যে ফুল ঝরে গেল অকালে

বুধবার, এপ্রিল ২৪, ২০১৯ ৫:৪৬ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


‘এ কোন মৃত্যু, এ কেমন মৃত্যু? এমন মৃত্যু তো দেখতে চাইনি কখনো’! যতোবার ছবিটির দিকে চোখ গিয়েছে, ততোবারই চোখ সরিয়ে নিয়েছি। না, তাকাতে পারিনি ঐ সহাস্য শিশুটির মুখের দিকে। ভাবতে পারিনি ঐ সুকুমার মুখটি আর কখনও কেউ দেখতে পাবে না - না তার মা-বাবা (তার বাবা এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে), না তার প্রিয়জনেরা, না অন্য কেউ। জায়ান একটি ছবি হয়ে গেল শুধু।

না, আমি জায়ানকে চিনি না, দেখিনিও কখনো, পরিচয়ও নেই তার মা-বাবার সঙ্গে। কিন্তু সে তো আমার দৌহিত্র হতে পারতো, তার সঙ্গে আমি গল্প বা খেলায় মাততে পারতাম, দু’জনে আমরা দুষ্টুমীও করতে পারতাম - যা আমি আমার শিশু দৌহিত্রীটির সঙ্গে করে থাকি। এ সব ভাবলে আমার দৌহিত্রীর মুখটা জায়ানের মুখে দেখতে পাই।

জায়ান শিকার হয়েছে অর্থহীন এক নির্মম সন্ত্রাসের। না, জায়ান সন্ত্রাস কী, তা জানতো না, শত্রু ছিলো না কারো, কোনো ক্ষতি করেনি সে তাদের, যারা তার প্রাণ হরণ করেছে। কিন্তু তবু মৃত্যু তাকে রেহাই দেয়নি। জায়ান তো শুধু সন্ত্রাসের শিকার হয়নি, সে বলি হয়েছে মনুষ্যহীনতা আর অমানবিকতার কাছে, পাশবিকতা আর নাশকতার কাছে, যুক্তিহীনতা আর অর্থহীনতার কাছে, বর্বরতা আর নৃশংশতার কাছে, ধর্মীয় উন্মত্ততা আর উন্মাদনার কাছে।

শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ঘটনা দেখে, অন্যান্য অনেক বিবেচনার মধ্যে পাঁচটি বিষয় আমাকে ভাবিয়েছে। প্রথমত: যে বিষয়গুলো সন্ত্রাসীরা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তারা যথার্থ যুক্তি-নির্ভর নয়, তার পেছনে থাকে না গভীর মনন, অনুপস্হিত থাকে সেখানে সঠিক বিচার-বুদ্ধি। একধরনের বিকৃত উণ্মত্ততা সেখানে কাজ করে। সুতরাং স্বাভাবিভাবেই সে ক্ষেত্রে সেখানে পেশীশক্তি, অস্ত্র আর সন্ত্রাসের বিকল্প থাকে না। সহনশীলতার অনুপস্হিতি, যুক্তির দৌর্বল্য সন্ত্রাসের একটি অন্যতম মূখ্য কারন। চূড়ান্ত বিচারে সন্ত্রাসের কারণগুলো যেমন যুক্তির নিরিখে দাঁড়াতে পারে না, সন্ত্রাসীরাও তেমনি দূর্বল ভূমির পরে দাঁড়িয়ে থাকে ।

দ্বিতীয়ত: চেহারায় মানুষ হলেও সন্ত্রাসীরা আসলে মানুষ নয়। চূড়ান্ত বিচারে তারা আসলে দানব, এক একটি অসুর। দানবের কাছে মানবিকতার কোন মূল্য নেই, মূল্য থাকে না জীবনের, মায়া থাকে না মানুষের প্রতি। তারা গড়তে চায় না, ভাঙ্গতে চায়, তারা আশ্বস্ত করতে চায় না, ভয় দেখাতে চায়, তারা সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করতে চায় না, অসুন্দরকে চাপিয়ে দিতে চায়। তারা প্রতিশোধ চায়, প্রতিহিংসা চায়, কিন্তু প্রতিকার চায় না। তারা চোখের বদলে চোখ চায় - কিন্তু এটা ভাবে না যে এ রকম করলে একদিন পুরো জগত অন্ধ হয়ে যাবে। সন্ত্রাসীদের আসলে কোন বিচারবুদ্ধি নেই, সুবিবেচনা নেই, হৃদয় নেই। তাদের কোন দেশ নেই, কোন প্রকৃত ধর্ম নেই, কোন নীতি নেই।

তৃতীয়ত: অনেকেই বলতে শুনি, ‘সন্ত্রাসের সঙ্গে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই’। কথাটা ঠিক নয় -আমাদের চারদিকের জগতের দিকে তাকালেই ঐ মন্তব্যটির অসাড়তা বোঝা যায়। মনে রাখা দরকার, এক ধরনের উন্মত্ততা সন্ত্রাসের অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। এবং সেই উন্মত্তার একটা বিরাট অংশ জুড়ে আছে ধর্মীয় উন্মত্ততা। ধর্মের নামেই বহু সন্ত্রাস ঘটানো হয় এবং ধর্মীয় উন্মত্ততাই বহু সন্ত্রাসের জন্ম দিয়েছে। নানান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে সন্ত্রাস সৃষ্টিতে ধর্মীয় উন্মত্ততা আমরা দেখেছি। সেই একই উন্মত্ততা আমরা দেখেছি উত্তর আয়ারল্যান্ডের সন্ত্রাসে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘর্ষে, কিংবা ইউরোপের নানান হিংসাত্মক কর্মকান্ডে। ধর্মীয় উন্মত্ততা মানুষকে মানুষ কিংবা মিত্র হিসেবে দেখে না, দেখে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ে এবং শত্রু হিসেবে।

চতুর্থত: সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে কোনো কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর ব্যাপারে সাধারন মানুষের একটি ভীতি তৈরী হয়। কখনো কখনো এ সব ভীতির পেছনে কোন ভিত্তি নেই বলে আমরা অন্যদের বোঝাতে চেষ্টা করি। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার যে, ভীতি কখনো একেবারে শূন্য থেকে তৈরী হয় না এবং কোন ভয়ই বায়বীয় নয়। অন্ধকারকে আমরা ভয় পাই, কারন অন্ধকারে আমরা কিছুই দেখি না, আমাদের পরিবেশ ও অবস্হান সম্পর্কে আমরা অনিশ্চিত থাকি। শূন্যে উঠে গেলে আমরা ভয় পাই কারন মাটি থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। সুতরাং বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে যে কোনো ধর্মালম্বীদের পৌন:পুণিক সম্পৃক্ততা সংশ্লিষ্ট ধর্ম এবং ধর্মালম্বীদের সম্পর্কে একটি ভীতিকর নেতিবাচক মনোভাবের জন্ম দেয়।

পঞ্চমত: অস্ত্রের ব্যবহার সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের একটি প্রধান উপকরণ। সুতরাং অস্ত্র উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত, তারা তাদের মুনাফার স্বার্থেই সন্ত্রাসকে শুধু জিইয়ে রাখতে চাইবে না, তার প্রসার ঘটাতে চাইবে। বিশ্বজুড়ে আজ অস্ত্র ব্যবসার পরিমান ২ ট্রিলিয়ন ডলার ( ১ ট্রিলিয়ন ডলার ১ লক্ষ কোটি ডলারের সমান) - ৪৭টি স্বল্পোন্নত দেশের জাতীয় আয়ের সমান। এ ব্যবসার ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে জাতিসংঘের পাঁচটি স্হায়ী সদস্য। আর সন্ত্রাসের অস্ত্রায়নের ফলে ২০১৭ সালে সারা বিশ্বে ৩০ হাজারেরও বেশী মানুষ সংহিস সন্ত্রাসের যূপকাষ্ঠে বলি হয়েছে। অতি সম্প্রতি জায়ান সে সংখ্যায় যুক্ত হলো।

কিন্তু জায়ান তো শুধু একটি সংখ্যা নয়, শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। জায়ান ছিল একটি নিষ্পাপ আলো, একটি সজীব প্রাণ, একটি আনন্দের প্রতীক। জায়ান ছিল একটি ভালোবাসার নাম, একটি আশার শিখা , একটি সম্ভাবনার বাতিঘর। এ সব কিছুকে যারা হত্যা করেছে, তাদের ক্ষমা নেই। তাদের সম্পূর্ণ বিনাশই আমি কামনা করি - তারা বিনষ্ট হয়ে যাক চিরতরে।


  • ২৪৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সেলিম জাহান

অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক

ফেসবুকে আমরা