সম্পর্ক এক সোনার শিকল

সোমবার, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৭ ৯:১১ PM | বিভাগ : ওলো সই


সম্পর্ক ভেঙে গেলে কি খুব কষ্ট হয়? এমনই তো দেখি চারপাশে। আমিও কষ্ট পাওয়ার চেষ্টা করি কিন্তু তা হয় না। কেনো হয় না? খুব কি নিষ্ঠুর আমি? ঝরাপতার জন্যেও যে খুব মায়া লাগে আমার! তবে আর নিষ্ঠুর দাবি করি কি করে!

সম্পর্ক এক জাদুর বাঁধন। যতই জড়াই, জড়াতেই থাকি। মানুষ থেকে শুরু করে মাঠ, পথ, ফুল, পাখি, সবার সাথেই একরকম সম্পর্ক হয়েই যায়। চাই বা না চাই। সম্পর্ক মানেই অন্যের অধিকারে চলে আসা। অন্যের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, মনখারাপ, ভালোবাসা, ঘৃনা, সমস্ত আবেগ আমাকে প্রভাবিত করতে থাকে। অধিক ভালোবাসায় নিজের পছন্দে খাওয়া এমন কি পোশাক পরায়ও ভালোবাসার মানুষের মতামত কে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো মানে হয়!

ওর ভালো লাগে তাই কপালে টিপ পর, ওর ভালো লাগে না তাই হলুদ রঙ পরতে পারবো না, এই বন্ধু সাথে মিশা যাবে না, ওখানে যাওয়া যাবে না, এই ছবি প্রোপিক করতে পারবো না, সেই কথা স্টেটাসে লিখতে পারবো না। দূর! আমার এসব পোষায় না! পাত্তা দিবো না তো সে ও আমায় পাত্তা দিবে না। আজব এক শিকলে বাঁধা। সে সোনার শিকল হলেও শিকলই।

সম্পর্ক একটা জীবন্ত জিনিস। কখনো মরে যায় আবার কখনো মৃত সম্পর্ক বেঁচে উঠে ঢালপালা ছড়াতে থাকে। আর সময় সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রন করে। সময়ে এর টান বাড়ে, সময়ের সাথে সাথে বাঁধন হালকা হতে থাকে। আমরা ভাবি আমায় ছাড়া চলবে না। তাই কি? যদি মরে যাই? থেমে থাকবে সব? কখনোই না। কখনো কি ভেবেছিলাম বাপুকে ছাড়া থাকবো? কিন্তু আছি তো দিব্যি। আমরা নিজেরাই নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবি। আমায় ছাড়া যেমন চলে, আবার কোথা থেকে অজানা অচেনা কেউ উড়ে এসে মন জুড়ে বসে থাকে।

একবার একটা কবিতা পড়েছিলাম, "সময় সবুজ ডাইনী"। কথা টা আমায় ভাবায়। ডাইনীই তো, তরতাজা সম্পর্ক সময় খেয়ে হজম করে ফেলে। ছোটবেলা থেকেই তো আমি কিছুদিন পরে পরে বন্ধু ছেড়ে, স্কুল ছেড়ে, শহর ছেড়ে, আপন হয়ে যাওয়া চারপাশ ছেড়ে অভ্যস্থ। কিছু ছেড়ে আসা মানেই আবার নতুন করে কিছু পাওয়া। আবার আমি যে স্থানটা শূন্য করে এসেছি সেটা কেউ পুরন করেছে, চিরন্তন এ সত্যি আমি শৈশবেই জেনে গেছি। কাজেই সম্পর্ক হারানোর ভয় আমার নেই। আমি ভাবি, আমায় বাঁধতে পারে যে জন, কোথায় সে জন? যখন সম্পর্ক ছাড়া, স্বাধীন থাকার মজাটা কেউ বুঝে যায় তখন কি তার মধ্যে এক রকম "খোঁজা" তৈরি হয়? কোথায় যাই? কি করি? এমন তো লাগে আমার। হ্যা, জড়াই আমিও। বেশ আনন্দ নিয়েই জড়াই। কিন্তু যখন এই জড়ানো আষ্টেপৃষ্ঠে হয়ে যায় তখনই একরকম পালাই পালাই ভাব এসে চেপে বসে। আমায় যেতে হবে কোথাও, ভীষন তাড়া। মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে বসে থাকি। সম্পর্ক যখন ছিন্ন হয় একরকম মুক্তির আনন্দ হয় বরং। সম্পর্ক তো আসলে আমাদের বেঁধেই রাখে। সম্পর্ক থেকে বের হওয়া কি তবে মুক্তি নয়? মুক্তি কষ্টের হতে পারে না। আজন্ম মানুষ মুক্তির পথই খুঁজে ফেরে।

আপন মানুষেরা অভিযোগ করে, "মায়া দয়া নেই তোমার"। কথাটা ভুল। আমার বরং মায়া অন্যদের থেকে বেশীই, আমি কেবল বেঁধে রাখতে চাই না। কি করে বোঝাই আমার থেকে তো কেউ কখনো হারায় না। আমার সব সম্পর্ক আমার সাথেই থাকে। এ বোঝানোর নয়, সে চেষ্টাও করি না। আর একটা গোপন ভয় কাজ করে। আমায় কেউ ছেড়ে যাবে তার আগেই আমি ছাড়ি। হয়তো, সুক্ষ একরকমের অহংকারবোধ আছে আমার মধ্যে। আমায় ছেড়ে যাওয়ার আনন্দ তোমায় আমি দিবো না। আমার জীবন, আমার সম্পর্ক আমিই নিয়ন্ত্রন করবো।

নিয়তি, ভবিষ্যৎ, এ সব অজানা, অদেখা বায়োবীয় জিনিসের খেলার পুতুল হতে ইচ্ছে করে না। একা হওয়ার চে আনন্দের জগৎ এ কিছু নেই। মানুষের স্বভাবই হচ্ছে ফেন্টাসি তৈরি করা। দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে থাকাও এক রকম রোমান্টিসিজম। সম্পর্কে ঘিরে থাকা মানুষ একা হওয়ার রোমান্টিকতায় ডুবে থাকে আবার একা যে সে সম্পর্কে জড়ানোর স্বপ্নে বিভোর থাকে। সম্পর্কে জড়ানো হচ্ছে সহজতম কাজ। একা হওয়া বা একা থাকাটা কঠিন। আমার কঠিন বিষয়েই আগ্রহ। একা যে পুরো জগৎ তার, একা যে যা ইচ্ছে করার স্বাধীনতা তার, এক যে আত্মবিশ্বাসী সে। একা থাকার অনন্দ, একরকম নেশা।

সম্পর্ক করার জন্যে ফালতু একটা অজুহাত হচ্ছে, কষ্ট শেয়ার করতে চাওয়া। কারো কষ্ট কি কেউ নিতে পারে সত্যিই? পারে না। যার যার অনুভুতি তার তার। মানুষ একাই আসে, একাই চলে যায়। হ্যা, সৃষ্টির জন্যে দু,জন দরকার কিন্তু তখনো দু’জনকে এক হতে হয়। সব সৃষ্টির জন্যেই, ব্যথা সৃষ্টির জন্যেও। একা থাকার সবচে মজার বিষয়টা হচ্ছে যাকে ইচ্ছে, যখন ইচ্ছে সঙ্গে নিয়ে থাকা। দুইদিন পরে পরে সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া এবং সম্পর্ক ভেঙে যাবে এই আতংকে থাকা প্রানীদের জন্যেও আমার খুবই মায়া হয়। আহা, সোনার শিকলে বাঁধা সকল প্রাণী সুখী হোক!


  • ২৬৮২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফারিসা মাহমুদ

লেখক, আর্টিস্ট

ফেসবুকে আমরা