে? এমন চমৎকার মিষ্টি স্বভাব ও মনের মানুষ ক'জন হয়? ওকে জানার আগে ওর প্রতি আমার যে জ্বালা-জ্বালা ভাব ছিলো তার জন্য নিজের মরমে আমি মরে যাই। শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় ওর প্রতি আমার মাথা নত হয়ে আসে। আমরা খুব ভালো বন্ধু হয়ে যাই। তোমার মত বন্ধু পেয়ে আমি ধন্য, ইনগ্রীড! এমন বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।


  • ২৬৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তামান্না ঝুমু

ব্লগার ও লেখক

ফেসবুকে আমরা