পাষণ্ড ধর্ষক ও অপহরণকারীর বিচার চাই

সোমবার, অক্টোবর ২৮, ২০১৯ ৩:৩৬ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


ছবিটি আমার প্রাক্তন স্বামী মোস্তফা জামান বাবলু-এর। সে আওয়ামী লীগ কর্মী। ২৫ নং ওয়ার্ড এর ৬ নং ইউনিট এর জয়েন্ট সেক্রেটারি। তার সাথে আমার বিয়ে হয় আজ ২০ বছর। বাসর রাত থেকেই তার হিরোইন, ফেনিসিডিল জাতীয় মাদক সেবনের ভয়ানক ব্যপারটি জানতে পারি আমি। বিয়ের পর আগ্রহ নিয়ে বাসরের বিছানা ঝেড়ে দিতে গিয়ে ভুলে আমি তার হিরোইনের পুড়িয়া ঝাড়ু দিয়ে ফেলে দেই। সে এসে পাগলের মতো সেই পুড়িয়া খুঁজে এবং না পেয়ে কষে আমাকে চড় মারে। তারপর থেকে অনবরত তার হাতে মারধোরের শিকার হচ্ছি আমি। বিয়ের পর থেকে আমাকে দিয়ে দেহ ব্যবসা করানোর জন্য অজস্রবার মারধোর করে। এসব সহ্য করতে না পেরে কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলাম আমি।

পরিবার জানতে পেরে সারাজীবন কেবল শান্তনা দিয়ে এসেছে যে, সব আল্লাহ ঠিক করে দিবে একদিন। কয়েকবার আত্মহত্যা করতে চেয়েও দুর্ভাগ্যবশত মরিনি। পালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, জোর করে ধরে এনেছে এই বদমাশ বাবলু। যতোবার তার অত্যাচার হতে পালাবার চেষ্টা করতাম, ততোবারই সে আমাকে ধরে নিয়ে আসতো। পরিবারের সাপোর্ট না থাকায় ও বাচ্চাদের কথা ভেবে আমি বাধ্য হয়ে এই লোকের সাথে সংসার করতে থাকি। আর আল্লাহ সব ঠিক করে দিবে, পরিবারের দেয়া এই আশাতে আশাতে আমার ২০ বছর সংসার জীবন পার করলাম।

২০১৩ তে তার নেশা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় ও আমাকে প্রচুর মারধোর করতো বলে রিহ্যাবে দিয়েছিলাম। কিন্তু আর ঠিক হলো না এই অমানুষটা। তাই ২০১৮ এর ডিসেম্বারে তাকে ডিভোর্স পেপার দেই আমি। কিন্তু সে আমাকে আওয়ামীলীগের লোকজন দিয়ে তুলে আনে। তুলে আনার পরে আমি নিচের পোস্টটি দিয়েছিলাম মিডিয়ার কেউ আমাকে সাহায্য করবে ভেবে। দেখলাম, কোনো সাহায্য এলো না। অসহায় নারীর কোনো অবস্থান নেই এই সমাজে। ডিভোর্স চলাকালে ১ম বার যখন আমাকে অপহরণ করে আনে, তখন আমি যে পোস্টটি দিয়েছিলাম তা নিম্নে দেয়া হলো।

"আমি আমার শেষ রক্ষা করতে পারলাম না।আমি জানিনা বাংলাদেশের আইনে ডিভোর্স দেয়া বউ য়ের সাথে তার বিনানুমতিতে থাকার পারমিশন আছে কিনা।আমি গত ১৮ ই ডিসেম্বর আমার হাজবেন্ড কে ডিভোর্স পেপার দিয়েছি।এত দিন আত্ম গোপন করেছিলাম কিন্তু গতকাল রাতে সে তেজগাঁ থানার এস আই রকিবুল সাহেবের সাহায্যে আমার মোবাইল নাম্বার ব্যকতিগত ভাবে ট্রাকিংয়ে দিয়ে আমাকে খুজে বের করে ও আওয়ামী লীগের কিছু নেতা কর্মীর দ্বারা উঠিয়ে নিয়ে আসে।সে নিজেও একজন আওয়ামী লীগ কর্মি।২৫ নং ওয়ার্ড এর ৬ নং ইউনিট এর জয়েন সেক্রেটারি।এখন আমি কি করতে পারি? আমাকে না পেয়ে সে আমার বন্ধুদের হুমকি দেয়া শুরু করে এবং এক পর্যায় সে আমার ঠিকানা বের করতে সক্ষম হয়।আমার এই ডিভোর্স কি তাহলে বাতিল হবে? আমাকে এ ব্যাপারে কেউ হেল্প করুন প্লিজ। আমি এখান থেকে বাঁচতে চাই।"
01644403184 শান্তি আকতার, নাখালপাড়া, ফার্মগেট।

সাহায্য এলো না। আমাকে অপহরণ করে এনে ইচ্ছামতো ধর্ষণ করলো পাষণ্ডটা। কাঁদতে কাঁদতে মেনে নিলাম এই পরিণতি। কিন্তু হাল ছেড়ে দিলাম না। সুযোগ তৈরি করে নিলাম এতো অত্যাচারের মধ্যেও। আর অত্যাচার সে একা করতো না। তার মা, ভাই মিলে অত্যাচার করতো। ফেব্রুয়ারী মাসে আবার পালালাম। এরপর সে আমাকে জঙ্গিদের সাথে চলে গেছি, এই রকম মিথ্যা তথ্য দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্ররোচিত করে, আওয়ামীলীগের কর্মী হবার সুবাদে মন্ত্রীর সাথে চলাফেরা করতো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ডিভোর্সের বিষয় সম্পূর্ণ গোপন করে সে মন্ত্রীর মাধ্যমে ও ডিবির কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ব্যবহার করে আমাকে ও আমার সাহায্যকারী বন্ধুকে আবার তুলে আনে।

তুলে আনার পরে আমি কোর্ট থেকে নিজ জামিনে বের হই। সে মানুষকে বোকা বানানোর জন্য আমার ৪ সন্তান নিয়ে আসে। মানুষকে ইমোশনালি প্রভাবিত করে বাচ্চাদের দেখিয়ে। এমনকি বাচ্চাদের লেলিয়ে দেয় সে আমার বিরুদ্ধে।

এছাড়া কোর্ট প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে ছিলো তার আওয়ামী লীগের বন্ধুবান্ধব। এদের মধ্যে বাবু, যে কিনা আওয়ামী লীগের ৬নং ইউনিটের দপ্তর সম্পাদক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পিএস শফিক ও এলাকার বিভিন্ন আওয়ামী লীগের ছেলে। এরা আমাকে পুলিশ, উকিল, ম্যাজিস্ট্রেট সবার সামনে থেকে জোর করে ২য় বারের মতো অপহরণ করে আনে।

তুলে আনার পরে আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এর বিচার চাইবার জন্য বের হই। বাসা থেকে বেরিয়ে নাখালপাড়া এলাকাও ছাড়তে পারিনা। তার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পিএস শফিককে ফোন দিয়ে সাবধান করে দেয় জানোয়ার বাবলু আমি যাতে মন্ত্রীর বাসায় ঢুকতে না পারি। আর এলাকায় আওয়ামীলীগের দপ্তর সম্পাদক বাবু, জানোয়ার বাবলু ও আরো কয়েকজন মিলে আমাকে টেনে-হিঁচড়ে ঘরে জোর করে ঢুকিয়ে ফেলে। এরপর পাষণ্ড জানোয়ার আমাকে তালা দিয়ে রাখে এবং ঘুমের ঔষধ খাইয়ে অজ্ঞান করে রাখে কয়েকদিন। তারপর জ্ঞান ফেরার পরে বলে, আমার জন্য অনেক মানুষ বিপদে পড়বে। তারচেয়ে আমি যেন ডিভোর্স উইথড্র করে ফেলি, তাহলে সবাই বেঁচে যাবে।

আমি চিৎকার করে কান্না করি। ভাবি মরেই যাবো। কিন্তু জীবন আমাকে যে পরিমাণ আঘাত করেছে বারবার, তাতে আমি কেমন যেন শক্ত হয়ে গেছি। দাঁতে দাঁত চেপে সময়ের অপেক্ষা করি। জানোয়ারটার বন্ধুবান্ধব এসে আমাকে নিয়ে কাউন্সিলরের কার্যালয়ে যায়, তারপর ডিভোর্স তুলে নিতে বাধ্য করে।

হায়রে সমাজ ব্যবস্থা!

সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে তামাশা দেখে, নারীকে গালিগালাজ করে, কিন্তু কারো সাহস হয় না পুরুষতন্ত্রকে প্রশ্ন করতে, নারীকে তুমি এমন অত্যাচার করো কেনো?

এরপর আবার আমি তার সাথে বসবাস করতে থাকি। কিন্তু সে আমাকে উঠতে বসতে বিকৃতভাবে শুধু ধর্ষণই করতো তা নয়, গায়ে হাত তুলতো ও খোঁচাত। এবার গায়ে হাত তুলতো ভয়ে ভয়ে। কারণ আমি থানা ও কোর্টে চিৎকার করে তার বিরুদ্ধে বলেছি। পুলিশ টাকা খেয়ে আওয়ামীলীগের নেতার পক্ষ নিয়ে আমাকে ধরে বেধে দিয়ে দিয়েছে তার ঘরে। মহান পুলিশদের কথা আর কী বলবো! তেজগাঁও থানার এসআই বাশার। সে এই মহান কাজের গর্বিত একজন বাংলাদেশ পুলিশ।

যাই হোক, মারধোর আবারো চলতে থাকে। একটা সময় আর সহ্য করতে না পেরে তাকে আবার রিহ্যাবে দেই। রিহ্যাবে দেয়ার পরে তার মা ও ভাই আমাকে মারধোরের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে সারাক্ষণ টরচার করতে থাকে৷ তাই আর না পেরে ডিভোর্স পেপার দিয়ে চলে এসেছি আমি।

আবারও সে কি আমাকে অপহরণ করতে পারবে?

অপহরণ করলে তো কোর্ট তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে, তাহলে নারী অধিকার বলে যে শব্দ আছে, সেটা কোন দেশের? শব্দটার মূল্য কোথায় পাবো কেউ বলতে পারেন?

আমি আবার এসেছি এই জানোয়ারের কবল থেকে পালিয়ে। তবে এবার সে আমাকে নিয়ে গেলে আমাকে জীবিত নিতে পারবে না। আমার লাশ নিয়ে যাবে। আর এই সমাজ কি কেবল নুসরাত ও তনুদের মরে যাওয়ার পরে জেগে উঠে? বেঁচে থাকা নুসরাত ও তনুদের বাঁচানোয় কি কারো চেষ্টা থাকবে না?

নাকি মরে গিয়ে আমাকে প্রমাণ করতে হবে যে, ওই জানোয়ার মোস্তফা জামান বাবলু আসলেই আমাকে অত্যাচার করতো?

এই প্রশ্নের উত্তর চাই সবার কাছে। উত্তর দিতে না পারলে, এই জানোয়ারটার এমন দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই, যেনো ঢাকা শহরের বুকে থেকে কারো সাহস না হয় নিজেদের স্ত্রীকে বছরের পর বছর ধরে এভাবে নির্যাতন করতে। এমন একটা বিচার চাই, যেনো নারীর ফ্যামিলি নিজেই এগিয়ে আসে নারীকে সাপোর্ট করতে। এমন একটা বিচার চাই, যেন বাবলুর মতো জানোয়াররা ভয়ে থেকে হলেও নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদের যথাযোগ্য অধিকারটুকু দেয়।

বর্তমানে আমাকে না পেয়ে আমার মা এবং ছোট বোনকে ফোন করে হুমকি দিচ্ছে যে আমার গ্রামের বাড়িতে আমার প্রাক্তন স্বামী, শাশুড়ী ও দেবর পুলিশ পাঠাবে। সেই সাথে আমাকে চুরির মামলা ও জঙ্গিদের মামলা যেভাবে দিয়েছিলো আগে, সেভাবেও আবার দিতে পারে তার রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে এই আতঙ্কে আমি দিন কাটাচ্ছি।


  • ২৯৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শান্তি আকতার

একটিভিস্ট

ফেসবুকে আমরা