সমতল শুনতে কি পাও, কাঁদছে পাহাড়?

শনিবার, জানুয়ারী ২৭, ২০১৮ ৯:৪০ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


পার্বত্য চট্টগ্রামের দূর্গম এলাকায় একটি পাহাড়ি গ্রাম। সবাই খেটে খাওয়া মানুষ। অনেকেই অশিক্ষিত এবং তাদের সন্তানরা ও বেশির ভাগ প্রাথমিক ধাপ পেরোতে পারে নি। সকাল হলে নিজস্ব জুমে,ধানক্ষেতে বা বাগান বাগিচায় কাজ করে ফসল-ফলফলাদি উৎপাদন করে হাটে-বাজারে বেচা বিক্রি করে তারা জীবন যাপন করে। যাদের নিজস্ব জুম, ফসল উৎপাদনের জায়গা নেই তারা অন্যের নিকট কামলা খাটে। সন্ধ্যা হলে বন্ধুবান্ধবদের সাথে হয়তো মদ গিলে। একসাথে তামাক টানে। সুখ দুঃখের কথা বলে। একে অপরের দুঃখ ভাগাভাগি করে। আপদে -বিপদে এগিয়ে আসে। মাঝে মাঝে একে অপরের সাথে কলহ- বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। আবার মিলন হয়। এভাবেই ছোট্ট গরীব গ্রামের বাসিন্দাদের দিন অতিবাহিত হয়।

গ্রামের নাম আথোয়াই পাড়া।এই গ্রামের শেষ মাথায় দক্ষিণ মুখী একটা জীর্ণশীর্ণ বাড়ি। সস্তা এবং রসুনের খোসার মতো পাতলা টিন দিয়ে দোচালা নড়বড়ে বাড়িটি। গাছ এবং বাঁশ দিয়ে বেঁধে চালের টিনগুলি আটকানো। বাঁশের বেড়াগুলোতে উইপোকারা আধিপত্য বিস্তার করেছে। একটু টোকা দিলে বেড়াগুলোর জীর্ণদশা পরিলক্ষিত হয়। খুঁটিগুলোর অবস্থা আরো বেশি শোচনীয়। উইপোকাদের বারি মেরে ঝেড়ে ফেলতে চাইলে খুঁটিগুলো ঝুলতে থাকে। বাড়ির পরিবার প্রধান চিং মগ অনেকদিন ধরে অজানা রোগে ভুগছে। বৈদ্য কবিরাজ দিয়ে অনেক চিকিৎসা করিয়ে ও কোনো সুফল পায় নি। লেখাপড়া জানা এক দূর সম্পর্কীয় আত্মীয় চিং মগের রোগের বর্ণনা শুনে জেলা শহরের এক ডাক্তারের সাথে দেখা করার পরামর্শ দেয়। চিং মগের ঠিকমতো ঘুম হয় না। বার বার প্রস্রাবের বেগ ধরে। দিনের বেলায় কাজে ও ব্যাঘাত ঘটে।শরীরে দূর্বলতা। শহরে ডাক্তার দেখাবে কি করে? শহরে যাওয়ার খরচটুকু পর্যন্ত যোগাড় করতে পারছে না। ডাক্তারের ফিস, ঔষুধ পত্তর কোথা থেকে কিনবে? এসব ভেবে চিং মগ আর শহরের ডাক্তারের কথা ভাবে নি। শরীর যেদিন ভালো ঠেকে সেদিন কাজ করে যেদিন খারাপ যায় সেদিন বিছানায় কাটায়।

সংসারের হাল ধরেছে তার স্ত্রী আনাই। দুই কিশোরী কন্যাকে নিয়ে যতটুকু সম্ভব নিজেদের ক্ষেত খামারের কাজ সেরে সুযোগ পেলে প্রতিবেশী বা ধনী গৃহস্থদের নিকট দিনমজুরী খাটে। সে আয় থেকে সিংহভাগ চলে যায় চিং মগের চিকিৎসায়। বৈদ্য আজ বলেতো বড় মোরগ একটা ঝিরিতে বলি দিতে হবে কাল বলে আবার ছোট্ট ছাগল বা শূকর বলি দিতে হবে। আজ বলে মায়ের নজর পড়েছে কাল বলে ভূতের আছড় ধরেছে। প্রতিনিয়ত এই সেই করে করে তাদের বর্তমানে একবেলার আহার জোটে তো দু 'বেলার জোটে না অবস্থা।

এই গ্রাম থেকে সামান্য দূরত্বে সেনা ক্যাম্প। আশে পাশে আরও কয়েকটি ছোট ছোট গ্রাম আছে। এই সব গ্রামের ওপর সেনাদের থাকে সার্বক্ষণিক নজরদারী, খবরদারী এবং কথায় কথায় বাটপারি। গরীব, অশিক্ষিত, নিরীহ, অসচেতন মানুষদের ওপর তারা সবসময় নিপীড়ন চালায়। অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রতি ঘরে ঘরে এমন কোনো পুরুষকে পাওয়া যাবে না যে সেনাদের হাতে নির্যাতিত হয় নি।

১৯৮০থেকে সেই নিপীড়নের স্টিম রোলার আজো চলমান। কৌশল পরিবর্তন করে বরং আরো গতি বৃদ্ধি পেয়েছে।শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু এসব দুঃসহ-দূর্বিসহ চলমান জীবন যাপনের সাথে আর একটি চাক্ষুস রোমহর্ষক ঘটনা আথোয়াই পাড়ার সাথে আশে পাশের গ্রামের সব বাসিন্দাদের হতবিহ্বল করে।

সেদিন সন্ধ্যায় চিং মগের পরিবারের সদস্যরা তাড়াতাড়ি দু'টো নুনভাত খেয়ে শুয়ে পড়ে। চিং মগের ছোট ছেলেটা তাদের সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। দুই কিশোরী মেয়ে ম্যামাচিং আর অনুচিং আরেক কক্ষে শুয়ে পড়ে। দু'বোনের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া রয়েছে। সারাক্ষণ খুনসুটিতে মেতে থাকে। সে রাতে দু'বোন বাংলার সুপার স্টার শাকিব খান অভিনীত কোনো সিনেমা কাহিনী হয়তো শেয়ার করেছে। ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁক গলে হুরমুর করে ঢুকে পড়া হিম হিম হাওয়ায় হয়তো জড়োসড়ো হয়ে একে অপরকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে।

আচমকা দিবাগত রাতে দু'বোনের ঘুম ভাঙ্গে বুট পড়া পায়ের আওয়াজে আর ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকিতে। চিং মগ এবং তার স্ত্রী আনাই ও ছেলেকে বাড়ির বাইরে বের করে দেয়া হয় তল্লাশীর নাম করে। দুই মেয়েকে বাড়ির ভেতরে আটকে রাখা হয়েছে। আলো জ্বালতে দেয়া হয় নি। চিং মগ, আনাই, ছেলে আপ্রু বার বার অনুরোধ করতে থাকে ম্যামাচিং ও অনুচিংকে বাড়ির বাইরে নিয়ে আসার জন্য। হঠাৎ তাদের কপাল বরাবর রাইফেল তাক করে কয়েকজন সেনা সদস্য। চুপ! সোজা মাথার খুলি উড়িয়ে দেবো। অন্ধকারে বন্দুকের নলের সামনে চিং মগ দিশেহারা হয়ে বসে থাকে। অজানা আশংকায় তার স্ত্রী আনাইয়ের চাপা কান্না তাকে আরো দূর্বল করে দিচ্ছে। হঠাৎ একটা গগনবিদারী আর্তচিৎকার ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। চিং মগ বুঝতে পারলনা চিৎকারের আওয়াজটা ছোট মেয়ের না বড় মেয়ের। কিন্তু চিৎকারের কারণটা বুঝতে বাকী রইলো না।

ভয়ংকর বিপদ ঘটতে চলেছে বুঝতে পেরে চিং মগ তার স্ত্রী এবং ছোট ছেলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। রোগাক্রান্ত চিং মগ প্রথমে বুঝতেই পারে নি তার ভাঙ্গা ঘরে কি প্রয়োজনে দিবাগত রাতে পার্শ্ববর্তী ক্যাম্প থেকে একদল সেনাবাহিনীর আচমকা উপস্থিতি। কয়েকজন সেনা সদস্য যখন তাকে সন্ত্রাসী তল্লাশীর কথা বলে ঘরে ঢুকতে চায় তখন সে বিস্মিত হয়। কিসের সন্ত্রাসী! ওরা দেখতে কেমন? অশিক্ষিত চিং মগের মগজে তা ঢুকে না। ওদের আধুনিক অস্ত্র এবং রক্তচক্ষুর সামনে চিং মগ ভীত বিহ্বল হয়ে পড়ে।

ঘরের ভেতর থেকে তার মেয়েদের চিৎকার, গোঙানির শব্দগুলো তার বুকে এক একটা বুলেটের মতো বিঁধছে। অসহায় চিং মগের দু 'চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। দু 'হাত দিয়ে কান ঢেকে রাখে মেয়েদের আর্তনাদের শব্দ যেন তার কানকে বিদ্ধ করতে না পারে। বন্দুকের নলের সামনে নিরীহ অসহায় বাবার যেন ঘুমের মধ্যে বোবায় ধরা। সবকিছু বুঝতে পারছে, উপলব্ধি করছে কিন্তু অসাড়তা ঝেড়ে ফেলতে পারছে না। নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না।

দীর্ঘসময় পর ঘরের ভেতরে ঢোকা সেনা সদস্যরা বেরিয়ে আসে এবং কড়া হুমকি দিয়ে শাসায় এই ঘটনা যেন প্রকাশ না করে। সেনারা চলে গেলে চিং মগ ও স্ত্রী আনাই এবং ছেলে আপ্রু ঘরে হুরমুর করে ঢুকে পড়ে মেয়েদের কাছে যাওয়ার জন্য। অন্ধকার কক্ষে আনাই আলো জ্বালালে মেয়েদের দিকে দৃষ্টি পড়তেই চিং মগ চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে বাইরে চলে যায়।

আনাই সেনাদের হাতে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত বিবস্ত্র তার এক মেয়েকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। আর এক মেয়ে এলোমেলো বেশে থর থর করে কাঁপছে। রক্তাক্ত মেয়েটার হুঁশ নেই। শরীর অসাড় হয়ে পড়ে আছে। দ্রুত বিবস্ত্র শরীরে কাপড় জড়িয়ে দিয়ে আনাই স্বামী চিং মগকে ভিতরে আসতে বলে।

এই মাঘের হিম ঝরা রাতে চিং মগ রাগে ক্ষোভে ঘৃনায় ঘেমে যাচ্ছে। নিজের শীর্ণ শরীরে নিজেই আঘাত করছে ক্রমাগত। নিজের চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলছে। তাদের কান্না, আর্তনাদের শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে চুরমার হয়। জেগে উঠে আশে পাশের প্রতিবেশীরা। ছুটে আসে সাথে সাথে।

বেহুঁশ অনুচিং এর রক্তাক্ত হিম দেহে গরম সেঁক দিয়ে উষ্ণতা আনার প্রচেষ্টা চালায় সবাই মিলে। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অনুচিং'র জ্ঞান ফিরে এলেও ছিঁড়ে যাওয়া যোনীপথ থেকে রক্তধারা বিরামহীন ঝরছে। সেই রক্তধারা রোধ করার কোনো শক্তি কারো কাছে নেই। শুধু অসহায় ভাবে চেয়ে থাকে এবং একের পর এক রক্তে ভেজা কাপড় পাল্টে দিয়ে ভোরের অপেক্ষা করতে থাকে।

অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস! ভোরের আলো ফোটে না। মোরগগুলো ভোরের ডাক দেয় না। ঘড়ির কাঁটাকে কে যেন পিছন থেকে টেনে ধরেছে। ঘড়ির কাঁটা এগোয় না। অন্যদিকে অনবরত রক্তপাতে অনুচিং ফ্যাকাসে এবং অসাড় হয়ে যাচ্ছে।

অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রতীক্ষিত ভোরের আবির্ভাব ঘটে। সবাই পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেয় হাসপাতালে নিয়ে যাবে। দূর্গম কন্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে যেতে হবে বলে কয়েকজন শক্ত সামর্থ্য পুরুষ এবং চিং মগের পরিবারের সদস্যরা ভোরের আলোয় বেরিয়ে পড়তে উদ্ধত হয়। ঠিক সে সময়ে আবারো সেনারা উপস্থিত হয়।

অনুচিংকে হাসপাতালে যেতে দিচ্ছে না। মুখ বন্ধ রাখতে হুমকি প্রদান করছে। জীবন -মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অবস্থান করা অনুচিংকে নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায় আথোয়াই গ্রামের বাসিন্দা এবং ধর্ষক দল সেনাবাহিনী। তাদের মধ্যে কি তর্ক বিতর্ক হচ্ছে সেটা নিস্তেজ হয়ে আসা অনুচিং'র কানে পৌঁছায় না।


  • ৪৯২০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

দীপনা চাকমা দীপু

লেখক ও একটিভিস্ট।

ফেসবুকে আমরা