স্বর্গলোকের লিঙ্গীয় রাজনীতি

সোমবার, অক্টোবর ২, ২০১৭ ১০:২৮ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


দেখতে দেখতে শারদীয় দুর্গাপূজা শেষ হয়ে গেলো প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে। নানা ঝামেলায় এবার আর পূজা দেখতে যাওয়া হলোনা আমার, নইলে প্রতিবছর একচক্কর হলেও যাওয়ার চেষ্টা করি।

সমাজ, সংসার, ধর্ম, রাষ্ট্র সবাই মিলে যখন নারীকে প্রতিনিয়ত অধস্তন অবস্থানের দিকে ঠেলে, তখন মহাসমারোহে নারীরূপী ঈশ্বর বন্দনা দেখতে আমার ভালো লাগে। নারী সত্তার মাঝে ঈশ্বরের শক্তির প্রকাশ আমাকে আনন্দ দেয়। ধর্ম মানা বা না মানার সাথে এর কোন যোগাযোগ নেই। নিছক কৌতুহল থেকে মাঝে মাঝে একটু ঘেঁটে দেখার চেষ্টা করি এই প্রকাশকে। 

হিন্দু দেবতা বলতে যোগশাস্ত্রের ইষ্টদেবতা, তেত্রিশ বৈদিক দেবতা বা শতাধিক পৌরাণিক দেবতাদের কথা বোঝানো যায়। এদের মধ্যে প্রধান তিন দেবতা ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর বা মহাদেব (শিব)। তাদের সহধর্মিণীরা হলেন যথাক্রমে সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং পার্বতী (দুর্গা)। আরো একজন দেবীকালী। দুর্গা ও কালী আবার পার্বতীর ভিন্নরূপ। 

অন্যদিকে, শিব ও দূর্গার পুত্র গণেশ ও কার্তিক। আরো আছেন, কামদেব, হনুমান, রাম ও কৃষ্ণ। রাম ও কৃষ্ণ আবার বিষ্ণুর দুই অবতার বা ভিন্নরূপ।

দেবদেবীগন প্রত্যেকে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং নিরাকার পরম সত্তার অংশবিশেষ। উপনিষদে আছে, "এক্কাম এবাদিতিয়াম" অর্থাৎ "ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়"।(ছান্দোগ্য উপনিষদ, প্রপাথাকা -অধ্যায় -৬, শ্লোক - ২)। বেদ অনুসারে, "ন তস্য প্রতিমা" অর্থাৎ "তার কোন আকার নেই'।(যজুর্বেদ, ৩২:৩)

এমনি আরো বেশ কয়েকটি শ্লোক আছে যা  হিন্দু ধর্মমতে এক ও নিরাকার ঈশ্বরের কথা বলে। দেব-দেবীরা ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপ বা শক্তির সাকার প্রকাশ মাত্র। একটু ভালো করে জানতে গিয়ে মনে হলো, মর্তলোকের নারী পুরুষের কর্ম বা ভূমিকা নিয়ে বিদ্যমান লিঙ্গীয় রাজনীতি থেকে স্বর্গলোকের দেবদেবীরাও মুক্ত নন! 

দেবীগন দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করেন। দূর্গা দূর্গতিনাশীনি, সংহারিনী। লক্ষী ধনসম্পদ, সৌভাগ্য ও সৌন্দর্যের দেবী। স্বরস্বতী সংগীত, শিল্পকলা, বুদ্ধি ও বিদ্যার দেবী। কিন্তু তারা কেউ সৃষ্টিকর্তা নন। সৃষ্টিকর্তা হলেন ব্রহ্মা, তিনি বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করেন। পালনকর্তা হলেন বিষ্ণু, তিনি ব্রহ্মার সৃষ্টিকে পালন করেন এবং তিনি ধর্মেরও রক্ষক। সংহারকর্তা হলেন মহেশ্বর বা শিব, পরবর্তী সৃষ্টির জন্য বর্তমান সৃষ্টিকে ধ্বংস করেন। 

দেবীরা সকলে মা। যেমন, মাদূর্গা, মা লক্ষী, মা সরস্বতী, মা কালী। মায়ের রূপই ঈশ্বরের নারীরূপ হিসেবে পূজিত। এখানে নারীর অন্যকোন রূপ, যেমন, প্রেমিকা বা স্ত্রী রূপের পূজা করতে দেখা যায় না। যদিও কখনো উপমা হিসেবে বলা হয় স্ত্রী হবে রূপে লক্ষী, গুণে স্বরস্বতী। কিন্তু সেটা উপমাই, পূজা বা আরাধনার অংশ নয়। 

অন্যদিকে আবার সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা দেবতাদের পিতা রূপকেও পূজা করতে দেখা যায় না। তারা কেউ পিতা ব্রহ্মা, পিতা বিষ্ণু, পিতা শিব, পিতা কৃষ্ণ, পিতা রাম নন। বরং দেবতাদের কর্তা বা স্বামী বা প্রেমিক রূপ আরাধ্য। যেমন, শিবকে সাধারণত বিমূর্ত শিবলিঙ্গের রূপে পূজা করা হয়। অবিবাহিত মেয়েরা এই দিন উপবাস করে ব্রত করেন, ভগবান শিবের মতো স্বামী পাওয়ার জন্য। যদিও বলা হয়, লিঙ্গ অর্থ প্রতীক এবং শিবলিঙ্গ শিবের প্রতীকি প্রকাশ, কোন যৌনাঙ্গ নয়। তবুও এতো কিছু থাকতে এই বিশেষ প্রতীকটিই কেন বেছে নেয়া হলো সেই প্রশ্নটা থেকেই যায়। যাইহোক, এর বিপরীতে দেবীদের মতো স্ত্রী পাওয়ার আশায় কোন পূজার কথা শোনা যায় না। 

নারীর মাতৃরূপ এবং পুরুষের কর্তা ও প্রেমিক রূপকে মহিমান্বিত করার যে কৌশল তার থেকে দেব দেবীরাও মুক্ত নন বুঝলাম।


  • ৩৫৫৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শাশ্বতী বিপ্লব

সমাজকর্মী

ফেসবুকে আমরা