দেরীতে হলেও আমার না বলা মি টু

বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৯, ২০১৭ ২:৪১ AM | বিভাগ : আলোচিত


যৌন নির্যাতন শব্দটির সাথে পরিচিত না হলেও এর শিকার আমিও কৈশোরের আগেই হয়েছিলাম। বয়স যখন ৮/৯ তখন পাড়া, প্রতিবেশী ছোকরা থেকে মধ্য-বয়স্কদের দ্বারা এ যন্ত্রনা আমাকে সইতে হয়েছিলো। খুব দস্যি ছিলাম। ঘরে মন টিকতো না। আগানে, বাগানে ঘুরে ঘুরে কার গাছে আম, জাম, কুল পেঁকেছে সেটার খোঁজেই ব্যস্ত থাকতাম।

একটি অফিসের সামনে কুলের গাছ ছিলো। কিসের অফিস, তা মনে নেই। প্রায়ই দল বেঁধে সে গাছে হামলা চালাতাম। একদিন আমি একাই গিয়েছি। গাছে ঢিল ছুড়তেই মাঝ বয়সী পিয়ন বেরিয়ে এসে চারিদিকে দেখে আমায় বল্লো, “বরই পাড়া আছে ঘরে, নিবা? আমি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম। লোকটি ঘরের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো, আমি দাঁড়িয়ে আছি গাছের নিচে। বল্লো, এসো, নিয়ে যাও।

আমি লোকটার পেছনে গেলাম। একটা তেলচিটে বিছানার পাশে বেতের ঝুড়িতে পাঁকা বরই ছিলো। আমার দু’হাতে বরই দিতেই আমি ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পিছন ফিরতেই সে লোক আমার কোমর দু’হাতে জড়িয়ে তার কোলে বসিয়ে দিলো। বরই হাত থেকে ছিটকে সারা ঘরে ছিটিয়ে পড়লো। আমি হতভম্ব অবস্থায়ও বুঝতে পারছিলাম আমার নিচে শক্ত কিছুর অবস্থান। ছিটকে উঠে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। সারাটা দিন আর বাড়ী থেকে বের হইনি। আম্মা আমার এই সুবোধ আচরনে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন, আমার কি হয়েছে? জানি না, আমি কেনো কিছুই বলতে পারি নি। শুধু আমার দু’বছরের বড় ভাই, যে আমার এক মাত্র বন্ধু, তাকে বলেছিলাম। “জানিস, ঐ লোকটা ভালো না”। দশ বছরের বালক সে কথায় কি বুঝেছিলো জানি না। দু’দিন পরে চুপি চুপি আমায় বলেছিলো, “দিয়েছি ঐ ব্যাটার মাথায় ঢিল ছুড়ে, কিন্তু মাথা ফাটেনি”।

আমাদের বাড়ীওয়ালার বড় ছেলে সিলেটে কলেজে পড়তো। ছুটিতে যখন বাড়ী আসতো তখন সে সুযোগ পেলেই আমায় জাপটে ধরতে চাইতো। তখন আমার ঐ আগের ঘটনা মনে পড়ে যেতো। সে ছেলের মায়ের কাছে গিয়ে নালিশ করেছিলাম। “খালা লিয়াকত ভাই টান দিয়ে আমার জামার বোতাম খুলে দেয়”। জানি না সে মা তার পুত্রকে কিছু বলেছিলেন কিনা। সে বাড়ীতে থাকলে আমি তাদের বাড়ী যেতামই না। একটি মেয়ের শরীরে নারীত্বের কোনো চিহ্ন ফুঁটে ওঠার আগেই তাতে দানবের থাবা পড়তো সেই ৬০ এর দশকেও।

সদ্য স্বাধীন দেশে আমি নিজ ঘরে আক্রান্ত হয়েছিলাম। নতুন বাসা, অনেকগুলো কামরা। কিন্তু তখনও গোছানো হয়নি। প্রচন্ড গরম ছিলো। একটি ঘরে দুটো ছোট ছোট চৌকিতে আমরা দু-ভাইবোন ঘুমিয়েছি। কিশোর কাজের ছেলেটি যাতে ফ্যানের বাতাসে আরামে ঘুমাতে পারে তাই তাকেও নিচে বিছানা করে ঘুমোতে বলা হয়েছিলো। মাঝ রাতে হঠাৎ আমার বুকে চাপ অনুভব করতেই ঘুম ভেঙ্গে গেলো। চিৎকার করে ভাইয়াকে ডাকতে গিয়ে বুঝলাম আমার ঠোটের উপর ক্রমাগত কেউ কামড়িয়ে যাচ্ছে। একটি মুহুর্ত! তারপরই আমি দু’হাতের ধাক্কায় ঐ পশুটাকে ছিটকে ফেলে দিয়ে দৌড়ে আব্বা, আম্মার রুমে গিয়ে দরজা ধাক্কা দিতে শুরু করলাম। আব্বা, আম্মা উঠে এসে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আতকে উঠে আম্মা আমায় জড়িয়ে ধরলেন। তারপর কি হয়েছিলো আমার কিছু মনে নেই। পরের তিন/চারদিন বাথরুমের আয়নাতেও আমি আমার মুখ দেখতে পারিনি। আমার ঘৃনা হতো।

এই একটি ঘটনার প্রভাব আমার সারা জীবন বয়ে যেতে হয়েছিলো। কোনো পুরুষের স্পর্শ, চুম্বন আমাকে সেই বিষাক্ত স্মৃতি মনে করিয়ে দিতো। আমি হয়েছিলাম যৌন শীতল। তখন যদি কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া হতো তবে হয়তো আমার জীবনের এই মেঘ কেটে যেতো। কিন্তু তখন মনোরোগ কথাটার প্রচলন এদেশে ছিলো না বললেই চলে। এই শীতলতা নিয়ে আমি সংসার করেছি, মা হয়েছি, কিন্তু একজন প্রকৃত স্ত্রী হতে পারিনি।


  • ৩২৮৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সুরঞ্জনা মায়া

পেশায় গৃহিণী সুরঞ্জনা ঘরকন্নার পাশাপাশি লেখালেখিতেও যুক্ত আছেন পুরাদস্তুর।

ফেসবুকে আমরা