স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা

বুধবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৭ ৪:২৯ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


সেদিন একটা আড্ডায় আমির খানের নতুন মুভি, “সিক্রেট সুপারস্টার” নিয়ে কথা হচ্ছিলো। সবাই খুব প্রশংসা করছিলো, আমির খানের সিনেমা বলে কথা। এই ভালো – সেই ভালো ইত্যাদি। আমি অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে তারপর বলেই ফেললাম, আমার কাছে খুব ফরম্যাটেড ফিল্ম মনে হয়েছে, তেমন আলাদা কিছু লাগে নি। ইরানিয়ান মুভি গুলোতে সাধারণতঃ এই ঘটনাগুলো খুব অন্যরকম ভাবে চিত্রায়ণ করা হয়, সিনেমা মনেই হয় না, মনে হয়, পাশের বাড়িতেই কাউকে দেখছি। আ সেপারেশান, দ্যা কালার ওফ প্যারাডাইস, এম ফো মাদার, আ মোমেন্ট অফ ইনোসেন্স, হেয়ার উইথাউট মি সিনেমা গুলো দেখলে কখনোই মনে হয় না সিনেমা দেখছি। সিনেমা সুলভ কোনো ব্যাপারই থাকে না, থাকে কিছু হৃদয় নিংড়ানো কষ্টকর বাস্তবতা। যারা চুপচাপ ছিলো তারাও তখন বলেই ফেললো, হ্যাঁ, “সিক্রেট সুপারস্টার” তাদেরকেও হতাশ করেছে। তারা কিছু তামিল, মারাঠি সিনেমার কথা বললো, যেগুলোতে আরও বিস্তার ছিলো কাহিনী’র। কাহিনীর যে গভীরতা ছিলো, হতে পারত মা ও সন্তানদের সংগ্রামের একটি বাস্তবচিত্র সেদিক থেকে “সিক্রেট সুপারস্টার” একটি সম্ভাবনার অপমৃত্যু।

এক বাসায় হালিম খাচ্ছিলাম। “আসল হালিম”, আমার গলা দিয়ে কিছুতেই নামছিলো না কিন্তু অন্যরা বাটি ভরে ভরে খেতে খেতে প্রচুর প্রশংসা করছিলো। আমি বাটি আর চামচ নেড়ে চেড়ে যাচ্ছি, গৃহকর্ত্রী বেশ কয়েকবার বলে গেলো, খেয়ে নাও, জীবনে ভুলবে না, মামা হালিম খাওয়া জেনারেশান, আসল হালিম তো কি জিনিস জানো না। কিন্তু ক্রমাগত আমার বাটি চামচ নাড়াচাড়া দেখে পাশের জন বললো, কি রে, খেতে পারছিস না। আমি ভয়ে কোনো “টু” শব্দ না করে, মাথা নেড়ে জানান দিলাম, না পারছি না। পাশের জন উঠে আমার বাটি নিয়ে সিঙ্কে ঢেলে দিয়ে এলো, সাথে নিজের বাটিও ঢেলে দিয়ে এলো। এসে বসে তার পাশের জনকে চোখ ট্যারিয়ে জিজ্ঞেস করলো, খেলি পুরোটা? পাশের জন নিপাট ভদ্র, প্রথমে বুঝতে পারে নি, বেশ গদ গদ বলতে থাকলো, তখন আবার সে জিজ্ঞ্রেস করলো, পুরোটাই খেলি, খেতে পারলি? বোধহয় এন্টেনায় কিছু ধরা পড়লো, আমতা আমতা শুরু করলো, কি করবো? ভদ্রতা, দিয়েছে, খেতে তো হবেই ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিছু দিন আগেই ফরিদ কবির ভাই তার আর ঝর্ণা আপা’র একটা ছবি পোস্ট করলেন তাজমহলের সামনে সাথে তার স্মৃতিকথা। স্মৃতিকথা পড়তে অপূর্ব লেগেছে, সবাই তার প্রশংসা করছে, সাথে তাজমহলেরও। আমি শেষ পর্যন্ত বলেই ফেললাম, “তাজ” আমাকে টানে নি। জীবনের বড় একটি আশাভঙ্গ’তার নাম হলো “তাজমহল”। মসজিদ আকৃতির এই ইমারতটি দেখে আমি হতাশ হয়েছি। আমার অন্য কিছু আশা ছিলো। বরং আগ্রা ফোর্ট, যেখানে আওরঙ্গজেব, সম্রাট শাহজাহান আর তার কন্যা জাহানারা’কে আটকে রেখেছিলেন সেটি আমার অনেক মন ছুঁয়েছে, যমুনার তীর ঘেঁসে, এখনো কি বিষন্ন, যেনো পুরো নদী আর প্রাসাদে এখনও তাদের কান্না মিশে আছে। প্রথমে আমাকে বেশ কয়েকজন বললো, “তাজমহল” মানে শুধু পাথর আর ইমারত নয়, চর্ম চক্ষু দিয়ে দেখলে তো তাই দেখবো, মনের চোখ দিয়ে যদি দেখি, ভাবি, উপলব্ধি করি তাহলে এর আসল সৌর্ন্দয বুঝতে পারবো। আমি সারেন্ডার করে বললাম, অন্য কোনো জনমে হয়তো, এবার আর হলো না। অবাক হয়ে দেখলাম তারপর, নেহাত মন্দ নয়, আরও অনেক বন্ধু নিজ থেকে এসেই বললো, তারাও চর্ম চক্ষুতে “তাজমহল” দেখেছে এবং হতাশ হয়েছে।

মা হয়েও আমার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। সিনেমায় দেখেছি, আজ বাচ্চা হলো, কাল শর্মিলা ঠাকুর, বাচ্চার কান্না শুনে আকাশ পাতাল এক করে ফেললো। নিজের বেলায় তেমন কিছু হচ্ছে না দেখে নিজের মনুষ্যত্ব বোধ নিয়ে খুব হীনমন্যতায় ছিলাম। এর বেশ অনেকদিন পর বান্ধবী’রা আমাদের দেখতে এলে, একদিন কথায় কথায় সাহস করে বলেই ফেললাম, দেখি আস্তে আস্তে অন্যরাও তাদের মনের কথা বলছে। মা হওয়া, একটি অন গোয়িং প্রসেস। মা আর বাচ্চা যত সময় একসাথে কাটাবে, যত সুখ দুঃখের স্মৃতি এক সাথে জমা হবে, বাচ্চার কান্না, বাচ্চার হাসি, বাচ্চার খেলা এ সবই মা’কে বাচ্চার কাছে টেনে আনে আর মায়ের এই নিঃশর্ত কাছে আসা টেনে আনে বাচ্চাকে তার মায়ের কাছে।

সত্যি কথা মাঝে মাঝে বলে ফেলার রিস্ক অনেক কিন্তু একটা গেইন থাকে, পোশাকী গল্পের বাইরে কিছু আটপোড়ে সত্যি গল্প শুনতে পাওয়া যায় যেখানে রঙচঙ থাকে না। নিজেকে যাচাই করা যায়, ঝালিয়েও নিয়ে যায়। মাঝে মাঝে সত্যি উচ্চারণি এই সাহসটা আমি পেয়েছিলাম, খুব ছোট একটা বাচ্চার থেকে।

একবার এক বাসায় মিলাদ হচ্ছিলো, হুজুর ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলেই যাচ্ছে তো বলেই যাচ্ছে, কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। বড়রা কেউ বসে আছে তো কেউ এই ঐ উছিলায় এদিক ওদিক করছে, মহিলা’রা মাঝে সাঝে টুকটাক কথা সেরে নিচ্ছে, ছোট’রা এই অবসরে একটু দুষ্টুমি করছে। মিলাদ শেষ হওয়ার পর বাচ্চাটির মা, বাচ্চাটিকে খুব বলছিলো, হুজুর ভাল ভাল সব কথা বলছিলো, তুমি শুনছিলে না, দুষ্টুমি করেই যাচ্ছিলে, ঠিক করছিলে কাজটা? বাচ্চাটা এমনিতে লক্ষী, বাবা মায়ের কথা শোনে, পড়াশোনায়ও ভালো। মায়ের কথা শুনতে শুনতে এক পর্যায়ে বলে উঠলো, আমি জানি হুজুর ভালো ভালো কথা বলছিলো, কিন্তু ভালো কথা শুনতে বেশিক্ষণ ভালো লাগে না আম্মু।

এই সাধারণ কিন্তু সহজ আর সত্য কথাটি উচ্চারন করতে একটা বাচ্চা মেয়ে’র অনেকটাই দৃঢ়তা আর আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন হয়। সমাজের বেশি’র ভাগ মানুষই সুযোগ সন্ধানী। সুবিধা যেখানে পাবে সেখানেই গলা মিলিয়ে ফেলে। সেখানে খুব ঠান্ডা, বিনম্র, আস্তে কিন্তু দৃঢ় গলা’র এই কথা গুলো কিন্তু কিছুতেই ফেলনা নয়। কারো না কারো কানে তো পৌঁছবে, সেটাই সার্থকতা। আওয়াজটা খুব অল্প থাকে কিন্তু থাকে। হয়তো ঝাঁকের কই হয়ে ক্ষণিক সুবিধে আনন্দ নিয়ে হারিয়ে যায় কিন্তু মৃদ্যু আওয়াজটা থেকে যায়।

 


  • ৮৫৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তানবীরা তালুকদার

জন্ম ২৯শে আষাঢ়, ঢাকা। আপাতত নেদারল্যান্ডস প্রবাসিনী। কিন্তু দেশের সাথে নাড়ির যোগাযোগ কাটেনি। পেশায় একাউনটেন্ট। বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের নানান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে আছেন। অবসর সময়ে আবৃত্তি, নাচ ও নাটকের পাশাপাশি লেখালেখি করার চেষ্টা করেন। তাঁর লেখায় নিছক গল্প নেই; রয়েছে সত্যের ওপর দাঁড়ানো এবং জীবন দিয়ে উপলব্ধি করা অনুভূতির কথা। লিখছেন ছোটবেলা থেকেই। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ “পাহাড় আর নদীর গল্প” (২০১৩) এবং উপন্যাস “একদিন অহনার অভিবাসন” (২০১৪)। ২০১১ সালে ডয়েচে ভেল আয়োজিত “ববস” সেরা ব্লগ নির্বাচন প্রতিযোগিতায় তাঁর নিজস্ব ব্লগ http://ratjagapakhi.blogspot.nl/ মনোনয়ন পেয়েছিল। “ইয়েপ আর ইয়ান্নেকে” ডাচ ভাষা থেকে বাংলায় তাঁর প্রথম অনূদিত বই।

ফেসবুকে আমরা