সিমন দ্য বোভোয়ার : দি সেকেন্ড সেক্স

সোমবার, জানুয়ারী ২৯, ২০১৮ ৫:১৭ PM | বিভাগ : আলোচিত


মার্কহাম শহরে একটা ভ্যালু ভিলেজ আছে। এটা মার্কহাম রোডের উপর। আমার বাসা থেকে পনেরো মিনিটের ড্রাইভ। প্রায়ই যাই ওখানে আমি। ভ্যালু ভিলেজটা পুরনো জিনিসপত্র বিক্রির দোকান। সস্তায় পুরনো কাপড়চোপড় এবং নানাবিধ জিনিস পাওয়া যায় এখানে। জিনিসপত্রের প্রতি আমার আকর্ষণ কম। আমি এখানে মূলত যাই বইয়ের খোঁজে। এই দোকানটার একটা অংশে পুরনো বই রাখা হয় কয়েকটা শেলফ জুড়ে। সেই সব শেলফ ঘাটলে প্রায়ই চমৎকার সব বই পাওয়া যায়।

আজকেও গিয়েছিলাম ওখানে। আন্না সাথে ছিলো। দুটো বই কিনলাম। একটা শার্লক হোমসের গল্পের সমাহার। বইটার নাম 'দ্যা কমপ্লিট শার্লক হোমস'। অন্য যে বইটা কিনেছি, সেটাই আসল। বইটার নাম 'দ্য সেকেন্ড সেক্স'। লেখকের নাম সিমোন দ্য বোভোয়ার। মূল বইটা ফরাসি ভাষায় লেখা। আমি যেটা পেয়েছি, সেটার অনুবাদক হচ্ছেন এইচ, এম পার্শলি।

সিমোনের বইটা এখানে পাবো, স্বপ্নেও সেটা কল্পনা করি নাই আমি। বইটা আগেও পড়েছি আমি। তবে ইংরেজিতে না, বাংলায়। এই বইটার বাংলা অনুবাদ করেছেন হুমায়ুন আজাদ। সেটাই পড়েছি আমি। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহেও বইটা রয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে পার্শলির করা এই ইংরেজি অনুবাদ থেকেই বাংলায় ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ অনুবাদ করেছেন তিনি।

সিমোনের জন্ম ১৯০৮ সালে প্যারিসে। মা ছিলেন গোঁড়া ক্যাথলিক, বাবা সন্দেহবাদী। তাঁর বাবা তাঁর সম্পর্কে গর্বের সাথে বলতেন, 'সিমোনের মগজ পুরুষের; সে পুরুষের মতো চিন্তা করে; সে পুরুষ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তাঁদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত করুণ হয়ে ওঠে। তাঁর মাকে সারাদিন ধরে গৃহস্থালির ক্লান্তিকর কাজগুলো করতে হতো। মায়ের এই করুণ অবস্থা দেখে, একদিন সে নিজেও বাঁধা পড়বে নির্মম নিরর্থক এই নিয়তিতে, এই ভয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন সিমোন, গৃহিনী বা মা হবেন না তিনি কখনোই। তরুণী বয়সে ফরাসি দার্শনিক সার্ত্রের সাথে জড়িয়ে পড়েন প্রেম ও বন্ধুত্বের এক ব্যতিক্রমী সম্পর্কে। এক সাথে, এক ছাদের নীচে থাকেন নি তারা, আবার কেউ কাউকে ছেড়েও যান নি সারাজীবন। কিন্তু দাম্পত্য বা প্রেমের সম্পর্কের যে শুদ্ধতা, দেহ ও মনের সতীত্বের বাধ্যবাধকতা, সেটাকেও মেনে চলেন নি তাঁদের দুজনের কেউ-ই।

বাবা তাঁকে পুরুষ হিসাবে যতোটাই ভাবুক না কেনো, নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় কাজটা করে গেছেন তিনিই। ১৯৪৯ সালে দুই খণ্ডে বের হয় তাঁর হাজার পৃষ্ঠার বই লা দ্যজিয়েম, যাকে ইংরেজিতে বলে দ্য সেকেন্ড সেক্স, বাংলায় দ্বিতীয় লিঙ্গ। হুমায়ুন আজাদ একে বলেছিলেন ‘পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতায় অপর, অপ্রয়োজনীয়, খাদ্য, রুদ্ধ, সীমাবদ্ধ, বিকলাঙ্গ, দাসী ও কামসামগ্রিত স্তরে থাকার জন্যে দণ্ডিত নারীর পরিস্থিতি সম্পর্কে অদ্বিতীয় গ্রন্থ, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও শিল্প সৌন্দর্যে যা অতুলনীয়।’

বিশ শতকের প্রথমার্ধ ছিলো নারীদের জন্য এক অন্ধকার সময়। নারী মুক্তির কথা স্তব্ধ হয়ে গেছে। নারীদের ধাক্কা দিয়ে ঢোকানো হচ্ছে ঘরসংসারে। নারীর চিরন্তনরূপে তাকে ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে পুরুষতন্ত্র। ঠিক এরকম এক সময়ে ঘন অন্ধকারের মধ্যে আলোর বার্তা নিয়ে আসে দ্য সেকেন্ড সেক্স। বিংশ শতাব্দীতে এই বইয়ের পৃষ্ঠাসমূহ থেকে বের হয়ে এসেছে অসংখ্য নারীবাদী। প্রথম প্রকাশে পাঠকদের বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিলো বইটা। আজকে এতো বছর পরে এসেও এই বই সারা-বিশ্বের শুধু নারীদেরই না, পুরুষদেরও নাড়া দিয়ে চলেছে।

বইটা প্রকাশের আগ পর্যন্ত সার্ত্রের বান্ধবী হিসাবেই পরিচিত ছিলেন তিনি। টুকটাক লিখতে পারেন, কিন্তু লেখক হিসাবে নিজস্ব পরিচয় সেভাবে গড়ে ওঠে নি তাঁর তখনো। 'দ্য সেকেন্ড সেক্স' সেই অবস্থাকে নাড়িয়ে দেয়। বইটা তাঁর আকস্মিক রচনা বলে তিনি বলেছেন। তিনি আসলে নিজের সম্পর্কে লিখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আত্মজীবনীর মাধ্যমে সেটা করা যেতে পারে এই ধারণাটা তাঁর ছিলো না। সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের নিরিখে গদ্য রচনা করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করলেন, আগে তাঁকে নারীদের অবস্থাটা বর্ণনা করতে হবে। তিনি এটা তাঁর এক সাক্ষাৎকারে এভাবে বলেছেন, “One day I wanted to explain myself to myself …. And it struck me with a sort of surprise that the first thing I had to say was ‘I am a woman’”

১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাস থেকে ১৯৪৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত, এই দুই বছর ধরে বইটা লেখার জন্য গবেষণা কাজ চালান তিনি। তবে, এইটুকু টাইমফ্রেমের মধ্যে এটাকে বেঁধে রাখলে ভুল হবে। বইটার লেখার রসদ তিনি আসলে জোগাড় করা শুরু করেছিলেন এরও এক দশক আগে থেকে।

'ওয়ান ইজ নট বর্ন, বাট র‍্যাদার বিকামস এ উইম্যান' - সিমোন দ্য বোভোয়ার দুঃসাহসের সাথে এই ঘোষণা দেন তাঁর দ্য সেকেন্ড সেক্স বইতে। সাহিত্য, ইতিহাস, জীববিজ্ঞান এবং দর্শনের তত্ত্ব, তথ্য এবং পদ্ধতি ব্যবহার করে নারীর বিষয়ে প্রচলিত ধারণা এবং আসল তথ্যকে যাচাই-বাছাই করেন তিনি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী যে সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, শুধু সেটাকে চিহ্নিত করেন না তিনি, একই সাথে এগুলোর সম্ভাব্য সমাধানের পন্থাও দেখান তিনি।

শুরু থেকেই ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ ছিলো বিতর্কিত গ্রন্থ। বইটা প্রকাশের পরে তাঁর এক বন্ধু তাঁকে বলেছিলো, ‘তুমি কতোটা সাহসী তুমি? এই বই লেখার অপরাধে তুমি বন্ধু হারাবে।” প্রকাশের প্রথম সপ্তাহেই বইটার বাইশ হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়। বিক্রি হলেও প্রকাশ্যে কেউ-ই স্বীকার করতো না যে তারা বইটা পড়ছে। লুকিয়ে চুরিয়েই পাঠক তখন পড়েছে এই বই। এই বই পড়ার প্রতিক্রিয়া যে সবসময় ইতিবাচক ছিলো তা নয়। অনেকেই এই পড়ে যে আনন্দিত হয়েছে, শিহরিত হয়েছে, নতুন চেতনার জন্ম অনুভব করেছে বুকের মাঝে, আবার অনেকেরই অনুভূতিতে তীব্র নেতিবাচক আঘাত হেনেছে এই বই। এদের সকলেরই প্রতিক্রিয়া জমা হয়েছে বোভোয়ারের কাছে। তিনি লিখেছেন,

‘I received - some signed and some anonymous - epigrams, epistles, satires, admonitions, and exhortations addressed to me by, for example, “some very active memebers of the First Sex.” Unsatisfied, frigid, priapic, nymphomaniac, lesbian, a hundred times aborted, I was everything, even an unmarried mother. People offered to cure me of my frigidity or to temper my labial appetites; I was promised revelations, in the coarsest terms but in the name of the true, the good and the beautiful, in the name of health and even of peotry.’

বইটা প্রকাশের আগে পত্রিকায় এর একটা অংশ বের হলে এক ফরাসি লেখক চিঠি লিখে তাঁকে জানিয়েছিলেন যে তিনি লেখিকার যৌনাঙ্গের বিস্তৃত বিবরণ পেয়েছেন। বইটা বের হবার পরে ভ্যাটিকান তাঁর বইটাকে অনৈতিক বলে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেয়। এক মার্কিন সাংবাদিক লেখেন, লেখিকার যা দরকার তা হচ্ছে একটা উৎকৃষ্ট সঙ্গম।

আমেরিকান লেখক নেলসন আলগ্রেন সেই সময়ে সিমোনের সাথে দেখা করতে প্যারিস গিয়েছিলেন। সিমোনের প্রতি প্যারিসের লোকদের আক্রোশ দেখে তিনি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি দেখতে পান, সেখানে তাঁর কার্টুন করা হচ্ছে, তাঁকে নিয়ে হাস্যরস করা হচ্ছে, কোথাও কোথাও নির্দোষ কৌতুক করা হচ্ছে, কোথাও বা তাঁকে আক্রমণ করা হচ্ছে অত্যন্ত চাছাছোলাভাবে।

এই বইটা কেমন, সে সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদ দ্বিতীয় লিঙ্গ বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ বই হিসাবে কেমন? বলবো কি এটি আমার পড়া শ্রেষ্ঠ গদ্য বইগুলোর একটি; বলবো কি, যদিও এ-দুটির মধ্যে তুলনা চলে না, এটি ওয়ার অ্যান্ড পিস এর থেকেও উৎকৃষ্ট? কেনো বলবো না? তলস্তয় পৌরাণিক, অনেকাংশে ক্ষতিকর ও অতিমূল্যায়িত, আর দ্য বোভোয়ার ভবিষ্যতের। তত্ত্ব, দর্শন, ব্যাখ্যা প্রভৃতির কথা ছেড়ে দিলেও থাকে এর অনন্য শিল্পিতা, সৌন্দর্য, অজস্র উৎকৃষ্ট কবিতার রূপক, উপমা, চিত্রকল্প জড়ো হয়ে আছে এ-বইয়ে, এর বর্ণনাগুলোতে আছে এমন নিবিড়তা, যা ক্ষণেক্ষণে মন ও ইন্দ্রিয়গুলোকে দেয় পরম শিহরণ।”

এই বিশ্বের সবচেয়ে অব্যাখ্যাত এবং অপ-ব্যাখ্যাত প্রজাতিটির নাম হচ্ছে নারী। নারীকে পুরুষ যেমন জানে না পূর্ণাঙ্গভাবে, নারীও তেমনি চেনে না তাঁর নিজেকে সম্পূর্ণরূপে। নারী সম্পর্কে জানতে গেলে সিমোনের এই বই কাজ করে মাইলফলক হিসাবে। নারী সৃষ্টির এবং এর ব্যাখ্যার ঈশ্বরী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন সিমোন তাঁর এই গ্রন্থের মাধ্যমে। এই গ্রন্থ তাই শুধু নারীর জন্য আবশ্যিক পাঠ্য নয়, বইটা পুরুষের জন্যও পরম প্রয়োজনীয়। এক লিঙ্গকে অস্বীকার করে অন্য লিঙ্গ সাময়িকভাবে সন্তুষ্ট হতে পারে, কিন্তু মানব সভ্যতার পূর্ণ বিকাশে দুই লিঙ্গের সমতা এবং সমঝোতা সূর্যরশ্মির মতোই অপরিহার্য।


  • ২৬৬১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা