শামীম আরা নীপা

এক্টিভিস্ট

স্তন ক্যান্সার সচেতনতা

চিকিৎসকেরা বলছেন, স্তনের কিছু কোষ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে, ঐ অনিয়মিত ও অতিরিক্ত কোষগুলো বিভাজনের মাধ্যমে টিউমার বা পিণ্ডে পরিণত হয়। সেটি রক্তনালীর লসিকা (কোষ-রস) ও অন্যান্য মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এই ছড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাই ক্যান্সার।

বাংলাদেশে নারীরা যেসব ক্যান্সারে আক্রান্ত হন তার মধ্যে স্তন ক্যান্সার শীর্ষে রয়েছে। স্তন ক্যান্সার বিশ্বজুড়েই নারীর মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটি সমানভাবে বিবেচ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৫ হাজারের বেশি মানুষ ব্রেস্ট ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। এদের মধ্যে ৯৮ শতাংশের বেশি নারী, তবে খুব অল্প সংখ্যক পুরুষও স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষ এ রোগে মারা যান। বর্তমানে বাংলাদেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলছে। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের (আইএআরসি) সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১২ সালে বাংলাদেশে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ ২৪ হাজার এবং প্রতি বছর আরও ১ লাখ ২২ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে নারী ও পুরুষের ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার হার কাছাকাছি হলেও সচেতনতার দিক থেকে নারীরা অনেক পিছিয়ে আছেন। নারীদের মধ্যে যেসব ক্যান্সারের মূলত বেশি প্রকোপ দেখা যায় সেগুলো হল স্তন ক্যান্সার ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার। আমাদের দেশে নারীরা লজ্জা পেয়ে বা অবহেলা করে এসব ক্যান্সার পরীক্ষা করাতে চান না। এতে করে অনেক ক্যান্সার রোগী সময়ের অনেক পরে গিয়ে জানতে পারেন তার ক্যান্সার আছে কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। ক্যান্সারের চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল এবং প্রতিবছর অনেক নারী এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে তবে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করলে ক্যান্সারের প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। সুস্থ থাকা যায়।

যথাসময়ে স্তন ক্যান্সার সনাক্ত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা নিয়মিত ম্যামোগ্রাম করে করা যায়। স্তন স্ক্রীনিং খুব গুরুত্বপূর্ণ রোগ নির্ণয়ের জন্য। স্তন ক্যান্সার যদি শুরুর দিকে শনাক্ত করা যায় এবং যথাযথ ফলোআপ ও চিকিৎসা গ্রহণ করা হয় তবে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পরও সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সাথে প্রয়োজন মানসিক সাপোর্ট পরিবার, বন্ধুবান্ধব সবার থেকে।

সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে বাংলাদেশের নারীরা যেখানে প্রকাশ্যে স্তন শব্দটি উচ্চারণ পর্যন্ত করতে চান না, সেখানে শরীরে প্রাথমিক কোনো লক্ষণ দেখা গেলেও তারা গোপন রাখেন সেসব, যে কারণে বেশিরভাগ রোগী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন একেবারে শেষ পর্যায়ে। যেহেতু বাংলাদেশে ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতার অভাব আছে, দেখা যায় যারা চিকিৎসা নিতে আসেন, তাদের বেশির ভাগই আসেন প্রায় শেষ পর্যায়ে। অধিকাংশ সময় তারা স্তনে একটি চাকা নিয়ে আসেন। অনেকে স্তনের বোঁটায় ঘা বা ক্ষত বা বোঁটার চারপাশে কালো অংশে চুলকানির লক্ষণ নিয়ে আসেন। কারো স্তনের বোঁটা দিয়ে দুধের মত সাদা রস নিঃসৃত হতে থাকে, ব্যথা বা স্তন লাল রং হয়ে গেছে এমন লক্ষণ নিয়ে খুব কম রোগীই আসেন।

উন্নত দেশে নারীরা স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে (স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে) ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে এবং চিকিৎসা নিয়ে থাকেন যা তাদের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে। তবে আমাদের দেশে অধিকাংশ নারী স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, পরিবার থেকে কোনো সাপোর্ট পান না, সামাজিক ও ধর্মীয় কারণে শেষ পর্যায়ে (চতুর্থ পর্যায়) ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন, যখন রোগীকে আর কোনোভাবেই বাঁচানো সম্ভব হয় না।

চল্লিশ বছর বয়সের মহিলারা তাদের প্রথম বেসলাইন ম্যামোগ্রামের সময় নির্ধারণ করতে উৎসাহিত হতে পারেন এবং প্রতি এক-দুই বছরে পর পর এটি হওয়া উচিত। তবে যাদের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি আছে, যেমন স্তন ক্যান্সারের পারিবারিক পূর্ব ইতিহাস রয়েছে এমন মহিলারা কিংবা যে সমস্ত মহিলারা এক বা উভয় স্তনে অস্বাভাবিক লাম্প লক্ষ্য করেন, তাদের খুব শীঘ্রই একটি ম্যামোগ্রাম করানো উচিত। ম্যামোগ্রাম কতবার করানো যায় সে সম্পর্কে আপনার ডাক্তারের সাথে আলোচনা করুন।

বেশির ভাগ মহিলার ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সার প্রথম লক্ষ করা যায় স্তনে একটি ব্যথাহীন পিন্ডের আকারে। এটি প্রথমে ছোট আকারে হয় এবং প্রায় ক্ষেত্রেই একটি গোটা বা নডিউলের আকারে দেখা দেয়। নিচের কিছু লক্ষণ দেখা দিলেই সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

স্তন ক্যান্সারের লক্ষন:

১। স্তন কিংবা বগলে চাকা বা দলা অনুভব করা। ঋতুচক্রের সময় অনেক মহিলার ক্ষেত্রে এ ধরনের লক্ষণ দেখা দেয় এবং ঋতুচক্র পরবর্তী সময়ে তা চলেও যায়, এতে ভয়ের কিছু নেই তবে এই লক্ষণ স্থায়ী হলে তা পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। স্তন ক্যান্সার জনিত এ ধরনের চাকা বা দলায় সাধারনত কোন ব্যথা অনুভূত হয় না তবে এক ধরনের খোঁচা লাগে এমন অনুভূতি হতে পারে।

২। হাতের নিচে অর্থাৎ বগলের কোথাও কিংবা গলার হাড়ের কোথাও নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই ফুলে ওঠা।

৩। স্তনের কোথাও লালচে ভাব কিংবা ব্যথা অনুভব করা।

৪। স্তনের কোনো অংশ অস্বাভাবিক ভাবে দেবে যাওয়া।

৫। স্তনের আকার, রঙ, ত্বকের মসৃণতা কিংবা তাপমাত্রায় তারতম্য পরিলক্ষিত হওয়া। স্তনের ত্বকে লালচে আভা এবং কমলা লেবুর খোসার মত অমসৃণতা দেখা দিলে তা এডভান্সড ব্রেস্ট ক্যান্সারের লক্ষণ। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন।

৬। স্তনবৃন্তে (Nipple) বিশেষ কিছু পরিবর্তন পরিলক্ষিত হওয়া, যেমন- স্তনবৃন্ত দেবে যাওয়া, চুলকানি, জ্বালা পোড়া, খুস্কি অথবা ক্ষত কিংবা ঘা এর উপস্থিতি।

৭। স্তনবৃন্ত থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণ। এ ক্ষেত্রে স্তনবৃন্ত থেকে পরিস্কার, রক্ত যুক্ত কিংবা অন্ন কোন রঙের পাতলা অথবা আঠালো তরল নিঃসরণ হতে পারে।

৮। চামড়ার নিচে কোনো ধরনের গুটি অনুভব করা।

৯। স্তনে এমন যেকোনো ধরনের পরিবর্তন যা দৃশ্যতই অস্বাভাবিক।

আমাদের জীবনাচরণে এবং খাদ্যাভ্যাসে অনেক পরিবর্তন এসেছে, সেটি স্তন ক্যান্সারের একটি কারণ। খাদ্যাভ্যাসে শাকসবজি বা ফলমূলের চাইতে চর্বি ও প্রাণীজ আমিষ বেশি থাকলে এবং প্রসেসড ফুড বেশি খেলে, এবং অতিরিক্ত ওজন যাদের তাদেরও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে। বয়স বাড়ার সাথে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বাড়ে। বিশেষ করে ৫০ বছর বয়সের পর এই ঝুঁকি অনেক বেশি বেড়ে যায়। প্রাথমিক অবস্থায় সনাক্ত হলে স্তন ক্যান্সার ১০০ ভাগ নিরাময়যোগ্য।

স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি:

১. জেনেটিক রিস্ক ফ্যাক্টর- স্তন ক্যান্সার হওয়ার একটি কারণ হলো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ক্রুটিযুক্ত ‘জিন’। যেসব অস্বাভাবিক জিন স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়, তাদের মধ্যে আছে BRCA1 এবং BRCA2 জিন।

২. পারিবারিক ইতিহাসঃ

• একই পরিবারের দুই বা তার বেশি নিকটাত্মীয়ের স্তনের ক্যান্সার।

• একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অন্যান্য ক্যান্সার- বিশেষ করে মলাশয় ও ভ্রুণকোষের ক্যান্সার, সেইসাথে স্তন ক্যান্সার।

• ৪০ বছরের কমবয়সী একজন নিকটাত্মীয়ের স্তন ক্যান্সার।

• স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত এমন একজন আত্মীয়, যার দুই স্তনেই এ রোগ হয়েছে।

৩. ব্যক্তিগত ইতিহাস: যেসব মহিলার এক স্তনে ক্যান্সার হয়েছে, তাদের অন্য স্তনে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

৪. সন্তানহীনতা বা বেশি বয়সে সন্তান হওয়া।

৫. খুব অল্প বয়সেই ঋতুস্রাব হওয়া কিংবা মেনোপজ বা ঋতুবন্ধ বেশি বয়সে হওয়া।

৬. দীর্ঘদিন গর্ভনিরোধক বড়ি ব্যবহার করা। যারা ১০ বছরের বেশি সময় আগে বড়ি খাওয়া বন্ধ করেছেন তাদের বেলায় সম্ভবত ঝুঁকি নেই।

৭. হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (HRT)।

৮. শিশুকে বুকের দুধ পান না করানো।

৯. অ্যালকোহল ব্যবহার।

১০. স্থুলতা, অধিক চর্বিজাতীয় খাবার ও শারীরিক কর্মহীনতা। ক্যান্সার সংক্রামক রোগ নয় এবং একজনের রোগ আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা নেই।

১১. তেজস্ক্রিয়তার শিকার হলে।

স্তন ক্যান্সার শনাক্তে যেসব টেস্ট করা হয়-

১. ম্যামোগ্রাম (চল্লিশোর্ধ বয়সী মহিলাদের প্রতি বছর একবার ম্যামোগ্রাম করানো উচিত। যদিও ম্যামোগ্রাম কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সার নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয়, তবুও স্তন ক্যান্সার নির্ণয়ে এটি একটি খুব ভালো পদ্ধতি।)

২. আলট্রাসনোগ্রাম

৩. ফাইন নিডল অ্যাম্পিরেশন সাইটোলজি

৪. নিডল (কোর) বাইয়োপ্সি

৫. এক্সিসন বাইয়োপ্সি৬. ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন (২০-৪০ বছর বয়সী মেয়েদের প্রতি তিন বছরে একবার কোনো অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে স্তন পরীক্ষা করানো উচিত এবং চল্লিশোর্ধ বয়সী মহিলাদের প্রতি বছর এ পরীক্ষা করানো উচিত।)

৬. ক্লিনিক্যান ব্রেস্ট এক্সামিনেশন (২০-৪০ বছর বয়সী মেয়েদের প্রতি তিন বছরে একবার কোনো অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে স্তন পরীক্ষা করানো উচিত)

 ৭. ব্রেস্ট সেলফ এক্সামিনেশন (২০ বছর বয়স থেকে মেয়েদের নিজের স্তন নিজেই পরীক্ষা শুরু করা উচিত। এর উপকারিতা এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও জানা উচিত। ব্রেস্ট সেলফ এক্সামিনেশন করার সঠিক পদ্ধতি কোনো ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।)

উপরোক্ত পরীক্ষায় যদি দেখা যায় আপনার স্তন ক্যান্সার হয়েছে, তাহলে চিকিৎসক আরো কিছু পরীক্ষা করে দেখতে চাইবেন ক্যান্সার শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছে কি না। যেমন-

১. লিভার আলট্রাসাইন্ড স্ক্যান

২. হাডের স্ক্যান

৩. সিটি স্ক্যান

৪. এমআরআই স্ক্যান

৫. পিইটি স্ক্যান।

 স্তন ক্যান্সারের জন্য সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতি:

স্তন ক্যান্সারের জন্য সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল অপারেশন, রেডিওথেরাপিএবং কেমোথেরাপি। অপারেশন প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার রোগীদের জন্য প্রধান পদ্ধতি। এর মাধ্যমে ক্যান্সার কোষগুলো ধবংস করে রোগী সুস্থ করা হয়। কিন্তু অপারেশনে কিছু নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

প্রথমত, টার্মিনাল স্তন ক্যান্সার বা দুর্বল রোগীদের জন্য ক্যান্সার কোষ এক্সসিসন করার সময়ে কিছু স্বাভাবিক টিস্যু অপসারণ করতে হয়।

দ্বিতীয়ত, অপারেশনের সাহায্যে ক্ষুদ্র টিউমারগুলো সরানো যায় না এবং এদের পুনরাবৃত্তি ও জীবানু ছড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়ে যায়। সুতরাং, অপারেশনের পরে পুনরায় চেক আপ করা উচিত।

রেডিওথেরাপি স্তন ক্যান্সার চিকিৎসা শুধুমাত্র প্রধান পদ্ধতি নয়, এটি স্থানীয় চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে অন্যতম। অপারেশন সাথে তুলনা করলে রেডিওথেরাপি রোগীর শরীরে তেমন উপযোগী নয়। যদিও এর চিকিৎসামূলক ফলপ্রসূতা বায়োলজিক্যাল রে এর উপর নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে রেডিওথেরাপি এর মাধ্যমে টিউমার পুরোপুরি ধবংস করা যায় না। অপারেশন চিকিৎসা তুলনায় রেডিওথেরাপি কম কার্যকর। সাধারণত বায়োলজিক্যাল ইম্যুনোথেরাপি রেডিওথেরাপির সাথে প্রয়োগ করে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং জটিলতা কমানো হয় যার ফলে আংশিক ক্ষতি হতে পারে ।

রেডিওথেরাপির মধ্যে কেমোথেরাপি একটি পদ্ধতিগত চিকিৎসা যার শক্তিশালী পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেমোথেরাপি ফলে অস্থি মজ্জা এর হেমাটোপোইটিক সিস্টেমকে নষ্ট করতে পারে যার ফলে ডব্লিউ বি সি এবং প্লেটলেট কমে যায়। চিকিৎসাগতভাবে, বায়োলজিক্যাল ইম্যুনোথেরাপি হেমাটোপোইটিক সিস্টেমের ক্ষতি কমিয়ে কেমোথেরাপি এর অসুবিধা কমাতে পারে।

স্তন ক্যান্সার চিকিৎসায় বায়োলজিক্যাল ইম্যুনোথেরাপি:

বায়োলজিক্যাল ইম্যুনোথেরাপি টিউমার চিকিৎসায় শুধুমাত্র আধুনিক প্রযুক্তি নয়। এটি সার্জারি, রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপি তুলনায় অনেক পরিণত ও বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তি। বায়োলজিক্যাল ইম্যুনোথেরাপি টিউমার কোষকে সরাসরি ধবংস করে, মেটাস্টিসিস, পুনরাবৃত্তি থেকে রোধ করতে পারে, এবং জীবনযাপনের মান উন্নত করে। বায়ো ইম্যুনোথেরাপি মাধ্যমে রোগীর রক্ত সংগ্রহ করে, ইমিউনোলজিক সেল (ডিসি-সিআইকে) তৈরি করে যা টিউমার কোষকে চিহ্নিত করে ধবংস করতে সাহায্য করে। তারপর এই সংগৃহীত রক্ত রোগীর শরীরে পুনরায় প্রবেশ করিয়ে তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে টিউমার সেলগুলোকে নষ্ট করা হয়।

এদিকে, সমন্বয় চিকিৎসা বায়োইম্যুনোথেরাপি প্রযুক্তি , আধুনিক সার্জারি, কেমোথেরাপি এবং রেডিওথেরাপি ক্যান্সার চিকিৎসায় শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে। যা শুধুমাত্র অবশিষ্ট ছোট ক্ষতকে সরায় না বরং এর পুনরাবৃত্তি এবং টিউমার স্থানান্তরণ হওয়া থেকে রোধ করে। এর ফলে রোগীর রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বাড়ে এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠে।

বর্তমান সময়ে বায়োলজিক্যাল বায়োইম্যুনোথেরাপি কোনো আঘাত বা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ছাড়া এবং ভালো ফলাফলের সঙ্গে টিউমার রোগীদের কাছে গ্রহনযোগ্য হয়েছে। যা শুধুমাত্র সবচেয়ে সক্রিয় এবং প্রতিশ্রুতিশীল থেরাপি বলে সমস্ত স্তন ক্যান্সার চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে মনে করা হয় এবং এর কার্যকারীতা হল জীবনের মানকে বৃদ্ধি করা।

স্তন ক্যান্সার চিকিৎসায় ফলোআপ:

স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা শেষ হলে স্বস্তি বোধ হয় তবে ক্যান্সার আবার ফিরে আসার দুঃশ্চিন্তা থাকে। চিকিৎসা শেষ হয়ে গেলে নিয়মিত ফলোআপ ভিজিটে আসা উচিত। এসব ভিজিটে ডাক্তার কোনো উপসর্গ আছে কি না জানতে চাইবেন, শারীরিক পরীক্ষা করবেন এবং প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে, ম্যামোগ্রাম ও সিটিস্ক্যান করতে উপদেশ দেবেন। ক্যান্সার ফিরে এসেছে কিনা বা ছড়িয়ে গেছে কি না তা জানার জন্য ফলোআপ প্রয়োজন। প্রথম দিকে এ ভিজিটগুলো তিন-চার মাস অন্তর হয়ে থাকে। তারপর রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে ফলোআপের সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়।

স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি এড়াতে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল করুন:

১। ভুল সাইজের বক্ষবন্ধনী ব্যবহার: স্তনের আকার অনুযায়ী সঠিক মাপের ব্রা ব্যবহার করুন। কেননা নয়তো এটি আপনার স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দিতে পারে অনেকখানি। স্তনের আকারের চেয়ে বড় মাপের বক্ষবন্ধনী স্তনের টিস্যুগুলোকে ঠিকমত সাপোর্ট দিতে পারে না আবার অতিরিক্ত ছোট বা টাইট ব্রা স্তনের তরলবাহী লসিকাগুলো কেটে ফেলতে পারে।

২। বক্ষবন্ধনী সারাক্ষণ পরে থাকা: সারাক্ষণ বক্ষবন্ধনী পরে থাকার কারণে ঘাম নির্গত হবার অসুবিধা, আর্দ্রতা জমে থাকা, সব মিলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। ঘরে থাকার সময়টুকুতে বক্ষবন্ধনী ব্যবহার না করার চেষ্টা করুন।

৩। লেবেল না দেখে ডিওডোরেন্ট কেনা: আজকাল কর্মজীবী নারী হোক বা শিক্ষার্থী সারাদিনের বাইরে থাকা আর সেই সাথে ঘামের দূর্গন্ধ এড়াতে ডিওডোরেন্ট ব্যবহার করেন প্রায় সবাইই! এতে নিজের ফ্রেশ ভাবটা যেমন বজায় থাকে তেমনি ঘামের গন্ধের কারণে অন্য কারো সামনেও বিব্রত হতে হয় না। কিন্তু এই ডিওডোরেন্ট কেনার সময় খেয়াল রাখুন কী কী উপাদান আছে এতে। এলুমিনাম বেসড উপাদান থাকলে তা স্তন ক্যান্সারের ঝুকি বাড়ায়। ডিওডোরেন্ট যেহেতু আপনি প্রতিদিন ব্যবহার করেন, তাই কোনো কোম্পানির পণ্যটি ব্যবহার করবেন তা আগে একজন স্কিন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জেনে নিন।

৪। ন্যাপলিথনের ব্যবহার: আলমারির কাপড়চোপড় পোকামাকড়ের হাত থেকে বাঁচাতে নেপথলিন তো আমরা ব্যবহার করেই থাকি। অনেকে আবার বাথরুমের দুর্গন্ধ এড়াতে বেসিনের সিঙ্কেও ফেলে রাখেন কয়েকটি। কিন্তু এটি পুরোটাই ক্ষতিকর কেমিকেল দিয়ে তৈরি, যা কেবল পোকামাকড়কে ১০০ মাইল দূরেই রাখে না, বরং আপনার স্তন ক্যান্সারের ঝুকিও বাড়ায় বহুগুণে। এর চেয়ে নিমপাতা শুকিয়ে কাগজে মুড়িয়ে রেখে দিন। একই উপকার পাবেন।

৫। ক্যান্সারপ্রতিরোধী খাবার খান: অনেক বেশি আঁশযুক্ত খাবার ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমাতে পারে। এর ফলে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ৫০% পর্যন্ত কমে। মটরশুঁটি, তাজা ফল, আস্ত শস্য এবং ফ্ল্যাভনয়েড, ক্রুসিফেরাস ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট (ব্রোকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি) ও ক্যারোটিনয়েড সমৃদ্ধ সবজি খেতে হবে। পেঁয়াজ, রসুন, পেঁয়াজ পাতা ইত্যাদি সবজিগুলো ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ফ্রির‍‍ ডিকেলকে নিরপেক্ষ করে এবং ক্যান্সার কোষের বিভক্ত হওয়া প্রতিরোধ করে। এইধরনের সবজি কাঁচা খেলেই সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। সয়াবিন ও অন্য সয়া পণ্য যেমন- টফু ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। কিন্তু মিষ্টি স্বাদের ও রিফাইন্ড সয়া পণ্য যেমন- সয়া দুধ ও সয়া তেল এড়িয়ে চলুন। মনে রাখবেন চিনি ক্যান্সারের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। চিনি ক্যান্সার জিনকে সক্রিয় করে এবং ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিতে জ্বালানী হিসেবে কাজ করে।

৬। শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন: যেসব নারীরা দৈনিক ৩০-৪৫ মিনিট ব্যায়াম করেন তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি যারা ব্যায়াম করেনা তাদের চেয়ে কম।

বাংলাদেশে ক্যান্সারের যেসব চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে, তা একদিকে অপ্রতুল এবং অন্যদিকে দীর্ঘ মেয়াদে বেশ ব্যয়বহুল। ফলে পরিবারে কারো ক্যান্সার হলে, সেটি ঐ পরিবারের ওপর এক ধরণের দুর্যোগ ডেকে আনে। এ সময় পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবসহ আশেপাশের মানুষের মানসিক সহায়তা একজন রোগীকে দ্রুত সেরে উঠতে সাহায্য করে, যা পাওয়ার সুযোগ নারীদের কম। মানসিক সাহায্য একজন রোগীর জন্য ম্যাজিকের মতো কাজ করে যা দেয়া প্রতিটা পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের অবশ্য কর্তব্য। কোনো নেগেটিভ কথা কিংবা দুঃখ কষ্টের কথা এই সময় রোগীর সাথে না বলাটা খুব জরুরি। একজন ক্যান্সারের রোগীর সাথে কথা বলার সময় প্রতিটা মানুষেরই স্থান কাল পাত্র বিবেচনা করে কথা বলা একান্ত কর্তব্য।

সরকারিভাবে স্তনের ক্যান্সার নির্ণয় ও নিরাময়ে রোগীর পরিস্থিতি ভেদে খরচ পঞ্চাশ হাজার টাকা থেকে দেড় লক্ষ টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে এ খরচ আরও বেশি।

আমাদের দেশের নারীরা আজ প্রজনন স্বাস্থ্যের অমানিশা কাটিয়ে উঠলেও, অ-প্রজনন স্বাস্থ্যের, বিশেষ করে স্তন ক্যান্সারের চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আর এই ঝুঁকি থেকে মুক্তির প্রধান উপায় হলো নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার মধ্যে স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা গড়ে তোলা। স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয় করা সম্ভব হলে শুধু ক্যান্সারযুক্ত গোটা ও আশপাশের কিছু অংশ অপারেশন করে ফেলে দিলে এবং পরবর্তীকালে রেডিওথেরাপি দিলে রোগী সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করেন। রোগ নির্ণয়ে দেরি হলে এবং ক্যান্সার পুরো স্তনে ছড়িয়ে পড়লে তখন পুরো স্তনটিকেই অপারেশনের মাধ্যমে কেটে ফেলে দিতে হয়। একে বলে মাসটেক্টমি। এরপর রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। এ চিকিৎসায় ৮০-৮৫ শতাংশ রোগী পাঁচ বছর সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন। তাই এসব বিষয়ে অবহেলা না করে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। মনে রাখতে হবে প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা নিলে এসবক্ষেত্রে দ্রুত আরোগ্য লাভ হয়। অন্যথায় জটিলতা বাড়ে।

যেহেতু স্তন ক্যান্সারের নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই, তাই ঝুঁকি এড়ানোর জন্য স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং নিয়মিত স্তন পরীক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে ৩০ বছরের পর, প্রতিমাসে মাসিকের পর পর নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষা করা জরুরি। উন্নতদেশে ডাক্তার বা নার্স কর্তৃক সর্বজনীন ফ্রি স্ক্রিনিং’য়ের ব্যবস্থা ও উন্নতমানের চিকিৎসা-সেবা, প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার শনাক্তকরণ এবং মৃত্যু নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে আমাদের দেশে সম্পদ ও কাঠামোগত স্বল্পতার কারণে সেই ধরনের সুযোগ কম। অন্যদিকে, স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে চিকিৎসা করানো সম্ভব হয় না। তাই, আমাদের দেশে স্তন ক্যান্সারের ভয়াবহতা থেকে মুক্তির প্রথম ও প্রধান উপায় হলো নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষার অভ্যাস তৈরির মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার শনাক্ত করা। ব্রেস্ট ক্যান্সার সারা বিশ্বে জুড়েই একটি ভয়াল আকার ধারণ করেছে। প্রতি ৮ জনে ১ জন নারী ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হন জীবনের কোনো না কোননো পর্যায়ে। কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর আছে যা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, যেমন- জেনেটিক কারণ। কিন্তু আপনার ডায়েট ও লাইফ স্টাইল পরিবর্তনের মাধ্যমে এই বিধ্বংসী রোগটির ঝুঁকি কমানো যায়।

বিঃদ্রঃ লেখাটি বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকার সংবাদ ও ডাক্তারদের পরামর্শ পড়ে ও শুনে তৈরি করা যা আমার একান্ত ব্যাক্তিগত কিছু নয়। সকলের জন্য এই লেখাটি উন্মুক্ত।

383 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।