নির্বাচনী তফসিল: আসলে স্ক্রিপ্টমতই সব হচ্ছে

শনিবার, নভেম্বর ১০, ২০১৮ ২:৪৩ PM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


আশংকা মতোই এগুচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। মাঝখানে সংলাপের নামে এক আধা উত্তেজনাকর প্রহসন হয়ে গেল। জাতীয় সংলাপের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনায় আসলো- কার মুখে কি খাবার, খাবারটা কোথায় থেকে আনা। খাবারের তালিকা সবিস্তারে প্রকাশকে এ কালের মূল ধারার মিডিয়া অন্যতম হট নিউজ আইটেম হিসেবে বিবেচনা করলো। জাতীয় সংলাপের প্রেক্ষপট কি,  যুক্তফ্রন্টের ৭ দফা কিংবা এ ধরণের বিতর্কে বরাবরই যা গুরুত্ব পাবার কথা -সংবিধানসম্মত দাবি বিবেচনার সরকার দলীয় সুরের উপর ভিত্তি করে, আদৌ সংবিধান অনুসারে ৭ দফা দাবি বিবেচনা সম্ভব কিনা সে নিয়ে সেরকম বিশ্লেষণ মিডিয়ায় খুব কম বা খুব একটি দেখা যায় নি বলা চলে। বাংলাদেশে যারা বেনিফিসিয়ারী তারা সব সময় সংবিধানের দোহাই দিয়ে নিজেদের সুরক্ষিত করতে চেয়েছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষার মত মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার কিংবা জীবনের নিরাপত্তা, চিন্তা, মত এবং বাক স্বাধীনতা, সভা সমিতির অধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বিধি বিধান  প্রতিপালনে হরহামেশাই সরকারগুলো ইচ্ছেকৃত ভ্রুক্ষেপহীন বা নানা প্রচেষ্টার পর ব্যর্থ হলেও এক নির্বাচনের সময় সংবিধানকে বাইবেলের মত জ্ঞান করে তার স্বরে চিৎকারটা চালাতে থাকে।

স্বচ্ছ এবং সবার অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য ড: কামালের নেতৃত্বে যুক্ত ফ্রন্ট যে ৭ দফা দাবি নিয়ে আলোচনার জন্য সরকারের সাথে যে দু দফা সংলাপ করলো, তার অর্জন সম্পর্কে বাংলাদেশের রাজনীতির পূর্ব অভিজ্ঞতা ও সমসাময়িক পক্ষগুলো বিশেষত: বলটা যাদের কোর্টে ছিল, সেই ক্ষমতাসীন পক্ষের আচরণ ও বক্তব্যের বিশ্লেষণে এটা অনেকের কাছে পরিস্কার ছিলো, ফলাফলটা কি হতে পারে। প্রথমবার সংলাপে খাবার হলো মিডিয়ার মূল ফোকাস, দ্বিতীয় যাত্রায় মিডিয়ায় আসল  টিকা টিপ্পনীর দারুণ এপিসোড। জাতীয় নির্বাচনের মতো একটা ইস্যুর গুরুত্বপূর্ণ নানা দিক বরাবরই উপেক্ষিত হলো। কম বেশি সবাই জানি -বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে মিডিয়া এবং চিন্তা, মত, বিবেক এবং বাক স্বাধীনতাকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়্গ দিয়ে, শহিদুল আলমের মত একজন ব্যক্তির সাথে সামান্য কিছু মত প্রকাশের সূত্র ধরে যা চলছে তাতো দৃশ্যমানই।

বাংলাদেশে স্বৈরশাসন সামরিক শাসন কিংবা একত্ববাদী শাসন নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পূর্বে আইয়ুব ইয়াহিয়া এবং পরবর্তীতে জিয়া এরশাদের শাসনও মানুষ দেখেছে। জরুরী অবস্থা, বিশেষ ক্ষমতা আইন, জননিরাপত্তা বিধান আইন, ৫৪ ধারার শাসন, সন্ত্রাস দমনের জন্য RAB এর সৃষ্টি, ক্রসফায়ারের ছকবাধা গল্প, যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় হার্ট এটাকে মৃত্যু। কী না দেখেছে মানুষ। কিন্তু গত দশ বছরে নাগরিকের বিশেষত: নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের  ক্ষেত্রে যা ঘটে গেছে তা এক কথায় বিভীষিকাময় অভূতপূর্ব। উন্নয়নের মোড়কে চাপা দেয়ার চেষ্টা। হয়েছে মানবাধিকারের মত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর। যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্রসফায়ার তথা বিচার বহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলেন, সেই তাঁর আমলেই দিনের পর দিন ক্রসফায়ারতো চলতেই থাকলো, সাথে যুক্ত হলো গুমের মহা আতংক। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক থেকে শুরু করে সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, ছাত্র কেউ রেহাই পেলেন না। জ্বলজ্যান্ত শত শত মানুষ হঠাৎ করে হাওয়া হয়ে গেল। এখানে ওখানে অনেকের লাশ পাওয়া গেল। ভাগ্যবান কেউ কেউ ফিরে এলেও চিরজীবনের জন্য যেন তারা নির্বাক হয়ে গেলেন। শহিদুল আলম এমন কি বলেছিলেন যে কোমলমতিদের আন্দোলনে তা উস্কানি যুগিয়েছে? যে সময় তিনি আল জাজিরার সাথে কথা বলেন সে সময় তো আন্দোলন প্রায় শেষ পর্যায়ে। ফেইসবুক লাইভ বা আল জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারী ভার্সনের বাইরে কথা বলার অধিকার কি কোন নাগরিকের নেই? যে কায়দায় তাঁকে গ্রেফতার এবং জিজ্ঞাসাবাদ, ' আবেগাক্রান্ত' হয়ে অভিনেত্রী টিয়া ফেইসবুকে লাইভ দিয়েছেন কাছাকাছি সময়ে, এর পর তার মূল্য হিসেবে হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার উপর কি নিপীড়ন চলেছে তা হয়তো ভবিষ্যতে কখনো জানা যাবে। সরকারী দলের প্রতি দুর্বল বলে ট্যাগ খাওয়া বুদ্বিজীবি লেখক ড: জাফর ইকবাল বলেছেন, শহিদুল আলমের বক্তব্য নিয়ে একাডেমিক বিতর্ক হতে পারতো। কিন্তু তা না হয়ে যা হলো যা এখনো তাঁর জামিন এবং তাকে নিয়ে হয়ে চলেছে তাতে যে ম্যাসেজটি এসেছে তা পরিস্কার -এত নোবেল জয়ী তাঁর পক্ষে দাঁড়ানোর পরও শুধুমাত্র ভিন্নমতের জন্য তিনি ক্ষমতাসীনদের দারুণ রোষ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না, অতএব তাদের অপছন্দের কথা বললে পরিণতিটা এমনই হবে, এমনকী হতে পারে আরো তীব্র মাত্রার।

ভিন্নমতের দমন ও আতংকসৃষ্টির জন্য গুম খুন, রাস্তায় বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচী বা কোটা নিরাপদ সড়কের মত অরাজনৈতিক আন্দোলন, যেখানেই সামান্য থেকে বৃহৎ জনসমাবেশ, জনসমাগম সেখানেই আইন শৃংখলা রক্ষার নামে নির্বিচার লাঠিপেটা, ধরপাকড়, মিথ্যা মামলা দেয়া হলো। সর্বশেষে নিপীড়নের জন্য যা এসেছে তা হচ্ছে গায়েবী মামলা। যে মামলায় মৃত ব্যক্তিকে ককটেল ছুঁড়তে দেখে পুলিশ, বিদেশে অবস্থানরতদের ভাঙচুরের মামলায় অভিযুক্ত করা, এমনকি গায়েবী ধর্ষণ মামলার ঘটনাও ঘটে যেখানে কথিত ভিকটিমই জানে না এমন ঘটনার সে শিকার; প্রায় ক্ষেত্রেই পুরো প্রক্রিয়াটাই সাজানো, কার্যত: সে এক মজার সংযোজনই বটে।

সরকার প্রধান থেকে শুরু করে মন্ত্রী সাংসদরা সরকারী সুযোগ সুবিধা ভোগ করে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। আর বিরোধী দলের ক্ষেত্রে উল্টোটা হচ্ছে। নির্বিচারে প্রশাসন যন্ত্র কাজে লাগিয়ে বিরোধী নেতা কর্মী, অনলাইন একটিভিস্টদেরকে তুলে নেয়া হচ্ছে। ইচ্ছেমত নানা সত্য মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করা, রিমান্ড, দিনের পর দিন মাসের পর মাস বিনা বিচারে কারাগারে অন্তরীণ রাখা হচ্ছে। যুক্ত ফ্রন্ট বেগম জিয়ার মুক্তির দাবি করছে। সরকার বলছে এসব আদালত আর দুদকের ব্যাপার। সরকারের কিছু করার নেই। কিন্তু বাস্তবতা তো বরাবরই ভিন্ন কিছু বলে। মইনুল হোসেনকে যে কায়দায় নিগৃহীত করা হলো রংপুরের আদালতে কিংবা গণস্বাস্থ্যের মত একটা প্রতিষ্ঠান যা মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ফিল্ড হসপিটালের লিগ্যাসি তাতে যেভাবে হামলা, ছাত্রছাত্রীদের উপরে নিপীড়ন হলো, সরকার পক্ষ যাই বলুন না কেনো -এ সব বৈরীতাই যে  তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য সেটা পর্যবেক্ষকসহ আপামর দেশবাসীর কাছে পরিস্কার।

দৃশ্যত: যুক্তফ্রন্টের সাথে কোন রূপ অর্থবহ সমঝোতা ছাড়া তাড়াহুড়া করে সিইসি ২৩ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে ঘোষণা দিলেন, তাতে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে তা নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনগুলোর বিতর্কিত ও অতি দূষণীয় নির্বাচনের মাধ্যমে এই নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে বসে আছে। এটা পরিস্কার, সাংবিধানিক বাধ্যকতায়ও এত দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের  তারিখ নির্ধারণের বিষয় ছিলো না। শুধু নির্বাচনের তারিখই নয়, বহু বিতর্কিত ইভিএম ব্যবহারেও নির্বাচন কমিশন অতি উদ্যোগী হয়ে উঠেছে। কদিন আগে দিল্লীতে বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএমে ভোট কারচুপি নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ আন্দোলন হয়েছিলো। নানা ত্রুটির কারণে প্রযুক্তি সমৃদ্ধ উন্নত দেশগুলোতেও  ইভিএম সেভাবে গ্রহনযোগ্য ও জনপ্রিয় হয় নি। শুধু ইভিএমই নয়, বিশ্বজুডে্ পরিত্যক্ত ও নিরুৎসাহের কয়লা বিদ্যুৎ কিংবা পরিবেশ ধ্বংসের মহাঝুকিপূর্ণ পারমানবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্পগুলো, বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তথ্য প্রবাহের অবাধ যুগে সেকেলে চিন্তায় তা নিয়ন্ত্রণে রাখার পেছনে শত শত কোটি টাকা ঢালা হচ্ছে। ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুন্ন করে টেলিফোনে আড়ি পেতে সাধারণ কথাবার্তাও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করে বিরোধী লোকজনকে হয়রানি করা হচ্ছে। এ লেখাটি যখন লিখছি তখন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ব্লক রেইড করে তল্লাশী চলছে। বিরোধী দল সমর্থিত সন্দেহে হাজার হাজার মানুষকে প্রতিদিন নানা কায়দায় গ্রেফতার করা হচ্ছে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য লেবেল ফিল্ড করা দূরে থাক আশংকা করা হচ্ছে সামনের দিনগুলোতে বিরোধী দলের উপর নিপীড়ন নির্যাতন বাড়তে যাচ্ছে।

নানা প্রাসঙ্গিক ও জরুরী বিষয়ে রাজনৈতিক মতৈক্য ছাড়া তড়িঘড়ি করে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করল, এর ফলে সংগত কারণেই উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় শেষ বিচারে এই কমিশনকেই নিতে হবে। 


  • ২৫৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শাহ আলম ফারুক

লন্ডনে নির্বাসিত বাংলাদেশী মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী, সাবেক সিনিয়র তদন্ত কর্মকর্তা, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

ফেসবুকে আমরা