বিয়ার "প্রতিশ্রুতি" দিয়া যৌনতা!

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ২৫, ২০১৮ ৯:৩৩ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


এই জীবনে যত হাস্যকর কথা শুনছি, তার একটা হইলো, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়া ধর্ষণ। কিংবা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়া প্রতারণা। অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, এই বাক্য নারীর কাছ থেকেই আসে। পুরুষ প্রতারিত হইলেও কখনো বিয়ের প্রতিশ্রুতির বিষয়টা নিয়া মাথা ঘামায় না। কিংবা কে জানে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়া কোনো মেয়ে কোনো পুরুষরে বিয়া করে নাই- এইটা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পুরুষের পৌরুষে লাগে। সে প্রতারিত হইসে এই কথা সে কয়, বলে- ছ্যাকা খাইসি, আঘাত পাইসি। কিন্তু কখনো কয় না যে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়া ওই মাইয়া আমার সাথে শুয়ে টুয়ে আমার সর্বনাশ করছে, আমার ভার্জিনিটি শেষ কিন্তু এখন বিয়া করতেসে না।


বরং পুরুষ বলে, মেয়ে আমার লগে শুইছিলো। এই ‘শুইছিলো’ শব্দ দিয়া পুরুষ বোঝায় তার এক্স গার্লফ্রেন্ড একটি অসৎ চরিত্রের মেয়ে এবং সেই অসৎ মেয়েতে তিনিও একদা চড়াও হয়েছিলেন যৌনসংগমের নামে, মানে তিনি যা করার করে দিয়েছেন। এইখানেও পুরুষের গর্বিত ভাব বজায় থাকে। অর্থাৎ ছ্যাকা খাবার পরও পুরুষ তার পৌরুষের অহং ছাড়ে না।

বিয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়া মাথা ঘামায় মেয়েরা। বিয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়া তারা প্রিয় পুরুষের সাথে শোয়। এই উপমহাদেশের নারীর এই ম্যাচুরিটি এখনো আসে নাই যে এটা তাদের মাথায় ঢুকবে যে, ভালোবেসে যখন সে কোনো পুরুষের সাথে সম্পর্কে যাবে, তখন সে তার সাথে শোবে- এটাই স্বাভাবিক।

এই শোয়াশুয়ির সাথে বিয়ের স্বপ্ন আসতে পারে আবার নাও পারে। বিয়ের স্বপ্ন ও সিদ্ধান্ত দুইজনের। এখন আপনার পুরুষ আপনার সাথে সেক্স করার আগে বা পরে কইলো, আমরা বিয়া করবো। এখন আপনাদের সম্পর্ক যদি বিয়ার সময়কাল অবধি সুন্দর সুস্থ থাকে, তবে অবশ্যই তা বিয়েতে রূপ নেবে। কিন্তু সম্পর্ক কুৎসিত আর ক্লোদাক্ত হয়া গেলো, কিন্তু যেহেতু আপনে শুইছেন তার সাথে, এখন আপনার তারে বিয়া করতেই হবে? এ কী ধরণের আদিম চিন্তা, এইটাই আমার মাথায় আসে না। এই দেশে, এই উপমহাদেশের মেয়েরা এখনো এই উদ্ভট ও আত্মঘাতি চিন্তার ভিতরেই পাক খেয়ে যাচ্ছে। আফসোস!

কিছু পুরুষ নারীর সাথে শোয়ার আগে পরে কয়, তোমারে বিয়া করমু। পরে আর তারে ‘বিয়া করে না।’ যখন মেয়ে পরে সালিশ বসায়, কয়, ‘ও আমারে বিয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়া আর আমারে বিয়া করে নাই।’

খেয়াল করে দেখেন, এক্ষেত্রে পুরুষ নারীরে ’বিয়া করে’। তারা দুইজন মিলা বিয়া করে না। পুরুষ বিয়া কইরা উদ্ধার করে। বিয়া ‘হইলো’ বলে নারী উদ্ধার হয়া যায়। মধ্যযুগের মানসিকতাও এতটা জঘন্য ছিলো কি না, গবেষণা করে দেখা দরকার।

এদেশের আদালতে, মানবাধিকার সংস্থাগুলোতে হরহামেশা এ ধরণের কেস আসে। বিয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়া বিয়া না করা।

এখন মাইয়া, তোমারে যে পুরুষ প্রতিশ্রুতি দিয়া আর বিয়া করে না, সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী পুরুষরে তুমি কোন বিবেচনায় ফিরে পাবার জন্য মামলা ঠুকে দাও? যখন তুমি তার সাথে যৌনসম্পর্কে যাও, সেই সম্পর্ক কি তোমদের দুইজনার না? নাকি শুধু তোমার পুরুষরে খুশি করতে তুমি তার হাতে নিজের শরীর তুলে দাও? যদি তাই হয়, তবে তো প্রেমের নামে তুমি নিয়ত স্বেচ্ছায় নিজেকে ধর্ষিত কর। এর দায়ভারটা আসলে কার?

শরীর নিয়া, যৌনতা নিয়া আমাদের ট্যাবুগুলো এতটাই আত্মঘাতি এবং এর বেশিরভাগ দায়ভারই নারীরে বহন করতে হয়। পরিবার তারে শিখায়, বিয়া ছাড়া শুবি না। বিয়ার আগ পর্যন্ত নিজেরে কুমারী রাখবি। সতী রাখবি। এই সমস্ত হাস্যকর আদিম কনসেপ্ট মাথায় পেলেপুষে রেখেই একটা মেয়ে প্রেমে পড়ে, দুরুদুরু বুকে প্রেমিকরে চুমু খায়, যৌনসম্পর্কে যায়। আর মনে মাথায় মগজে ধারণ করে, এরে তো শরীর দিসি। এখন এরে ছাড়া আমার গতি নাই।

এরপর সেই প্রেমিক তারে দুইদিন পর যখন ঝাটার বাড়ি মারে, যখন কয়, ’তোমারে আমার আর ভাল্লাগে না, তুমি যাও’; তখন মাইয়ার মাথায় বাজ পড়ে। প্রেমিক হারানোর কষ্টের পাশাপাশি তাকে তাড়া করে ফেরে ভয়। সে তো ‘সর্বস্ব’ দিয়া ফেলছে।

এইদেশে নারীর কাছে তার শরীরই তার সর্বস্ব। শরীর দিয়া তারে সমাজ মাপে। সেও নিজেকে শরীর দিয়াই মাপে। এই মাপামাপির ইম্যাচুরিটি আর আদিমতা থেকে এদেশের নারীরা বাইর হইতে পারবে যেইদিন, সেই দিন সত্যি দিন পাল্টাবে।

শরীরের পবিত্রতা রক্ষায় নারী যুদ্ধংদেহী হয়ে ওঠে। পুরুষরে কয়, ‘বিয়া করবা না তো শুইছো কেলো’? তার মাথায় এইডা আসে না, যে পুরুষ তারে আর ভালোবাসে না, তার সাথে বিয়া বসলে আসলে আর কিছুই আদায় হবে না- নিজের জন্য একটি অহেতুক, বিভীষিকার জীবন ছাড়া।

আর যৌনতা? ভালোবাসার আড়ালে যৌনতাই সবচেয়ে ক্রিয়াশীল। এরে মেনে নেয়াই উত্তম। এই নিয়া হুদাই শুচিতার ভং কইরা লাভ নাই। যারে ভালোবাসেন, তারে শারীরিকভাবে ভালোবাসার মধ্যে অশুচিতারও কিছু নাই। আর ভালোবাসা না থাকলে সেই সম্পর্ককে শেষ অবধি জোর করে পরিনতি দিয়ে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করারও কোনো অর্থ নেই। এতে নিজেকেই সবচেয়ে বেশি অপমান করা হয়।


  • ৪০২৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শারমিন শামস্

সমাজকর্মী শারমিন একজন ফিল্মমেকার ও সাংবাদিক।

ফেসবুকে আমরা