নিজ গৃহে নিগৃহীত নারীর গাথা

শনিবার, জুলাই ১৩, ২০১৯ ৪:১০ PM | বিভাগ : ওলো সই


প্রতিদিন নিউজফিল্ডের পাতা ভরে থাকে ধর্ষন, ধর্ষন আর ধর্ষনের সংবাদে। ব্যপারটা কি এমন যে হঠাৎ বেড়েছে, আমার তা মনে হয় না, মেয়েরা মুখ খুলছে, রির্পোট করছে। আর আগে মুখ খুলতো না বলে হয়তো মেরে ফেলতো না। তবে আমি আজকে ধর্ষণ নিয়ে না, দরজার আড়ালে যে কান্নাগুলো সমাজ, সম্মান, পরিবার আর ধর্মের নামে চাপা পড়ে তা নিয়ে আমার ব্যথাটা জানাতে চাই। রাস্তায়, স্কুলে, অফিসে যদি যৌন হযরানীর শিকার হয় ২০% তার বাকি ৮০% যৌন নিপীড়ন এর শিকার হয় মেয়েরা নিজ গৃহে। হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন এবং আপনারা তা জানেনও।

ঘটনা-১।  ছোট্ট তুন্তিকে নানার কাছে রেখে মা চাকরীতে যেতো, নানার সাথে গ্রামের পুকুরে দাপাদাপি, মসজিদে যাওয়া, দোকানে গরম গরম রসগোল্লা খেতে যাওয়া, আর নকল করে পত্রিকা পড়ার ভান ধরা, গল্প শোনা এসবই ছিলো তুলতুলের শৈশব। আপাতদৃষ্টিতে কি রঙিন তাই না! অথচ রাতে নানা তাঁকে গল্প শোনাতে শোনাতে তাঁর কোলে বসাতো, তার ছোট্ট শরীরটা বুঝতো না কিছুই শুধু তার খারাপ লাগতো। এখন সে সব বোঝে কিন্তু তাঁর ভালোবাসার মানুষটা সদ্য বিয়ে করে যাঁর ঘরে সে এসেছে তাঁর সাথে অন্তরঙ্গ হতে গেলেই পুরানো শৈশব সামনে এসে দাঁড়ায়। সে পারে না স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন বয়ে নিতে।

ঘটনা-২। ছোটো সায়রার সাথে তাঁর বড়ো বোনের বয়সের তফাত ১৭ বছর। বড়ো বোনের বিয়ের সময় সে হাফপ্যন্ট পড়তো। বড়ো বোনের মেয়ে তার বছর দু'য়েকের ছোট। দুলাভাই বরাবর আদর করতো। সায়রা এখন ক্লাস এইটে পড়ে, ছোট্টটি নেই, বয়ঃসন্ধি কাল পেরুচ্ছে, মা অসুস্থ, বিছানায় শয্যাশায়ী। দুলাভাই প্রায় সন্ধ্যায় মাকে দেখতে আসে, এসেই সায়রাকে বলে কোলে আয় তোকে ন্যাংটো কত কোলে নিয়েছি। তুই আমার সামনে কতবার কাপড় পাল্টেছিস এখন আর পাল্টাস না কেনো? একদিন দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে ভাতঘুম দিচ্ছিলো, দুলাভাই তাঁর শরীরে হাত দিতে গেলে সে ধরমর করে উঠে চিৎকার করে উঠে। সে পরিবারের লোকজনকে জানালে পরিবার এর লোকজন তাঁকেই গালি দেয়, দুলাভাই এর দুষ্টুমি শালিকার সাথে, সে এটা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করছে, বোনের মেয়ে, বড় বোন দু'জন তাঁকে নটী, বেশ্যা বলে ও গালি দেয়। সেই শত্রুতা আজো মেয়েটা বয়ে বেড়াচ্ছে। তাঁর ডির্ভোসের পর তাঁর বোনরাই থাকে শুনিয়েছে তাঁর মতো চরিত্রহীন মেয়ের সংসার হবে না এটাইতো স্বাভাবিক।

ঘটনা-৩। পুতুল এর সমবয়সী সব কাজিন ছেলে, সে তাঁদের সাথে গোল্লাছুট খেলে, কানামাছি খেলে, দড়ি লাফ খেলে, ঘরের চেয়ে উঠোনে ধূলোয়, ডাংগুলি, মার্বেল আর ছাগল ছানার পিছনে দৌড়াতেই তাঁর ভালো লাগে। বয়সে বেশ বড়ো তাঁর খালাতে ভাই ছোটবেলা থেকেই তাঁকে কোলে নিয়ে বিচ্ছিরি ভাবে বুকের উপর হাত রাখতো, উরুতে হাত রাখতো, আর একটু বড় হওয়ার পর রাতের বেলা তাঁদের বাসায় বেড়াতে এসে তাঁর বিছানায় চলে আসে, পাশে নানী ঘুমাচ্ছে তবু কী সাহস! এটা কি সাহস নাকি আমরা, বড়রা সম্মানের নামে তাঁদের কে বাঁচিয়ে দেই বলে তাঁদের কোনো বিকার নেই। পুতুল তাঁর পরিবারকে জানালে তাঁর পরিবার বলে সবাই বলে হুসহুস লোকে জানলে তোরি বদনাম হবে। শাস্তি হলো ঐ ভাই এরপর আর বাসায় আসলেও রাতে থাকতে পারবে না।

ঘটনা-৪। শিমুলের বিয়ে হয়েছে পারিবারিক ভাবে, বরকে বিয়ের দিন ভোরে প্রথম দেখে, সে অচেনা মানুষের সাথে বাসর রাতে তাঁকে বলে কিছু সময় দিতে যাতে দুজনের পরিচয়টা ঘনিষ্ট হয়। বর বলে এতো টাকার গয়না আর কাবিন দিয়ে সে তাঁকে কিনে নিয়েছে অপেক্ষা করার জন্যে না। বিকৃত স্যাডিস্ট লোকটার প্রি ইজাক্যুলেশনের সমস্যা ছিলো। নিজের অক্ষমতা ঢাকতে সে শিমুলকে মারতো, কামড়ে ক্ষত বিক্ষত করে চিৎকার করতে বলতো। সে পরিবারকে জানালে সবার আগে তাঁদের দু'জনকে পাঠানো হয় ভাসুরের কাছে কারণ সে ডাক্তার। ডাক্তার ভাসুর তাঁর বরকে বাইরে পাঠিয়ে দেয়, আলাদা করে দুজনের সাথে কথা বলবে বলে, আর খালি রুমে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিমুলের উপর বলে তাঁর ভাই যেটা থাকে দিতে পারছে না সেটা সে দিবে। বাবা মা কে জানালে বলে, এডজাস্ট করো, বলে আমাদের পরিবার এর মেয়েরা লাল কাপড়ে শ্বশুর বাড়ি যায় সাদা কাপড়ে ফেরত আসে।

এরকম আরো অসংখ্য কোটি কোটি মেয়ের শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যে সে রোজ খুন হয় নিজের ঘরে, সবচেয়ে নিরাপদ গৃহে কখনো মামা, কখনো খালু, কখনো কাজিন, তো কখনো দাদা-নানার দ্বারা, তো কখনো নিজের বর। এই যে পরিবার হুসহুস বলে, লোকে কী বলবে সেই ভয়ে চুপ করিয়ে দেয়, এগুলোই জন্ম দেয় নির্লজ্জ পৈশাচিক ধর্ষকের। এগুলোর কোনো রির্পোট হয় না, কোনো মামলা হয় না। খবরের কাগজে নিউজ হয় না। অথচ কোটি কোটি মেয়ে বড় হয় নিজের শরীরকে ঘৃণা করে, এঁটো ভেবে, নিজের শত্রু ভেবে। তাঁদের অনেকেই পারে না বিবাহিত জীবনের স্বাভাবিক দাম্পত্য পালন করতে।

যে সমাজে রোজ রোজ ৫ মাসের শিশু থেকে ৫০ বছরের বৃদ্ধা ধর্ষিত হয়, ধর্ষনের পর মেরে ফেলে। তাঁর রিপোর্ট সংখ্যাই আপনাদের পত্রিকার ছয় মাসের পরিসংখ্যানে আসে। তাঁদেরই বিচার হয় না। আর সেখানে এসবতো ডালভাত। এসব আবার কথা বলার মতো বিষয় নাকি? ঠিকঠাক মতো পর্দা করলে এসব হতো না। মেয়ে মানুষ, যদি ও পাঁচ বছরের শিশু কেনো বাইরে বেটাছেলেদের সাথে মার্বেল খেলবে, কেনো এতো মিশবে ছেলেদের সাথে, কেনো এতো হাসবে হোক না তা মামা- চাচা, দাদা- নানা। যাকগে, যা হওয়ার হয়েছে, এর জন্যে আত্মীয়র সাথে সম্পর্কতো ভাঙা যাবে না। আর লোকে জানলে কে বিয়ে করবে এই মেয়েকে, সমাজে মুখ দেখাবে কী করে? থু থু দিবে লোকে। কিন্তু কতো কতো মেয়ে জীবন্মৃত হয়ে শুধু সামাজিকতার দায়, পরিবারের সম্মানের দায় মেটানোর জন্যে বেঁচে থাকে খুন হয়ে যাওয়া শৈশব নিয়ে সেটা নিয়ে আর কতকাল চুপ থাকবে এই সমাজ?


  • ২৫১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শায়লা হক তানজু

প্রবাসী লেখক, এক্টিভিস্ট।

ফেসবুকে আমরা