প্রমা ইসরাত

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন এবং ধর্ষণ এক বিষয় নয়

একজন ৪১ বছর বয়সী নারী যিনি একটি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক, যার তিন জন সন্তান আছে, তিনি আরেকজন ৪৬ বছর বয়সী পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষনের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছেন পল্লবী থানায়। ধর্ষণের পয়েন্ট হচ্ছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের "বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক"
 
মামলার কপিতে লেখা আছে যে, ৪৬ বছরের লোকটি, নারীটির বাড়িতে অবস্থান নিয়েছিলো, তার সন্তানদের পিতা ডাকতেও উৎসাহ দিয়েছিলো, এবং নারীটির সাথে শারীরিক ভাবেও মিলিত হয়েছিলো। তারপর বিয়ে করবে করবে করে বিয়ে করেনি।
এটা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হতে পারে, কিন্তু ধর্ষণ নয়।
 
এই প্রতিশ্রুতি তো নারীটিও ভাঙ্গতে পারতেন। তখন এক্ষেত্রে পুরুষটি প্রতিকারের জন্য কোথায় যেতেন? এই যে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ এই আইনটি কেনো শুধু নারীদের জন্য বিদ্যমান। কারণ খুবই স্পষ্ট। এই আইনটি পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা থেকে তৈরি করা হয়েছে। এই আইনের দ্বারা এটা বোঝানো হয়েছে যে, নারীর কারো সাথে শারীরিক সম্পর্ক হলে, তার সেই ব্যক্তি ছাড়া অন্য কোথাও আর যাওয়ার জায়গা নেই। এটা বোঝানো হয়েছে, একই জিনিস পুরুষের সাথে ঘটলে, পুরুষের কোনো আইনী প্রতিকার চাওয়ার দরকার নেই, কারণঃ
 
১। জেন্ডার টা পুরুষ
 
২। পুরুষ শারীরিক সম্পর্ক করলেই কিছু যায় আসে না, সে অন্য যে কোনো নারীকে আবার বিয়ে করতে পারে, আবার প্রেমে জড়াতে পারে, তার ভার্জিনিটি বলে কোনো কনসেপ্ট নেই।
 
৩। প্রাপ্ত বয়স্ক নারীকে প্রলোভন দেখানো গেলেও প্রাপ্ত বয়ষ্ক পুরুষকে প্রলোভন দেখানো যায় না।
 
৪। যৌনতার স্বীকৃতি শুধু পুরুষের আছে, নারীর নেই।
 
যে কোনো সম্পর্কে ম্যানুপুলেশন, গ্যাস লাইটিং, লাভ বোম্বিং এগুলোর মাধ্যমে এক্সপ্লয়ট করে একটা সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন কেউ। সেক্ষেত্রে সেটা এক্সপ্লয়টেশন, কিন্তু ধর্ষণ নয়।
 
আমাদের দেশে, সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো আইন নেই। এই আইন নেই বলেই, সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন কে ধর্ষণ বলে চালিয়েই মামলা দিয়ে দেয়ার প্রবণতা আছে। এতে যেটা হচ্ছে, যারা আসলেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তাদের ধর্ষকের সাথে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং বিয়ের মাধ্যমে সেই ধর্ষণ জায়েজ করা হচ্ছে। এভাবে একটা অন্যায় থেকে উদ্ধার করার জন্য আরেকটা অন্যায় করা হচ্ছে, যেটাতে কোনোভাবেই ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না।
 
সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন, সামাজিক ভাবে অর্থনৈতিক ভাবে এবং বিশেষ করে মানসিক ভাবে একজন মানুষকে ডেমেইজড করে দেয়। কিন্তু বিষয় হচ্ছে এটা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে না। আইনী কোনো প্রতিকার নেই। কেউ অভিযোগ করলেও, জাস্ট মুভ অন, এগিয়ে যাও, বাদ দাও এইটুকু সান্তনা বাণী ছাড়া আর অন্য কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না। বছরের পর বছর ডিপ্রেশনের ঔষধ, সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে যাওয়া সেখানের ব্যয় ভার বহন এটাও সেই ব্যক্তিকেই করতে হয় যার এটা অসুখ। এই ব্যাপারটা নিয়ে কেউ কথা বলে না সাধারণত।
 
যেহেতু এটা ধর্ষণ না, তাই এই সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন কে কেউ গুরুত্ব দেয় না। ওই "মজা তুমিও পাইছ, মজা আমিও পাইছি" টাইপ সস্তা ফালতু মূর্খ একটা মেয়ের ডায়ালগ দিয়েই দায় সারেন অনেকে। কিন্তু এটাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। অপরাধের ধরণ বদলে গেছে। আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্র যেহেতু নারী অবান্ধব, তাই এখানে নারী জড়িত এরকম সব জায়গায় একটা ভেজাল থাকবে। খুন, নরহত্যা, দুর্ঘটনায় মৃত্যু এগুলো যেমন আলাদা আলাদা সংজ্ঞায় আছে, তেমনি ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা মূলক অপরাধ, সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন এগুলোরও আলাদা আলাদা সংজ্ঞা থাকতে হবে। আর সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন যৌনতা ভিত্তিক সহিংসতার সংজ্ঞায়, উল্লেখ থাকতে হবে যে এটা নারী পুরুষ ট্রান্সজেন্ডার সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
 

270 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।