করোনা কালে নারীর প্রতি সহিংসতা

শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২০ ২:৪৯ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


নারী তিনি, তিনি বাইরে যত কাজই করুন না কেনো তার জন্য বরাদ্দ গৃহাভ্যন্তরের কাজ কখনোই কমে না। সে কাজ বরং বেড়ে যায় যখন বাড়িতে বাইরের মানুষের আপ্যায়নে,পার্বণে ও বিপদ আপদের কালে। আর করোনা কাল হচ্ছে স্মরণাতীত কালের এক মহা বিপদ। বিগত সময়ে পৃথিবীতে যত যুদ্ধ, মন্বন্তর, বন্যা, দূর্ভিক্ষ হয়েছে তার প্রধান শিকার ছিলো নারী। সে কি কারণে তা আরেক দিন বলা যাবে। কিন্তু কথা যে সত্য তা সবারই জ্ঞাত থাকার কথা। তাই এখান থেকেই আমার কথার শুরু। এবারেও নারী যে তার বিপদ, কষ্ট ও ত্যাগের সীমা ছাড়িয়ে যাবে তাতে আমি অবাক না। আমি অবাক নারীর প্রতি সহিংতা বৃদ্ধি পাওয়ার সংবাদে। আশংকার কথা হলো নারীকে কেন্দ্র করে সে সহিংসতা নারীর শিশু সন্তান পর্যন্ত গড়িয়েছে।

অথচ আমি কিনা ভেবেছিলাম সমাজ এগিয়েছে, চিন্তা ভাবনায় পুরুষ প্রজাতি এগিয়েছেন, অর্থায়নে নারীর সহযোগিতা বেড়েছে, নারীর সৃজনশীল চিন্তা সমাজের বুদ্ধির, বৃদ্ধির ও প্রবৃদ্ধির সহযোগী হয়েছে- তাই তাদের প্রতি সহিংসতার মাত্রা কমেছে। কিন্তু না এই করোনাকালীন সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বেড়েছে ২০%। এখানে বিদেশ স্বদেশ বলে কোনো ফারাক হয় নি। উন্নত বিশ্বে তার সুরাহাচিত্র একটু ভাল হলেও আমাদের জগতে তার কোনো প্রতিবিধান নেই ই।

আমাদের দেশ বাংলাদেশে এপ্রিল মাসেই ৪২৪৯ জন নারী এর শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৬৭২ জন শিকার হয়েছেন প্রথম বারের জন্য, এ করোনা কালে। যারা এ জাতীয় সহিংসতার শিকার হয়েছেন যারা তার মধ্যে ৮৪৮ জন শারীরিক, ২০০০ জন মানসিক ও ১৩০৮ জন নারী অর্থনীতিক সহিংসতার জন্য নির্যাতিত হয়েছেন। অর্থনৈতিক সহিংসতা মানে তারা খাদ্য ও অন্যান্য অর্থনীতিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন (তথ্য মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সমীক্ষা, ডেইলি স্টার বাংলাদেশ)।

বিলেতে শুধু মাত্র লন্ডনেই প্রতিদিন পারিবারিক সহিংসতার জন্য শতেকের অধিক জন পুরুষকে গ্রেপ্তার করতে হয়েছে। ক’সপ্তাহের আগের খবর থেকে বলছি ইংল্যান্ডের পশ্চিম মধ্যাঞ্চলে নারীর প্রতি সহিংস হবার কারণে ৪০০ পুরুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুরুষের সহিংসতায় শারিরীক আঘাতের ঘটনাতো আছেই এমনকি মৃত্যুও হচ্ছে নারী ও শিশুর। পরিবারের প্রধান আয়কারী ব্যাক্তিটি পুরুষ হলে সে সব ক্ষেত্রে মেয়েরাই নির্যাতনের ঘটনা পুলিশকে জানাচ্ছেন না। করোনার কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে গেছে গ্রিস, জার্মানি, চায়না, ব্রাজিল এবং ইটালিতেও।

বিদেশে সাধারন মানুষ ও তাদের নিত্যদিনের কাজ ও কর্ম প্রাণালীর একটি সমন্বিত সুরাহা ব্যবস্থা পান, তাদের রান্না ঘরও উন্নত যা বাংলাদেশসহ উন্নয়ন মূলক দেশগুলতে তা নেই। নেই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও। বাংলাদেশের সম্পন্ন পরিবারগুলো বাদ দিলে বাদ বাকি সব পরিবারেই তাদের গৃহকর্ম, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সেবা, রান্না, বর্ষিয়ানদের দেখাশোনাসহ সব কাজই মূলত বাড়ির পরিনত বয়সের নারী লাগাতার করে চলেছেন। কোনো কোনো পরিবারে তার সহযোগী যোগালী তার কিশোরী কন্যা ও বৃদ্ধা মা বা শাশুড়ী। বাড়ির বৃদ্ধটি এখন যেহেতু আর ঊপাসনালয়ে গিয়ে ধর্ম কর্ম করার পর আড্ডা দিতে পারেন না তিনি দিবানিদ্রা করেন। তিনি যখন দিবানিদ্রা দেন তখন তার বৃদ্ধাটি চশমা পরে কোমর ধরে ধরে হলেও শাক বাছতে বসেন বা বৃদ্ধের ওষুধের বাক্স গোছান ও পাঁচন তৈরি করেন। ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া, কুটা বাছা সবই করছেন সংসারের মেয়েরা। সারাক্ষণ বাড়ীতে থাকার জন্য পারিবারিক সদস্যদেরও খাই খাই বেড়ে গেছে। এমতাবস্থায় খাবার পর বা রান্নার পর খালা বাসন হাঁড়ি পাতিল ধোয়া কিংবা ফ্রিজে খাবার তোলা, মোছা, টয়লেট ও বাথরুম পরিষ্কার তো আছেই। আরো যুক্ত হয়েছে করোনার জন্য বিশেষ সতর্কতা। ধোয়া মোছার যেন শেষ নেই। এত বেশি ক্ষার ব্যবহারে অনেকের হাত ও নখের অবস্থা ও শোচনীয়। সংসারের মূল মানুষটি সংবেদনশীল হলে যতটা পারছেন করছেন। কিন্তু কিছু কাজ চাইলেও করতে পারছেন না। কারন কিছু কাজ তিনি ‘মেয়েদের কাজ’ হিসেবে সনাক্ত করেন। অথবা সেগুলোকে ‘কাজের’ পর্যায়ে ধরেন না। এসব কাজের কোনো লগবুক নেই। নেই কোনো স্বীকৃতি।

মেয়েদের শ্রম যে সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে সামনে অথবা পেছন থেকে প্রভাব রাখছে তার স্বীকৃতিটা এখনো মৌখিক রয়ে গেছে। আর তাদের যে ব্যবসা বা শিল্প আছে সে বুটিক, পার্লার, ফসল সংরক্ষন, সঙ্গীত, ছবি আঁকা, ছবি তৈরি বা খাবারের দোকান চালানো, প্রেমিসেস পরিষ্কার করা বা গৃহ সহকারীত্বই হোক না কেনো তার আয়, অবদান, শিক্ষা ও স্বীকৃত নয়। ফলে এই করোনাকালে বাড়ি বসে অনলাইন বা টেলিফোনে সে কাজটি করেই তার নিয়মিত কাজগুলোও (যা আগে উল্লেখ করেছি) তিনি করে চলেছেন অব্যাহত ও একটানা। বেশির ভাগ নারীই এ সময় তার শরীরের সুবিধা অসুবিধা ও অসুখ বিসুখ উপেক্ষা করেই করে চলেছেন। বাড়িতে সবার মধ্যে তার দেহ, তার ইচ্ছা অনিচ্ছা, তার জ্ঞান, তার কাজ সর্পেক্ষা কম গুরু্ত্বপূর্ণ বৈ আর কিছু না।

মজার কথা হলো বাড়িতে বাইরেরর কাজের লোকের প্রবেশ বন্ধ হলে আর্থ-সামাজিক অবস্থানে উপরে থাকা নারীরা এই প্রথম দেখলেন তিনি আর বেগম সাহেব নেই। তাকেই ঘর মোছা- হোক তা মপ করা, কাপড় ধোয়া- হোক তা মেশিনে, ঘর ঝাড় দেয়া- হোক তা ভেকুম ক্লিনারে তবু মূলত তাকেই করতে হচ্ছে। অনেকে অবশ্য কাজের লোকের ছুটি ফুটি বাদ দিয়ে তাকেও গৃহবন্দী করে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন। কিন্তু বাঁচেন নি সেই এ্যবিউসিব স্বামীটির হাত থেকে। করোনার কারণে লক্ষ লক্ষ নির্যাতনকারী পুরুষরা এখন তাদের ভিক্টিমকে পেয়ে গেছেন একেবারে হাতের গোড়ায়। ২৪ ঘন্টার মধ্যে আগে সে বৃদ্ধ, যুবা না হয় কিছুটা সময় অন্তত ঘরের বাইরে থাকতেন।

কিন্তু বাড়িই নারীর বাড়িই গৃহকোন। বাড়িই একই সঙ্গে নারীর নীড় ও আকাশ। তার সে আকাশের শকুন নিচে নেমে এসেছে। শকুনের নিজের পরাজয়, অপারগতা সবই ঝেড়ে ফেলার স্থান তার নারী। তাই করোনাকালে নারীর প্রতি সহিংসতা বরাবরের পরিসংখ্যান ছাড়িয়ে এত উপরে উঠে গেছে। আমাদের বাড়ির মেয়েদের ঘর সংসার দেখাটাই প্রধান কর্তব্য বলে এমনকি পাঠ্যপুস্তকেও তার পাঠ দিই। মেয়েটি সমান আয় করলেও তাকে ভাল রাঁধুনি, উত্তম সেবিকা, অসাধারন মা ও প্রেমিকা নারী হবার বিশেষ দায়িত্ব থেকে রেহাই দিই না। অনেক সুন্দর সুন্দর কথা যেমন, যে মেয়ে রাঁধে সে চুলও বাঁধে জাতীয় কথামালা করে তাদের বেঁধে রেখেছি। মুখে মুখে মহান করে তাদেরকে আমরা তাদের নায্য যাবতীয় সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে এসেছি যুগ যুগ।

বিদেশে বাস করছি বলেই আমরা বদলে যাবো এমন দিব্বি দিইনি। বিদেশী ভাষা ভাল আয়ত্ব না করার ফলে এ নারীদের কাছে সে দেশের অনেক তথ্যই সরাসরি পৌঁছায় না। পারিবারিক সদস্যদের মাধ্যমে এসে ফিল্টার হয়ে পৌঁছায়। অথচ নারীই করে যাচ্ছেন সব চেয়ে বেশি কাজ। তা যে কোন দেশেই হোক।

করোনা আগমনের আগে ঘরে, সংসারে অনুপস্থিত পুরুষরা কোনো সময়ই মেয়েদের কাজের মাত্রা, চাপ ও পরিমাণ উপলব্ধি করতে চাইলেও পারেন নি। পারার কথা না।‘ তাকে দোষ দেবেন কি করে? তাকেতো বড় করে তোলা হয়েছে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ বড় বড় সমস্যা যেমন ইসরায়েল- প্যালেস্টাইন ইস্যু, খালেদা না হাসিনা এবার আসবেন কি আসবেন না কিংবা রিসেশন ও রিটেইল মার্কেট এর মতো বড় বড় সমস্যা নিয়ে ভাবার জন্য। আর মেয়েদের বড় করা হচ্ছে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাসহ জীবনের তুচ্ছ ও ছোট ছোট বিষয় যেমন, সাংসারিক আয় ব্যয়, বাচ্চার পড়াশোনা ও স্কুল নির্বাচন, দেহে নতুন প্রাণ ধারণ ও বহন, পরিবারের পুষ্টি এসব সমাধানের জন্য। আর তাতেই মেয়েরা বড় হয়ে ফুল টাইমার হয়- ছেলেরা পার্ট টাইমার! ওরা সব কাজ পারে না।

অথচ বায়োলজিক্যালি সন্তান ধারণ ও দুগ্ধদান ছাড়া আর সবইতো তাদের পারার কথা। এই করোনা কাল সে আত্মজিজ্ঞাসার সুযোগ দিয়েছে। আর পুরো সমাজ তাকে সমতার রাজ্যে স্বাগতম জানানোর জন্য বসে আছে।


  • ৪০৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শামীম আজাদ

কবি, লেখক।

ফেসবুকে আমরা