লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষ এবং লিঙ্গভিত্তিক ব‍্যজস্তুতি : দুটোই নারীর সমানাধিকারের অন্তরায়

বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৩০, ২০২০ ১০:০০ AM | বিভাগ : আলোচিত


নারীবিদ্বেষের আড়ালে যে ধান্দাবাজি লুকিয়ে আছে, নারীর অকারণ ব‍্যজস্তুতির পেছনেও সেই এক‌ই ধান্দাবাজি লুকিয়ে আছে, মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। নারী মায়ের জাত, অমুক দেবী, তমুক দেবীর অংশ, নারীকে সম্মান করতে হবে জাতীয় কথাগুলো শুনতে মিছরির মতো মনে হলেও এর আড়ালে রয়েছে সেই চিরাচরিত উদ্দেশ‍্য, নারীর সমানাধিকারকে খর্ব করা। কথায় কথায় মায়ের জাত বলে নারীকে উল্লেখ করা হয়, পুরুষের ভূমিকাও সন্তান উৎপাদনে অপরিহার্য, অথচ তাদের কখনো ঢালাওভাবে পিতৃজাতি বলা হয় না, পিতৃত্ব কখনোই পুরুষের অস্তিত্বের সাথে একাকার হয়ে ওঠেনি, পিতৃত্ব পুরুষের জীবনে নেহাত এক জৈবিক ঘটনা মাত্র। অথচ নারীর বেলায় উঠেছে মাতৃত্বেই নারীর সার্থকতা, সন্তান জন্ম দেয়াই জীবনের মোক্ষ, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কারো মা, কারো বোন বা কারো স্ত্রী এই পরিচয়ের বাইরে নারী যে একজন স্বতন্ত্র মানুষ, মেধায় প্রজ্ঞায় চেতনায় পরিপূর্ণ মানুষ যে সে হয়ে উঠতে পারে, মাতৃত্ব ছাড়াই পারে, বিবাহ ছাড়াই পারে, এ কথা সমাজে বড়ো একটা আলোচিত হতেও দেখা যায় না। মেয়ে তার কর্মক্ষেত্রে যতোই ছাপ রাখুক না কেনো, তার ব‍্যক্তিগত জীবন, সংসার সন্তান, এসব দিয়েই তাকে মাপতে বা সিগনিফাই করতে সমাজ সোয়াস্তি পায় বেশি।

মেয়েদের সম্মান করুন বলে একদল চিৎকার করেন, এটাও অত‍্যন্ত অবান্তর দাবী। কেবল মেয়ে বলেই, লিঙ্গের ভিত্তিতে তাকে সম্মান করতে হবে কেনো? মেয়েরাও অপরাধজগতের সাথে জড়ান, মা মুচড়ে ভেঙে দেন শিশু সন্তানের হাত, বিক্রি করে দেন সন্তান, যৌনদাসত্বে বাঁধেন মেয়েকে, শাশুড়ি নিজের হাতে কেরোসিন ঢেলে দেশলাই ঠুকে দেন বধূর শরীরে। এরাও নারী! ঢালাও সম্মান করতে গেলে এদের‌ও করতে হয়! লিঙ্গের ভিত্তিতে ঢালাও সম্মান করতে হলে পুরুষমাত্রেই কিছু দোষ করেননি, তাদের‌ও সম্মান করতে হয় !!

নারী হোক বা পুরুষ, সম্মান হোক অর্জনের ভিত্তিতে। কেবল লিঙ্গ, বয়স, সম্পর্ক - এসবের ভিত্তিতে সম্মান দাঁড়িয়ে থাকলে, তা অপাত্রে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। সম্মান অর্জনের‌ও বিভিন্নরকম ভিত্তি থাকে! কেউ যদি কর্মজীবনে চূড়ান্ত সফল হন, দেশের বা সমাজের অগ্রগতিতে অবদান রাখেন, তাহলে আমরা তাঁকে সম্মান করি তাঁর কাজের নিরিখে। ব‍্যক্তিজীবনে হয়তো তিনি বধূ নির্যাতন করা শাশুড়ি, সন্তানকে অবহেলা করা মা, হয়তো শ্বশুর শাশুড়ির নামে মিথ‍্যে মামলা করে ফাঁসিয়েছেন (নারী হলে) কিংবা হয়তো তিনি নারী ধর্ষক, চূড়ান্ত নারীবিদ্বেষী, সন্তানকে পাশবিক অত‍্যাচার করা পিতা অথবা সন্তানের সামনে স্ত্রীকে প্রহার করা স্বামী (পুরুষ হলে)। ক'জন আছেন যারা এই দুই ক্ষেত্রকে আলাদা করে সম্মান অসম্মানের সূচক নির্ধারণ করবেন?

অত‌এব দেখা যাচ্ছে সম্মান বড়ো সোজা বস্তু নয়। বাটি করে সামনে সাজিয়ে দেয়ার বিষয়‌ও নয়। এটি একটি অর্জন, এবং বলা বাহুল্য খুব কঠিন অর্জন। নারী হোক বা পুরুষ, সকলকেই সম্মান অর্জন করে নিতে হবে, তবেই তারা সম্মানের যোগ‍্য হয়ে উঠবেন, নচেৎ নয়। লিঙ্গভিত্তিক ঢালাও সম্মান, মায়ের জাত, দেবী অংশ ইত‍্যাদি গালভরা চিনির বাটি নারীর প্রয়োজন নেই, এটিও তার সমানাধিকারের অন্তরায়। একদিকে নারীর সমানাধিকারের কথা বলা হবে, আবার অপরদিকে বলা হবে নারী হলেই সম্মান করতে হবে, দুটি দাবি তো স্পষ্টত স্ববিরোধী!

আর র‌ইলো নারী দরদী হয়ে ওঠার তাগিদ প্রসঙ্গ। নারী বলেই আলাদা করে সম্মান করবার কোনো দরকার নেই, নারী বলেই অসম্মান করাটা বন্ধ করলেই যথেষ্ট হবে।


  • ২১৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শীলা চক্রবর্তী

জন্ম খুলনায়। কলকাতা বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে আইনে স্নাতক। মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে অপরাধ আইনে স্নাতকোত্তর। পেশায় আইনজীবী। নেশা রবীন্দ্রনাথের গান , ধ্রুপদী সঙ্গীত , কবিতা, অভিনয়, লেখালিখি । মঞ্চে নিয়মিত উপস্থিতি । লেখালিখি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও পোর্টালে প্রকাশিত । পেশায় আইনজীবী শীলা চক্রবর্তীর জন্ম খুলনায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক আর মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করা শীলার নেশা রবীন্দ্র সঙ্গীত, ধ্রুপদী সঙ্গীত, কবিতা, অভিনয় এবং লেখালেখি। মঞ্চ নাটকেও তিনি নিয়মিত।

ফেসবুকে আমরা