"মানুষ দিবস চাই" একটি কৌতুক

রবিবার, মার্চ ৮, ২০২০ ৭:১৫ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


খুব বেশি দিন আগে না, মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ বছর আগেই স্বামী মারা যাওয়ার পর মেয়েদেরকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা হতো ধর্ম এবং সমাজের নামে। মাত্র ৫০ থেকে ১০০ বছর আগে ১০ বছরের আগেই (৫ থেকে ৮ বছর বয়সে) কন্যাশিশুদের বিয়ে হতো তাদের চেয়ে বয়সে ৩০-৪০ বছরের বড় পুরুষদের সাথে। যেটা ছিলো লিগ্যালি ধর্ষণ প্রতিদিন। মাত্র ৫০ বছর আগে ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সে মেয়েরা মা হতো যখন সে নিজেই একজন বাচ্চা। এখনো অনেক জায়গাতে ১৫-১৬ বছরের মেয়ের বিয়ে হয় ২৫ থেকে ৩০ বছরের ছেলেদের সাথে। সবকিছুই ধর্ম এবং সমাজ এর নামে। বাংলাদেশের মেয়েরা এখনো সম্পত্তিতে ছেলেদের সমান ভাগ পায় না। কিছু ধর্ম অনুযায়ী মেয়েরা একেবারেই বাবার সম্পত্তি পায় না। মাত্র ১০০ বছর আগে মেয়েদের ভোটের অনুমতি ছিলো না, মেয়েদের দৌড়ানোর অনুমতি ছিলো না (ক্যাথেরিন সুইটজার ১৯৬৭ সালে প্রথম বোস্টন ম্যারাথনে দৌড়াতে চেয়েছিলেন এবং তাকে ম্যারাথনের কর্তাব্যক্তিরা গায়ের জোরে থামিয়ে রাখতে চেষ্টা করেন), মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিলো না। এসবই হতো ধর্ম এবং সমাজের নামে।

বিজ্ঞানের এতো প্রসারের পরেও এখনো বাচ্চা না হওয়া টা মেয়েদের কারণে বলে বেশির ভাগ মানুষ মনে করে। সন্তানের জন্য একের অধিক বিয়ে করাটাও কোনো আশ্চর্য বিষয় নয়। যৌতুকের জন্য প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতন একটা কমন ঘটনা। এবং যেখানে শারীরিক নির্যাতন হচ্ছে না সেখানে প্রতিনিয়ত মানসিক নির্যাতন। বউ ঘরের বাইরে কখন যাবে, কেনো রাত করে বাসায় আসবে, কেনো বাসায় রান্না থাকবে না, কেনো সন্তানের প্রপার যত্ন হচ্ছে না, কেনো সে স্বামীর সাথে তর্ক করছে এই বিষয়গুলোর জন্য এখনও অনেক জায়গাতেই মেয়েরা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং এবং ২৫ শতাংশ মেয়ে এবং ছেলে মনে করে এই নির্যাতন মেয়েদের প্রাপ্য। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে এক বছর অবর্ণনীয় কষ্ট এবং এরপর বড় করার অবর্ণনীয় কষ্টের পরেও সন্তানের অভিভাবকত্ব নির্ধারিত হয় ধর্ম এবং আদালত অনুযায়ী পুরুষদের পক্ষে। সন্তান বড় হওয়ার পর তার অভিভাবক এখনো আমাদের দেশে বাবাই হয়। জন্ম দিতে গিয়ে মা মৃত্যুর মুখোমুখি চলে যাওয়ার পরেও জন্ম দেওয়ার পর তাকে বড় করতে গিয়ে শারীরিক-মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ার পরেও মা সন্তানের অভিভাবকত্ব পায় না। খোঁড়া যুক্তি দেখানো হয় যেহেতু পুরুষ অর্থনৈতিকভাবে ভূমিকা রাখছে তাই সন্তান বাবার প্রাপ্য। পুরুষের সমগ্র অর্থনৈতিক ভূমিকা মায়ের এক মাসের সন্তান বহন করার কষ্টের সমতুল্য নয়। কিন্তু যুগে যুগে সমস্ত নিয়ম কানুন, সমাজ, ধর্ম ইত্যাদি পুরুষ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। তাই কোনো ধর্ম এবং কোনো নিয়মে মাকে সন্তানের অভিভাবকত্ব দেওয়া হয় নি।

খুব কমন একটা লাইন হচ্ছে তুমি সারাদিন বাসায় কী করো। সাম্প্রতিক একটা রিপোর্ট অনুযায়ী মেয়েরা সারাবিশ্বে ৩২৬ কোটি ঘণ্টা গৃহস্থালি কাজ করছে এবং এই কাজ অর্থনৈতিকভাবে মূল্যায়িত নয়। বাংলাদেশ গৃহিণীদের ঘরের কাজের যদি অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারিত হতো তাহলে সেটা হতো জিডিপির ৪৮%। ব্যক্তিগতভাবে যদি একজন রান্না করার এবং ঘরের কাজ করার লোক রাখতে হয় এবং এর সাথে যদি একজন বাচ্চা পালার জন্য মানুষ রাখতে হয় যে টাকা খরচ হবে সেটা এখনো বেশিরভাগ মানুষ বহন করতে পারবে না। ঘরের মেয়ে বউ এইসব কাজ ফ্রিতে করছে এবং বিনিময়ে শুনতে হচ্ছে তুমি সারাদিন বাসায় থেকে কী করো, তুমি কী বুঝবা টাকা উপার্জনের কষ্ট। ব্যক্তিগতভাবে আমি বাইরে কাজ করি, আমি টাকা উপার্জন করি এবং যেহেতু আমি একা থাকি সে জন্য আমার নিজের জন্য টুকটাক ঘরের কাজ মাঝেমাঝে করতে হয়। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি আমি যে বাইরে প্রতিদিন ১০ ঘন্টা কাজ করি আর বাসায় সপ্তাহে ৪ ঘন্টা কাজ করি, কোনটা কষ্টের বেশি? আমি চোখ বন্ধ করে বলবো প্রতিদিন ১০ ঘন্টা কাজ করার চেয়ে বাসার ওই ৪ ঘণ্টা রান্না এবং ঘরের কাজে কষ্ট বেশি।

এখন বেশিরভাগ মেয়েরাই কর্মজীবী এবং এখন বেশিরভাগ মেয়ে সংসারে অর্থনৈতিকভাবে অবদান রাখছে। কিন্তু এখনো যেসব নিয়মকানুনের পিছনে প্রধান যুক্তি ছিলো "ছেলেরা যেহেতু উপার্জন করে তাই তারা এই সুবিধাটুকু পাবে" এটা বদলায় নি। মেয়েদের এই ক্যারিয়ার গড়তে যে পরিমাণ বাধার মুখে পড়তে হয় পরিবার থেকে সমাজ থেকে, ঘরে বাইরে যে পরিমাণ নিগৃহীত হতে হয় তার অর্ধেক একটা ছেলের ফেস করতে হয় না। প্রতিদিন একটা মেয়ে পড়তে গিয়ে কিংবা কাজের জন্য বাইরে গিয়ে যে পরিমাণ সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট এর শিকার হয় সেটা অকল্পনীয়। এমনকি উচ্চশিক্ষিত বলে পরিচিত মানুষেরাও তাদের নারী সহকর্মীদের কমন কিছু কথা বলেন যেটা অনায়াসেই সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট। তাই আমি স্পেসিফিক্যালি সবসময় মেয়েদের অভিবাদন জানাই এবং আমার দৃষ্টিতে একই পজিশনের একজন পুরুষ এবং একজন নারীর মধ্যে সব সময় নারীটি এগিয়ে। কারণ আমি জানি তাকে কী কী বাধা জয় করে এই পর্যায়ে আসতে হয়েছে।

নারী দিবস পৃথিবীর সকল মেয়েদের এই অবিরাম সংগ্রামের জন্যই উৎসর্গকৃত। অতীত এবং বর্তমান মেয়েদের যে পরিমাণ সংগ্রাম করতে হয়েছে তাদের অধিকারের জন্য, নরমাল কাজের জন্য, যেটা শুধুমাত্র তারা নারী বলেই পায় নি, তাদের জন্য উৎসর্গকৃত। আর তাই নারী দিবস আসলেই কিছু মানুষের "মানুষ দিবস চাই" কথাটা শুনলে আমার হাসি আসে। মেয়েদেরকে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে, মেয়েদেরকে ভোট দিতে দেওয়া হয় নি, মেয়েদেরকে এখনো ঘরের বাইরে যেতে অনুমতি নিতে হয়, এখনো সন্তানের যে কোনো খারাপ কাজের জন্য মাকে দায়ী করা হয়, এখনো মেয়েদের গৃহস্থালি কাজের মূল্যায়ন হয় না, প্রতিদিন শত শত ধর্ষণ সবকিছুই মেয়েরা স্পেসিফিক। কাজেই এখনো "মানুষ দিবস চাই" মার্কা হাস্যকর কৌতুকের কোনো সুযোগ নেই।

পৃথিবীর সকল নারীকে অভিবাদন, যারা তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছেন এবং যারা স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন নি, সবাইকেই। সুসময় আসবে, আসবেই।


  • ১২৮৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সোনম আক্তার

সোনম আক্তার, সহকারী অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। পিএইচডি স্টুডেন্ট, সেন্টার ফর ট্রানসলেশনাল নিউরোমেডিসিন, ইউনিভার্সিটি অফ কোপেনহেগেন, ডেনমার্ক।

ফেসবুকে আমরা