বিশ্বাস নয়, মানুষের ক্ষমতার উপরে আস্থা রাখুন

বুধবার, মে ২৯, ২০১৯ ৩:২০ AM | বিভাগ : আলোচিত


পুরো খ্রিস্ট ধর্মে বিশ্বাসী বলয়ে এক সময় কুষ্ঠরোগ নিয়ে হাজার রকমের মীথ প্রচলিত ছিলো। বাইবেলের পুরোনো টেস্টামেন্টে কুষ্ঠ রোগকে ঈশ্বরের অভিশাপ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। মানুষের পাপের ফল হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সে কারণেই কুষ্ঠ রোগীকে বহুদূরে শহরের বাইরে আলাদা করে দেয়া হতো আর একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে খ্রিস্টিয় পদ্ধতিতে “তওবা” করার পরে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার পরে তাঁকে আবারো সমাজে গ্রহন করা হতো।

বাইবেলের পুরোনো টেস্টামেন্ট বাতিল করেছে খ্রিস্টধর্মের মানুষেরাই। কিন্তু রোগ বালাই নিয়ে সেই অদ্ভুত গল্পের কোনো শেষ নেই দুনিয়াতে।

গেরহারড আরমার হানসেন ছিলেন নরওয়ের একজন বিখ্যাত ডাক্তার ও অনুজীব বিজ্ঞানী। ভদ্রলোক খুব কট্টর নাস্তিক, ঈশ্বর অবিশ্বাসী মানুষ ছিলেন। নাস্তিকতার জন্যে তাঁকে তার শহর ত্যাগ করতে হয়েছিলো আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে । এই ভদ্রলোক ১৮৭৩ সালে আবিস্কার করে ফেললেন মাইকো ব্যাক্টেরিয়াম লেপরি নামের ব্যাক্টেরিয়া যা লেপ্রসী বা কুষ্ঠ রোগের কারণ। বলুন তো এই আবিস্কারের পরে লেপ্রসী হবার জন্যে বাইবেলের সেই গল্প কি আর টিকে থাকার ভিত পায়? ঈশ্বরের অভিশাপ নয়, কোনো পাপ বা অবাধ্যতা নয়, লেপ্রসী রোগের কারণ হচ্ছে মাইকোব্যাক্টেরিয়াম লেপরি নামের একটা ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমন। এর প্রায় আশি বছর পরে ১৯৫০ সালে প্রথম আবিস্কার হলো ড্যাপসন নামের ঔষধ যা সফল ভাবে চিকিৎসা করলো লেপ্রসী’র। আর ১৯৭০ সালে, হানসন এর আবিস্কারের প্রায় একশো বছর পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তিনটি ঔষধ দিয়ে কঠিন লেপ্রসী’র চিকিৎসা শুরু করে।

এখনও কি মানুষ বলবে লেপ্রসী বিধাতার “অভিশাপ”? ঈশ্বরে অবাধ্যতার ফসল? বরং ইতিহাস বলে – এক উদ্ধত ঈশ্বর অবাধ্য মানুষ গেরহারড হানসন লেপ্রসী নিয়ে ঈশ্বরবাদীদের মুখে ঝামা ঘসে দিয়েছিলেন আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে।

আমাদের ভারতবর্ষে কলেরা’কে মনে করা হতো ভগবানের অভিশাপ। বাঙলা সাহিত্যে বিভিন্ন লেখায় কলেরার কথা উঠে এসেছে। আমরা পড়েছি – কলেরা আর ওলাওঠাতে গ্রামের পর গ্রাম সাফ হয়ে যাবার গল্প। বহু ঝাড়-ফুক, যজ্ঞের আয়োজনের কথাও পড়েছি। অথচ এই কলেরা একটি পানিবাহিত রোগ। ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনের লাইম হাউস এলাকায় যখন মাত্র ১০ দিনে ৫০০ জন মানুষ মারা যায় কলেরাতে তখন ডা জন স্নো নেমে পড়েন এর কারণ খোঁজার জন্যে। তিনি এপিডেমিওলজিক্যাল সারভে করে খুঁজে পান যে “Broad Street Pump” থেকে যে সকল বাড়ীতে পানির সরবরাহ গেছে শুধুমাত্র সেই বাড়ী বা পরিবার গুলোই কলেরায় আক্রান্ত হচ্ছে। পরে দেখা যায় সেই পানির পাম্পটির হাতলটি খুবই নোংরা ও জীবানুযুক্ত। সেই “Broad Street Pump” এর হাতল পরিবর্তন করার এক সপ্তাহের মাথায় মৃত্যুর হার কমে আসে। পরবর্তীতে অনুজীব বিজ্ঞানী ফিলিপ্পো পাসিনি আবিস্কার করেন যে কলেরার জীবানুর নাম “ভিবরিও কলেরি” এবং এটি একটি ব্যাকটেরিয়া। জন স্নো আবিস্কার করেন কলেরা পানিবাহিত রোগ, তাই বাড়ীতে সরবরাহ করা পানি বিশুদ্ধ হলে কলেরা নাই হয়ে যাবে দুনিয়া থেকে। সত্যিই তাই, উন্নত বিশ্বে যেখানে জীবানুমুক্ত পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেছে, কলেরা সেখান থেকে বিদায় নিয়েছে। ঈশ্বরের কেরামতিও সেখানে মৃত্যুবরন করেছে।

এই রকমের হাজার হাজার গল্প – কাহিনী – মীথ আছে রোগ বালাইকে ঈশ্বরের হাত, আল্লাহর অভিশাপ আর ভগবানের দান বলে বিশ্বাস করার। এমন কি আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষিত ডাক্তারেরাও তাদের রোগীদের বলেন “আল্লাহ আল্লাহ করেন” যদিও আল্লাহর কোনো ক্ষমতাই নেই রোগ দেয়ার কিংবা তা ভালো করে দেয়ার।

প্রকৃতিকে তার কার্যকারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে শেখায় না আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। সেজন্যেই আমাদের দেশের অতি উচ্চ শিক্ষিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচাইতে বড় ডিগ্রীধারী লোকগুলোও রোগাক্রান্ত মানুষদের শুভকামনা জানানোর পাশাপাশি স্মরণ করিয়ে দেন তার “পাপ”, “কৃতকর্ম” এসবের সাথে রোগীর রোগের সম্পর্ককে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের নৈতকতাতে খুব সুস্পষ্ট করে লেখা আছে কোনো রোগ কে রোগীর আচরণ, ব্যক্তিগত ধর্ম, বর্ণ, কৃতকর্ম ইত্যাদির সাথে যুক্ত করা যাবেনা। এমন কি বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবার নৈতিক গাইডলাইনেও তাইই আছে। তবুও বহু ডাক্তাররাও মনে করেন ... রোগ বালাই সব "উপর ওয়ালার বিচার"।

একাডেমিক শিক্ষা মানুষ কে চাকুরী দেয়, কাণ্ডজ্ঞান দেয় না। কাণ্ডজ্ঞান মানুষ অর্জন করে তার চিন্তাশক্তি দিয়ে, চিন্তা করার চর্চা দিয়ে, অনুসন্ধিৎসু মন দিয়ে।


  • ২২০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মুহাম্মদ গোলাম সারওয়ার

মুক্তচিন্তক ব্লগার গোলাম সারওয়ার নিজেকে আড়ালে রাখতেই বেশি পছন্দ করেন।

ফেসবুকে আমরা