বই আলোচনা: ‘দি ক্রিসেন্ট আন্ড দি পেনঃ দি স্ট্রেইঞ্জ জার্নি অফ তসলিমা নাসরিন

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৭ ৬:২৩ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


বহু আকাঙ্ক্ষিত বইটাকে আজকে হাতে পেলাম। অনেকদিন ধরেই আগ্রহ ছিলো বইটা কেনার। কিন্তু, কেনা হয়নি। সপ্তাহ দুয়েক আগ অ্যামাজন থেকে কিনতে গেলাম।। গিয়ে দেখি ওখানে নেই বইটা। শেষে অর্কবুড়ার সাহায্য নিয়ে ব্লু ক্লাউড বুকস থেকে অর্ডার করলাম। আজ মেইল বক্স খুলে দেখি হাজির হয়েছেন তিনি।

যে বইটার কথা বলছি, সেটার নাম ‘The crescent and the Pen: the Strange Journey of Taslima Nasrin’. প্রকাশিত হয়েছে ২০০৬ সালে আমেরিকা থেকে। প্রকাশক হচ্ছে প্রেইগার পাবলিশার্স। এই বইটার লেখক হচ্ছেন হানিফা ডীন। ইনি অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর মুসলিম মাইনোরিটিস এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো।

বইটা লেখার জন্য হানিফা ডীনকে ফান্ড দিয়েছিলো অস্ট্রেলিয়া কাউন্সিল ফর আর্ট। এটা অস্ট্রেলিয়ান সরকারের একটা অংশ। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০০ পর্যন্ত বইয়ের তথ্য সংগ্রহের কাজ করেন তিনি। এই তথ্য সংগ্রহ এবং লেখার রসদ জোগাড় করার জন্য হানিফাকে তিনটা মহাদেশের বিভিন্ন দেশে ঘুরতে হয়েছে। নিতে হয়েছে শত খানেকেরও বেশি লোকের সাক্ষাৎকার। দুইশো ঘণ্টারও বেশি টেপড সাক্ষাৎকার ঝুলিতে পুরতে হয়েছিলো তাঁর।

তসলিমাকে নিয়ে এই বইটা লিখতে গিয়ে তসলিমার অতীত থেকে যাত্রা শুরু করেন হানিফা। এটা করতে গিয়ে পাঁচবার তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। শুধু বাংলাদেশেই না, তিনি ভ্রমণ করেছেন কোলকাতা, লন্ডন, স্টকহোম, কোপেনহেগেন, হেলসিংকি, বার্লিন, কলন, প্যারিস, নিউ ইয়র্ক এবং আটলান্টায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, পেন, আর্টিকেল নাইন্টিন, রিপোর্টার্স স্যান ফ্রন্টিয়ার, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, উইমেনস ওয়ার্ল্ড এই সমস্ত মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রথম সারির কর্মীদের সাথে দেখা করেছেন তিনি। ও হ্যাঁ, এই সময়কালের মধ্যে তসলিমার সাথেও সাক্ষাৎ হয়েছে তাঁর।

 

 

তসলিমা নাসরিন লেখালেখি করেন। তিনি একজন নারীবাদী, সেই সাথে অত্যন্ত বিখ্যাত একজন মানুষও। শুধু যে বাংলাদেশেই তিনি বিখ্যাত তা নন, তাকে বিশ্বের বহু দেশের মানুষই তাঁকে এক নামে চেনে। তাঁর এই পরিচিতি লেখালেখির কারণেই, তবে সেটা তাঁর উঁচু মানের জন্য নয়। লেখালেখির ‘অপরাধে’ তাঁকে দেশ থেকে এক প্রকার পালিয়েই বিদেশে চলে আসতে হয়েছিলো। নব্বই দশকের শুরুর দিকে লজ্জা নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন তিনি। এই উপন্যাসে বাবরি মসজিদ ভাঙার পরবর্তী সময়ে এর পালটা হিসাবে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর যে অবর্ণনীয় সাম্প্রদায়িক অত্যাচার হয়েছিলো, সেই অত্যাচারকে নির্জলা সত্যি হিসাবে তুলে ধরেছিলেন তিনি। এটি কোনো মহত্তম উপন্যাস ছিলো না, বরং বলা চলে যে উপন্যাস হিসাবে এটি অত্যন্ত নিম্নমানের ছিলো। কিন্তু তা সত্ত্বেও এতে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং চরম সত্য বক্তব্য ছিলো। স্বাভাবিকভাবেই তসলিমার এই সত্যকথনকে বাংলাদেশের মোল্লারা হজম করতে পারে নি। একে তো মেয়ে, তার উপরে খোলামেলাভাবে নারীবাদী তিনি, সেই সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে বই লিখেছেন, কাজেই মোল্লারা তাঁর মাথার দাম ধার্য করে দেয়। শুরুর দিকে প্রাণ বাঁচাতে একপ্রকার গৃহবন্দী হয়েই থাকতেন তিনি, সঙ্গিবিহীন অবস্থায় কোথাও যেতেন না। তাঁর এই দুঃসহ অবস্থার পরিত্রাণ ঘটে সুইডিশ পেনের কল্যাণে। তারা তাঁকে বাংলাদেশ থেকে উদ্ধার করে মুক্ত পৃথিবীতে নিয়ে আসে। সালটা ছিলো উনিশশো চুরানব্বই।

দেশ থেকে পালিয়ে পশ্চিমে আসার পরেই মানবাধিকার সেলিব্রিটি হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর নাম-ডাক ক্রমান্বয়ে বেড়ে উঠতে থাকে। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট তাঁকে শাখারভ পুরস্কার দেয় ১৯৯৪ সালে। পরবর্তী দুই বছর ইউরোপের নানা দেশের প্রেসিডেন্ট, চ্যান্সেলর, মেয়র এবং বিখ্যাত লেখকেরা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য উতলা হয়ে ওঠে। আজো তাঁকে একজন দুরন্ত নারীবাদী হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যিনি নিজেের দেশের মোল্লা এবং মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এবং যার কারণে তাঁর জীবন তখনও হুমকির সম্মুখীন ছিলো, আজো তা বিপদাপন্ন রয়েছে।

তসলিমা নাসরিনের বিষয়ে এটা হচ্ছে সর্বসাধারণ ধারণা এবং এই ধারণাকেই বিশ্বাস করে সারা বিশ্ব। কিন্তু, হানিফা তাঁর বই ‘The Cresent and the Pen’ এ এই প্রচলিত ধারণার বিপরীত ধারণাকেই প্রকাশ করেছেন। তসলিমাকে ‘উদ্ধার’ করার আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইন এবং ক্রুসেডের পিছনের প্রকৃত সত্যকে আসলে উন্মোচিত করা হয়নি, এটাই হচ্ছে হানিফার মতামত। আর তাঁর এই মতামত গড়ে উঠেছে তাঁর দীর্ঘ গবেষণা এবং সাহিত্য গোয়েন্দার মতো তসলিমার পিছু ধাওয়া করার মাধ্যমে। তসলিমার ক্ষেত্রে যা ঘটেছিলো, তার সরল যে ভাষ্য আমরা পাই, সেটার আড়ালে রয়ে গিয়েছে জটিল কিছু ঘটনাপ্রবাহ, উদ্দেশ্য, স্বার্থ এবং গুঢ় কারণ। আসল ঘটনা এবং শ্রুতিকথা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। হানিফা তাঁর বইয়ে এইসব মিথ বা শ্রুতিকথাকে অতি সাবধানে বাতিল করার প্রচেষ্টা নিয়েছেন।

পুরো বইটা পড়া শেষ হয়নি এখনো। সত্যি কথা বলতে আসলে একেবারেই শুরুতে আছি আমি। পুরোটা পড়ার পরেই বুঝতে পারবো হানিফা তাঁর প্রচেষ্টায় কতোটুকু সফল হয়েছেন। তসলিমার বহু কিছু যে মিথ, সেটা আমরা নিজেরাই জানি। বিশেষ করে আমরা যারা বেড়ে উঠেছি তাঁর সমসাময়িককালে। তাঁর বিরুদ্ধে দেশে আন্দোলন, তাঁর বিদেশে পালিয়ে যাওয়া, বিদেশে বসবাস, সবই ঘটেছে আমাদের চোখের সামনে। এ কারণে, তাঁকে নিয়ে আমাদের প্রজন্মের আবেগ এবং উচ্ছ্বাসটা খুব একটা বেশি না। কিন্তু, ইদানিং ফেসবুকে দেখি তাঁকে নিয়ে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের শ্রুতিকথা। নতুন প্রজন্মের অনেকেই তাঁর বিষয়ে প্রবলভাবে উচ্ছ্বসিত এবং উত্তেজিত। অনেকেই তাঁর অন্ধ ধরনের ভক্তও। হানিফা ডীনের বইটা এইসব শ্রুতিকথাকে এড়িয়ে তসলিমা নাসরিনের বিষয়ে প্রকৃত সত্যকে তুলে ধরতে পারেন কিনা, সেটা দেখার আশায় এর পাতায় আপাতত নাক গুঁজে রেখেছি আমি।

 


  • ১৯১৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা