শামীম আজাদ

কবি, লেখক।

আমার মুক্তি রাতের আলোয়

একদিন, রাতের বেলা। আমি ঈশিতার খাবার ঘরে বসে লিখছি পুরো বনানী সুনসান। মাঝে মাঝে চেয়ারম্যান বাড়ির কুকুরগুলোর কুঁই কুঁই আর মোড়ের গেইটে রিক্সা থেমে যাবার শব্দ।

রাত সোয়া একটা যুগপৎ দু’টো কম্পিউটার নিয়ে কাজ করছি। একটার লেখা পড়ে পড়ে অন্যটাতে মৌলিক কিছু চিন্তা লিখছি। দু’হাতের দু’মধ্যমা কি-বোর্ডের খোপ থেকে খোপে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে দু’হাতের তর্জনীরা আর নির্দেশিকারা উঠে আছে খরগোশের কানের মতো কি-বোর্ডের তরঙ্গে তিড়িং বিড়িং নড়ছে আমার আঙ্গুল, উঠছে নামছে হাত। আমার খরগোস ছেড়ে দিয়েছি বিস্তর গাজরের ক্ষেতে।

এভাবেই, গভীর রাতে আমি লিখি। আমার পৃথিবী হুড খুলে পাশে বসে থাকে। এভাবে কম্পিউটারে লিখছি কুড়ি বছর। তার আগের কুড়ি বছর, বিয়ের পর থেকেই লিখেছি খাতা-কলমে, নিউজপ্রিন্ট প্যাডে-বলপয়েন্টে। কিন্তু সবই রাতে। সবাই ঘুমোলে পরে। লিখতাম বারান্দায়, বাথরুমে, রান্না ঘরে, শোবার ঘরে টেবিল লাইটে ঘোমটা পরিয়ে।

ঈশিতা উঠে ঘুম চোখে ফ্রিজ খুলে জলের বোতল হাতে কতোক্ষণ আমাকে দেখছে জানি না

লেখা থামিয়ে বলি, কিছু বলবি?

-নাহ। তোমাকে দেখি। সেই কবে থেকে রাতের বেলা লেখো।

আমিনা, ঈশিতাকে পেটে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবসিডিয়ারী বিষয় ইংরেজী ও সমাজ বিজ্ঞান পরীক্ষা দিয়েছি। মেয়েটাকে কোলে নিয়ে অনার্স করেছি আর পাশে রেখে এম এ করেছি। ওকে দুধ খাওয়াবার বিরতীতে ক্লাশ করার কালে সময়মত ব্লাউজের ভেতর দুধে ভেসে যেতো বলে ব্রার ভেতরে তুলো ও নরম কাপড় ভরে ক্লাশে গেছি। লাইব্রেরীতে পড়েছি। রাতে ও ঘুমে গলে গেলে পা টিপে টিপে উঠে এসে লেখার টেবিলে বসেছি। পড়তে পড়তে বা লিখতে লিখতে এক সময় টের পেয়েছি ছোট্ট এক জোড়া কোমল হাত পেছন থেকে আমার ব্লাউজ নিচে পেটের খোলা অংশে নড়ছে, আদর করছে। আমি কিছু বলছি না, লিখে যাচ্ছি। এবার হাত জোড়া আমার বাহুর খোলা জায়গাগুলোতে খেলছে। আমি তবু কিছু বলছি না, কাজ করে যাচ্ছি। এবার ঈশুমনি সে খেলা রেখে পেছন থেকে চেয়ার বেয়ে, আমার পিঠ ছাপানো পিচ্ছিল চুল বেয়ে উঠে ঘুরে থপ করে মুখোমুখি আমার খাতার উপর বসে পড়েছে। তার ঘন পাপড়ি ভরা একজোড়া চোখে দুষ্টু হাসি। ভাবখানা এমন, বধ করেছি আমার শ্ত্রু। এখন দেখি কি করে পড়ো! আমি তখন ওর কপালের ফ্রিঞ্জ সরিয়ে চুমু দিয়ে হেসে টেবিল গুটিয়ে আবার তাকে ওর ঘরে বিছানায় নিয়ে যেতাম। পেছনে শুনতে পেতাম আজাদের ক্ষীণ নাসিকা ধ্বনি! সে লোক জানেই না আমার রাতের কারবার। ভাবে আমি খুব মেধাবী। কতো অল্প পড়ে পড়ে পাশ দিয়ে যাচ্ছি ফটাফট। বহুমুখী গুন আমার!

আর আমি তাকে বলিও না। আমি ভাবি এটাইতো হবার কথা। মেয়েরা সবার পর ঘুমাবে, সবার আগে জাগবে। কম আর শিশু উচ্ছিষ্ট খাবে কিন্তু বেশি দেবে। মানুষ দাওয়াত করলে সে খালি শাটল কর্কের মত দৌড়াবে। সব করে সে যখন খাবার প্লেট হাতে নেবে তখন মেহমানদের বিদায় আসন্ন হবে। তাইতো সেই কবে থেকে সকলের সব দাবী মিটিয়ে চুপি চুপি উঠে রাতের পর রাত জেগে থেকে আমি আমারে করেছি নির্মাণ। আমার বৃদ্ধি রাতে রাতে... এই জীবনে আমার মুক্তি রাতের আলোয়!

-ঐ সময়টায় যে আর কোনো কাজ থাকে না।

সে হেসে বলে, জানি। ঐ সময়টায় তোমাকে বাসার কারো জন্য আর কিছু করতে হয় না। কেউ জ্বালায় না। কারণ সবাই ঘুমায় তখন।

এখন আমি লন্ডনের লী নদীর পাড়ে থাকি। এদেশে কাজ করছি বহু বছর। লেখারই কাজ। দেশে এলে ঈশিতার বনানীর বাড়িতেই উঠি। আগে দেশে থাকার সময় অনেকগুলো বছর কাটিয়েছি ধানমন্ডিতে ধুন্দুমার। আমরা সে সময় দু’দুটো সুন্দর একতলা বাড়িতে ছিলাম। একটি ছিলো কবি সিকান্দার আবু জাফরের আর অন্যটি অধ্যাপক আব্দুল হাই স্যারের। সে এক অসাধারন অনুভুতি! রাতের বেলা আমি তাদের আছর প্রার্থনা করতাম। কখনো ভাবতাম বাংলা ভাষার কীর্তিমান দুই পুরুষের বাড়িতে থাকছি তাই হয়তো আমি লিখতে পারি। পাগল না!

দু’টো বাড়িরই গাড়ি বারান্দায় বেগুনী বাগান বিলাস ছিলো। দিনে তার ফিনফিনে হাওয়া ছিলো। সুপ্রচুর নারকেল গাছ ছিলো। তার ঘন সবুজ ঝরঝরে পাতার ফাঁকে ঝড়ো হাওয়া ছিলো। ঘন সবুজ নেট দেয়া বিশাল বারান্দা ছিলো। দু’বাড়িতেই কুকুর ছিলো। আমি যখন রাতে একা জেগে জেগে বারান্দার রাইটিং ডেস্কে বসে লিখতাম তখন বাইরে নারকেল বিথীর শো শো শব্দ শুনতাম। কুকুর টপ্সী কিংবা টিপটপ সারা বাড়ি চক্কর দিয়ে দিয়ে ঠিক আমি যেখানে তার বাইরের কংক্রিটে বসে কুঁই কুঁই করতো। বহুদিন আমার রাতের সঙ্গী ছিল ঐ নারকেল পাতার শানিত শব্দ আর পালিত সারমেয়ের শ্বাস। কিন্তু কি আশচর্য বাইরের ঐ নিকশ অন্ধকারে ভুতের ভয় পেতাম না। আমিও হয়তো মানুষ ভূত! আমাকে মেনে নিয়ে যদি তারা থাকে থাকুক!

জানি আমি যদি নারী না হতাম, লেখার সময় আমার স্ত্রী চা করে দিতেন। বাচ্চাদের দূরে সামলে রাখতেন। হঠাৎ শব্দের দরকার হলে ডিক্সোনারিটা এগিয়ে দিতেন। আমার লেখার ডেড লাইনের সময় বাসায় কাউকে নিমন্ত্রণ দিতেন না। এলোমেলো কাগজ পত্র রেখে ঘুমিয়ে পড়লে গভীর মমতায় তা গুছিয়ে রাখতেন। সকালে ঘুম পুষিয়ে নেবার জন্য নিজে চুপি চুপি শব্দ না করে উঠে যেতেন।

-মা ! কী অদ্ভুত ভাবে তুমি টাইপ করো!

বলে জলের বোতলটা টেবিলে নামিয়ে আমার পেছনে গিয়ে পিঠে হাত রাখে ওর মুখে কৌতুক

- ‘আমার মা'টা আসলেই অদ্ভুত!’

- কেনোরে মা?

- তুমি না টাইপ করো যেনো পিয়ানো বাজাচ্ছো কম্পিউটারের কি-বোর্ডকে এভাবে পিয়ানোর মতো ব্যবহার করতে আমি জীবনেও কাউকে দেখি নাই

-তো কথাতো আসলে সত্য এটাইতো আমার বাজনা আমার গান সিমাস হেইনীর দু’আঙ্গুলের মধ্যে বন্দুক সমতুল্য। সেখানেই তার কলম শ্বাস নেয়, গান গায়।

“Between my fingers and my thumb,

The squat pen rests; snug as a gun.”

আর আমার আঙুলের টুকুস টাকুশ টোকায় আমার লেখা জন্মায়।

- তবে হেইনী এভাবে সারারাত জেগে থেকে সারা জীবন লিখেছেন কিনা জানি না যদিও।

- নারীদের সংসার করে লেখক হতে হলে করতে হয়। জানিস, বড় লেখক আমাদেরই ঢাকার বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী প্রতিভা বসুও খুব গুনী লেখক ছিলেন। কিন্তু তাঁর কোন লেখার টেবিল ছিলো না। সকলের কাজ শেষে তিনি সিঁড়ির নিচে পা ছড়িয়ে বসে লিখতেন!

- আমরা তা করবো না। তোমাদের আসলে আরেকটু স্বার্থপর মানে নিজের প্রতি ফেয়ার হওয়া উচিৎ ছিলো।

- আমরা আসলে নিজেকে ক্ষয় করেই নিজের জন্য সময় খরিদ করেছি।

- তো এখনতো দিনে লিখতে পারো।

-পারি। কিন্তু পারি না দু’কারনে। এক, অভ্যাস। দুই, এতো লেখা থাকে যে দিনে রাতে লিখেও কুলোতে পারি না।

এবার সে আমাকে একটা চুমু দিয়ে আমার মা’র কথা মনে করায়। আমার মা একবার আমার বাসায় ছুটি কাটিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় বলেন, ফুরি তোর বাসাত আর আইতাম নায়। আম্মার প্রচন্ড অভিমানী স্বর। পাশে দাঁড়িয়ে আছে হলিক্রস স্কুলে পড়া ঈশিতা। সামনে রুস্তুমের কোলে সজীব।

-কেনেগো আম্মা? ভাবলাম নিশ্চয়ই এখানে থাকার সময় তার সাথে কেউ কিছু একটা করেছে।

- তুই আস্তা রাইত গুমাস না। লেখস আর মাজে মাজে বাচ্চাইনরে দেকিয়া যাস। আম্মা আমাদের কাছে এলে বাচ্চাদের সঙ্গে শুতেন। আমি জিজ্ঞাস করলাম। তাতে তাঁর সমস্যা কী? তিনি যা বললেন তাতে বুঝতাম- তার কন্যা সারাদিন কলেজে পড়িয়ে, বিচিত্রার কাজ করে ঘরে এসে রান্নাবান্না ও বাচ্চাদের দেখা শোনা করার পরেও আবার রাতেও কষ্ট করে! এভাবে তো চলে না। আমার আয়ু কমে যাবে। এখন জোয়ান আছি কিন্তু ষাট হলে ঠিকই টের পাবো এবং বাচ্চারা বড়ো হলেতো কাজ করতে পারি, নাকি?

আম্মার অভিযোগ শোনার পর আমি তাকে গাড়ি বারান্দা থেকে ভেতরে নিয়ে আসি এবং বলি আমি হাত তুলে রাখলেও কিন্তু পৃথিবী আমাকে ফেলে ঠিক চলে যাবে। যখন হাত নামিয়ে কাজে যেতে চাইবো তখন ঐসব জায়গা ভরে গেছে। আমাকে শুরু করতে হবে আমার চাইতে ঢের ছোটদের সঙ্গে। আমার প্রজন্মে এটা হবেই। হয় আর্লি স্টার্ট এ্যান্ড ব্রেক অর লেইট স্টার্ট ও জুনিয়ের গ্রেডে কাজ। আম্মা তবু বলেন, ষাইট অউক। বুজবে তখন!

ষাট হয়ে গেছে কবে! মা নেই আছে আমার ঈশিতা। সে আমাকে আলতো করে একটা চুমু দেয়। রাবার ব্যান্ডে খাট চুলগুলো গুছিয়ে বেঁধে ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দেয়। তারপর তার কন্যা আনাহিতার ঘরে নিঃশব্দে প্রবেশ করে বেরিয়ে জলের বোতল হাতে ওর ঘরের দরোজার দিকে পা বাড়ায়।

1071 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।