ফিলিং হ্যাপিলি সিংগেল মম

শুক্রবার, জুন ২১, ২০১৯ ৩:৪৮ PM | বিভাগ : ওলো সই


কী কী শুনি নাই না, এখনো শুনি, আমার জীবন অভিশপ্ত, এরকম একা জীবন, দেমাগী ছিলাম, আল্লাহ রূপ, মেধা, ভালো ফ্যামিলি সব দিয়েছিলো। এখন কোনো দাম নাই, আর কয়দিন পর কেউ ফিরেও তাকাবে না, মুখের ভাষা খারাপ, আমি রুড, আমার কি আপসোস হয় না জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো, আর বাকী দশটা মেয়ের মতো সাধারন একটা জীবন, স্বামী সোহাগি! সরি,,,,,, স্টপ, আমি হ্যাপি কি হ্যাপি না সেটাও কি আপনি ঠিক করে দিবেন?

দুংখ একটাই যাদেরকে ছেড়ে আমার অস্তিত্ব নেই তারাই বলেছিলো কোনো এক জন্মদিনে, যার জীবন নেই তার আবার জন্মদিন! স্বামীপরিত্যক্তা, ব্ল্যা ব্ল্যা। আমার পরিচিত অসাধারন ব্যক্তিত্ব আর সুন্দরী দু'জন বিশ্ববিদ্যালয়েরর শিক্ষিকা বিয়ে করেননি বলে তাদের জীবনও ব্যর্থ শুনেছি বহু বার বহু গুনীজনের কাছে।

প্রথমত আমি আমার স্বামীকে পরিত্যাগ করেছি। আর আমি ও ঠিক বাকি দশটা মেয়ের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করি, বরং আমি একটু বেশি ভাগ্যবান যে আমি আমার বেছে নেওয়া জীবন যাপন করছি। আমার দুংখ বা সুখ কোনটাই কারো চাপিয়ে দেওয়া না। আমি যেমন বুক চেপে কেঁদেছি, সেরকম হেসেছি, গেয়েছি, খেলেছি, ঘুরেছি।

নিজেকেই হিংসে করি, ২০০৩ সালে প্রথম ৩০০ টাকা আয় করেছিলাম টিউশন থেকে, তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রথম বর্ষে পড়ি। ছেলেবেলা থেকে আমি জেদী, আর বিদ্রোহি টাইপ, মানে এক কথায় একগুঁয়ে ফালতু ছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম আমি কী চাই। এই চাওয়া গুলো সময়ের সাথে পাল্টেছেও, কিন্তু ভেতরকার আমি না, আমার উল্টো পায়ে হাটতে ভালো লাগতো, জীবনে শুধুমাত্র মনের দাম দিতে গিয়ে আমি উল্টো আর এবড়ো থেবড়ো পথই বেছে নিয়েছি।

মেয়ে হিসেবে এটা পারবো না, ওটা পারবো না, এসব মানিনি কখনো। কিন্তু আমি জানতাম স্বামীর টাকায় কেনা শর্ট প্যান্ট আমাকে স্বাধীনতা দিবে না, আমার প্রিয় বই বা লুকিয়ে কেনা প্রথম সাদা নাইটিটা নিজের টিউশনির টাকায় কিনেছিলাম। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া ঘুরে বেড়িয়েছি। আমার সবচেয়ে দামী শাড়িটা আমার নিজের টাকাতেই কেনা। আমি আমার জন্য একটা ঘর চেয়েছিলাম, সেটা আছে আমার।

আমিও বাকী দশটা মেয়ের মতো শাড়ী, চুড়ি, পাউডার কিনি, সাজুগুজু করি, আমার জন্য করি, স্বামীর অফিসের পার্টির জন্য করি না। আমি ও ইউটিউব থেকে রেসিপি দেখে রান্না করি, আর প্রিয় মানুষদের খাওয়াই, অন্যের পচ্ছন্দ করা মানুষদের না। আমি আমার মর্জির মালিক, আমার রাজ্যে আমি রানী।

বিবাহিত সুখী রমনীদের মতো আমার চড়াই উৎরাই আছে, জীবন তো আর সরল রেখা না। আমার কোথাও বেড়াতে যেতে ইচ্ছে হলে টাকা জমাতে হয়, কারো অনুমতি বা সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। আমার জ্বর হলে আমার ওষুধটা কিনে দেওয়ার বন্ধু বান্ধব আছে, আর না হলে নিজেরটা নিজে করতে পারি। মন খারাপ হলে ফোন করে আব্দার করার, ন্যাকামি বা কান্না করার জায়গাও আছে, একা লাগলে কারো কাছে গিয়ে দুদন্ড বসার জায়গা আছে, আর এরা কেউ আমার রক্তের সম্পর্কের নয়, তারা সবাই আমার আত্মার, যারা আমাকে বুঝে, আমার ভেতরকার মানুষকে বুঝে।

এমন একজনও কি বিবাহিত সুখী রমনী আছে যার নিজেকে কখনো একা মনে হয়নি! আমারও মাঝে মাঝে একা মনে হয়। তবে আমি বরং একটু বেশি স্বাভাবিক জীবন যাপন করি, আমার একা জীবন আমার স্বপ্নগুলোকে পাল্টে দিয়েছে, সুখ শুধু বিছানায় সীমাবদ্ধ না, তার জন্য বিয়ে ও করতে হয় না। আমার বিছানার বঞ্চনা নিয়ে না হয় কষ্ট নাই পেলেন, নিজের বিছানার দিকে মনোযোগ দেন।

আমি সত্যি বলছি আমার একটুও আপসোস হয় না, আর একটু কম্রোমাইজ করলে হয়ত আমারও লাল নীল সংসার হতো, দিন শেষে স্বামীর বুকে ঘুমাতাম। যে বুকে আমার জন্য সম্মান নেই, বাংলাদেশের অধিকাংশ স্বামীদের বুকে কি কোন মেয়ের স্বপ্ন ঘুমায়?

আমার জীবন টা অনেক রংগীন, আমার একা জীবন আমার বেছে নেওয়া, আর কোন অপশন নেই বলে একা থাকি তা না। আমি নাম বা ভরন পোষন বা রাতের শয্যার জন্য বিয়ে করবো না। যদি আমার মনের যোগ্য কাউকে খুজে পাই, তখন দেখবোখন।

বিকিনি পরার স্বাধীনতার চেয়ে সেটা নিজে কেনার সামর্থ্য অর্জন বেশি দরকার। তারপর ভেবে দেখো কোন জীবনটা বেশি সহনীয়, নিজের ইচ্ছেয় বেছে নেওয়া জীবন না সমাজ, ধর্ম আর ভালো মেয়ের নামে চাপিয়ে দেওয়া জীবন। আমি যে রংগীন জীবন যাপন করেছি, যে স্বাধীনতা ভোগ করেছি, আজো করছি সেটা আমাকে সুখী করে, আমার একবিন্দু আপসোস নেই, আমি স্বমী সোহাগি হতে পারিনি বলে। আমি একজন হ্যাপিলি ডিভোর্সি। আমার নিঃসঙ্গ জীবন আমাকে জীবনের তলানীটাও চেটেপুটে খেতে শিখিয়েছে, আত্মবিশ্বাসী করেছে, একসময় পচ্ছন্দের জামা না পেলে কাঁদতাম ঈদে। এখন ভাবলে হাসি আসে, আমি এখন স্বপ্ন দেখি একদিন ক্যারাভান কিনবো, আর পথে পথেই আমার পথ খুজে নেবো।


  • ৫০২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শায়লা হক তানজু

প্রবাসী লেখক, এক্টিভিস্ট।

ফেসবুকে আমরা