সারথি বিশ্বাস

প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক, পশ্চিম বঙ্গ।

যতদিন নারী লক্ষীর আসনে বসতে চাইবে ততদিন মুক্তি নেই

গল্পটা এমন- কর্তৃত্ব-মেজাজ থেকেই গল্পের শুরু, মানুষের সভ্যতার শুরু। আর শুরু থেকেই এই কর্তৃত্বের মৌসুরিপাট্টা কায়েম করে রেখেছে পুরুষরা। তারা তাদের সুবিধা এবং দৃষ্টিভঙ্গির বিচারেই সমাজের নিয়ম-নীতি-নৈতিকতার ভীত গড়েছে। তাই দেশে দেশে আমাদের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। আর তাই পুরুষতান্ত্রিকতা বললেই পুরুষরা নড়েচড়ে উঠেন, তারা অনেকেই একে অবান্তর এবং অকারণ বিরোধিতা বলে মনে করেন।

পুরুষতান্ত্রিকতা কি নারী-স্বাধীনতার বিপরীত শব্দ? অনেকাংশেই তাই। তবে এটা কোনও লিঙ্গ নির্ণায়ক শব্দ নয়, এটা একটা মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি। আর এটা কোনও পুরুষের মনে যতখানি জায়গা জুড়ে থাকে, কোনও নারীর মনেও ততখানিই জুড়ে থাকতে পারে। কার্যত থাকেও। আবার, হতে পারে, কোনও পুরুষও পুরুষতান্ত্রিকতা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। কাজেই, পুরুষতান্ত্রিক বললেই পুরুষদের গায়ে মেখে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। অনেক নারীও পুরুষতান্ত্রিক, এমনকি, অনেক পুরুষের চেয়ে বেশিই পুরুষতান্ত্রিক মন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। 

যে মা ছেলেকে মানুষ করার মূল্যস্বরূপ পণ দাবি করে, যে বাবা বৌমার বাপের পাঠানো কাঠটা সেগুন কিনা খাটের সে গুণ বিচার করে, যে বোন নতুন ভাই-বৌয়ের গলার হার টেনে দেখে পাতলা কিনা, যে পড়শি কানের দুল নেড়ে দেখে হালকা কিনা- তারা সবাই সমান পুরুষতান্ত্রিক। রবীন্দ্রনাথের নিরুপমা সাক্ষী, পণের দায়ে তার সব অবমাননায় পুরুষের চেয়ে নারী বেশি দায়ী।

আমাদের সমাজে অবিশ্বাসের সংস্কৃতির চাষ হয় সেই প্রথম ফসল ফলানোর আমল থেকেই। কাকে অবিশ্বাস? নারীকে। কীসের অবিশ্বাস? সবখানে-নারীর রূপে, চরিত্রে, গড়নে, মননে, মেধায়; নারীর যোগ্যতায়, উচ্চতায়, ক্ষমতায়। নারীর ক্ষমতা এমন একটা জিনিস, যেটা না থাকলে আমরা তার উপর চড়াও হই, তাকে লাঞ্ছিত করি, কোণঠাসা করি; আবার যে নারীর এই ক্ষমতা, এই স্বাবলম্বন থাকে তাকে নিয়ে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি-এই বোধহয় তাকে আর ঘরে পাওয়া গেলো না! এই যে অবিশ্বাসের আতঙ্ক, এটা কেবল নারীকে নিয়েই-তাকে নিয়ে বাইরে যতখানি অবিশ্বাস, ততখানিই ঘরেও। কেননা, নারীকে অবিশ্বাস করতে কোনো যুক্তি লাগে না, কোনো প্রমাণ দরকার হয় না। এর টাটকা উদাহরণ সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর ঘটনা। তাঁর প্রতি গোটা ভারতবর্ষের কী অগাধ বিশ্বাস-ড্রাগ নেওয়া তো দূরের কথা, তিনি নাকি কোনোদিন একটা সিগারেটও ধরান নি, তার মতো ব্রিলিয়ান্ট ছেলে নাকি অবসাদগ্রস্ত হতে পারেন না, আত্মহত্যাও করতে পারেন না কিছুতেই। উল্টোদিকে তার বান্ধবী রিয়া চক্রবর্তীর ঘাড়ে কোনো রকম প্রমাণ ছাড়াই কেবল সব দায়ই চাপানো হয় নি, তার চরিত্রের পোস্টমর্টেমই কেবল হয় নি, তাকে ডাইনিও বলা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, রিয়া চক্রবর্তীর কালা জাদুর শক্তি আর ডাইনিতত্ত্বের ঝড় সমস্ত বাঙালি মেয়ের গায়েই আছড়ে পড়ছে-সব বাঙালি মেয়েই নাকি জাদু জানা ডাইনি! মেয়েদের প্রতি সন্দেহ আর অবিশ্বাস একই সঙ্গে এমনই গভীর এবং সস্তা।

কই? কোনও পুরুষকে তো কেউ এতখানি অবিশ্বাস করে না? কোনো পুরুষকে তো কেউ ব্রহ্মদত্যি ভাবে না, তাকে তো কেউ মামদোভূত বলে না, নররাক্ষস সন্দেহে পুড়িয়ে মারা হয় না তো কোনও পুরুষকে! তবে কি সব পুরুষই ঠোঁটে দুধের ঝিনুক গোঁজা শিশুর মতো নিরীহ? পুরুষরা কি সবাই ঘরের পোষা কুকুরটির মতো খুব বিশ্বস্ত? উত্তর সম্ভবত না। কিন্তু, এর পরেও, সমস্ত বাপ-ভাই -স্বামী, এমনকি, মা-বোন-মাসি পর্যন্ত সবাই নারীকেই সন্দেহ করে। নারীকে নিয়ে এমনই ভারতজোড়া অবিশ্বাস আর বিদ্বেষের সংস্কৃতিতেই আমরা লালিত।

অতিভক্তির সংস্কৃতিও আছে, সেটাও সমান বিপজ্জনক। অনেক সময় মেয়েকে, কখনও কখনও বৌমাকেও লক্ষ্মীর তকমা দিয়ে সংসারে মঙ্গল বয়ে আনার কৃতিত্ব দেওয়া হয়। আর আমরা মেয়েরাও ভাবে গদগদ হয়ে নিজেকে লক্ষ্মী ভেবে বসি, সরষের মধ্যেই ভূত আছে ভেবে দেখি না একবারও। মঙ্গল ঘটার কৃতিত্ব নিলে অমঙ্গলের দায়টাও যে আমাদেরই নিতে হয়! সেইজন্যই মেয়েরাই অলক্ষ্মী হয়, তার জন্যই সংসারে আয়-উন্নতি হয় না; অলক্ষ্মী মেয়েরাই স্বামী খায়, সন্তান হারায়, ব্যবসায় মন্দা ডেকে আনে। যতদিন মেয়েদের অলক্ষ্মী বলে গাল দেওয়া হবে, যতদিন মেয়েদের লক্ষ্মী বলে পুজো করা হবে, যতদিন আমরা মেয়েরা নিজেকে লক্ষ্মীর আসনে বসাতে চাইব ততদিন মুক্তি নেই। মেয়েদের 'মানুষ' পরিচয়ে বিশ্বাস করতে না পারলে কীসের মুক্তি? কীসের নারী-স্বাধীনতা?

কিছু কিছু পুরুষ সদম্ভ ঘোষণা করে 'মেয়েরা বুদ্ধিহীন প্রাণী'। মেয়েদের নিয়ে যতো চটুল রসিকতা রকে, গলির মোড়ে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলে তার সবখানে আছে এই নিম্নরুচি এবং নিচুমনের পরিচয়, নারী বিদ্বেষের বীজ। খুব অবাক লাগে যখন দেখি মেয়েরাও এতে উচ্ছ্বসিত হয়ে খি খি করে হাসে! এখানেও আত্মঘাতী জাতিবিদ্বেষ আমাদের। পুরুষরা নারীদের এমনভাবে পুরুষতন্ত্রের কোণায় সেঁধিয়ে দিয়েছে যাতে নারীরা নিজেও সেখান থেকে বেরোতে সাহস না পায়, বেরোনোর ইচ্ছাপ্রকাশ না করে। মেয়েরাও কোনায় বসে পুরুষতন্ত্রের তন্তুটি টেনে ধরে শেখানো বুলি আওড়ায় পোষা ময়নাটির মতো।

অধিকাংশ নারী নির্যাতনই পুরুষ একা করে না। তার সঙ্গে কোথাও তার মা থাকে, কোথাও বোন, কোথাও পড়শি, কোথাও বান্ধবী। নারীর সমস্ত চলনে-গমনে পরাধীনতার বেড়ি পরাতে উৎসাহ দেখায় মেয়েরা নিজেও। তাহলে নারী-স্বাধীনতার মিছিলে আত্মঘাতী হামলাটি কে চালায়? নারী নিজেই। এই জন্যই, রামমোহন, বিদ্যাসাগর পুরুষ হয়েও, তাঁদের অনেকখানি শক্তি নারী-স্বাধীনতায় খরচ করেও নারীকে পুরোপুরি স্বাধীন করতে পারেন নি। নারীকে পুরুষ নিজস্বার্থে পরাধীন করে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু নারী যে নিজেও স্বাধীন হতে অক্ষম তার প্রমাণ একটা পঁচাশি বছরের মেয়ে বিধবা হয়ে সেজেগুজে ঠাকুর দেখতে বেরোলে তাকে শুনতে হয়, 'কী বেহায়া মেয়ে গো, কোনও শোক নেই! বিধবা মেয়ের এত সাজ!' কোনও স্বামীহারা মেয়ের শরীরের ওজন বাড়লে সমাজ নিন্দা করে, স্বামীর শোকে যে শুকায় না সে তো দুশ্চরিত্র! এই আত্মঘাতী আক্রমণগুলোও নারীর তরফ থেকেই বেশি আসে। অথচ, স্ত্রীহারা পুরুষকে শুকিয়ে মরতে হয় না, স্ত্রীহারা পুরুষের আনন্দ-উল্লাসে কোনও দূষণ থাকে না। উল্টে সমাজ তার মনোরঞ্জনে মনোনিবেশ করে, মনোযোগ দেয়। আহা রে! 'বয়েজ উইল বি বয়েজ' এটাই তো স্বাভাবিক !

যে কাজের প্রতি নিষ্ঠা পুরুষকে মহিমান্বিত করে, সেই নিষ্ঠাই কোনও নারীর চরিত্রে সন্দেহ জাগায়-অপিসে এত তাড়াতাড়ি যায় কেন? ফিরতেই বা দেরি হয় কেনো? কী এত কাজ থাকে অফিসে? অথচ, এই কারণগুলোই পুরুষ চরিত্রকে মহান করে তোলে-নিয়মনিষ্ঠ, সময়নিষ্ঠ, কর্মনিষ্ঠ পারফেক্ট পুরুষ! বাড়িতে ফিরে একটু বেশিই যত্ন-আত্তির অধিকার রাখে সে। এই অধিকারের দাবি শুধু কি পুরুষই করে? মেয়েরা ইন্ধন জোগায় না?

পুরুষ নিজে যে ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, স্ত্রীকে সেই স্বাধীনতা দিতে কুণ্ঠিত। যে পুরুষ বিশ্বাস করে, নিজের একটা আলাদা স্পেস থাকা ভীষণ জরুরি, সেই পুরুষই রান্নাঘর আর বিছানা ছাড়া গোটা পৃথিবীতে বৌয়ের জন্য আর কোনও স্পেস থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করে না। আর মেয়েরা? যে স্বাধীনতা সে পায় নি, সেই স্বাধীনতা শাশুড়ি, ননদ ঘরের বউকে দিতে চায় না ; যে স্বাধীনতা বৌমা চায়, সেই ব্যক্তি স্বাধীনতা সে শাশুড়ি, ননদের ক্ষেত্রে স্বীকার করে না। নিজের মেয়ের যে স্বাধীনতায় আমরা ফুল ছড়াই, ছেলের বৌয়ের জন্য সেখানে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করি। যে স্বাধীন জীবন নারী মনে মনে কামনা করে, সেই স্বাবলম্বন অন্য নারী যাপন করলে তাকে উচ্চস্বরে গাল পাড়ে। এমন আত্মঘাতী জাতি কি পৃথিবীতে আর আছে!

কেবল নারী-স্বাধীনতা বলে তো নয়, আমার অভিজ্ঞতা বলে, সব স্বাধীনতাই বাক-স্বাধীনতার মতো, আমি নিজে তো তাতে পূর্ণ আস্থা রেখে চলি, কিন্তু অন্য কেউ সেটা ফলাতে এলেই তার টুটি টিপে ধরি। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপরীতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি থাকবেই, থাকে বলেই তো আন্দোলন। কিন্তু আন্দোলনে এমন আত্মঘাতী হামলা চলতে থাকলে কতখানি গতি পাবে সে আন্দোলন? সত্যিকারের গতি পেতে হলে নারীকে বাদ দিতে হবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চাপিয়ে দেয়া তথাকথিত লক্ষ্মী হবার লোভ, বাসনা। খুঁজতে হবে নিজেকে নিজের সংজ্ঞায়, স্বাধীনতার সংজ্ঞায়।

445 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।