সুমনা চৌধুরী

পেশাগত জীবনে শিক্ষিকা সুমনা চৌধুরী বর্তমানে আসাম প্রবাসি।

#metoo- হ্যাঁ, আমিও

সোস্যাল মিডিয়ায় শুরু হওয়া একটি ক্যাম্পেইন #me_too। টুইটার ও ফেসবুকের দেওয়ালে এতো সংখ্যক ‘মি টু’-র হ্যাশট্যাগ হয়েছে যা দেখে বোঝা যাচ্ছে যৌন হয়রানি কতোটা ব্যাপক, কতটা বিশাল তার পরিধি, রোজ কত সংখ্যক নারী যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছেন!

আলোড়ন শুরু করেছিলেন হলিউডের এক অভিনেত্রী। হ্যাঁ আলোড়নই। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে আওয়াজ উঠলো, আমিও, হ্যাঁ আমিও! #metoo - এই ছোট একটা হ্যাশট্যাগ লক্ষ-কোটি মেয়ের মুখে ভাষা জুগিয়ে দিলো। বুক ফাটছিলো, কিন্তু কিভাবে বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। মাত্র একটা ফুলকি বিস্ফোরণে পরিণত হলো। সমাজ, লোকলজ্জার ভয়ে যে দরজা এতদিন বন্ধ ছিলো, আজ যখন খুললো, তখন বেরিয়ে আসুক সব বিষ, সাফ হয়ে যাক সব জঞ্জাল।

ঘটনা এক : বয়স তখন পাঁচ। প্রথম শ্রেণিতে পড়ি। ছোটো থেকে আমি প্যান্ট আর গেঞ্জিতেই অভ্যস্ত ছিলাম। স্কুলেও যেতাম প্যান্ট আর শার্ট বা গেঞ্জি পরে। আমাদের স্কুল ছিলো ছেলে মেয়ে কোম্বাইন। ক্লাস ফাইভের দাদারা একদিন প্ল্যান করলো আমি ছেলে না মেয়ে সেটা দেখবে! তো দেখার উপায় কি? আমার প্যান্ট খুলে দেখবে আমি ছেলে না মেয়ে!! টিফিনের সময় চার/পাঁচজন দাদা আমায় মাঠের এককোনে প্যান্ট খোলার জন্য চেপে ধরে। আমি তখন রাগে একজনের হাত কামড়ে দিয়েছি, ঠিক তখনই ছেলেগুলোর চিৎকার শুনে স্কুলের দারোয়ান দেখতে পায়, এবং আমাকে হেড স্যারের ঘরে নিয়ে আসে। আমি ভয় আর রাগে কাঁপছিলাম। তখন জানতাম না এটা যৌনহেনস্তা কি না!! পাঁচ বছর বয়েসে বোঝা সম্ভব ও ছিলো না কি না! শুধু বুঝতে পারছিলাম, যেটা ঘটতে যাচ্ছিলো সেটা খারাপ কিছু, যা হওয়া উচিত নয়। ঘরে এসে বাপীকে বললাম সব। বাপী পরদিন স্কুলে এসে খুব রাগারাগী করলেন, ঐ ছেলেগুলোর বাবাদের আনানো হলো স্কুলে। তারপর কি হলো জানি না, ঐ ছেলেগুলো দুর থেকে কমেন্ট পাস করতো, কিন্তু সামনাসামনি আর কিছু করেনি। তার কিছুদিন পর মা'র ট্র্যান্সফার হয়ে যায়, আর আমরা অন্য শহরে চলে আসি।

ঘটনা দুই : ক্লাস সিক্স। স্কুলের ছুটিতে বাসে করে গ্রামের বাড়ী যাচ্ছি। মা আর ছোটোবোন মুন একটা সিটে বসে, আর আমি সিট না পেয়ে মা'র সিটের পাশেই দাড়িয়ে আছি। হঠাৎ খেয়াল করি আমার পিঠে কে হাত বুলোচ্ছে। বুঝতে পারছি এই ছোঁয়াটা স্বাভাবিক নয়। পেছন ফিরে দেখি বাপীর বয়সী একটা লোক, একহাত আমার পিঠে, একহাত তার প্যান্টের সামনে। আমি সামনের দিকে সরে আসলাম। লোকটা কিছু সময় পর সামনের দিকে সরে আসলো। এবার চেষ্টা করলো আমার বুকে হাত দিতে। আমি যত সরি, লোকটাও তত সরে। সামনের দিকে আরো মানুষ দাড়িয়ে, বেশী সরতে ও পারছি না। কোনোরকম সিঁটিয়ে দাড়িয়ে রইলাম। মাকেও বলতে পারছি না, সঙ্কোচবোধ থেকে। বললেও মা কি করতে পারতেন জানি না। হয়তো মাও লোকলজ্জার ভয়ে লোকটাকে কিছুই বলতেন না। যতক্ষণ দাড়িয়েছিলাম আমার একটাই কাজ ছিলো লোকটার হাত ঠেলে সরানো। কিছু সময় পর মা'র পাশের সিটের মহিলা নেমে যাওয়ায় ঐ সিটে বসি।

ঘটনা তিন: ক্লাস সেভেন। অঙ্ক ক্লাস। অঙ্ক দেখার বাহানায় স্যারের পিঠে হাত বুলানো। কিছু বলতে পারতাম না। সিঁটিয়ে থাকতাম। অঙ্ক ক্লাস ভয় পেতাম।

ঘটনা চার : ক্লাস এইট না নাইন। শীতকাল। আমি কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছি। পিসতুতো এক দাদা এসেছে ঘরে। কিছু সময় পর ঐ দাদাটাও আমার কম্বলের নিচে পা ঢুকিয়ে বসলো। একটু সময় পরে দেখি আমার ঘাড়ে আর পিঠে মৃদু চাপ। সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে উঠি। অন্য ঘরে চলে যাই।

ঘটনা পাঁচ : আমরা তখন ভাড়া থাকতাম একটা ঘরে। স্নানঘর ছিলো একটু দুরে। স্নানঘরের দেওয়াল বেয়ে একটা নারকেল গাছ ছিলো। গাছ আর দেওয়ালের মাঝ বরাবর একটা জায়গা এক ইট ফাঁক ছিলো। একদিন স্নান করার সময় দেখি ঐ ফাঁকা জায়গা দিয়ে ঘর মালিকের ছেলে তাকিয়ে আছে। যখন দেখলো আমি তাকে দেখতে পেয়ে গেছি, তখন চলে গেলো। তারপর থেকে আমাকে নানাভাবে উত্যক্ত করার চেষ্টা করতো। কিন্তু ততদিনে ভয় পাওয়া ভীরু মেয়ে থেকে আমি রাগী, সাহসী, মারকুটে বদনাম কুড়িয়েছি। তাই ঐ ছেলেটার সাহসও আর বাড়েনি।

ঘটনা ছয়: একাদশ শ্রেণি। এন সি সি করতাম। মেয়েদের প্যারেড আলাদা হতো, ছেলেদের আলাদা। প্যারেড করার সময় দেখতাম কিছু ছেলে আমাদের দিকে তাকিয়ে অশ্লীল ভাবে কমেন্ট পাস করছে।

ঘটনা সাত : ফেইসবুক। প্রায় রোজদিন কোনো না কোনোভাবে যৌনহেনস্তা চলছে। অশ্লীল মেসেজ, ভিডিও, ছবি। কত ব্লক করবো বলতে পারেন?

ঘটনা আরো অনেক আছে, ভীড় রাস্তা, বাস, অটো এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে পুরুষের নোংরা হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে হয় নি!! আমার কিংবা আমাদের একটাই অপরাধ, আমরা মেয়ে। মেয়েদের ভোগ করা যায় যখন তখন, যেখানে সেখানে তার গায়ে হাত দেওয়া যায়, কমেন্ট পাস করা যায়, হায়েনার মতো ধর্ষণ করা যায়, ধর্ষণের পর তার রক্তাক্ত দেহ নর্দমায় ছুড়ে ফেলা যায়, যা খুশী তা করা যায় তার সাথে। পাঁচ বছর বয়স হোক বা পঞ্চাশ বছর -মেয়ে মানেই পুরুষদের কাছে যৌন চাহিদা মেটানোর মেশিন। যৌনতার জন্য একজন পুরুষের একটি যোনী হলেই চলে, জরায়ু হলেই চলে। তার বয়স দেখা লাগে না, সম্পর্ক দেখা লাগে না, ইচ্ছে-অনিচ্ছে দেখা লাগে না, প্রেম দেখা লাগে না, সময় দেখা লাগে না, সমাজ, বিবেক কিছুই লাগে না।

যৌনহেনস্তাকারী পুরুষের একমাত্র গন্তব্য মেয়েদের অন্তর্বাস আবৃত স্থানসমূহে। নারী হিজাব পরুক, বোরখা পরুক বা আলখাল্লা, পুরুষের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি ঠিকই খুঁজে নিবে মেয়েদের গোপনীয় সব অঙ্গ। মেয়েদের হেনস্তা হতে হবে হিজাবের দেশে, মেয়েদের হেনস্তা হতে হবে হিজাব না থাকা দেশে, সর্বত্র। এই পৃথিবীতে কোথাও মেয়েদের কোনো নিরাপদ স্থান নেই। স্কুল, কলেজ, অফিস, হাসপাতাল, লিফ্ট, আদালত, এমনকি নিজের ঘরও নিরাপদ আশ্রয় নয়। হঠাৎ জঙ্গল থেকে লোকালয়ে এসে পড়া কোনো পশুও এতটা অনিরাপদ নয়, যতটা এই পৃথিবীতে মেয়েরা।

আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমার পরিচিত প্রত্যেকজন মেয়ে জীবনের কোনো না কোনো সময় যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছেন, ক্ষেত্রবিশেষে আজও হচ্ছেন। পৃথিবীর সব দেশে, সমাজে, ক্ষমতার সব স্তরে নারীর যন্ত্রণা একই। হ্যাঁ, উন্নত বিশ্বে হয়তো তৃতীয় বিশ্ব থেকে সংখ্যায় কম, কিন্তু আছে। আফ্রিকা থেকে শুরু করে মিসর, আরব, আমেরিকা, রাশিয়া, ভারত সহ এই উপমহাদেশ, কোথাও জীবনে কখনো যৌন হয়রানির শিকার হননি—এমন নারী খুঁজে পাওয়া ভার। সাড়ে সাত বিলিয়ন মানুষের পৃথিবীতে তিন বিলিয়ন মানুষ যদি যৌন হেনস্তার শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে এটা মানবতার লজ্জা!!

আমাদের সমাজে এখনো যৌন হেনস্তাকে খুব স্বাভাবিক ভাবে দেখা হয়। ছেলেরা ওরম একটু করবেই, মেয়েটা কেনো এরকম পোষাক পরলো? মেয়ে দেখালে ছেলে দেখবে না? মেয়েমানুষ যেখানে সেখানে গেলে এরকম তো হবেই, ইত্যাদি বলে যৌনহেনস্তাকারীদের আরো সোহাগ দিয়ে মাথার উপর তোলে আমাদের সমাজ, তাদের শাস্তি তো দুরের কথা, এইভাবে আমাদের সমাজে গড়ে উঠেছে যৌনহয়রানী করার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে ছেলেরা যুবক হয়ে ওঠার অংশ হিসেবে শেখে যৌন হয়রানী। বন্ধুরা বাজি ধরে রাস্তার মেয়েদের উত্যক্ত করে, ফিগার নিয়ে কটুক্তি করে, স্নানরতা মেয়েদের লুকিয়ে বা প্রকাশ্যে দেখে, শিস দেয়, হিন্দি গানের লাইন গায়, খারাপ কথা বলে।

অনেকেই হয়তো এখন এই স্লোগান নিয়ে উপস্থিত হবেন, "সব পুরুষ সমান নয়", তাদের বলে রাখি, যৌন হয়রানি যারা করে তারা কোনো আলাদা পৃথিবীর মানুষ নন, তারা আপনাদেরই বন্ধু, ভাই, বাবা, দাদা, কাকা, পিসে, মেসো, দাদু, শিক্ষক, উকিল, ডাক্তার, সহকর্মী, সহপাঠী। আপনাদেরই স্বজাতি। যৌন হয়রানী অপরাধ। এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক আচরণ নয়। এবং ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠার সঙ্গেও এর কোনো সম্পর্ক নেই। আপনি নিজে হয়তো হয়রানী করেন না, কিন্তু আপনি যখন চুপ করে থেকে এই সংস্কৃতি কে উস্কে দেন, তখন আপনিও একজন সম্ভাব্য হয়রানীকারক। যৌন হয়রানী করে পুরুষরা, তাই একে বন্ধ করতে হলে পুরুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে, তাদেরকেই সচেতন হতে হবে।

এখন যারা বলবেন, 'ফেইসবুকে এসব লেখে কি হবে' -তাদের বলি, অনেক কিছুই হবে। ফেইসবুকে তো এই সমাজের বাইরের কেউ আসে না। এই #metoo দেখে যদি পুরুষরা এখন থেকে বদলাতে চায়, বুঝতে শেখে এই পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ ভালো নেই, কষ্টে আছে, যন্ত্রনায় আছে, মানসিক অবসাদে আছে, ভয়-শংকায় সিটিয়ে আছে, সর্বোপরি পুরুষদের ঘৃণা করছে - তাই তাদের বদলাতে হবে, মানুষের পৃথিবীতে জানোয়ার না হয়ে মানুষের মতো থাকতে হবে, বাঁচতে হবে, বাঁচাতে হবে -এই আহ্বান জানিয়েই এই লেখা। কেমন হয় আজ থেকে যদি পুরুষরা কখনো যৌন হয়রানি করে না? কেমন হয় যদি নিজের বন্ধু, ভাই, দাদা, ছেলেকে আড়াল না করে যৌনহেনস্তা যে অপরাধ সেটা বোঝালে? আপনারাই চিন্তা করুন বলুন তো!!

আর মেয়েরা, আর কত লুকিয়ে বাঁচবে? নিজেদের প্রতি হওয়া অন্যায়কে অন্যায় বলতে শেখো। মুখ ফুটে নিজের প্রতি হওয়া প্রত্যেকটা অন্যায় চিৎকার করে শোনাও সবাইকে। তোমার সেই চিৎকারে প্রত্যেকটা যৌনহেনস্তাকারী পুরুষ যেন লজ্জায় মাটিতে মিশে যায়। তাদেরকে বুঝিয়ে দাও তোমার প্রতি হওয়া যৌনহেনস্তায় তুমি লজ্জিত নও। বরং লজ্জা তাদের পাওয়া উচিৎ যারা তোমার সাথে এরকম করে!! মহাশ্বেতা দেবীর দ্রৌপদীকে মনে আছে?? সেনানায়কের সামনে যে আকাশচেরা, তীক্ষ্ণ গলায় বলেছিলো, "কাপড় কী হবে, কাপড়? লেংটা করতে পারিস, কাপড় পরাবি কেমন করে? মরদ তু?"

#Metoo আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুধু মেয়েরা নয়, পুরুষরাও সচেতন হয়ে ওঠুক। সামাজিকভাবে সোচ্চার হোক। যৌন হেনস্তা পৃথিবীর ইতিহাস থেকে মুছে যাক। সারা পৃথিবীর মানুষ জানুক এ পৃথিবীতে আর যৌন হেনস্তা হয় না!!

#I_am_not_a_victim
#i_am_a_survivor
#Me_Too

1815 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।