খাতুনে জান্নাত

কবি, প্রাক্তন শিক্ষক ও প্রশিক্ষক।

সামাজিক অবক্ষয় মুক্ত হোক সমাজ

পরিবার যখন অশিক্ষায় ভরা থাকে। শিল্প চর্চা যখন নিষিদ্ধ ঘেরাটোপে বন্দী থাকে। শিক্ষক যখন শিক্ষার মূল্য বোঝে না। পাঠ্যপুস্তক পাঠ করানোই শিক্ষকদের কাজ মনে করে, জ্ঞান বিতরণ করে টাকা কামাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে জ্ঞানী। সেখানে নতুন প্রজন্ম নষ্ট মন নিয়ে বড় হবে। নষ্ট মন নষ্ট শরীর দিয়ে নষ্ট করে তুলবে সমাজ, রাষ্ট্র। ধর্ষণ শুধু শারীরিক নয়। আমার তো মনে হয় ঘর থেকে বের হলেই কতগুলো ধর্ষককে তাদের কর্মকাণ্ড চালাতে দেখি। মন নির্যাতিত হতে হতে ঘরে ফিরে আসে ধ্বস্ত বিধ্বস্ত। বাড়িওয়ালা থেকে বড়িওয়ালা, মাছওয়ালা থেকে সব্জিওয়ালা, মোরগওয়ালা থেকে মনিহারিওয়ালা কাজের বুয়া থেকে কেয়ারটেকার। সবার মন ও মস্তিষ্কে কাজ করে ধর্ষণ। আরেকজনকে ধ্বসিয়ে দিয়ে নিজের লালসা জয় করার নাম তো ধর্ষণ! আর সরাসরি ধর্ষণ তো রয়েছে।
 
মাদ্রাসার শিক্ষকেরা ধর্ষণ করছে শিশু পুরুষ ছাত্রদের, স্কুল শিক্ষকেরাও বাদ দেয় না ছাত্রী। মন্দিরের পুরোহিত, গির্জার পাদ্রী। স্বয়ং পিতা, সত্তর বছরের বৃদ্ধ সাত বছরের শিশুকে, চৌদ্দ বছরের কিশোর সত্তুর বছরের বৃদ্ধাকে। তারপর গণধর্ষণ।
 
নারীর মন কি ধর্ষণমুক্ত! কিভাবে? এক মা যখন প্রার্থনা করে আরেক মায়ের সন্তানের খারাপ রেজাল্ট, পরীক্ষার সময় অসুখ বা অন্যকিছু এটাকে আপনি কী বলবেন। অন্যের ভালো দেখলে মন তুষ্ট না হওয়া। একজন সমাজ সেবককে হতে হয় নিঃস্বার্থ। আর আমাদের সমাজসেবক নিজের পকেট ভারী করার পাঁয়তারা করেন। রাজনীতি, পুলিশ ও সরকারি পদ মর্যাদাবানদের কথা বাদ দিলাম। ওখান থেকেই বীজ বুনন চলে ধর্ষণের। নীচপদস্থজনকে হেয় করা, কাজের বিনিময়ে সাধারণ মানুষদের পকেট সাফ করাই যখন কাজের অন্তর্ভুক্ত। ডাক্তার আর ঔষধ পেশার সাথে জড়িয়ে আছে অগণিত ধর্ষক।
 
আপনি বোরকা পরে হাঁটছেন আর পাঁচবার শুনিয়ে শুনিয়ে নামাজ পড়ে ভাবছেন ধার্মিক হয়ে গেছেন! ধর্ম মানে সততা, ধর্ম মানে ধৈর্য, ধর্ম মানে পবিত্রতা, অপরের প্রতি শ্রদ্ধা কোনটাই আপনার নাই তবে আপনি কেমন ধার্মিক। আর এ অধার্মিকতা তৈরি করছে অসততা। আসলে আপনি নামাজ পড়ছেন বা দেবদেবীর প্রার্থনা করছেন বেহেস্ত বা স্বর্গ পাবার জন্য। আপনার মনে কাজ করছে প্রচণ্ড লোভ। লোভ আর ভয়ের বশবর্তী হয়ে যে কাজ করা হয় তা অন্তরের ফাঁকি দিয়ে নির্মিত। যেখানে ফাঁকি সেখানে অন্তঃসারশূন্যতা। আর এ অন্তঃসারশূন্যতার কবলে পড়ে গেছে সমাজ। গুটিকয় ভালো মানুষের উপস্থিতি ছায়া হতে পারছে না। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে ধর্ষক। আমরা তাদের গুটিকয়েক কে দেখতে পাচ্ছি...
 
কথা হলো এর থেকে উত্তরণের উপায়। উপায় পেতে অপেক্ষা করতে হবে। সরাসরি ধর্ষণ যারা করছে ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই(!) ধর্ষকের ফাঁসি হলেই কী ধর্ষণ কমে যাবে? এটা যে নয় তা আমরা কেউ বুঝছি না। কেনো এরা ধর্ষক হচ্ছে দিনে দিনে তাদের সংখ্যা বাড়ছে। নষ্ট হয়ে পচে যাচ্ছে সমাজ। দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। নারীর প্রতি মর্যাদাহীন সমাজের এরূপ হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর মর্যাদাহীন সংসারে, প্রেমহীন সংসারে, ধর্ষণের মাধ্যমে উৎপাদিত সন্তান ভালো হবে এটা আমরা আশা করতে পারি না। পরিবারগুলো দিকে তাকালে দেখা যায় স্বামী-স্ত্রী যেন পরস্পরের শত্রু। কৌতুক, নাটক লেখা হচ্ছে নারীর অবমাননা মিশ্রিত করে। মা যেখানে সংসারের কেন্দ্রবিন্দু হবে বুদ্ধি, মনন, ভালোবাসায় ঘিরে রাখবে সেখানে মা উচ্ছেদ পরিবেশে ঘুরে। মেয়ে ও ছেলে দুটি শিশু এক ডালের দুটি ফুল তা না শিখিয়ে মেয়েটাকে শেখায় পরের বাড়ির মন্ত্র। আজকালকার চাকুরিজীবী সক্ষম মেয়ে কেনো ওবাড়িকে নিজের বাড়ি মনে করবে যে নিজেই সংসার চালাতে পারে। কেনো নারী সন্তানটি মা-বাবার সম্পত্তির অর্ধেক পাবে যে মা-বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে আসছে। রাষ্ট্রীয় ভাবে না দিলেও পারিবারিক ভাবে তো দেয়া যায়। এটাতে তো কারও কোনো অসুবিধা থাকার কথা নয়। কাজেই সামাজিক কাঠামো পরিবর্তনের চিন্তারও সময় এসেছে। সন্তান জন্ম হয়ে নির্ভর থাকে মায়ের উপর। বড় হয়ে দেখে এ মায়ের নিজস্ব কোনো পরিচয় নেই। এগুলো তার মধ্যে তৈরি করে মানসিক দ্বন্দ্ব যা তাকে সহজাত বেড়ে উঠতে বাধাগ্রস্ত করে। আর এসব বিরোধের (কোথাও প্রত্যক্ষ কোথাও পরোক্ষ) ভেতর দিয়ে বড়ো হওয়া শিশু মানসিকভাবে অস্থির থাকে। যেখানে অস্থিরতা সেখানে উন্মত্ততা। নেশায় জড়িয়ে পড়ে সহজে। নেশা গ্রহণ ও বিপণন হাতের মুঠোয় এনে দেয় অসৎ ব্যবসায়ী। তাই তো জাতি চলে যাচ্ছে অধঃপতনের পথে। আমরা দেখছি আজ তাই বাংলাদেশের চিত্র। সৎ ও সততা শব্দ গুলো সরে যাচ্ছে জীবন থেকে। তারপর ধর্ষিত নারীকে নিয়ে লুকোছাপা চলে প্রচার মাধ্যমে। কেনো এ লুকোচুরি। ধর্ষিত নারীকে মিছিলের অগ্রভাগে দাঁড় করিয়ে মিছিল করা দরকার। সে কেনো লুকোবে সে তো কোনো অপরাধ করে নি। যে আইনে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান পেয়েছে বীরাঙ্গনাগণ সেরকম বা অন্যকোনো সম্মানের ব্যবস্থা হোক তার জন্য।
 
সবশেষে বলতে হয় তাঁদের কথা কুকুর, শুওর, শেয়াল বলে গালাগাল করে ধর্ষণকারীকে। আমাদের সর্বস্তরে এটা বিরাজমান। বলে এবং কবিতাও লিখে। কিন্তু আমাদের বিবেকবানদের মনে একবারও আসে না। এসব প্রাণীরা ধর্ষণ করে না। তারা রতি কর্মের আগে মানসিক ও শারিরীকভাবে প্রস্তুত করে, বিভিন্ন সমীক্ষায় বিভিন্ন প্রাণীর বিভিন্ন কৌশলের কথা উল্লেখ আছে। কখনো দিনের পর দিন সময় নেয় অপেক্ষা করে। যা করতে ব্যর্থ হচ্ছে মানব জাতি। কিন্তু কথায় কথায় কুত্তার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা, শিয়ালের বাচ্চা বলে ধর্ষকদের গালি দেয়া নিয়মিত হয়ে গেছে। যা আমাদের দীর্ঘ অপসংস্কৃতির ফল বলে মনে করি।
 
এখন তো ধর্ষকের ফাঁসির ছবি, লিঙ্গ কর্তনের ছবি আরও নোংরা নোংরা ছবি দিয়ে প্রতিবাদ করছেন। মজার ব্যাপার যারা ধর্ষিতার ছবি পোস্ট করে লাইক কমেন্টস কামিয়েছেন তারাই এখন ফাঁসি ও লিঙ্গ কর্তন চেয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন আন্দোলনে আন্দোলনে মাঠ গরম করছেন।
 
রাষ্ট্রের কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। একটা রাষ্ট্র তৈরি হয় সচেতন জনগণের মস্তিস্কপ্রসুত চিন্তা নিয়ে। ঘরে বাইরে যেখানে মানুষের মধ্যে সুস্থ চিন্তা নাই এখানে নারীর কোনো অধিকার থাকবে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সমানাধিকার বহু পরের কথা। ধর্ষকের ফাঁসি দিয়ে কী হবে? সাময়িক আন্দোলন বা হৈচৈ কমবে। সমাজ আবার চলতে থাকবে নারীর প্রতি অনিহা নিয়ে। নারীতে নারীতে পরস্পরের দ্বন্দ্ব নিয়ে। শিক্ষকগণ পড়াতে থাকবেন পাঠ্যবই। সমাজবিজ্ঞানে পড়াবেন মানুষ সৃষ্টি হয়েছে বিবর্তনের মাধ্যমে আর ইসলাম শিক্ষা বইয়ে পড়াবে পুরুষকে মাটি দিয়ে বানিয়েছে আল্লাহ বা গড আর নারীকে পুরুষের পাঁজরের হাড় দিয়ে। সব শিক্ষা, সব উদ্যম সংস্কৃতিচর্চা যেখানে এসে বিলীন হয়ে যায়...

189 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।