শুভ জন্মদিন লেখক তসলিমা নাসরিন

শনিবার, আগস্ট ২৫, ২০১৮ ১২:১১ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


আজ ২৫ শে আগস্ট, লেখক তসলিমা নাসরিনের জন্মদিন। চারিদিকে যেদিকেই দেখি, লক্ষ্য করছি মহা সমারোহে চলছে লেখকের জন্মদিন উৎসব পালন করার তোড়জোড়, প্রস্তুতিপর্ব। আমি ভেবেছিলাম কবিতা লিখবো। কিন্তু কবিতা লিখতে যে পরিমাণ পরিস্কার মাথার প্রয়োজন হয়, খোলা মনের প্রয়োজন হয়, এই মুহূর্তে আমি সেই পরিস্থিতিতে নেই। শরীরেও অস্বস্তিকর যন্ত্রণা। অনেক চেষ্টা করেও কবিতা লিখতে পারলাম না। তাই ভাবলাম মনের কথা লিখি। গল্প করি।

এমনই এক আগস্টে লেখকের সাথে আমার ফেসবুকে আলাপ হয়েছিলো। ঠিক সেই সময় আলাপ হয়েছিলো, যখন আমাকে মানুষ হয়ে বাঁচতে গেলে, আমার মনে, আমার চেতনায়, আমার আচরণে, চলাফেরায় আমূল পরিবর্তন আনতে হতো। অনেকটা মাছের খাবি খাওয়ার মতন আমার অবস্থা হয়েছিলো। কোনোকিছুই ঠিক করতে পারছিলাম না। চেষ্টা করছিলাম হয়তো ঠিক করার। কিন্তু সেসব ছিলো ব্যর্থ চেষ্টা। এমনকি ব্যর্থতা আমার নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিলো। আমি এক পুরুষতান্ত্রিক পরিবেশে চরম পুরুষতান্ত্রিক পরিবারে বড় হয়েছি। এই পরিবারে থেকে ভালো কিছু চিন্তা করা, শুধুমাত্র মানুষ হতে, এটা অনেকটা অলীক কল্পনা। এই পরিবারে হয় নারীকে নির্যাতিত হতে হয়, অথবা নারীও হয়ে ওঠে পুরুষতন্ত্রে অভ্যস্ত পুরুষতান্ত্রিক। আমিও ব্যতিক্রম হতে পারি নি। যেমন পরিবেশ, যেমন পরিবার, আমিও তেমনই হচ্ছিলাম। হতে গিয়ে সমাজে দেখলাম অনেক মানুষের মধ্যে আমি ভীষণ একা। আমার কলেজ জীবন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যখন নারী বন্ধুদের দেখলাম, আমার মনে হলো আমি যেন ওদের কারোর সাথেই ঠিকমতো মানিয়ে নিতে পারছি না। অথবা আমার নিজের চরিত্রের প্রতিই অনেক সময় সন্দেহ হতো, যে আমি হয়তো নারীর সাথে মিশতে চাইছি শুধুমাত্র শরীরের কাছাকাছি যেতে!

আমার এক প্রেমিকা ছিলো। মনে করি, মেয়েটির নাম নূপুর। মেয়েটি আমার থেকে সবকিছুতেই অনেক এগিয়ে ছিলো। চিন্তাতে, বুদ্ধিতে, মেধাতে, সবকিছুতেই ভীষণ এগিয়ে ছিলো। কিন্তু মেয়েটির একটিই দুর্বলতা ছিলো যে সে আমার প্রতি ভীষণ দুর্বল। আমিও ওর প্রতি দুর্বল ছিলাম। কিন্তু ক্রমশ এই দুর্বলতা পুরুষতন্ত্রের রূপ ধারণ করলো। আমি মেয়েটির ওপর প্রভুত্ব খাটাতে শুরু করলাম, মেয়েটিকে মানসিকভাবে নির্যাতন করতে শুরু করলাম। গায়েও হাত তুলতাম। মারতাম। মনে হতো ভুল করছি। অন্যায় করছি। কিন্তু নিজেকে একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম না। মেয়েটিও এসব মেনে নিতে শুরু করেছিলো। কিন্তু ওকে ভাঙতে ভাঙতে এতোটাই ভেঙে ফেলেছিলাম, যে অনেক বছর একসাথে থাকার পর, সে আর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আমার থেকে দূরে সরে যায়।

আমি চেয়েছিলাম মেয়েটি ফিরে আসুক। আমি ভালো হতে চেয়েছিলাম। পুরুষতন্ত্র ভেদ করে একজন ভালো মানুষ হতে চেয়েছিলাম।

লেখক তসলিমা নাসরিনের কথা শুনেছিলাম আঠার বছর বয়সে, আমার দিদির কাছে। যখন লেখককে কলকাতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, সেই সময় আমি লেখক তসলিমা নাসরিনের কথা প্রথম শুনি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেদিন লেখককে আমার হিরো বানিয়ে ফেলেছিলাম। সেই থেকে লেখক আমার অবচেতন মস্তিষ্কে ছিলোই। আরও পাঁচ বছর পর যখন নূপুর আমার জীবন থেকে সরে যায়, তখন আমি অসহায় হয়ে উঠেছিলাম ভীষণ। আমি একটি অবলম্বন চাইছিলাম, যে আমার চারপাশে একটি বেড়া তুলে দেবে যাতে কোনো খারাপ আর আমায় স্পর্শ করতে না পারে। একদিন ফেসবুকে লেখকের একটি লেখা দেখলাম। আমার মনে পড়ে গেলো, আঠার বছর বয়সে দিদির বলা কথাগুলি। আমার মনে পড়ে গেলো, সেদিন আমি এই লেখককে আমার হিরোর আসনে বসিয়েছিলাম। আমি লেখকের বইগুলি, বইগুলিতে লেখা অজস্র যন্ত্রণা, আদর্শের সাথে পরিচিত হতে থাকি। লজ্জা, আমার মেয়েবেলা, সেইসব অন্ধকার যতো পড়ি, যতো পরিচিত হই, ততোই মন শান্ত হতে শুরু করে। একটি উন্নত দিক আমার সামনে উন্মোচিত হতে থাকে। আমি অনুভব করতে শুরু করি, আমার ভিতরে পরিবর্তন আসছে। আমি মানুষ হয়ে উঠছি।

লেখকের লেখাগুলির মধ্যে আমি সবথেকে যেটি বেশি লক্ষ্য করি, তা হলো ধৈর্য, হার না মানা মানসিকতা, সত্যের জন্য অন্যায়ের সাথে আপসহীনতা। আমি মানুষটা তো পাল্টে যেতে শুরু করেছিলাম, কিন্তু নিজের অন্যায়গুলির জন্য প্রেমকে হারিয়ে ফেলা, এই যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হতে পারছিলাম না। একজন মানুষের প্রতি করা অন্যায়গুলির স্মৃতি থেকে আমি মুক্ত হতে পারছিলাম না। এমন মুহূর্তে লেখকের সাথে আমার ফেসবুকে আলাপ হয়। আমি আরও, আরও পাল্টে যেতে থাকি লেখকের স্নেহ পেয়ে। এবার আমার মধ্যে শুরু হয় অস্থিরতা, বাচ্চামি। এবার আমি ভীষণ মানুষে পরিণত হতে পেরেছিলাম। যন্ত্রণাগুলি থেকে মুক্ত হতে পেরেছিলাম। এরপর আমার জীবনে প্রেম আসে। ভালোবাসা আসে। এবার আমি আর আগের ভুলগুলি করি নি। হ্যাঁ, প্রেম টেকে নি। ভুল বোঝাবুঝিতে প্রেম নষ্ট হয়ে গেছে। আবারও দূরে সরে গেছে ভালোবাসার মানুষটি। কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি, আগে যেভাবে আমি অন্যায় করতাম, আর সেই অন্যায় আমি দ্বিতীয়বার করি নি।

এই তো কিছুদিন আগে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হওয়ার জন্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। অথচ কয়েকবছর আগেও আমি জানতাম না যে আমি কি হবো! কি হতে চাই! কি করতে চাই! লেখক তসলিমা নাসরিনের আদর্শ শুধু আমার চরিত্রেই বদল আনে নি, আমি মানসিকভাবেও আরও সমর্থ হতে শিখেছি। স্বপ্ন দেখতে শিখেছি। স্বপ্নকে সফল করতে শিখেছি। আমি যেমন আমার মা, বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ, একই কারণে আমি লেখক তসলিমা নাসরিনের প্রতিও ভীষণ কৃতজ্ঞ আমায় আলো দেখানোর জন্য, সঠিক পথ দেখানোর জন্য।

শুভ জন্মদিন আমার লেখক।

সুস্থ, সুন্দর বেঁচে থেকো ভালোবাসায় মেয়েমা।

সৌম্য।


  • ৮০০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সৌম্যজিৎ দত্ত

লেখক, ব্লগার, আইএসআই তে লেকচারার এবং গবেষণারত ছাত্র।

ফেসবুকে আমরা