সারথি বিশ্বাস

প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক, পশ্চিম বঙ্গ।

পুরুষকে লেখা নারীর খোলা চিঠি

তুমি আমাকে সহমরণ থেকে বাঁচিয়েছো। আমার বৈধব্য লাঞ্ছনা ঘুচিয়েছো। শিক্ষার উঠোনে আমার জন্য জায়গা পেতেছো। প্রাতঃস্মরণীয় লিস্টে তোমারই নাম বারবার লিখেছি। খুব সকালের এই স্মরণটুকু দিনের অন্য ভাগেও হাতড়েছি। আজও হাতড়াই। কিন্তু তারও আগে। অনেক আগে। যখন আমি নিজেও ঠিক মেয়ে বলে চিনি নি আমাকে, তোমাকে চিনেছি পুরুষ। তুমি এলে আমাদের বাড়ি কোদালের খোঁজ করতে। আমি ঘরে গেলাম কোদাল আনতে। তুমি পিছন থেকে দু'হাত দিয়ে আমার বুক চেপে ধরলে। আমি 'মা 'বলে চিৎকার করে পালিয়ে আসলাম। কেমন একটা চ্যাটচেটে অশুদ্ধ অনুভব এলো মনে! যদিও আমার আর তোমার বুকের কোনো ফারাকই সেদিন ছিলো না। তবুও বুঝলাম তুমি পুরুষ! আমি তবে মেয়ে!

পুরুষ তুমিই তো আমার বাবা। কতো ভরসার জায়গা! সেদিন রেলের পরীক্ষা দিতে বান্ধবী উত্তরার সাথে কলকাতা যাচ্ছিলাম। ট্রেনে আমার আর উত্তরার মাঝখানে বসেছিলে তুমি-  উত্তরার বাবা। নিরীহ। ভদ্রলোক। খুব অবাক হয়েছিলাম, তোমার হাতটা বারবার আমার বগলের তলা দিয়ে সেঁধিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলো। খুব অস্বস্তি হচ্ছিলো আমার। নিজের হাতটা শরীরের সাথে শক্ত করে চেপে রেখে বগলের কাছে ফাঁকটা আগলে রাখছিলাম। উত্তরার দিকে তাকাচ্ছিলাম বারবার। ও নিশ্চিতে বসে আছে অন্য পাশে। আমিও ঠিক এতখানিই নিশ্চয়তায় তোমার সাথে ট্রেনে উঠেছিলাম। বুঝলাম, সব বাবাই হয়তো খুব ভালো বাবা। কিন্তু সব ভালো বাবা ভালো মানুষ হয় না তাহলে!

এভাবেই তোমার সাথে পরিচয়টা একটু একটু করে স্পষ্ট হয়েছে। আজও খানিকটা হবে। কালও হবে নতুন করে।

আজকের সকালটা আমি পেয়েছি। একটা সকাল তো আসবেই যেদিন আমি আর থাকবো না। তো কাল সকালেই যদি আমার আর ঘুম না ভাঙে, আজই মন খুলবো তোমার কাছে।

যদিও পুরুষ, নারীর মন তুমি দেখো কিনা জানি না। তুমি কি নারীর শুধু শরীরটাই চাও? ওটাই দেখো?

লিলিথকে মনে পড়ে তোমার? কী! চমকে উঠলে তোমার গুম করে দেওয়া নারীর নাম শুনে? লিলিথ! আমাদের আদি নারী। যে মাটিতে আদমের জন্ম, সেই মাটিতেই জন্ম তার। তাই সে আদমের সমান হতে চেয়েছিলো। মানতে পারে নি পুরুষের আধিপত্য। পুরুষের চোখে সে নিজেকে দেখে নি। নিজেকে দেখার তার একজোড়া চোখ ছিলো। নিজের। স্বাধীন। তুমি মেনে নিতে পারো নি তার স্বাধীনতা। তার উপর নেমে এসেছে ঈশ্বরের অদ্ভুত অভিশাপ। ঈশ্বর, তুমিও তো আসলে পুরুষই! তাই বাইবেলের পবিত্র পাতা থেকে তাকে ছিঁড়ে ফেললে তুমি। সেও স্বাভিমানে নিজের ডানা তৈরি করে পাখা মেলে উড়ে গেলো ঈশ্বরের বাগান ত্যাগ করে। আর তুমি তাকে ইতিহাসের প্রথম ডাইনি প্রমাণ করে দিলে। তারপর তোমার পুরুষতন্ত্রের কাঠামো মজবুত করতে তৈরি করলে ইভকে। তোমার পাঁজর থেকে তার জন্ম, সে তোমারই একটা অংশ মাত্র! ইতিহাস ভুলে গেলো লিলিথকে। আমাদের আদি পুরুষ আর নারী হয়ে থেকে গেলো আদম আর ইভ।

এতো অবাক হচ্ছো কেনো? তুমিই তো তিতাস রায় বর্মন নাম নিয়ে আমাকে বললে এসব গোপন কথা! তোমাকে আর কী বলি! নারীর সৃষ্টির কাহিনিতেই যে অসম্মান! তাই তো আমরা নারীরা আজও নিজেকে দেখার দু'টো চোখ আবিষ্কার করতে সাহস পাই না। আজও শুধু নারীরাই ডাইনি হয়। আর তাকে শাস্তি দিতে তার চুল কেটে মাথায় ঘোল ঢালি আমরা নারীরাই। আজও আমি নিজেকে সাজিয়ে-গুজিয়ে তোমার পাতে পরিবেশন করি- 'আমি কলকাতার রসগোল্লা' বলে কোমর দোলাই। শুনে খুশি হবে পুরুষ, আজও আমি তোমার চোখেই নিজেকে দেখি।

সকাল দিয়েই শুরু করি তাহলে। রোজ সকালে তুমি মর্নিংওয়াকে যাও। সুস্বাস্থ্যের জন্য। আমিও যাই। কিন্তু শরীরের জন্য। শরীরটাকে প্রদর্শনের উপযুক্ত রাখার জন্য। এমন ইঙ্গিতই তো লেগে থাকে আমার চারপাশের বাতাসের ধূলিকণায়। আমি তবে স্বাস্থ্যের জন্য হাঁটি না! আমার শরীরের সঙ্গে স্বাস্থ্যের কোনও যোগ নেই তাহলে!

আসলে কী জানো? আমার নিজের জন্য আলাদা কোনো সময় থাকতে নেই। অন্ধকারে জেগে উঠে শরীরচর্চা করার মতো একান্ত সময় কাটালে কেমন বেহায়া লাগে আমাকে! ঘুম আমার ভোরবেলায়ই ভাঙতে হবে। কিন্তু তা সংসারের প্রয়োজনে। তখন আমাকে কতো যে লক্ষ্মী লাগে!

অথচ আমার শরীর বেঢপ হলে তোমার মন বসবে না তাতে। তার উপর রোগ বাঁধালেও মেজাজ হারাবে তুমি! হ্যাঁ, আমি রোগ বাঁধাই। রোগ হয় না আমার! আমার সব দুয়ারেই এমন শিকল আঁটা কেনো বলতে পারো?

তুমি চুপচাপ উপরের দিকে তাকিয়ে থাকলে নিশ্চয়ই আকাশ দেখো। অথবা জরুরি কিছু চিন্তা করো। আমি তাকালেই নিষিদ্ধ প্রেমের গন্ধ শুঁকি! তুমি অফিস থেকে দেরি করে ফিরলে কাজের চাপ থাকে। একটু বেশিই যত্ন-আত্তির অধিকার থাকে তোমার। আমার একটু দেরি হলেই কারো সাথে আড্ডা মেরে ফিরি! কে বলতে পারে, হয়তো অফিসেও আমাকে আড্ডা মারার জন্যই বেতন দেয়!

তুমি অনলাইন থাকলে দরকারি কাজ সারো। অথবা নির্দোষ বিনোদনে মাতো। আমি অনলাইন থাকলে নিশ্চয়ই কারো সাথে লাইন মারি! কেনো আমার নিজের কোনও সময় থাকতে নেই? আমার একান্তে কাটানো সব সময়েই কেনো বদ গন্ধ লেগে থাকে?

এর একটা উত্তর আমি পেয়েছি। তুমি বলবে ঠিক কিনা। আমার একান্ত নিজের করে সময় কাটানো তুমি মানতে পারো না। আমার কাটানো যে সময়ের ভাগ তুমি নিতে পারো না, সেইসব সময় দূষিত তোমার কাছে। আমার রান্নাঘরে কাটানো সময়ের ভাগ তুমি পাতে পাও। আমার অফিসে কাটানো সময়ের ভাগ তুমি হাতে পাও (যদিও একথা উচ্চারণ করতে মানা)। তোমার ভাগ না পওয়া আমার সব সময় নষ্ট! পচা! দুর্গন্ধযুক্ত! তুমি ছাড়া আমার কোনও শুভ চিন্তা নেই! শুদ্ধ বিনোদন নেই!

আমি কি তবে তোমার মতো না, প্রথম শ্রেণির নাগরিক? আমি কি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক? আমি কি আজও, আজও তোমার ইনভেস্ট? যে ইনভেস্ট তোমাকে শরীরী সুখ দেয়। আর সন্তানের জন্ম দেয়। আর সংসার সুখের করে রাখে নিজ গুণে। আজও তুমি আমাকে জাস্ট পোষো। আমার গ্রামে একটা কথা প্রচলিত আছে- 'বৌ পোষা আর হাতি পোষা একই'। আজও আমিই তোমার সবচেয়ে প্রিয় পোষ্য!

আমি তোমার সম্পত্তি। তাই তুমি প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হলে আমার মুখে অ্যাসিড ছুড়ে মারো। তোমার পুরুষত্বের গৌরব প্রতিষ্ঠায় ধর্ষন করো আমাকে। তুমি শুধু অধিকার করতে চাও আমাকে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভিখুকে মনে পড়ে তোমার? ভিখারি। কিন্তু খাদ্যের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সমস্ত নারীকে নিজের অধিকারে চেয়েছিলো সে।

পুরুষ, তুমি আমাকে নিয়েই সংশয়ে থাকো? আচ্ছা বলো তো, বাসে, ট্রেনে, পাবলিক প্লেসে ক'জন মেয়ে, ক'দিন ইচ্ছা করে তোমার গা-ঘেষে দাঁড়িয়েছে? তোমার গোপনাঙ্গে হাত চালিয়েছে? এমন অভিজ্ঞতা কোনোদিন হয়েছে তোমার? আমার হয়েছে। প্রতিবার আমি যখন বাসে উঠি, ট্রেনে দাঁড়াই, পাবলিক প্লেসে থাকি, তুমি পিছন থেকে সেট করে দাঁড়িয়ে পড়েছো। বারবার ঢলে পড়েছো গায়ে। বগলের তলা দিয়ে হাত চালিয়ে দিয়েছো। সামনে থেকেও খামচা মেরেছো আমার সত্ত্বায়। এমন একটা নারীকেও তুমি রেখেছো, যার বুকে তোমার ঐ নোংরা হাত পড়ে নি?

সকালে কষাই যখন খাসি কেটে ঝুলিয়ে রাখে, মাংসের দোকানের সামনে মাংসপ্রেমীদের ভিড় জমে যায় দেখেছো তো? তুমি কি আমাকে একটা মাংসের দলাই ভালো না? আমাকে মানুষ ভাবলে, নিদেনপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণির হলেও, রাস্তাঘাটে অপরিচিত আমাকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যখন তখন এমন ছুঁতে পারতে? নারী-পুরুষের ছোঁয়াছুঁয়িতে মনের একটা ভূমিকা থাকলে বেশ হতো না! এই পাঠটা আর কবে নেবে তুমি?

তবু্ও পুরুষ, তুমিই সংশয়ে থাকো আমাকে নিয়ে! আমার চরিত্র নিয়ে! হাজারো অভিযোগ দেখি তোমার চোখে। আমি শরীর দেখাই। পুরুষ ভোলাই ছলাকলায়। জানো তো, আমি উচ্ছেটা অল্প তেলে লো-আঁচে অনেকটা সময় নিয়ে ভাজি। তুমি বেশি তেল খেতে চাও না তো তাই। তুমি লবন কম খাও বলে তরকারিতে নুনও খুব কম দেওয়া অভ্যাস হয়ে গেছে আমার। তুমি আমার শরীর দেখা বন্ধ করো। আমিও দেখানো বন্ধ করে দেবো। কী করব আমি? মহান চিন্তাবিদ রুশোও যে মনে করেছেন, পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য নিজেকে তৈরি করাই নারীর উপযুক্ত শিক্ষা! রুশোর চিন্তায়ও আমার মন নেই। মনন নেই। তোমাকে দোষ দিই কী করে? তোমারও আমার মনে অরুচি! আমার মননে সন্দেহ! আমার চরিত্রে অবিশ্বাস!

আচ্ছা পুরুষ, তুমি প্রেম প্রত্যাখ্যান করেছো কখনো? ব্যর্থ প্রেমের আক্রোশে অ্যাসিড ছুড়ে মারার সাহসতো অনেক দেখিয়েছো, প্রেম প্রত্যাখ্যান করার শক্তি জোগার করতে পেরেছো কখনো? আমি পেরেছি। তোমার খুব কাছের বন্ধু, প্রেম প্রার্থনা করেছিলো আমার। আর আমাকে পটাতে নিজের বউয়ের বদনাম করেছিলো খুব। আমি প্রত্যাখ্যান করেছি। হ্যাঁ, তোমাকে বলি নি আগে। বলি নি, কারণ আমি চাইনা তুমি একটা বন্ধু হারাও। আমার কোনো বান্ধবী তোমাকে প্রেম নিবেদন করলে তুমি পারতে তো আমার মতো ফিরিয়ে দিতে?

পাড়ার ঐ যে খুব ভদ্র, লাজুক ছেলেটা; আমার থেকে বয়সে ছোটো, বলেছিলো- তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে। আমি তাকে আনফ্রেন্ড করে দিয়েছি। স্পষ্ট করে না বললেও অনেকেই আভাসে-ইঙ্গিতে প্রেমপত্র লেখে। আমি সেসব বুঝেও না বোঝার ভান করে আছি এখনও। কেননা আমি জানি সতী বা অসতীর ছাপ্পা কেবল নারীর দেহ-মনেই পড়ে। পুরুষের এসব ঝুট ঝামেলা নেই। সতীর তো কোনো জুতসই পুংলিঙ্গবাচক শব্দই নেই আমার মাতৃভাষায়!

অথচ, তোমার জীবনে প্রেমের গুঞ্জনে আমি নীরব শ্রোতা হয়ে রই। তুমি আমায় ছেড়ে গেলে আমি শূন্য হই। ফিরে এলে ধন্য হই! তবুও তোমারই এতো সংশয় আমাকে নিয়ে সবখানে! তোমার মতো আমার জীবনেও যদি একটা প্রেম চলে আসে দুম করে। ভুল করে। তুমি পারবে তো আমার মতো ক্ষমা করে নিতে?

বড়োদের মুখে শুনেছি, ঈশ্বর যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন। তা হবেই না বা কেনো? ঈশ্বরও যে পুরুষ! পুরুষ কি কখনো অমঙ্গলের কারণ হয়? আজ আমিও একথা বিশ্বাস করছি। তুমি আমাকে দু'পায়ে না ঠেললে নিজেকে এতো ভালোবাসতেই শিখতাম না যে! মাছের সব বড়ো পিসগুলো শুধু তোমার জন্যই তুলে রাখতাম, একটাও নিজে খেতে পারতাম না। বুঝতামই না আমাকে ভালো রাখার সবখানি দায়িত্ব নিয়ে তুমি পৃথিবীতে আসো নি। সে দায়িত্বের অনেকখানিই আমার।

তবুও আমার কিন্তু তেমন দুঃখ নেই কোনো। বেশ আদরে- আহ্লাদেই আছি। ভালোবাসি আমাকে। তোমাকেও ভালোবাসি। কেনো? উঁহু, বলবো না তো সেকথা। এইটুকু একান্তই আমার। আমারই থাক গোপনে।

ধন্যবাদ তোমাকে। তুমি যা-কিছু দিয়েছো, যা-কিছু দাওনি, আর যা-কিছু কেড়ে নিয়েছো- সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।

1017 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।