সারথি বিশ্বাস

প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক, পশ্চিম বঙ্গ।

মেয়ে, তুমি নাগরিক নও, সহকর্মী নও, বন্ধু নও, প্রতিবেশী নও, আত্মীয় নও, মানুষ নও -তুমি শুধুই নারী

ছোটবেলায় আমি মায়ের সঙ্গে হেঁটে মামার বাড়ি যেতাম মহাভারতের একফালি মাটির উপর দিয়ে। যেতে যেতে যতদূর চোখ যায়, ঘুরেফিরে আমি দ্রৌপদীকে খুঁজতাম, সেই দ্রৌপদীকে, যাকে তার স্বামী জুয়া খেলায় হেরেছিলো। হয়তো সে তখন সেই ডোমপাড়ার কোনো কুঁড়ে ঘরের কোনায় অপটু হাতে ডাগড়া-কুলো তৈরিতে ব্যস্ত থাকতো, তাই দেখা হয় নি কোনদিন।

আমার সেই কোনদিন না দেখা দ্রৌপদীকে আমি আজও স্যালুট জানাই মনে মনে। মহাভারতের দ্রৌপদী তার সমস্ত বৈদগ্ধ আর তেজ নিয়ে যা পারে নি, আমার সেই দ্রৌপদী তাই পেরেছিলো স্বামী তাকে জুয়া খেলায় হেরেছে শুনেই এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিলো ঘর থেকে, উঠেছিলো ডোমপাড়ার সেই জিতে যাওয়া জুয়াড়ির ঘরে। সারা জীবনে আর কোনদিন ফিরে যায় নি সে। কী তীব্র আর জোরালো প্রতিবাদ!

ভরা রাজসভায় দ্রৌপদীকে বিবসনা করার প্রচেষ্টা দেখেও চুপ থেকেছে সবাই। তাদের ভাষা ছিলো না প্রতিবাদের, যুক্তি ছিলো না নাকি প্রতিরোধের! আজকের মেয়ে, তুমি কোন ছার! সীতাকেও যে আগুনে পুড়তে হয়েছিলো! তিন যুগের তিন নারী- নির্যাতিতা, লাঞ্ছিতা, অপমানিতা। সত্য থেকে কলি, রাজপথ থেকে গলি, ধনীর প্রসাদ থেকে চাষের জমি...কেউ নারীকে মানুষের সম্মানটুকু দেয় নি। শুধু একটাই পার্থক্য- আজকের মেয়েটি একবচন নয়, বহুবচন।

মহাভাতের দ্রৌপদী তবুও পেরেছিললো তার অপমানের প্রতিশোধ নিতে, দুর্যোধনের এনকাউন্টারের জন্য তার ভীম ছিলো। রামায়ণে রাবণ শাস্তি পেলেও বিচার পায় নি সীতা। নিজর চরিত্রশুদ্ধির প্রমাণ দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে অভিমানে মুখ ঢেকেছিলো মাটিতে। রামমোহন সতীকে বিধবা করেছিলেন, বিদ্যাসাগর বিধবাকে নারী করেছিলেন, নারীর মানুষ হওয়া এখনো বাকি। লড়াইটা জারি আছে... রাজার বিরুদ্ধেও, প্রজার বিরুদ্ধেও।

মেয়েদের বিরুদ্ধে কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলেই সব শাসকের প্রথম এবং প্রধান চেষ্টা থাকে তাকে যথাসম্ভব ছোট করে দেখানোর এবং এটা প্রমাণের যে, যারা এসব তুলে ধরছে তারা সবাই মিথ্যাবাদী, চক্রান্তকারী। সেইজন্য মেয়েদের জেতা যায়, মারা যায়, জুয়া খেলায় হারা যায়, তাকে বিবস্ত্র করা যায়, তার চুল কেটে মাথায় ঘোল ঢালা যায়... তাকে ধর্ষণ করা যায়, তার মুখে অ্যাসিড ছোড়া যায়.....

আর আমরা? অভিযুক্ত আমার ছেলে হলে সে কখনোই একাজ করতে পারে না, আমার স্বামী হলে তার মতো ভালো মানুষ দ্বিতীয়টি নেই, আমার জাতের হলে তো কোনও কথাই নেই, আমার ধর্মের ছেলে এমন অধর্ম কিছুতেই করে না, আমার দলের হলে তো কিছুতেই পারে না। যদিও ঘটনাস্থলে আমরা কেউ-ই ছিলাম না, তাও আমাদের স্থির বিশ্বাস, সব সাজানো এবং ফাঁসানোর চক্রান্ত। একে অপরের উপরে আমাদের এতখানিই বিশ্বাস ! আমরা কবে বুঝবো, অভিযুক্ত আমার কেউ হলেই তার অপরাধ প্রবণতা কমে যায় না, সে সমস্ত অপরাধের উর্ধে ওঠে না! কে কী পারে, আর কে কী পারে না এটা বোঝা যদি এতই সহজ হতো, দুর্ঘটনাগুলো এড়িয়ে যাওয়াও যেতো। মানুষের চরিত্র নিউটনের গতিসূত্র না যে আপনি মুখস্থ করে রেখেছেন, সে মানুষ আপনার ছেলে হলেও না, স্বামী হলেও না।

এই শিক্ষার অভাবেই সমাজের প্রায় সব স্তর একসঙ্গে অবিশ্বাস করে নির্যাতিতাকে। সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে নির্যাতিতা যত পিছিয়ে পড়া, অবিশ্বাস ততই জোরালো। তাই পুলিশ তার অভিযোগ নিতে গড়িমসি করে। আর আমরা নিজেদের অপরাধ ধামাচাপা দিতে নির্যাতিতার চরিত্রে গর্ত খুঁড়ি। অথচ, মেয়েদের ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা ধরে নেওয়াই নিয়ম, যতক্ষণ না তা মিথ্যা প্রমাণিত হচ্ছে। অথচ, সত্য প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেটাকে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে মিথ্যা বলে যায়। যতক্ষণ মিডিয়া হইচই না করছে, যতক্ষণ ধর্ষণের সত্যতা সামনে না আসছে, আমরা তাকে মিথ্যা ধরে নিই, সাজানো ভেবে নিই, চক্রান্তের গন্ধ শুঁকি। কী বিপরীত মেরুতে অবস্থান আমাদের। মেয়েদের মুখের কথার সম্মান প্রতিষ্ঠা করে আইন হয়েছিলো ১৯৮৩ সালে, আমরা কি মনে রেখেছি সেকথা?

অবশ্যই, একথা মনে রাখার দায় শুধু পুরুষের নয়, মেয়েদেরও। যারা পুরুষের উপর প্রতিশোধ নাও ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ এনে, যারা নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বুকের কাপড় ফেলে দিয়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগ আনো, দোহাই, তোমরা এবার থামো। যেদিন সত্যিই পালে বাঘ পড়বে, বিশ্বাস করার লোক পাবে না একটাও। রাখালের গল্পে ছলনার ফল কেবল সেই ভুগেছিলো, কিন্তু এ গল্পে যে তোমার পাপের ফল কোনো নিরপরাধকে পেতে হয় ! নির্যাতিতাকে বিশ্বাস করার জায়গাটা কেড়ে নিও না, তার মুখের কথার সম্মাটুকু রক্ষা করো। যারা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ আনো, যারা কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ আনো তারাও অন্য পথে হাঁটো। এটা ধর্ষণ নয়, যা হয়েছে তোমার সম্মতিতেই হয়েছে- ইচ্ছায় না হলেও তোমারই লোভে হয়েছে, বা প্রয়োজনে হয়েছে, বা ভুলে হয়েছে। তুমি প্রতারণার অভিযোগ আনতে পারো, ধর্ষণের নয়। এতে ধর্ষণের শিকার হয় যে মেয়েটি, সে খুব সস্তা হয়ে যায়, খুব ছোট হয়ে যায়। নিজে একজন মেয়ে হয়ে ধর্ষণকে এত সহজ করে নিও না, এত ছোট করে দেখো না। যদি দেখো, তবে তুমি জানোই না ধর্ষণ কী!

ধর্ষণ আসলে একটা কড়া ধমক- চুপ থাকো, সমঝে থাকো, আমি যেমন করে বলছি তেমন করে থাকো। ধর্ষণ শুধুই যৌন উত্তেজনা হলে মেয়েটার জিভ কাটার দরকার হয় না, শিরদাঁড়া ভাঙার প্রয়োজন পড়ে না। ধর্ষণ আসলে 'আমার আমি'তে আঘাত করা, নারীর নিজস্ব সত্তাটিতে আঘাত হানা, তার সমস্ত অস্তিত্বকে দুমড়ে মুচড়ে অস্বীকার করা। তুমি যে আছো, তুমি যে কিছুমাত্র কিছু... সবচেয়ে আগে এইটাকে নস্যাৎ করা। যে মেয়ে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন, যে পৌরুষের সামনে মাথা তুলে দাঁড়ায়, যে স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, যার জানার ইচ্ছা প্রবল, যে কৌতূহলী, যে প্রতিবাদ করে; যার বুদ্ধি কম, যে ভবঘুরে পাগলী, যে আশ্রয়হীন, যে অসহায়, যে মুখরা, যে মুখচোরা যুগে যুগে, কালে কালে, বার বার, একের পর এক ধর্ষণ করতে হয় তাকে। এই মেয়ে, তুমি নাগরিক নও, সহকর্মী নও, বন্ধু নও, প্রতিবেশী নও, আত্মীয় নও, মানুষ নও, তুমি শুধুই নারী- সমঝে চলো ! নাহলে.....

তাই ধর্ষণ ধর্ষক একা করে না, শুধু একটা গ্যাং করে না, গোটা সমাজ করে, আমাদের ডমিনেন্ট কালচার করে। কে বলেছে ধর্ষক পুরুষ? প্রশাসনের কি কোনো লিঙ্গ হয়? সে কি পুরুষ? হবে হয়তো, নাহলে পুলিশ কেনো তদন্তের আগেই বলে দেয় কোনও ধর্ষণ হয় নি! সরকারও কি পুরুষ? তাই হবে, নাহলে সেও কেনো হুট করে বলে দেয় কিচ্ছু হয় নি, সব সাজানো ঘটনা! ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াইটা তাই একমুখী নয়, বহুগামী, মানুষের চরিত্রের মতো।

অনেকেরই এই বহুপথে চলন-গমনের সাধ্য থাকে না, সাহস পায় না; তারা চুপচাপ চেপে যায় সব। কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় আমাদের সবাইকে লজ্জার হাত থেকে রক্ষা করতে। ঘরে বাইরে লাগাতার প্রশ্নের মুখে সীতাকেও যে পাতাল ফুঁড়ে মায়ের কোলে আশ্রয় নিতে হয়েছিলো! সবাই তো কালী হতে পারে না, যে পুরুষতন্ত্রের মুখের ওপর পোশাক ছুড়ে মেরে দাপিয়ে বেড়ায় তার বুকে। আর লিঙ্গসর্বস্ব পুরুষ চোখ তুলে তাকাতেও সাহস পায় না তার দিকে। অথচ, দুর্গার পোশাকে ঢাকা স্নিগ্ধ রূপ দেখেও ছোঁকছোঁক করে অসুর, তাকে পাওয়ার লোভে তারা লড়াই করে মরে ভাতৃত্ব ভুলে। পুরুষের লালসা তাহলে কোথায়? শরীরে, না মনে? যে আমরা ভক্তিতে গদগদ হয়ে মা কালীর নগ্ন পায়ে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করি, সেই আমরাই নারীর পোশাকের মাপ নিতে ফিতে হাতে ছুটি। আর ধর্ষক ইন্দ্র বসে থাকে দেবরাজের সিংহাসনে, পাষাণ হতে হয় অহল্যাকে!

সেইজন্য, অন্য অপরাধের কথা জানি না, ধর্ষণের শাস্তি এনকাউন্টার হতে পারে না। তৎক্ষণাৎ প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে দেওয়া, লিঙ্গ কেটে নেওয়া, গাছে বেঁধে আগুন লাগিয়ে দেওয়া- কোনটাই ধর্ষণের উপযুক্ত শাস্তি নয়। ধর্ষণের উপযুক্ত শাস্তি ধর্ষককে আদালতে তোলা, আইনের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণ করা। তারপর কঠোর শাস্তি। নাহলে পুলিশ কী করে জানবে তার অসহযোগিতা করাটাও অপরাধ, প্রশাসক কী করে বুঝবে সে বেফাঁস মন্তব্য করেছিলো, নেতা কী করে স্বীকার করবে সে দুষ্কৃতীকে আশ্রয় দিয়েছিলো? সর্বোপরি, পরিবার কী করে শিখবে, অভিযুক্ত তাদের ঘরের একজন হওয়া সত্ত্বেও সে অপরাধীই! অপরাধী আকাশ থেকেও পড়ে না, মাটি ফুঁড়েও ওঠে না, সে যে মায়ের পেটেই জন্মায়! এনকাউন্টার হলে আবেগের আতিশয্যে আমরা পুলিশকে হিরো বানাই, তাদের উপর পুষ্পবৃষ্টি করি, কিন্তু সেই গোছা গোছা ফুলের নীচে এই সমস্ত প্রশ্নচিহ্নগুলো যে চাপা পড়ে যায়! সেই প্রশ্ন চিহ্নগুলো মুছে দাঁড়ি বসানোর কী ব্যবস্থা হবে? কীভাবে আমরা সবাই একসঙ্গে বলতে পারবো অপরাধ ইজ অপরাধ ?

354 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।