বডিশেমিং নামক অসভ‍্যতা এবং স্বতস্ফূর্ত প্রতিবাদ

বৃহস্পতিবার, মার্চ ৫, ২০২০ ১:৪৬ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


বডিশেমিং করলে দাঁত বের করে হেহে করাটা স্পোর্টিং স্পিরিট নয় মোটেই, বা "মাইণ্ড খাইনি" প্রমাণ করার‌ও কিচ্ছু নেই। যে বা যারা বডিশেমিং করে গোপন অর্গ‍্যাজম লাভ করে ইতরামিটা তারাই করে এটা তাদের বুঝিয়ে দেয়ার এটাই হাইটাইম! বডিশেমিং করে অসভ‍্যতা করবেন, আবার প্রতিবাদ করলে উল্টে বলবেন, ইয়ার্কি একদ‌অঅঅঅম নিতে পারিসনে বল! হ‍্যাহ‍্যাহ‍্যা! খ‍্যাখ‍্যাখ‍্যা!

বডিশেমিং একটা অসভ‍্যতা, একটা ইতরামো, একটা নোংরা মাইণ্ডগেম। এটি মোটেও নিরীহ ইয়ার্কি নয়। যারা এটাকে ইয়ার্কির নাম দিতে চেষ্টা করে, বডিশেমিং মেনে না নিলে উল্টে অসহিষ্ণু প্রমাণ করার চেষ্টা করে, ব‍্যক্তিত্বের গোড়ায় গলদ আছে তাদের‌ই, এটা তাদের জোর গলায় বুঝিয়ে দেয়াটা দরকার।

লোকজনের সবকিছুতেই অসুবিধে, কেউ মোটা হলে সে খিল্লির পাত্র, কেউ রোগা হলে সে-ও খিল্লির পাত্র (কী আজব, আর ইনিরা সব কুমোরটুলি থেকে পছন্দমতো একমেটে দোমেটে হয়েই এয়েচেন)! কেউ বেশি লম্বা হলে সে খিল্লির পাত্র, কেউ বেঁটে হলে সেও খিল্লির পাত্র। কেউ কালো হলে সে খিল্লির পাত্র, কেউ ফ‍্যাটফেটে ফরসা হলে সেও খিল্লির পাত্র! এরা নিজেদের আয়নায় একবার দেখে না যে এরা নিজেরা কতোগুলো খুঁত নিয়ে বসে আছে, এরা লোকের পেছনে অসীম স্ট‍্যামিনা নিয়ে লেগে থাকে!

জেনে রাখুন, বুলিইং, শেমিং, লিঞ্চিং এইগুলো মানসিক অসুস্থতা, যিনি করছেন, অসুস্থ তিনি বা তারাই, যাকে করা হচ্ছে সে নয়। তাই মামার বাড়ির আবদারের মতো আপনার মনোবিকারের দায় অপরের ওপর চাপাবেন না "ইয়ার্কি করা যায় না তোর সাথে" জাতীয় কথা বলে ন‍্যাকাপনা করে। এইজাতীয় লোকদের অনেকেই আবার নিজেদের নিয়ে তেমনভাবে ইয়ার্কি করলে তেলেবেগুনে জ্বলে যান, অথচ দাবিটা কী আহ্লাদের! আমি বেশ শেমিং করবো আর তুই হেহে করে হাসবি কেমন? তা নৈলে কিন্তু তোকে আনস্পোর্টিং বলবো!

ছোট থেকে চারপাশে এইসব অসভ‍্যতা যারা ক্রমাগত সহ‍্য করে, তাদের মানসিক অবস্থা ভেবে দেখার মতো সংবেদনশীলতা এদের থাকে না। বিশেষত শিশুদের মনে জঘন‍্য হীনম্মন‍্যতার বোধ জন্ম নেয় এসব শুনে শুনে। তুইতো কালো, বিয়ে দিতে জান বেরিয়ে যাবে, তুইতো ঢ‍্যাঙা তোর তো বর বগলের তলায় বাধবে জাতীয় সব জঘন‍্য কথার চাষ ছোটদের সামনেই অনেকে করে থাকেন। আরেকপাল থাকে তারা হিংসায় জর্জরিত হয়ে শেমিংকে আঁকড়ে ধরে, যোগ‍্যতায় যার ধারপাশ মাড়াতে পারে না, তার শারীরিক কোনো একটি বিষয় ধরে ক্রমাগত বুলি করে যেতে থাকে। যে বুলি হয়, সেও সবসময় রিঅ্যাক্ট করতে পারে না, তার ওপর উল্টো চাপ তৈরি করে রাখা হয়, তুই মাইণ্ড করলে, রিঅ্যাক্ট করলেই তুই আনস্পোর্টিং, তুই ডবল খিল্লির পাত্র!

জেনে রাখুন হে গর্দভকুল, খারাপ সবার লাগে, সব্বাইকার। কেউ শেমিংটা এনজয় করে না, কেউ না। নিজে যেমন‌ই হোক, নিজেকে সবাই ভালোবাসে। হতে পারে যিনি মোটা বলে আমায় বুলি করতে আসছেন তিনি নিজে কুচকুচে কালো, তাকে হয়তো কেউ রঙ নিয়ে বললো! তার তো ভালো লাগবে না! অথবা বেঁটে খুব, কেউ যদি তা নিয়ে বিদ্রূপ করে, ভালো লাগবে না। হয়তো হেহে করে বলবে আমি মাইণ্ড খাইনি আমি কী স্মার্ট! কিন্তু এটা আদৌ স্মার্টনেসের বিষয় নয়, বিষয়টি অসভ‍্যতার। এই অসভ‍্যতার জন‍্যেই ফরসা হবার ক্রিম থেকে শুরু করে স্লিমট্রিম ট‍্যাবলেট এতো জনপ্রিয়। কী আতঙ্ক অহো পথে বেরোলে লোকে মোটা বলবে কালো বলবে, বিয়ের বাজারে দাম কমে যাবে, ঠিক যেন আলুপটল!

আমরাই সার্কাসের মঞ্চে বামনাকৃতির লোকদের দেখে হেসে কুটিপাটি খাই, এদের তো জন্ম‌ই হয়েছে খিল্লির খোরাক জোগানোর জন‍্য। আমরাই সন্তানকে শেখাই অমুককে মোটা তমুককে কেলো তমুককে দেড়ফুটিয়া বলে বিদ্রূপ করতে আর নিজেদের বিশাল শিক্ষিত বলে ক্লেম করি! আমি হলে আমার লজ্জা করতো। কী করে এই মূর্খেরা ভুলে যায় পারফেক্ট জগতে কেউই নয়! তারা নিজেরাও নয়। কিন্তু একটু মানুষের মতো হ‌ওয়ার চেষ্টাটা তো করাই যায়!

আমার চেহারা নিয়ে কেউ খোঁটা দিতে এলে আমি বলি আগে আমার বাড়িতে দুবস্তা চাল পাঠিয়ে দিতে, কারণ আমায় যখন শেমিং করা প্রাণীটি খাওয়ায় না, তখন তার আমার চেহারা নিয়ে কথা বলার মতো আহ্লাদ‌ও আমি মেনে নেবো না। নিজেকে আয়নায় দেখলে শেমিংয়ের প্রভূত উপাদান তিনি বা তেনারা খুঁজে পাবেন, ফাউ সময় বেশি হয়ে থাকলে সেগুলো নিয়ে ভাবুন বরং...


  • ২৪৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শীলা চক্রবর্তী

জন্ম খুলনায়। কলকাতা বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে আইনে স্নাতক। মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে অপরাধ আইনে স্নাতকোত্তর। পেশায় আইনজীবী। নেশা রবীন্দ্রনাথের গান , ধ্রুপদী সঙ্গীত , কবিতা, অভিনয়, লেখালিখি । মঞ্চে নিয়মিত উপস্থিতি । লেখালিখি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও পোর্টালে প্রকাশিত । পেশায় আইনজীবী শীলা চক্রবর্তীর জন্ম খুলনায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক আর মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করা শীলার নেশা রবীন্দ্র সঙ্গীত, ধ্রুপদী সঙ্গীত, কবিতা, অভিনয় এবং লেখালেখি। মঞ্চ নাটকেও তিনি নিয়মিত।

ফেসবুকে আমরা