ভাঙবে সবকিছুইঃ কিছুই শাশ্বত নয়

শুক্রবার, অক্টোবর ৬, ২০১৭ ৮:৩৭ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


যারা নানা উছিলায় কোনো না কোনো ভাবে এই সমাজ ভাঙার বিপক্ষে অজুহাত দাড় করায় ওদের থেকে সাবধান থাকবেন। যারা অফিশিয়ালি ডানদিকে আছে, রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক দিয়েই রক্ষণশীল, ওদের কথা বলছি না। ওদের তো রাজনীতিই পরিবর্তনের বিপক্ষে, প্রগতির বিপক্ষে। ওরা তো কিছুই ভাঙতে চান না। যা আছে সেটাই রেখে দিয়ে একটু সংস্কার টংস্কার করে চালানোর পক্ষে ওরা। ওদের কথা বলছি না। আমি বলছি সেইসব ভাইজানদের কথা, যারা মুখে বলেন- সমাজ বদলাতে হবে, মাঝেই মাঝেই আওয়াজ করে বলেন- 'আমরা যারা প্রগতিশীল রাজনীতি করি' বা বেশ বিজ্ঞের মতো মার্ক্সবাদ বিপ্লব এইসবের কথা বলেন, ওদের কথা বলছি।

আপনি বিপ্লব চাইবেন, নয়া সমাজ গড়তে চাইবেন, আর এই সমাজ ভাঙার প্রশ্ন উঠলেই সরু গলায় বলবেন আবহমান সমাজের কথা, এইটা তো ভাই হইলো না। আপনি বিপ্লবের কথা বলবেন আর কেউ একজন যখন আপনার পূর্বপুরুষের বেঁধে দেওয়া নিয়ম না মানতে চাইবেন তাকে ধমক দিবেন, এইটা কি ভাই? আপনি মুখে বলবেন মানুষের মুক্তির কথা, নয়া সমাজ তৈরি করার কথা, অথচ একদল মেয়ে যখন প্রচলিত প্রথা প্রতিষ্ঠানকে ছুড়ে ফেলতে চাইছে তখনই আপনি তাকে খারাপ একটা গালি দিয়ে বলবেন যে ওদেরকে নাকি আপনি আপনার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করতে দিবেন না- এইটা তো ভাই হয় না, আপনার কোথাও বুদ্ধির ভুল হয়েছে, অথবা আপনি প্রবঞ্চনা করছেন। 

দুইটা উদাহরণ দিই। একজন এই কিছুদিন আগেও নাকি কম্যুনিস্ট পার্টির মেম্বার ছিলেন। এখনো মাঝে মাঝে মার্ক্সবাদ লাইনে বাণী মারে ফেসবুকে। ফরহাদ মজহার লাইনের লোক- খ্যাতি আছে। তিনি কয়েকদিন আগে টেলিভিশনে গেছেন সেজেগুজে, নারীবাদ নিয়ে আলোচনা করতে। ওর নিজের বক্তব্যের ইন্ট্রো দিতে গিয়ে তিনি তার নিজের টিউনটা সেট করলেন এই বলে যে আমাদের এইখানে এখন যে নারীবাদটা চলছে সেটা এসেছে পশ্চিম ইউরোপ থেকে আর এটার পিছনে আসল মতলব নাকি আমাদের আবহমান বিশ্বাস ও সংস্কৃতি ইত্যাদি ধ্বংস করা। আমি পুরো শো দেখিনি, সেজন্যে ভদ্রলোকের অন্য বক্তব্য নিয়ে কিছু বলবো না।

আরেকজন আমার অত্যন্ত প্রিয় তরুণ, একসময় একটি সমাজতন্ত্রী দল করতেন, এখন কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্ভবত আর নাই। কবি। গণজাগরণ মঞ্চের পত্তন করেছিলেন এরকম কয়েকজনের একজন তিনি। তিনি মাঝে মাঝেই সিপিবিকে ও এর নেতাদেরকে আক্রমণ করেন কেননা, ওর মতে, সিপিবি ও এর নেতারা যথেষ্ট বিপ্লবী না বা বিপ্লব করার লায়েক না। তার সাথে আমার এমনিতে অনেক প্রশ্নে মতৈক্য- কিন্তু তিনি 'পরিবার' ইন্সটিটিউশনটির প্রতি অত্যন্ত আস্থাবান। পরিবার প্রথার বিপক্ষে সরাসরি বা পরোক্ষে কেউ কোনো কথা বললে তিনি রেগে ওঠেন। পরিবারের এই গুরুত্ব নাকি তিনি শিখেছেন মার্ক্স সাহেবের বই পড়ে। সম্প্রতি তিনি আমাদের দেশের নারীবাদীদের নিয়ে পড়েছেন- এদেরকে বিরোধ করা আর তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা চলছে নানান ইস্যুতে। ইনার পবিত্র জিনিসটি হচ্ছে পরিবার- একে ভাঙা যাবেনা বা এটিকে খাটো করে এমন কিছু বলা যাবে না। এইটা নাকি শাশ্বত। 

দুইজনের কথা বলছি উদাহরণ হিসাবে। বৈশিষ্ট্যগুলি দেখেন। ওরা কিন্তু আপনাকে কখনোই বলবেন না যে মার্ক্সবাদ খারাপ। বা কখনোই বলবে না বিপ্লবের প্রয়োজন নাই। এরা আপনাকে বলবে যে বিপ্লব তো খুবই জরুরী, কিন্তু সিপিবির দোষ আছে, এই দেশে বিপ্লব হবে না। আবার কোনো কোনো সময় একটু জটিল করে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সারা দুনিয়া দেখিয়ে রাশিয়া চীন আমেরিকা তুরস্ক ইরাক সিরিয়া ভারত শ্রীলঙ্কা ঘুরিয়ে এনে আপনাকে বুঝাবে যে, না ঐসব বিপ্লবের চিন্তা ভাবনা আপাতত বাদ দেন। বলতে পারেন যে একজন লোক তো মনে করতেই পারেন যে বিপ্লব করে মানব জাতির মুক্তি হবে না। সে ওদেরই মতামত, এদের সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক হওয়ার দরকার কি? 

সতর্কতার প্রয়োজনটা আসে কারণ এরা একধরনের ভান ধরে থাকে বলে। ঐ যে প্রথমেই বলেছি, আপনি যদি দক্ষিণের পথ পছন্দ করেন আর যদি সৎভাবে সেটা বলেন তাইলে তো আপনাকে চিনিই- অসুবিধার বিশেষ কিছু নাই। কিন্তু এরা ভান ধরবে যে এরা দক্ষিনপন্থী না, এরা নাকি বাম। নিজেদেরকে সাজিয়ে রাখেন প্রগতিশীল পোশাকে। আর পেটে পেটে চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল। এই ভানটুকুর জন্যেই সতর্ক থাকতে হয়।

ভান বলছি কেন? কারণ আপনি যদি নয়া সমাজই বানাতে চান তাইলে তো সমাজ ভাঙতে হবে। আর সমাজ ভাঙা মানে কি? এটা তো দালান কোঠা ভাঙার ব্যাপার না। সমাজের এখনকার যে কাঠামো- ভিত্তিটা এবং উপরেরটা- দুইটাই তো ভাঙতে হবে। নাকি? এইসব যে বলছেন আপনারা- যে আবহমান বিশ্বাস, প্রথা, প্রতিষ্ঠান নিয়ম কানুন মূল্যবোধ এইগুলি ভাঙা যাবে না- এইগুলিই তো সমাজের বর্তমান কাঠামো- উপরেরটা। এইগুলি ভাঙতে হবে না? না ভেঙে আপনি নয়া সমাজ নির্মাণ করবেন কিসের উপর?

এখন যদি আপনি কারো কথা শুনে বলতে শুরু করেন, যে না না, এটা তো আমাদের শাশ্বত প্রতিষ্ঠান এটা ভাঙলে তো বিপদ, তাইলে তো আপনি নয়া সমাজ গঠনের বিপক্ষে কথা বলছেন। তাইলে স্পষ্ট করে বলেন, যে না, আপনি প্রগতি, পরিবর্তন, বিপ্লব, নয়া সমাজ এইসবের বিপক্ষে। তাইলে অন্তত সততাটা থাকে আরকি।

শোনেন, প্রতিক্রিয়াশীল হওয়া বা প্রগতিশীল হওয়া- কোনোটাই ভালো না বা মন্দ না। আপনার পছন্দ কোনটা সেটা হচ্ছে কথা। আপনি যদি মনে করেন যে, সমাজ যে পথে চলছে সেটাই ভাল, পরিবর্তন দরকার নাই, একটু সংস্কার একটু উন্নয়ন এইসব করে নিলেই চলবে, ফাইন, ঐটা আপনার মতামত। চলেন, আমরা যার যার পথে চলি। দেখা যাক, শেষ বিচারে কে কোথায় যায়। কিন্তু আপনি বিপ্লবের মিছিলে থেকে বলবেন যে, না, প্রচলিত বিশ্বাস ভাঙা যাবে না, পরিবার প্রথার বিরুদ্ধে বলা যাবে না, না, আবহমান সংস্কৃতিতে আঘাত করা যাবে না, সেটা তো ভাই অসততা হয়ে গেল।

এইজন্যেই তরুণ বন্ধুদেরকে বলি। স্পষ্ট করেই বলি। এইসব স্যুডো প্রোগ্রেসিভদের ব্যাপারে সাবধান থাকবেন। এদের সাথে তর্কও হবে না। কেনো? কারণ মুখ ঢেকে রাখা ভণ্ডদের সাথে আবার তর্ক কি? তর্ক হবে শত্রু ক্যাম্পের সাথে- যারা প্রকাশ্যে আমার বিরোধিতা করে। প্রয়োজনে লড়াই হবে, লড়বো। কিন্তু এইসব সাহেবদেরকে এড়িয়ে যাবেন। এদেরকে সন্দেহের তালিকায় রাখবেন- ঐটুকুই সতর্কতা।

আর সেইসব নামে প্রগতিশীল কিন্তু হাড়ে মজ্জায় প্রতিক্রিয়াশীল বন্ধুদের বলি, আপনাদের ঐসব শাশ্বত, আবহমান সংস্কৃতি, বিশ্বাস ইত্যাদি এইসব বাকোয়াস কথাবার্তা। কোনো কিছুই শাশ্বত নয়, কোনো বিশ্বাসই চিরস্থায়ী নয় আর সংস্কৃতির কোনো দিকই অপরিবর্তনীয় নয়। এগুলি এমনিতেও ভেঙে পড়বে, মায়া করে লাভ নেই। বরং চিন্তা করে দেখুন- সৎভাবে- ভাঙার পর কি এইরকম আরেকটা পচা সমাজ দাঁড় করাবেন নতুন খোলসে? নাকি মানুষের জন্যে একটা মর্যাদাকর সমাজ গড়ার প্রস্তুতি নিবেন? ঐসব শাশ্বত আর আবহমান আর ঐসব ইয়ে ঐগুলি কিছুই থাকবে না। ফুহ!

 


  • ২৮৪৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ইমতিয়াজ মাহমুদ

এডভোকেট, মানবাধিকারকর্মী

ফেসবুকে আমরা