মাতৃত্বে নারীর সার্থকতার ধারণা এবং .....

বুধবার, জুলাই ২৪, ২০১৯ ৯:৪৪ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


মাতৃত্বেই নারী জন্মের সার্থকতা -এই ধারণাটি পিতৃতন্ত্রের গোড়ার দিকের সৃষ্ট ধারণাগুলির একটি। গুহাযুগে বা গোষ্ঠীযুগে এই ধারণার উন্মেষ ঘটেনি। পিতৃতন্ত্রের উন্মেষের সাথে সাথেই এই ধারণার উদ্ভব ঘটে। পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের ধারণার মূলে আছে ব‍্যক্তিগত সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং তার জন‍্য সন্তানের পিতৃপরিচয়ভিত্তিক অস্তিত্ব। নারীর গর্ভের ওপর পরিবারের অধিকার এর প্রধান সহায়ক। এক্ষেত্রে নারী প্রজননক্ষম না হলে, সে পিতৃতান্ত্রিক পরিবারকে উত্তরাধিকার দিতে না পারলে ব‍্যক্তিগত সম্পত্তির পরবর্তী দখলদার আসবে না, বংশধারা অগ্রবর্তী হবে না, পিতৃতন্ত্রের যে গোড়ার কথা, সেটির ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যাবে! সুতরাং নারীর প্রজননক্ষমতার ওপর জোর দেয়াতেই এই প্রথা এগিয়ে নিয়ে যাবার সুবিধে। একারণেই প্রজননের ওপর আরোপিত হয়েছে সার্থকতা ও ব‍্যর্থতার মানদণ্ড। প্রজনন যা নারীর জীবনের একটি জৈবিক ঘটনামাত্র, তার সাথে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে জীবন সার্থক নাকি ব‍্যর্থ তার প‍্যারামিটার! যার প্রকৃতপক্ষে কোনো ভিত্তি নেই।

আমাদের উপমহাদেশীয় সমাজ গঠন নারীর জন্মের সার্থকতা তার প্রজননের ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ সন্তান জন্ম দিতে পারলে নারীর জীবন সার্থক, পূর্ণ, অর্থবহ .... আর না পারলে ব‍্যর্থ, শূণ্য, অর্থহীন। বিবাহের অব‍্যবহিত পরে সন্তান জন্ম না দিতে পারলে নারীর জন‍্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে অভিধানজোড়া সব বাছা বাছা বাক‍্যবাণ! বন্ধ‍্যা, বাঁজা, আঁটকুড়ি, শূন‍্যগর্ভা .... এমন কী একটিই সন্তান যে নারীর, তাকে বলা হয় কাকবন্ধ‍্যা! সমাজে সন্তানহীন নারীর অবস্থা যে কী হয় সেটা আর বলে বোঝাবার কিছু নেই! আজকের দিনে দাঁড়িয়েও গর্ভবতী মায়েদের নিয়ে কোনো শুভ অনুষ্ঠানের আয়োজনে সন্তানহীনা নারীরা ব্রাত‍্য। তাদের অপয়া অলক্ষ্মী ইত‍্যাদি সম্বোধনে ভূষিত করা হয়। বহু উচ্চশিক্ষিত নারী জলপড়া, তেলপড়া জাতীয় কুসংস্কারের ফাঁদে পড়ে বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, লোভী অসৎ ভণ্ড জ‍্যোতিষ তান্ত্রিক পূজারীরা যাগযজ্ঞ, আংটি পাথর তাবিজ কবচের নাম করে দুপয়সা কামিয়ে লাল হয়ে যাচ্ছেন, এমন কী মানুষকে সর্বস্বান্ত‌ও হতে হচ্ছে এদের ফাঁদে পড়ে। কারণ আমাদের সমাজ ব‍্যবস্থায় সন্তানহীন হলে যে গঞ্জনা শুনতে হয়, তাতে এসব করে টাকা অপব‍্যয়ের দিকে বহুজন ফিরেও দেখেন না, যেকোনো মূল‍্যে সন্তান চাইই চাই!

সন্তান অবশ‍্য‌ই থাকা জরুরী, না হলে তো সৃষ্টিই আগে বাড়বে না। কিন্তু এই জৈবিক ঘটনাটিতে তো কারো হাত নেই, ইচ্ছে করলেই সন্তান তো গর্ভে নাই আসতে পারে! সন্তানহীনতার দায় জীবনের ব‍্যর্থতার দায় হিসেবে কী হেতু বহন করতে বাধ‍্য হবেন মেয়েরা? জীবনে কর্মক্ষেত্রে বা অন‍্যান‍্য শিল্পক্ষেত্রে প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখতে পারা মেয়েদের জীবনের সার্থকতা কেনো, কীসে কম হবে কোনো অংশে, সন্তানবতী নারীর চেয়ে? কী কারণে এরকম সফল নারীদের‌ও দাগিয়ে দেয়া হবে ব‍্যর্থ বলে, যদি কেবল সন্তান না থাকে? এছাড়া নারীর তো সিদ্ধান্তের অধিকার থাকাও জরুরী! তাঁর গর্ভে তিনি আদৌ সন্তান ধারণ করতে ইচ্ছুক কিনা! অথবা তাঁর শরীরে সন্তানধারণের ফলে কোনো বড় সমস‍্যা তৈরি হবে কিনা, এর প্রত‍্যেকটি কথাই সমান গুরুত্ব সহকারে ভেবে দেখা জরুরী! শারীরিক প্রতিবন্ধকতাগুলির জন‍্য বিজ্ঞানে এসেছে সারোগেসি, টেস্টটিউব বেবি আইভিএফ, বিবিধ চিকিৎসা ...। ইচ্ছুক দম্পতিরা তার সমস্ত সুবিধে নিতে পারেন। কিন্তু চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো অনেকটাই খরচসাপেক্ষ হ‌ওয়ায় অপেক্ষাকৃত কম অর্থ সম্পন্ন মানুষ বিভিন্ন প্রতারকের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত‌ও হচ্ছেন, ফল‌ও কিছু হচ্ছে না স্বাভাবিকভাবেই। যে দম্পতি ইচ্ছুক নন সন্তান নিতে, তাঁদের‌ও শুনতে হয় সামাজিক গঞ্জনা। এমন কী দত্তক সন্তান থাকলেও যার নিজের সন্তান নেই এমন নারী কটু কথা বা বক্রোক্তি থেকে রেহাই পান না। সন্তান নারীপুরুষ উভয়ের‌ই যৌথ জৈবিক উৎপাদন হলেও, সন্তানহীনতার গঞ্জনা নারীকে একাই প্রায় বহন করতে হয়। সন্তান থাকা বা না থাকার সাথে পুরুষের জীবনের সার্থকতা বা ব‍্যর্থতা অন্তত কোনোভাবেই জড়িত হতে দেখা যায় না।

আমরা সব সময়েই এগিয়েছি বা সমাজ পাল্টেছে বলে গর্ব করি, অথচ একটু রিমোট অঞ্চলে গেলেই প্রকৃত অবস্থাটা বোঝা যায়। বিবাহের দীর্ঘকাল পরেও স্ত্রী সন্তান ধারণ করতে না পারলে অনায়াসেই পুরুষটির পুনর্বিবাহের আয়োজন করা হয়, সমাজ‌ও বড় একটা লাল চোখে দেখে না এ ব‍্যবস্থাকে। আইনকে কাঁচকলা দেখিয়ে বহু বিবাহের এক ছুতো হিসেবে এখনো কোথাও কোথাও টিকে আছে এ ব‍্যবস্থা। সন্তানহীন দম্পতির ক্ষেত্রে সন্তানহীনতার দায় বা অক্ষমতার দায় চট করে নারীটির ওপরেই চাপানো হয়, তা সে সমস‍্যা পুরুষটির শরীরে থাকলেও। এটাতেই সমাজকাঠামো স্বস্তিবোধ করে থাকে। পুরুষের শারীরিক সমস‍্যার কথা আজ‌ও অনেক ক্ষেত্রেই চট করে মেনে নেয়া হয় না।

মহাকাব‍্যের দিকে তাকালেও দেখি রাজ‍্য বা সম্পত্তির উত্তরাধিকার বজায় রাখার জন‍্য রাজা সন্তানহীন থাকলেও রাণীদের গর্ভে ক্ষেত্রজ পুত্র (উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে তখন পুত্রসন্তান থাকাকেই প্রায়োরিটি বলে গণ‍্য করা হতো, বংশধারা এগিয়ে নিয়ে যাবার জন‍্য এখন‌ও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুত্রসন্তানকেই অগ্রগণ‍্য ধরা হয়) উৎপাদন করা হতো রাজপরিবারের‌ই অপর কোনো রাজপুরুষ দ্বারা অথবা রাজবংশের কুলগুরু দ্বারা। যাগযজ্ঞের প্রসাদী ফল খেলে যে গর্ভসঞ্চার হয় না একথা মূর্খেও বোঝে। কুরুরাজবংশের বধূ অম্বিকা ও অম্বালিকা, পাণ্ডবজননী কুন্তী অবধি সবাইই উত্তরাধিকারীর প্রয়োজনে সন্তান কামনায় অপর পুরুষের অঙ্কশায়িনী হয়েছেন ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, স্বামী অথবা শ্বশ্রুকুলের পূর্ণ সম্মতিতে। অর্থাৎ নারীর গর্ভ শুধুই উত্তরাধিকার নির্মাণের যন্ত্র হিসেবেই এখানে ব‍্যবহৃত, তার নিজের শরীর বা ইচ্ছা অনিচ্ছার মালিকানা তার নিজের একেবারেই নয়।

প্রজনন নারীর জীবনের মূল উদ্দেশ‍্য হলেই পিতৃতন্ত্রের সুবিধে, একাধারে বহুরকম সুবিধে। নারী বন্ধ‍্যাত্বের কলঙ্কমোচনের জন‍্য উত্তরাধিকার প্রদানে যত্নবান হবে, প্রয়োজন পড়লে নিজের বিদ‍্যার্জন বা কেরিয়ার বিসর্জন দিয়েও, সমস‍্যা যার‌ই হোক না কেনো বন্ধ‍্যাত্বের দায় নারীর।

সমস‍্যা যার‌ই হোকনা কেনো বন্ধ‍্যাত্বের দায় নারীর ওপর চাপিয়ে দিয়ে বহুবিবাহের পথ সুগম করা যাবে, বন্ধ‍্যাত্বের অজুহাতে নারীটিকে বেশ চাপেও রাখা যাবে। পুরুষের জীবনের সার্থকতা আজ‌ও যেখানে মাপা হয় তার মেধা, কর্মক্ষেত্রে যোগ‍্যতা ও উপার্জনের অঙ্কের হিসেবে, সেখানে নারীর জীবনের সার্থকতার মানদণ্ড আজ‌ও সন্তান উৎপাদনে নিহিত। সুপ্রাচীন এই আপ্তবাক‍্য অতীব চাতুর্যের সঙ্গে নারীর জীবনের ভবিতব‍্য হিসেবে দাগিয়ে দেয়া হয়েছে আর নিরপরাধ মেয়েরা অনিচ্ছায় অজান্তে এর ভার বয়ে চলেছে চোখ বাঁধা বলদের মতো , ভাবতেও লজ্জা হয়।


  • ২৮৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শীলা চক্রবর্তী

জন্ম খুলনায়। কলকাতা বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে আইনে স্নাতক। মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে অপরাধ আইনে স্নাতকোত্তর। পেশায় আইনজীবী। নেশা রবীন্দ্রনাথের গান , ধ্রুপদী সঙ্গীত , কবিতা, অভিনয়, লেখালিখি । মঞ্চে নিয়মিত উপস্থিতি । লেখালিখি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও পোর্টালে প্রকাশিত । পেশায় আইনজীবী শীলা চক্রবর্তীর জন্ম খুলনায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক আর মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করা শীলার নেশা রবীন্দ্র সঙ্গীত, ধ্রুপদী সঙ্গীত, কবিতা, অভিনয় এবং লেখালেখি। মঞ্চ নাটকেও তিনি নিয়মিত।

ফেসবুকে আমরা