শীলা চক্রবর্তী

পেশায় আইনজীবী শীলা চক্রবর্তীর জন্ম খুলনায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক আর মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করা শীলার নেশা রবীন্দ্র সঙ্গীত, ধ্রুপদী সঙ্গীত, কবিতা, অভিনয় এবং লেখালেখি। মঞ্চ নাটকেও তিনি নিয়মিত।

যৌনতার স্বাভাবিক পাঠ কমাতে পারে এইডসের মতো ভয়াবহ রোগের সম্ভাবনা

আমাদের উপমহাদেশীয় মূল‍্যবোধে যৌনতা নিয়ে ঢাকঢাক গুড়গুড়ের কারণেই যৌনতা সম্পর্কে অজ্ঞতা সীমাহীন। যৌনতাকে আমরা আহার নিদ্রার মতো সহজভাবে জীবনে নিতে শিখিনি। যৌনতা শব্দটাই এক ভয়াবহ ছুঁৎমার্গের মতো আমরা মগজে পুষে রেখেছি। আমাদের যৌনতার বিষয়টি আমাদের শরীরের হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে না, নিয়ন্ত্রণ করে আজন্ম লালিত তথাকথিত নীতিবোধ। সেক্স এডুকেশান কথাটির অর্থ যে সেক্স করবার শিক্ষা নয়, এটা বুঝতেই আমাদের জীবন পার হয়ে যায়, যার ফল হয় মারাত্মক। আমাদের মতো বাল‍্যবিবাহের দেশে শারীরিক ও মানসিকভাবে যৌনতায় যাবার জন‍্য প্রস্তুত না হতেই বিষয়টি ঘটে গিয়েছে বিরাট অংকের নারী পুরুষের জীবনে। অজ্ঞানতা ও অসাবধানতার কারণে ঘটেছে প্রচুর যৌন সংক্রমণ, অকাল গর্ভধারণ ও প্রসূতিমৃত‍্যু, সদ‍্যোজাতের মৃত‍্যুর মতো ঘটনা। যখন বাল‍্যবিবাহের প্রকোপ অপেক্ষাকৃত কম, সেখানে অধিকাংশ কমবয়সীর যৌনতার প্রাথমিক পাঠ হয় পর্নোগ্রাফির ব‌ই বা ভিডিও দিয়ে কিংবা বন্ধুদের আলোচনায়, কারো ক্ষেত্রে শিশুকালেই পারিবারিক বা পরিচিত বৃত্তে যৌন হেনস্থার মধ‍্যে দিয়ে। অনেক ক্ষেত্রেই এই কমবয়সীদের অনেকেই ধরেই নেয় যে যৌনতা মানেই এহেন অসুস্থ, ভয়াবহ, যন্ত্রণাদায়ক বিষয়। সারাজীবনের মতো এরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে, কার‌ও ক্ষেত্রে ফল হয় মারাত্মক। সুস্থভাবে যৌনতার পাঠ দেয়ার কথা আমাদের মগজেও আসে না, কারণ ওই আরোপিত নীতিবোধ।

যে সমাজে যৌনতা নিয়ে অহেতুক ঢাকঢাক গুড়গুড় যতো কম, যৌনতাকে আর পাঁচটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়ার মতোই দেখা হয়, যৌনতা সম্পর্কে স্বাভাবিক কৌতুহলের মুখ চেপে ধরা হয় না , এসব সমাজে সাধারণত কেউ কারোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রয়োজন বোধ করে না। অপরের সম্মতিকেও গুরুত্ব দিতে শেখে, সেই সমাজে যৌন অপরাধ, যৌন হেনস্থা, ধর্ষণের মতো অপরাধ ততো কম। যে সমাজে ছোট থেকেই শিশুকে শেখানো হয় অপর লিঙ্গের শিশুর কাছে তুমি এলিয়েন সদৃশ, তুমি অপর, তুমি ইনফেরিওর বা সুপিরিওর, সেই সমাজেই শিশু বড় হয়ে নিজেকে খাদক আর অপরকে খাদ‍্য ভাবতে শেখে, অথবা উল্টোটা।

যৌনতা নিয়ে অজ্ঞতার কারণেই বিরাট অংশের মানুষ যৌনরোগে ভোগেন, ভোগেন বিভিন্ন সংক্রমণে, বিন্দুমাত্র সতর্কতার ধারণা ছাড়াই মিলিত হন অরক্ষিত সংসর্গে যার ফল হয় এইচ‌আইভির মতো মারাত্মক সংক্রমণ। এইচ‌আইভি পজিটিভ হলেই আমাদের উপমহাদেশে তাকে প্রথমেই সামাজিকভাবে ব‍্যাপক বয়কটের সম্মুখীন হতে হয়, কারণ প্রাথমিকভাবে ধরেই নেয়া হয় একাধিক এবং লাগামছাড়া যৌনজীবন এই মানুষটি যাপন করেছেন অত‌এব ইনি ঘৃণার্হ। একে রোগের আতঙ্ক তার ওপর সামাজিক হেনস্থায় মানুষটির এবং তার পরিবারের মানসিক অবস্থা হয়ে দাঁড়ায় ভয়াবহ। বিরাট অংশের মানুষ জানেন‌ইনা যে যৌনসংসর্গ ছাড়াও এইচ‌আইভি সংক্রমণ হতে পারে, সম্পূর্ণ রোগীর অজান্তে ঘটে যেতে পারে এই সংক্রমণ। রক্ত দেয়া বা নেয়ার সময় সূঁচটির মাধ‍্যমে বা সেলুনে চুলদাড়ি কাটার সময়ে সামান‍্য কেটে গেলেও এই রোগ ছড়ানো সম্ভব। এইচ‌আইভি পজিটিভ মানেই যে এডস নয় এটাও অনেকেই জানেন না। বিভিন্ন গণমাধ‍্যমে লাগাতার প্রচার সত্ত্বেও, শিক্ষিত হ‌ওয়া সত্ত্বেও, চিকিৎসকদের উপর্যুপরি নিশ্চিতকরণের পরেও প্রচুর মানুষ শুধুই সংস্কারবশত মেনেই নিতে পারেন না যে এইচ‌আইভি সংক্রমণ এমনকী এইডস হলেও রোগটি ছোঁয়াচে নয়, সাধারণ সামাজিক ব‍্যবহার আচার, এক বাড়িতে বসবাস বা থালাবাসন ব‍্যবহারে, হাত মেলানো, চুম্বনের মতো ঘটনায় (মুখে বা জিভে ঘা বা ক্ষত না থাকলে) এডস কোনোমতেই ছড়ায় না। রোগ শারীরিকভাবে শেষ করে আর এই সামাজিক হেনস্থা মানুষটিকে শেষ করে মানসিকভাবে। বাঁচার ইচ্ছেটাও শেষাবধি আর থাকে না।

অপরিচিত ব‍্যক্তির সাথে অথবা একাধিক যৌনতায় যেতে গেলেই সুরক্ষা বা নিরোধ ব‍্যবহার এইচ‌আইভি সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রাথমিক ব‍্যবস্থা বা নিজস্ব প্রতিরোধ। প্রচুর ক্ষেত্রে এমন হয়েছে যেখানে স্বামী বা স্ত্রীর থেকেও এইচ‌আইভি সংক্রমণ ঘটেছে যেখানে সাধারণভাবে সুরক্ষা ব‍্যবস্থা নেয়ার কথা কেউ ভাবেন না। অনেকক্ষেত্রে জানতে পারলেও যে নিজে এইচ‌আইভি সংক্রমিত, সঙ্গীর কাছে সেটি লুকিয়ে গেছেন বা যান অনেকে। এতে অনেকক্ষেত্রে সঙ্গীটিই শুধু সংক্রমিত হন বা হয়েছেন এটাই নয়, মহিলার ক্ষেত্রে গর্ভস্থ ভ্রূণ, সদ‍্যোজাত শিশু বা মাতৃদুগ্ধপানকালীন‌ও শিশুটি সংক্রমিত হতে পারে। তাই জানতে পারা মাত্র নিজের সঙ্গীকে জানানো জরুরী, পার্টনারের কাছে নিজের বিশ্বাসযোগ‍্যতা হারানোকে এই ঝুঁকিগুলোর চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া ভয়ানক ক্ষতিকর এবং অপরাধ‌ও বটে।

বিবাহ বা একত্রবাসের সময় থেকেই রক্তে এইচ‌আইভি পরীক্ষার ওপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকরা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংক্রমণ ঠেকানোর জন‍্য গর্ভাবস্থায় এইচ‌আইভি টেস্ট করানো জরুরী।

যারা যৌনপল্লীতে গিয়ে অভ‍্যস্ত, তারাই অনেকসময়ে জোর করেন অরক্ষিত যৌনসংসর্গের জন‍্য। জোরেশোরে প্রচার চালানো সত্ত্বেও সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বা সতর্কতার ধার ধারেন না।

যৌনসংসর্গে সুরক্ষা নিয়ে সতর্ক হবার পাশাপাশি যৌনতা বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিতে শেখা আমাদের সমাজের মঙ্গলের জন‍্য‌ই অত‍্যন্ত জরুরী। শরীর এবং যৌনতা নিয়ে ন‍্যূনতম জ্ঞান, শিক্ষা, পাঠ পরবর্তী প্রজন্মকে যথাসময়ে দেয়াও জরুরী। এই সচেতনতা কেবল এইচ‌আইভি সংক্রমণ বা এডস নয়, নানাবিধ যৌনরোগ, যৌনতা সম্পর্কে অহেতুক আতঙ্ক, ভুলভাল ধারণা, অবাঞ্ছিত ও অকাল গর্ভধারণ ইত‍্যাদি অনেক সমস‍্যার মুখোমুখি হয়ে লড়বার শক্তি যোগাবে আমাদের। আজ বিশ্ব এডস দিবসে নতুন করে অঙ্গীকার হোক, সতর্কতা অবলম্বনের সাথে সাথে ট‍্যাবু বা নিষিদ্ধ আলাপের গণ্ডী থেকে যৌনতার মুক্তি ঘটানো।

664 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।