নাস্তিক ধরার ফাঁদ

মঙ্গলবার, অক্টোবর ১, ২০১৯ ৬:৪২ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


আসিফ মহিউদ্দীনের কাছে আমি এমনটা আশা করি নাই যে নাদিয়া নামের খুবই স্থুল চিন্তা ও ভাষার কোনো ফেইসবুকারের কাছে নিজের বিয়ে চাকরি বিদেশ যাপনের প্রমাণ দিতে হবে। শাহজাহান বাচ্চুর কথা বলি। উনি নিরাপত্তা নিয়ে খুব কৌশলী ছিলেন। আমার সঙ্গে কথা হতো। তিনি এক মাস আগে যেখানে থাকতেন সেই ছবি ও পোস্ট লিখত নতুন ঠিকানায় বসে। ভারতে চলে যাবেন ঠিক হয়েছিলো। একবার গিয়েছিলেনও। সেই তিনি সামান্য টাকা পয়সার নয়-ছয় অভিযোগ উঠায় নিজের সব ঠিকানা, প্রতিদিনের আড্ডার স্থান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ফোন নম্বর দিয়ে প্রমাণ করতে চাইলেন তিনি একজন স্বচ্ছল মানুষ, গরীব মানুষের জন্য দেয়া সামান্য অর্থ আর যাই হোক মেরে দেয়ার তার কোনো প্রয়োজন নেই। বাচ্চু ভাইয়ের অবস্থা ভালো ছিলো সেটা আমিও জানতাম। যাই হোক, অনলাইনে তাকে চোর-জোচ্চোর বলে গালির বন্যায় তিনি সইতে না পেরে নিজের সব তথ্য প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। তার কিছুদিন পরই তিনি ইসলামপন্থিদের হাতে খুন হন। বলছি না সেই ঘটনা পরিকল্পিত ছিলো। কিন্তু এটাও ঠিক সেই ঘটনা ঘটার কারণেই বাচ্চু ভাই নিজের সমস্ত তথ্য পাবলিক করে দিয়েছিলেন।

কালকের লাইভ আমি দেখি নাই। আসিফের পোস্ট ও অন্যেদের পোস্টে জানলাম আসিফ মহিউদ্দীন নিজের কর্মস্থল বাসা ও অন্যান্য কাগজপত্র প্রকাশ করে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। নাদিয়া নিতান্তই অবার্চীন অনলাইন জগতে। সে ব্লগার ছিলো না। আমরা যখন অনলাইনে লিখি তখন তার অনলাইনে জন্ম হয়নি। সে ব্লগ-ব্লগার বিষয়গুলো কিছুই জানে না। সে মূলত পিনাকীর কাছ থেকে ব্লগারদের সম্পর্কে তথ্য পেয়ে থাকে। আসিফের তথ্য প্রকাশ্যে বের করে আনার জন্য নাদিয়া হচ্ছে একটা ঘুটি মাত্র।

অভিজিৎ রায় মারা যাবার পর ‘উগ্র নাস্তিক’ মার্ক করে মুক্তমনা ব্লগেরই কিছু স্বঘোষিত নাস্তিক স্বয়ং লেখালেখিকেই নাস্তিক হত্যার জন্য দায়ী করে। এর সামান্য আগে অভিজিৎ রায়কে ‘সালাফি সেক্যুলার’ বা উগ্র নাস্তিক ট্যাগ মেরে তাকে উগ্রতা ছড়নোর জন্য দায়ী করা হয়, কোমলতি উগ্র মৌলবাদীদের বাধ্য করছে অভিজিতের লেখা হাতে অস্ত্র তুলে নিতে। অভিজিৎ রায় এর পরপরই মারা যায়। তার মৃত্যুর পর বলা হলো উগ্র নাস্তিকদের কারণেই ‘প্রকৃত নাস্তিক’ অভিজিৎ মারা গেলো। যদিও অভিজিৎ বেঁচে থাকতেই উগ্র নাস্তিকের তকমা পেয়ে গিয়েছিলেন। যে ওয়াশিকুর বাবু নবী পোন্দানী সাপ্তাহ করেছিলো তার মৃত্যুর পর বলা হলো যারা নিজেদের মুখ লুকিয়ে উগ্র নাস্তিকতা করে তাদের জন্য মুখ দেখানো নাস্তিকরা কোপ খাচ্ছে। লেখার যদি এতই সখ তাহলে মুখ দেখিয়ে লিখ…। এসব যারা বলেছে তারা সবাই একসময় সামু, আমার ব্লগ, মুক্তমনায় আমাদের সমান সমান নাস্তিকতা প্রচার করেছেন। তারাই প্ররোচিত করেছিল কেনো আমরা মুখ দেখিয়ে লিখি না…।

তারপর শুরু হলো অন্য খেলা। কারা মারছে নাস্তিকদের? আমি কিন্তু পরিস্কার করে উপরে লিখেছি বাচ্চু ভাইকে মেরেছে ‘ইসলামপন্থিরা’। এটাই নাকি উগ্র নাস্তিকতার প্রমাণ! কারণ আদালতে প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত আমি কেনো নিরহ ইসলামিস্টদের নামে কলংক দিচ্ছি? কঠিন এক খেলা। অভিনেতা মোশাররফ করিম ‘ধর্ষণের জন্য পোশাক নয় মানসিকতাই দায়ী’ বলার জন্য কি রামকৃষ্ণ মিশন থেকে হুমকি পেয়েছিলেন? নাকি কাকরাইল চার্চ থেকে? জাস্টিসিয়া ভাস্কর্য কাদের পুটু জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছিলো? ইউরোপ কেউ লরি জনসম্মুখে উঠিয়ে দেয়ার সংবাদ আসার পর যখন আমরা বলা শুরু করি বা অনুমান করতে থাকি এটা নিশ্চয় ইসলামিক জঙ্গিদের কাজ- তখন কাদের জ্বালা ধরে খেয়াল করুন? কারা নব্য নাস্তিকদের ইসলামফোবিয়া নিয়ে কিস্তির পর কিস্তি লেখে? কারা ইসলামের সমালোচনাকে ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ ‘হিন্দুত্ববাদী’ ‘ইন্ডিয়ান আরএসএস কর্মী’ বলে? তাদের এই কৌশলটা যে একটা ফাঁদ সে সম্পর্কে সবাইকে সজাগ করা উচিৎ মনে করছি। আপনাকে ‘ইন্ডিয়ান আরএসএস কর্মী’ বলে বলে লাগাতার প্রচার করলে কখনো নিজেকে সামলাতে না পেরে নিজের পরিচয় স্থান বলে দিবেন- এটাই হচ্ছে সেই ফাঁদ।

আমাকে প্রতিনিয়ত এরকম ফাঁদে ফেলার জন্য আমার পোস্টে কমেন্টে, ইনবক্সে এসে জিজ্ঞেস করা হয়, কেন আমি নিরপেক্ষ নাস্তিকতা ছেড়ে দিয়ে হিন্দুত্ববাদী হয়ে গেছি? আচ্ছা আপনি আগে তো নাস্তিক ছিলেন সেটা ছেড়ে হিন্দুত্ববাদী হলেন কেনো? আপনি হিন্দু বলেই খালি ইসলামের সমালোচনা করেন? আপনি ইন্ডিয়াতে থেকে ইসলামের সমালোচনা করেন, পারলে সেখান বসে একবার হিন্দু ধর্মের সমা্লোচনা করে দেখান তো…। না আমি মোটেই আমার বিরুদ্ধে কিছু নিন্ম সংস্কৃতির মডারেট মুসলিম, বামপন্থি, নাস্তিকদের অভিযোগে চিন্তিত নই। এদেশে হিন্দু বলা হয়েছিলো শেখ মুজিবকে। তাজউদ্দিন, ভাসানী কাউকেই ছাড় দেয়া হয়নি। ব্লগে এক ধরণের ‘কমেন্ট তাকিয়া’ চালাতো ছাগুর দল। মাল্টি নিক দিয়ে তারা দলবেধে নাস্তিক টার্গেট করে তার পোস্টে এসে বিজ্ঞের মত বলত, ভাই কিছু মনে করবেন না, আপনার লেখার মান পড়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে আপনার লেখা পড়ছি তো, খুবই একপেশে হয়ে যাচ্ছে, খালি একটা ধর্মকে ধরে এভাবে বিদ্বেষ প্রকাশটা আর যাই হোক বস্তুনিষ্ঠ না…। এরকম একাধিক নিক এসে কমেন্টে একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে তারা চাইত ব্লগারকে মানসিকভাবে দ্বিধান্বিত করে ফেলতে। আমার মতো অনেকের পোস্টে এখনো সেই একই তাকিয়া ঘটছে বছরের পর বছর ধরে। সেই কাজটা এখন করছে কিছু সুশীল নাস্তিক নারীবাদী অজ্ঞেয়বাদী দাবীদাররা…। এগুলো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, লাইক কমেন্টে জন্য ঈর্ষা নাকি বড় রকমের আদর্শিক এক পরিবর্তন সেটা বুঝতে হলে তাদের সুক্ষ্মভাবে ইসলামী মৌলবাদীদের আড়াল করা, অন্যান্য মৌলবাদীদের রাজনৈতিক ইসলামের চাইতে বড় করে দেখানো বা সমান করে নিরপেক্ষ সাজার ফর্মূলা বের করা থেকে বুঝা যায় এক ধরণের বিবর্তন ঘটেছে চিন্তায়…।

আসিফ মহিউদ্দীনের জন্য অবশ্যই দু:শ্চিন্তা হচ্ছে। আরিফুর রহমানের কাছ থেকে ‘উগ্র নাস্তিকতা’ শুনতে হবে আশা করিনি কোনোদিন। এক দিক দিয়ে ভালোই হচ্ছে। নাস্তিকতা পরিশুদ্ধ হোক। ব্লগযুগে আওয়ামী লীগ নাস্তিক, বাম নাস্তিক, হিন্দু নাস্তিক, মুসলমান নাস্তিক, রাজনৈতিক আদর্শহীন নাস্তিক… সবাই একই অভিন্ন নাস্তিকতা নিয়ে লেখা শুরু করেছিলো। পরে যখন লীগ ক্ষমতায় আসল তখন লীগ নাস্তিকরা মনে করল এভাবে লিখলে সরকার সমস্যায় পড়বে, লীগকে হুজুররা নাস্তিক বলে প্রচার করতে শুরু করবে তখন তারা ‘সহি নাস্তিক’ কেমন হওয়া উচিৎ তার পলিট্রিক্যাল সংজ্ঞা বের করলেন। তারপর বামপন্থিরা তাদের বিপ্লবের জন্য ধর্ম সমালোচনাকে ক্ষতিকর মনে করলেন। সেই মনে করা থেকে তারা ধর্ম সমালোচনাবিহীন অদ্ভূত এক নাস্তিকতার সংজ্ঞা বের করলেন! তারা দেখলেন, সাম্রাজ্যবাদকে বাদ দিয়ে ইসলাম ও মুহাম্মদের আইডিওলোজিকে বড় শত্রু মনে করলে বামপন্থায় ঈমান থাকে না। তাছাড়া সারা দুনিয়াতে ইসলামি জঙ্গিদের সহযোগী হিসেবে বামদের সংযুক্ততাও একটি কারণ ছিলো। তাই তারাও ‘প্রকৃত নাস্তিকতা’ তৈরি করল তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ থেকে। নাস্তিকতা তাই রাজনৈতিক বিশ্বাসহীন প্রভাবহীন স্বার্থহীন ধর্ম বিদ্বেষের সংগ্রামে ফিরবে বলেই আমার বিশ্বাস। কারণ অচিরেই এইসব বিশুদ্ধ নাস্তিকতার অনুসারীরা তাদের রাজনৈতিক পরিচয়েই লীন হবেন…।

নাদিয়া ‘না বুইঝা লাফাই ইসলাম’-কে দিয়ে কেউ খেলিয়েছে। খুব কঠিন খেলা। নাদিয়া মোটামুটি মর্ডান নারীবাদী হিসেবে একটা ইমেজ গড়ে তুলেছিলেন। তাকে দিয়ে ডানপন্থি পিনাকীর মাধ্যমে গিয়ে শেষে আরিফুর রহমানের লাইভে গিয়ে শেষ। বিপদে আমরা সবাই আছি সত্য। আরো সত্য হলো- সত্য বললে কে বেজার হবে আর আমি পড়ব বিপদে! তবু সত্য বলা কে রুখে?


  • ৫২৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সুষুপ্ত পাঠক

বাংলা অন্তর্জালে পরিচিত "সুষুপ্ত পাঠক" একজন সমাজ সচেতন অনলাইন একটিভিস্ট ও ব্লগার।

ফেসবুকে আমরা